
।। নাদিয়া ইসলাম ।।
আজ ২২ আগস্ট। রবীন্দ্র সংগীতের মহীরুহ, গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম মুখ, গণসংগীতের দরাজ কণ্ঠের অধিকারী জর্জ বিশ্বাস ওরফে দেবব্রত বিশ্বাসের আজ জন্মদিন। দেবব্রতর জীবন মানে এক লহমায় খণ্ডিত পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা কিনা দ্রোহ, স্বপ্ন, বাংলাভাগের বেদনা, রাজনৈতিক প্রতিস্পর্ধা, রাজনৈতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের দ্বন্দ্ব, রাবিন্দ্রীক ট্যাবু বনাম গণমানুষের পরিসরে রবীন্দ্রনাথকে অধিষ্ঠিত করার মতো নানাবিধ উত্থানপতনের ঘটনায় কখনও রঙিন, কখনো-বা রক্তাক্ত। যা দেবব্রত নিজেই তাঁর আত্মজীবনী ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত‘-এ প্রকাশ করেছিলেন। আর সেই আত্মকথনকে ইতিহাসের গতিপথের সঙ্গে যুক্ত করে নাট্যকার ব্রাত্য বসু তার সফল প্রয়োগ করেছিলেন নাটকে। এবং সেই নাটক মঞ্চায়নে বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছিল। আর ‘ব্রাত্যজন’ প্রযোজিত ব্রাত্য বসুর সেই ‘রুদ্ধসংগীত’ নাটকের ভিতর থেকে দেবব্রত বিশ্বাসকে তাঁরই জন্মদিনে পাঠ করলেন নাদিয়া ইসলাম। ব্রাত্য বসুর নাটকের হাত ধরে নাদিয়া ঘুরলেন ইতিহাসের চড়াই-উৎরাই পথে।

স্পটিফাইয়ে আমার একটা প্লেলিস্ট আছে ‘দেবব্রত এসেনশিয়ালস্’ নামে।
তার প্রথম গানটা হইলো ঋত্বিক ঘটকের কোমল গান্ধার সিনামায় অনিল চট্টোপাধ্যায়ের লিপ-সিং করা রবীন্দ্রনাথের ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ’। এই গানটা আমি যতবার শুনি, বা যতবার ইউটিউবে এই ক্লিপটা দেখি, মনে হয়, আলুঝালু ঝাঁকড়া চুল অনিল যেইভাবে ল্যাগব্যাগা থ্রি-কোয়ার্টার ট্রাউযার্স আর ততোধিক ল্যাগব্যাগা একখান শার্ট পিন্দা পাহাড়ি রাস্তায় ঘাসে ঘাসে খালি পা ফেইলা ফুলের গন্ধে চমকায়ে উইঠা জানার মাঝে অজানারে পাইয়া বিস্মিত হইতে হইতে গান গাওনের অভিনয় করছেন, আর দেবব্রত যেইভাবে গম্ভীর খরখরা গলায় থাইমা থাইমা, “কান পেতেছি, চোখ মেলেছি, ধরার বুকে প্রাণ ঢেলেছি” লাইনে তিন অক্টেভে বেইজ নামায়ে প্রায় ফিসফিস স্বরে যেন কাউরে শুনতে দিতে চান না এমন ভঙ্গিতে গানটা গাইছেন, তাতে মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঋত্বিক দেবব্রত অনিল তো অবশ্যই, অসীম কালের হিল্লোলে যে জোয়ার-ভাঁটায় ভূবন দুলতেছে, তা নিজের নাড়ীর রক্তধারায় আমিও টের পাইতেছি। মনে হয় গানটার সাথে সাথে চেয়ারে বইসা আমিও খানিক দুলতেছি সামনে পিছে।
ব্রাত্য বসুর একটা থিয়েটার প্রডাকশান আছে, দেবব্রতরে নিয়া। নাম রুদ্ধসংগীত। দেবব্রতর আত্মজীবনী ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’ অবলম্বনে। ব্রাত্য বসু নিজেও এইখানে অভিনয় করছেন, সন্তোষকুমার ঘোষ চরিত্রে। আর দেবব্রতর ভূমিকায় দেবশঙ্কর হালদার।
তবে এই থিয়েটারের প্রথাগত রিভিউ আমার লেখার বিষয় না। আমার লেখার বিষয় এই থিয়েটারের মধ্য দিয়া দেবব্রতরে দেখা।
স্বীকার করতে সঙ্কোচ নাই যে শিল্পী দেবব্রতর সাথে আমার পরিচয় এবং প্রেম থাকলেও ব্যক্তি দেবব্রতরে আমি চিনতাম না। তার আত্মজীবনী ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’ আমার পড়া নাই। ব্যক্তি দেবব্রতরে আমি চিনছি ব্রাত্য বসুর এই থিয়েটারের মাধ্যমেই। ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’-এর পর আবারও গণনাট্যের ইতিহাস, আবারও দেশভাগের স্মৃতি, আবারও সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের স্ট্রাগল—এইসবরেই মঞ্চে প্রকাশ করছিলেন ব্রাত্য। আমি দেখছি এই থিয়েটার দেবব্রত বিশ্বাস বা জর্জ বিশ্বাসের জীবনরে ঘিরা বিভক্ত বাংলার পশ্চিম প্রান্তে বা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস চোখের সামনে মূর্ত হইয়া উঠতে। দেবব্রতর আত্মজীবনীর থিয়েট্রিকাল প্রকাশে উইঠা আসছে কমিউনিস্ট পার্টি ও তার সাংস্কৃতিক সংগঠন গণনাট্য সংঘের একইসঙ্গে গৌরব্জজ্বল ও আত্মঘাতী সময়কাল। থিয়েটারের ভিতর দিয়ে আমি প্রত্যক্ষ করলাম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি নিজের সমাজ বিপ্লবের ডাক দিয়া আধা-ঔপনেশিক-আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশে স্থা-বিরোধী রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি করলেও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার চর্চার নিজের কেন্দ্রস্থলই আন্তঃপার্টি পরিসরে হইয়া উঠছিল আধিপত্যবাদী শক্তি আকারে। কীভাবে দলীয় আমলাতন্ত্রও নেতৃত্বের সামন্তীয় মনোভাব ইন্টেলেকচুয়ালদের রাজনৈতিক স্ট্রাগল থিকা বিচ্ছিন্ন ও একা কইরা দেয় তাও ব্রাত্য বসুর নাটক তুইলা ধরছে দেবব্রত বিশ্বাসরে সামনে রাইখা। তুইলা ধরছে পলিটিকাল ও কালচারাল ব্যাটনের মধ্যে দ্বন্দ্ব। আর তারই সমান্তরালে বিশ্বভারতী থিকা আনন্দবাজারের মতো প্রতিষ্ঠানও রাবিন্দ্রীক শুদ্ধতার ট্যাবু। প্রতিষ্ঠানিকতার প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রতিষ্ঠান, এই দুইয়ের জাঁতাকলে রুদ্ধ হইয়া যাওয়া দেবব্রত বিশ্বাস থিকা ঋত্বিককুমার ঘটক, উৎপল দত্তদের সৃজন। বাংলা ভাগের যন্ত্রণা আর বিপ্লবের স্বপ্ন, এই দুই কারণেই কিশোরগঞ্জ থিকা কলকাতায় স্থিত হওয়া দেবব্রত বিশ্বাসের গান কীভাবে রুদ্ধ হইলো, কেন রুদ্ধ হইলো, কীভাবে তা ব্রাত্যজন হইলো তা নাট্যকার ব্রাত্য বসু থিয়েটারের ভাষায় মূর্ত করলেন। আর সেই থিয়েটারও মঞ্চস্থ হইলো নাট্যদল ব্রাত্যজনের তরফে। রুদ্ধসংগীত নামটা সেই কারণে যথার্থ। যা ‘বদ্ধ’ তা তো সঙ্গীত স্বরূপ না, বরং সঙ্গীত সেই সামাজিক প্রবাহ, যার ভিতর দিয়া গান সুর ছাড়ায়ে মানুষের স্বর হইয়া ওঠে। রুদ্ধসংগীত দেখাইছে দেবব্রত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এই সংগ্রাম কেবল তাল লয় উচ্চারণ স্বরের গভীরতা ব্যাখ্যামূলক স্বাধীনতা বা রবীন্দ্রনাথের গানের অনুমোদিত ব্যাকরণ নিয়া ছিল না। এই সংগ্রাম ছিল স্বয়ং কর্তৃত্ব নিয়া, কে গাইতেছে, কে ব্যাখ্যা করতেছে, কে রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকারী হইতেছে, কে জনগণের পক্ষে কথা বলতেছে এবং কে বুর্জোয়া পাণ্ডিত্য ও দলীয় অভিভাবকত্ব উভয়রেই প্রত্যাখ্যান করতেছে, তা নিয়াও।
রুদ্ধসংগীতে দেবব্রতরে আমরা দেখি আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির একলব্য এক ব্যক্তিত্ব হিসাবে, অনুমতিবিহীন এক শিষ্য, প্রাতিষ্ঠানিক আশীর্বাদ বিহীন এক গুরু, অরূপের রূপনির্মাতা এক অপ্রতিরোধ্য শিল্পী হিসাবে, যার শিল্পসৃষ্টির বুড়া আঙুলের দাবিতে তাবৎ সাংস্কৃতিক দ্রোণাচার্যরা শকুনের মতো অপেক্ষায় বইসা আছে শৈল্পিক গাছের ততোধিক শৈল্পিক উচ্চডালে। কিন্তু একলব্যের এই উপমা ব্যবহারে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে। দেবব্রত হাল আমলের ক্যান্সেল কালচারের তৎকালীন নিষ্ক্রিয় শিকার ছিলেন না। তিনি ক্যান্সেল হওয়ার প্রক্রিয়ার ভিতরে বইসাও ছিলেন তীব্র ঘাড়ত্যাড়া আর থিয়েট্রিকাল, রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত, এবং নিজের প্রকাশ্য শক্তি সম্পর্কে ভীষনভাবে সচেতন এক শক্তিরূপে। তিনি কেবল প্রতিষ্ঠানের বাইরে এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়ান নাই; তিনি প্রতিষ্ঠানরে তাদের অন্তর্ভুক্তি, সেন্সরশিপ এবং শাস্তির পদ্ধতি প্রকাশ করতে বাধ্য করছিলেন।
ইউটিউবে রুদ্ধসংগীতের ১ ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের টাইম স্ট্যাম্পে দেখা যায় আনন্দবাজার থিকা সন্তোষকুমার ঘোষ আসছেন দেবব্রতর বাসায়, আনন্দবাজারের পুরষ্কার অনুষ্ঠানের সূচনায় তারে গান গাওনের আমন্ত্রণ জানাইতে। দেবব্রত পান চিবাইতে চিবাইতে থুঃথুঃ করতে করতে পানদানিতে ছ্যাপ ফেলতে ফেলতে মুখে এক ধরণের শ্লেষমূলক হাসি ধইরা সন্তোষকুমাররে জিগান, “কইতাছি, আমারে গান গাওনের জইন্যে কত ট্যাহা দিবেন?”
সন্তোষকুমার দেবব্রতর আনন্দবাজাররে হ্যাটা করার সেই তাচ্ছিল্যের নাক-উঁচুপনার ভঙ্গিতে অপমানিত হন।
পরের দৃশ্যে দেখা যায় অবজ্ঞাত সন্তোষকুমার অহংকার ঘৃণা এবং ব্যথা মিশানো স্বরে মনোলগ দিতেছেন, “জানেন, যখন কেউ বলেন আমি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে, আমি তার মানে বুঝি না। আবার কেউ যখন বলেন আমি প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে, আমি তারও মানে ভালো করে বুঝি না। পক্ষে বা বিপক্ষে, এই শব্দ দু’টোকে মনে হয়, মানে—আমার অন্ততঃ মনে হয়, এক ধরণের ধাপ্পাবাজি। মানুষ তার অবস্থান অনুযায়ী এই শব্দ দু’টোকে নির্মাণ করে। অবস্থান বদলালে, শব্দ দু’টোরও স্থানান্তর ঘটে। বরং তার চাইতে আমি অনেক বেশি প্রতিভাবান, আমি মনে করি তাকে, যে নিজেই, নিজেই হয়ে উঠতে চাইছে একটা জ্যান্ত প্রতিষ্ঠান।”
ইন্টারেস্টিংলি এবং ইনটেনশনালি একই সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতেছে,
এ মণিহার আমায় নাহি সাজে-
এরে পরতে গেলে লাগে, এরে ছিঁড়তে গেলে বাজে
কণ্ঠ যে রোধ করে, সুর তো নাহি সরে…
হ্যাঁ, দেবব্রতর আচরণে সন্তোষকুমার অপমানিত হইছিলেন সত্য, কিন্তু এও সত্য যে সন্তোষকুমার জানতেন দেবব্রত সেই জিনিয়াস প্রতিভাবান যে প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানের প্রচলিত রূপের কাছে নতি স্বীকার না কইরা নিজে নিজেই একজন একক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হইয়া উঠতে সমর্থ হইছিলেন।

রুদ্ধসংগীত নাটকের নেপথ্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বাংলার ক্লান্তিকর দীর্ঘ বিংশ শতাব্দী। ঔপনিবেশিক সংকট দাঙ্গা ও দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলা ভাগ, তেভাগা আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টির আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স, ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন বা আইপিটিএ’র গঠন ও ভাঙন, শরণার্থী বাস্তুহীন সংসারের স্থানচ্যুতি, চীন-ভারত যুদ্ধ, ১৯৬৪ সালের সিপিআই বিভাজন, নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান, এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অমীমাংসিত ক্ষত। দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে, আগেই বলছি, বর্তমান বাংলাদেশে। কলকাতার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবনে কেন্দ্রীয় হইয়া ওঠা বহু পূর্ববঙ্গীয় সাংস্কৃতিক কর্মীর মতো, ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনরেও ৪৭-এ গায়ের জোরে শুধুমাত্র বাংলাভাগের আরোপিত ভূগোল থিকা মুক্ত করা যায় না। বঙ্গভঙ্গ কেবল দেবব্রতর মতো অসংখ্য মানুষরে (পড়েন: হিন্দু বা ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বীরে, বা নাস্তিক অমুসলমানরে) সীমান্তের ওপারে স্থানান্তরিত করে নাই, মানচিত্রে শুধুমাত্র একটা লম্বা আচানক রেখা টাইনা একটা বাড়ির দুইটা ঘররে দুই দেশে পাঠায় নাই, বঙ্গভঙ্গ মানুষের উচ্চারণ ভাষা বাচনভঙ্গি স্মৃতি শ্রেণিগত অবস্থান আত্মীয়তার কাঠামো শিল্পের উত্তরাধিকার এবং রাজনৈতিক আনুগত্যরেও স্থানচ্যুত করছিল। কলকাতা তখন কেবল শরণার্থী আগমনের প্রতিগ্রাহের একটা ঘনবসতির শহরই হইয়া উঠে নাই, কলকাতা তখন হইয়া উঠছিল ভগ্ন সমষ্টির সমবেত ভঙ্গুর স্মৃতির এক পরীক্ষাগারে।
এই ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার খানিক ইতিহাস কচকচানো জরুরি। এই ইতিহাসে আমরা দেখি একদিকে পার্টির ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক সংগ্রামের গল্প, আরেকদিকে নিজের ভিতরেই ক্রমাগত লাইন-সংগ্রাম, আমলাতন্ত্র, বিভাজন আর সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের চরিত্র। ১৯২৫ সালে কানপুরে সিপিআই’র আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ধরা হয়, যদিও তার আগেই তাসখন্দ বোম্বে কলকাতা মাদ্রাজ শ্রমিক সংগঠন আর ট্রেড ইউনিয়ন আর বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী বৃত্ত আর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট নেটওয়ার্কের ভিতর দিয়া ভারতীয় কমিউনিস্ট রাজনীতির বীজ তৈরি হইতেছিল। ব্রিটিশ সরকার শুরু থিকাই এই রাজনীতিরে রাষ্ট্রদ্রোহী বিপদ হিসাবে দেখছে; মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা তার বড় নিদর্শন। তার ফলশ্রুতিতে তিরিশের দশকে পার্টি বেআইনি অবস্থায় শ্রমিক ইউনিয়ন, কৃষকসভা, ছাত্র আন্দোলন আর ঔপনিবেশিক বিরোধী রাজনীতির ভিতর কাজ করতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্টি-লাইন বড় রকম পরিবর্তনের ভিতর দিয়া যায়; প্রথমে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধ, পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর নাৎসি আক্রমণ পরবর্তী জনযুদ্ধের লাইন সূত্রে। এই লাইন বদলের ফলে ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন নিয়া পার্টির অবস্থান জাতীয়তাবাদী জনমনে সন্দেহ তৈরি করে, কিন্তু একইসঙ্গে তা শ্রমিক-কৃষক সংগঠনে পার্টি শক্তিও বাড়ায়। এরপর ’৪৩-এর মনন্তর থিকা তেভাগা থিকা ’৪৬-এর নৌবিদ্রোহে কমিউনিস্ট উপস্থিতি শুধু দলীয় রাজনীতি না, বাংলার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্ররেও নাড়া দিছিল। স্বাধীনতার পরপরই, ’৪৮ সালে সিপিআই নিষিদ্ধ হয়; বি. টি. রণদিভের লাইনে সশস্ত্র অভ্যুত্থানমুখী রাজনীতি এই সময়ের বাস্তবতা। ১৯৫১-এর পর পার্টি আবার সংসদীয় রাজনীতিতে ফেরত আসে, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিতরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৫৭ সালে কেরালায় প্রথম নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার গঠন করে। কিন্তু এই সংসদীয় রাজনীতিই ভবিষ্যতের সংশোধনবাদ বিতর্কের ভিত তৈরি করে। ১৯৪৯-এ চীনা-বিপ্লব আর ১৯৫৩ সালে স্তালিন মারা যাওয়ার পরে ’৫৬-তে ক্রুশ্চেভের ‘ডিস্তালিনাইযেশান’ পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ধীরে ধীরে যখন ‘অন্য’ পথ ধইরা হাঁটতে শুরু করলো, তখন সেই অন্য পথ নিয়াই চীনের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ানের দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকলো। আর এই আন্তর্জাতিক ফাটল ভারতীয় কমিউনিস্টদের ভিতরেও আরেক নতুন ফাটলের জন্ম দিলো। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ সেই ফাটলরে প্রায় তীব্র পর্যায়ে নিয়া যায়; জাতীয় প্রতিরক্ষা, আন্তর্জাতিকতাবাদ, চীন-সমর্থন, ভারত রাষ্ট্রের চরিত্র প্রশ্নে পার্টির ভিতর তীব্র সংঘাত শুরু হইলো। এরপর ১৯৬৪ সালে সিপিআই ভাঙে এবং সিপিআই(এম) আলাদা সংগঠন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পুরানা সিপিআই তুলনামূলকভাবে সোভিয়েতপন্থী ও সংসদীয় সহযোগিতামুখী লাইনে থাইকা যায় আর সিপিআই(এম) তুলনামূলকভাবে নিজেরে বিপ্লবী কংগ্রেসবিরোধী ও সংশোধনবাদ বিরোধী হিসাবে দাঁড় করায়। যদিও পরের ইতিহাসে সিপিআই(এম)-এর নিজের ভিতরেও আমলাতান্ত্রিকতা আর নির্বাচনী রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে আপস আমরা দেখি। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে; জ্যোতি বসু তখন উপমুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। সেই বছরই নকশালবাড়িতে কৃষক বিদ্রোহে পুলিশ গুলি চালাইলে নারী-শিশুসহ কয়েকজন কৃষক মারা যায়, আর সেইখান থিকা চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতালদের নেতৃত্বে বিপ্লবী কমিউনিস্ট ‘মাও চিন্তাধারা’র ধারার উত্থান ঘটে (Shah & Jain, 2017; Singh, 2026)। যদিও মাওবাদ শব্দের বদলে ‘মাও চিন্তাধারা’ বা ‘মাও চিন্তাপ্রভাবিত’ বলাই এই ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ। এদিকে ১৯৬৭-৬৮ পর্বে সিপিআই(এম)-এর ভিতরের বিপ্লবী অংশ এআইসিসিআর গঠন করে এবং পরে ১৯৬৯ সালে সিপিআই(এমএল) তৈরি হয়। সত্তর দশকে আইসা এই ধারা শহরের ছাত্র-যুব রাজনীতিতে ছড়ায় এবং গ্রামে-গ্রামে তা জমিদার-জোতদার ও স্থানীয় শ্রেণিশত্রু বিরোধী সহিংসতায় রূপ নেয়। রাষ্ট্র তার জবাবে দমন আর পুলিশের এনকাউন্টার নামায়। এর ভিতরেই পার্টি ভাঙে, আত্মঘাতী লাইন তৈরি হয়, আর বিপ্লবী রোমান্টিসিজমের এক জটিল ইতিহাসের সূত্রপাত হয় (History of Communist Party of India, 2022)। একই সময়ে সিপিআই ক্রমে ইন্দিরা গান্ধীর রাষ্ট্রনীতির কাছাকাছি অবস্থান নেয়, আর সিপিআই(এম) সংসদীয় বামপন্থার প্রধান ধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে সত্তর দশকে আইসা ভারতীয় কমিউনিস্ট রাজনীতিরে একসাথে তিন রূপে দেখা যায়, (১) রাষ্ট্রক্ষমতার ভিতরে ঢুকতে চাওয়া সংসদীয় বাম, (২) পার্টি-শৃঙ্খলাপরায়ণ কেন্দ্রীভূত সংগঠন, আর (৩) রাষ্ট্র ও পার্টি উভয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বিপ্লবী অসন্তোষ।
দেবব্রতর সাংস্কৃতিক ইতিহাস এই বৃহত্তর কমিউনিস্ট ইতিহাসের ভগ্ন সমষ্টির সাথে জড়িত।
দেবব্রতর একই টাইমলাইনে বাস করা হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী বা ঋত্বিক কুমার ঘটকের দিকে তাকাইলেই এই সমষ্টির বিচ্ছেদের ঐতিহাসিক ঐক্য চোখে পড়ে। আমরা দেখি, এরা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন প্লাটফর্মে পূর্ববঙ্গ গণ-রাজনীতি প্রতিরোধের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ক্ষত আর বেদনা আর ক্ষোভ আর অভিমান বহন কইরা চলতেছেন। হ্যাঁ, শব্দটা অভিমানই।
অভিমান, যেই বাংলা শব্দের ইংরেজি হয় না।
১৯৪৩ সালের বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নিয়া বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’, শম্ভু আর তৃপ্তি মিত্রের নাটক, বহুরূপীর ইতিহাস এবং মঞ্চনাটক ও পথনাটকের পরিবর্তনশীল সম্পর্ক, বা অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা সলিলের সুরে ‘তেলের শিষি ভাঙলো বলে খুকুর ’পরে রাগ করো’ গান—সবই একই অভিমানের একই টানাপোড়েনের অন্তর্গত রাজনীতি। এইখানে প্রশ্ন এই না যে শিল্পরে রাজনৈতিক হইতে হবে কি না। দুর্ভিক্ষ দেশভাগ এবং শ্রেণি-বিদ্রোহের পর বাংলায় শিল্প ইতোমধ্যেই ভয়ংকরভাবে রাজনৈতিক ছিল। মূল প্রশ্নটা ছিল এই যে, রাজনৈতিক শিল্পরে প্রশাসনিকভাবে অনুগত হইতে হবে কি না, নন্দনতত্ত্বরে প্রচারণার ঊর্ধ্বে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সাংস্কৃতিক কর্মীরা রাজনৈতিক দলের পা-চাটা দালাল না হইয়াও কমরেড হইতে পারবে কি না, এবং দল এমন সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তারে বা সৃজনশীলতারে সহ্য করতে পারবে কি না যা কেবল দলীয় নীতির এ-বি-সি’রে গান নাটক বা চলচ্চিত্রে রূপান্তর ছাড়াও একান্ত শিল্প হিসাবে বাংলার আকাশেবাতাসেফুলেফলে বিরাজিত থাকার ‘অনুমতি’ পাবে।
এই কারণে রুদ্ধসংগীত কেবল দেবব্রত বা সমসাময়িকদের জীবনীমূলক নাটক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ না, বরং ‘বাম’ নামক মহান ‘বস্তু’খানির সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের নাট্যিক মনন হিসাবেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই নাটক বাংলার কমিউনিস্ট আধুনিকতার অভ্যন্তরীণ মধ্যযুগীয় দ্বন্দ্বরে মঞ্চস্থ করছে, অথবা অন্ততঃ আমাদের তা মঞ্চস্থ করতে আহ্বান জানাইতেছে। ঐতিহাসিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টি লৈঙ্গিক আধিপত্যবাদী (পড়েন: পিতৃতান্ত্রিক) সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম উৎসরিত রহস্যময়তা এবং জমিদার ও সামন্ততন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ, উদ্বৃত্ত সম্পদ নির্ভর অর্থনীতি (পড়েন: পুঁজিবাদ) এবং বুর্জোয়া শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান কইরা আসছে; অথচ রুদ্ধসংগীত নাটকের মাধ্যমে আমরা তৎকালীন বাংলায় দেখি প্রাতিষ্ঠানিক বামপন্থা তার নিজস্ব কাঠামোর মধ্যেই, বিশেষতঃ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণের চাপে প্রায়শই বুদ্ধিবৃত্তিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সন্দেহ বজায় রাইখা আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব থিকা শুরু কইরা পিতৃতান্ত্রিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক ঊর্ধ্বতনের প্রতি এক ধরনের সামন্ততান্ত্রিক শ্রদ্ধার পুনরুৎপাদন করতেছে ক্রমাগত। আমি এই ক্ষেত্রে নোক্তা দিয়া রাখতে চাই এই বইলা যে, এই আলাপ উদারনৈতিক বা এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল অর্থেও কমিউনিজম-বিরোধী আলাপ না। এই আলাপ মুক্তিকামী রাজনীতির কর্তৃত্ববাদী বিকৃতির বিরুদ্ধে আলাপ। আমার (ব্যক্তিগত = রাজনৈতিক) সমস্যা এও না যে বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন সমাজরে রূপান্তরিত করতে চাইছে। সমস্যা এই যে এই রূপান্তরের প্রক্রিয়া পার্টি প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্যের মাধ্যমে উৎপাদন করার চেষ্টা করছে।
মজার বিষয় এই, সিপিআইয়ের কালচারাল ফ্রন্টের মাধ্যমেই পার্টির এই রাজনৈতিক ভণ্ডামি দ্বিচারিতা বেশ্যাবৃত্তির স্বরূপ উন্মোচিত হইছিলো। রুদ্ধসংগীতের সেটে কার্জন পার্কের যেই গাছটা দেখা যায়, যার পাতাগুলা নানা রঙের আলোয় জ্বইলা ওঠে, সেই গাছটাই গণনাট্য সংঘ, আইপিটিএ। আর সেই আলোকমঞ্জরীগুলা একেকজন সাংস্কৃতিক নক্ষত্র—দেবব্রত হেমাঙ্গ সলিল ঋত্বিক বিজন শম্ভু তৃপ্তি। একেকটা রঙ একেকটা আর্টিস্টিক ফর্ম এবং আর্টিস্টিক জনরা; দেবব্রত’র প্রথাবিরোধী রবীন্দ্রসংগীত, সলিলের অর্কেস্ট্রাল আধুনিকতা ও গণগীতিময়তা, হেমাঙ্গর গণসংগীত, ঘটকের এ্যানার্কিস্ট চলচ্চিত্র, বিজনের দুর্ভিক্ষ-নাট্য, মিত্রদের নাট্যরূপের পুনর্নির্মাণ। মাও বলছিলেন, শতফুল বিকশিত হোক। আইপিটিএ’তে সত্য সত্যই সেই শতফুল বিকশিত হইছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক উত্তরজীবন নিজেই রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নে নিয়োযিত হইয়া শেষ পর্যন্ত সেই বহু রঙের সতেজ গাছটারে এক রঙের এক ভঙ্গির এক লাইনের এক মিলিটারি অনুমোদিত শৃঙ্খলার বুট জুতার কুচকাওয়াচের সোজা সোজা হইয়া দাঁড়ায়া থাকা একখানি রেনেসন্স আর বারোক বাগানের হর্টিকালচারাল শিল্প নামক মেকানিকাল টপিয়ারি শৃঙ্খলিত গাছ বানাইতে চাইছে। ফলতঃ গাছটা মরে নাই ঠিকই, কিন্তু পার্টির সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান ক্রমে বন্ধ হইছে। পার্টি ভাবছিলো গাছটারে শাসন করতেছে; কিন্তু আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস থিকা বিচ্ছিন্ন হইতেছিল মাত্র। নাটকের একটা দৃশ্যে জ্যোতি বসুর উপস্থিতিতে ঋত্বিককুমার ঘটকের সঙ্গে প্রমোদ দাশগুপ্তের বাকবিতণ্ডায় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আমরা দেখি। নিজের বিরুদ্ধে উঠা ব্যক্তিগত স্খলনের অভিযোগ খারিজ করতে গিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনে ঋত্বিক পার্টি নেতৃত্বের সামন্তবাদী মনোভাবরে সামনে নিয়া আসেন। আমরা জানি কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের কাছে ঋত্বিক একখানি থিসিস জমা দিছিলেন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পার্টির অবস্থান ও রণকৌশল প্রসঙ্গে। যেইটা পরে ‘অন দ্যা কালচারাল ফ্রন্ট’ নামে বই হিসাবে প্রকাশ হইছে। কিন্তু ঋত্বিকের সেই থিসিস কমিউনিস্ট পার্টি তো ধামাচাপা দিয়া বহুকাল ফালায়ে রাখছিলই, এবং তার জীবদ্দশাতেও সেই থিসিস তারা প্রকাশ করতে দেয় নাই।
তো এই সাংস্কৃতিক পুলিশগিরির বৃহত্তর ইতিহাসের ভিতরেই রবীন্দ্রসংগীত নিয়া বিশ্বভারতীর সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাসের পরের দিককার সংঘাতরে তাই বসাইতে হবে। বিশ্বভারতীর আপত্তি তো কেবল কোনো খামখেয়ালি ‘মাথাখারাপ’ শিল্পীর সঙ্গে কোনো সঙ্গীত-প্রতিষ্ঠানের রুচিগত মতভেদ ছিল না; এই আপত্তির ভিতর দিয়া আসলে প্রশ্ন উঠছিল রবীন্দ্রনাথের গান কার, জীবন্ত মানুষের, না শুদ্ধতার পাহারাদার এক ব্রাহ্মণ জাতীয় পুরোহিত শ্রেণির? দেবব্রতর গাওয়া গান সেই অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্বরে বিপদে ফেলছিল, কারণ তিনি রবীন্দ্রসংগীতরে মন্দিরের ভিতরকার নিষ্কলুষ বিশুদ্ধ উচ্চারণ না বানায়া ইতিহাসমাখা দেহমাখা ব্যক্তিগত অথচ বিদ্রোহী এক ব্যক্তিগত কণ্ঠে ‘নামায়া’ আনছিলেন। তার গলা কোনো পূর্বানুমোদিত ঠাকুরীয় সারসত্যের কাচের মতো স্বচ্ছ বাহন ছিল না; সেই গলায় ছিল শস্যদানা, ক্ষত, শ্লেষ, শ্বাস, বয়স, আর অসম্মতি। ফলে তার ক্ষেত্রে “সুরসন্ধান যেন স্বরসন্ধান না হয়ে ওঠে” কথাটা উল্টাইয়া যায়: সুরের সন্ধানই তার কাছে স্বরের সন্ধানের সঙ্গে যেন অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হইয়া উঠছিল। তার গান শুধু জিজ্ঞেস করে নাই, গানটা কেমন কইরা কোন্ ব্যকরণে কোন্ যন্ত্রে কোন্ ভাবে চোখ মেইলা চোখ বুইজা গাওয়া উচিত; তার গান জিজ্ঞেস করছিল, গান গাওয়ার অধিকার আসলে কার?
অথচ রবীন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন প্রথাবিরোধী ব্যাকরণ-ভাঙা জাতিবাদবিরোধী আধুনিক লোক। ১৯১৬-১৭ সালে আমেরিকা আর জাপান সফরের সময় রবীন্দ্রনাথ তার বক্তৃতায় সংগীতরে জাতিরাষ্ট্রের মেশিনারি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগের ভাষা হিসাবে বলছিলেন (রবীন্দ্রনাথের ‘ন্যাশনালিজম’ বক্তৃতার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আমেরিকায় | The Daily Star, n.d.)। তিনি নিজে প্রতিষ্ঠানী শুদ্ধতার পাহারাদারদের বিপরীতে অবস্থান করছেন। তিনি মানুষের অনুভূতিরে চিরপুরাতন ভাবছেন সত্য, কিন্তু সেই পুরাতন অনুভূতি প্রকাশের নতুন মাধ্যম নিয়া তার আপত্তি ছিল না। তার কাছে নতুন ছিল তাই, যা যুগের পর যুগ প্রাণী-হৃদয়রে তৃপ্ত করতে পারে। ক্ষণস্থায়ী নব্যতা না, বরং চিরপুরাতনের পুনরাবিষ্কারই শিল্পরে সত্যিকার অর্থে নূতন করে তোলে বইলা তিনি ভাবতেন।
সাহিত্য সর্ব দেশে এই কথাই প্রমাণ করে আসছে যে, মানুষের আনন্দনিকেতন চিরপুরাতন। কালিদাসের মেঘদতে মানুষ আপন চিরপুরাতন বিরহ বেদনারই স্বাদ পেয়ে আনন্দিত। সেই চিরপুরাতনের চিরনূতনত্ব বহন করছে মানুষের সাহিত্য, মানুষের শিল্পকলা। এইজনেই মানুষের সাহিত্য, মানুষের শিল্পকলা সর্বমানবের। তাই বারে বারে এই কথা আমার মনে হয়েছে, বর্তমান ইংরেজি কাব্য উদ্ধতভাবে নূতন, পুরাতনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী-ভাবে নূতন। যে তরুণের মন কালাপাহাড়ি সে এর নব্যতার মদির রসে মত্ত, কিন্তু এই নব্যতাই এর ক্ষণিকতার লক্ষণ। যে নবীনতাকে অভ্যর্থনা করে বলতে পারি নে—
জনম অবধি হম রপে নেহারনু নয়ন ন তিরপিত ভেল,
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু তবু হিয়া জুড়ন ন গেল—
তাকে যেন সত্যই নূতন ব’লে ভ্রম না করি, সে আপন সদ্যজন্মমুহূর্তেই আপন জরা সঙ্গে নিয়েই এসেছে, তার আয়ুঃস্থানে যে শনি সে যত উজ্জ্বলই হোক তবু সে শনিই বটে।(ঠাকুর, ১৯৫৮)
রুদ্ধসংগীতে আমরা দেখি দেবব্রত নিজে রবীন্দ্রনাথ কৌট করতেছেন এই বইলা যে,
“কিন্তু হারমোনি ইওরোপীয় সঙ্গীতে ব্যবহার হয় বলিয়াই যদি তাকে একান্তভাবে ইওরোপীয় বলিতে হয়, তবে একথাও বলিতে হয় যে দেহতত্ত্ব অনুসারে ইওরোপে যে অস্ত্রচিকিৎসা চলে, তাহা ইওরোপীয়, অতএব বাঙালীর দেহে ওটা চালাইতে গেলে ভুল হইবে।” (Bratyajon, 2021)
এইক্ষেত্রে উল্লেখ্য এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক সত্যাসত্য বিষয়ে সন্দেহ আছে। তবে রবীন্দ্রনাথ এই কথা বইলা থাকুক বা নাই থাকুক, তিনি নিশ্চিতভাবে তার নিজের লেখা গান গাওয়ার ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক খবরদারি আরোপ কইরা যান নাই।
এইখানেই আনন্দবাজারের মতো পুঁজিবাদী সংবাদপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকারে একই প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ের ভিতর ধরতে হয়। সন্তোষকুমারের ব্যক্তিগত আঘাত অহং অনুরাগ বা প্রতিশোধস্পৃহা নিয়া আগেই বলছি, রুদ্ধসংগীতের সেই ইশারারে সরাসরি ঐতিহাসিক সত্য বানায়া ফেলা হয়তো ঠিক হবে না; এই জায়গায় প্রমাণের দরকার আছে। কিন্তু বিশ্লেষণের জায়গা থিকা প্রশ্নটা কোনো একক সম্পাদকের মান-অভিমানের চাইতেও বড়। আমরা দেখছি বাংলার উচ্চঘর কংশরাজের বংশধর এলিট সংবাদপত্রগণ বারবার এমন এক গেইটকিপিং মেশিন হিসাবে কাজ করছে, যা বিদ্রোহরে নান্দনিকভাবে ব্যবহারযোগ্য মনে হইলে তারে মুকুট পরায় মাথায় তুইলা নাচছে, আর সেই বিদ্রোহ সম্পাদকীয় পোষ মানতে না চাইলে তারে লাথি মাইরা মাটিতে ফালায়া দিছে।
এবং এই ক্ষেত্রে বিশ্বভারতী যদি শুদ্ধতার অর্চকতীয় পুরোহিতি অধ্বর্যু কর্তৃত্ব হয়, বুর্জোয়া সংবাদপত্র আনন্দবাজার তাইলে তার চলমান বাজারক্ষমতাসম্পন্ন নতুন মিডিওকার সংস্করণ হিসাবে প্রতিভাত হইতে পারে।
এছাড়াও রুদ্ধসংগীতের ভিতর দিয়া যে দার্শনিক সমস্যাটা বারবার ফিরা আসে তা হইলো শিল্পের স্বাধীনতা আর ইতিহাসের নির্ধারণের সম্পর্ক। সাত্রে যেইভাবে অস্তিত্ববাদী স্বাধীনতারে মার্ক্সীয় ইতিহাসচিন্তার সঙ্গে কথা বলাইতে চাইছিলেন, সেই চেষ্টা এইখানে কাজে লাগে, দেবব্রতরে কোনো ইউরোপীয় তত্ত্বের খাঁচায় ঢুকানোর জন্য না, বরং দেবব্রতর জীবন নিজেই একই রকম এক সমস্যারে সামনে আনে বইলা। সাত্রে বলছিলেন, মানুষের স্বাধীনতা কোনো আকাশ থিকা পড়া বিমূর্ত স্বাধীনতা না; মানুষ সবসময় একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ভিতরে নিক্ষিপ্ত, শ্রেণি শ্রম দারিদ্র্য যুদ্ধ ঔপনিবেশিকতা দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠান ভাষা শরীর সবকিছুর ভিতরে। অর্থাৎ মার্ক্সবাদ যদি আমাদের শেখায় ইতিহাসের বস্তুগত কাঠামো উৎপাদন সম্পর্ক শ্রেণিসংগ্রাম শোষণের হাতিয়ার; অস্তিত্ববাদ সেই ক্ষেত্রে আমাদের মনে করায় এই কাঠামোর ভিতরেও মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, দায় নেয়, স্বীকার বা অস্বীকার করে, সহযোগিতা করে, বিশ্বাসঘাতকতা করে, প্রেম করে, বা অসম্ভব মনে হওয়া স্বাধীনতার দিকে হাত বাড়ায়। সাত্রের কাছে তাই স্বাধীনতা কোনো লিবারেল পছন্দের বাজার না, আবার ইতিহাসও কোনো লোহার খাঁচা না। সুতরাং হ্যাঁ দেবব্রত শিল্পী হিসাবে উদারনৈতিক অর্থে ‘স্বাধীন’ ছিলেন না তা জানা কথাই, (অবশ্য স্বাধীন আমরা কে?)—ফলতঃ তার সামনে নিরপেক্ষ কয়েকটা বিকল্প সাজানো আছে আর তিনি ‘স্বাধীনভাবে’ একটা বাছাই করতেছেন, বিষয়টা তেমন কোনোদিনই ছিল না। তার যে স্বাধীনতা, এই স্বাধীনতা মূলতঃ বন্দীদশার স্বাধীনতা; দেশভাগ শ্রেণিসংগ্রাম পূর্ববঙ্গের স্মৃতি—রবীন্দ্রনাথের কর্তৃত্ব, কমিউনিস্ট পার্টির দাবি, বিশ্বভারতীর অনুমোদন-ব্যবস্থা, আনন্দবাজারি বুর্জোয়া সংবাদক্ষমতা, রেকর্ড কোম্পানির বাজার, অসুখ বার্ধক্য রাষ্ট্র এবং পুঁজির ভিতর দিয়া ‘পাওয়া’ স্বাধীনতা।
তাই দেবব্রত বিশ্বাসরে নিয়া লেখা মানে শেষ পর্যন্ত সেই সব কর্তৃত্বের ব্যর্থতা নিয়া লেখা, যারা তারে আটকায় রাখতে চাইছিল, তার উপর শর্তারোপ করতে চাইছিল; সেইসব প্রাতিষ্ঠানিক ঠাকুরীয় বিশুদ্ধতাবাদ, পার্টির আমলাতন্ত্র, উদারনৈতিক রাজনীতি, পুঁজিবাদী মিডিয়ার ক্ষমতা, আর সেই ধর্মীয় বা প্রায়-ধর্মীয় ভক্তিভাব, যা শিল্পরে জীবন্ত অভিজ্ঞতা না বানায়া আচার-অনুষ্ঠানের সম্পত্তি বানাইতে বদ্ধপরিকর ছিল, তাদের শিল্পের স্বাধীনতার উপর ছুরি চালাইতে চাওয়ার ব্যর্থ আস্ফালন নিয়া লেখা। রুদ্ধসংগীত গান বন্ধ কইরা দেওয়ার সেই আস্ফালনের আরেক নাম। রুদ্ধসংগীত তাই “ক্যারে হেরা আমারে গাইতায় দিলা না। আমি বুঝতাম পারলাম না। এই কথাডা তো ব্যাবাকের আসে জানা। জাইন্যা হুইন্যাও কেউ কিসু পরাও করে না।” (কত কথা, কত সুর, 2023) তবে দেবব্রত’র ঐতিহাসিক তাৎপর্য এইখানেই যে গান শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে নাই, তারে বন্ধ করা যায় নাই। তার মৃত্যুর তিরিশ বছর পরও তা ফিরা আসছে আমার প্লেলিস্টে যুক্তি হিসাবে, ক্ষত হিসাবে, স্মৃতি হিসাবে, অভিমান হিসাবে, আর সেই রাজনীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসাবে, যেই রাজনীতি বারবার শিল্পের পাশ থিকা, শিল্পীর পাশ থিকা সইরা গেছে, অথচ তাদের হাতেই শিল্পের শিল্পীর কল্পনাশক্তির ক্যালিডোস্কোপিক ম্যাজিক তৈরি হইছিল একদিন, এই বাংলায়।
আর সেই ম্যাজিক মঞ্চে হাজির করছিলেন ব্রাত্য। গণসংগীত ও যূথবদ্ধতা মঞ্চে প্রকাশ কইরা সেই ম্যাজিক হইয়া উঠছিল রঙিন সত্য, সেটের সেই গাছখানির মতোই। অভিনয় শিল্পীদের প্রাণবন্ত অভিনয় রঙ ও রস নিয়া অন্য সময় আলাপ দেওয়া যাবে হয়তো। কিন্তু ইতিহাসের চলন যে বিভক্ত বাংলার দুই পারেই বেদনাবিধুর, তা বইলা আপাততঃ অদ্যকার আলাপ শেষ করা যাক। তাই মঞ্চে যূথবদ্ধতায় প্রকাশ হওয়া অভিমানী জর্জ বিশ্বাসের পরিণতি ইজিচেয়ারের নিঃসঙ্গতায়। তাঁর যেই দিন ‘গেছে ভেসে’, সেইদিনগুলিতে আলোকপাত করলেন নাট্যকার ব্রাত্য বসু।
আর সেই আলোয় আমরাও, আমিও ভাসলাম, মুগ্ধতা মায়া আর বাংলার রক্তাক্ত ইতিহাসের বেদনায়।

তথ্যসূত্র
Bratyajon. (2021, May 27). Ruddhasangeet | Bengali Play | Bratya Basu [Video recording]. https://www.youtube.com/watch?v=Zm5xWbxLUng
History of Communist Party of India. (2022, March 16). CPI Official App. https://www.communistparty.in/post/history-of-communist-party-of-india
Shah, A., & Jain, D. (2017). Naxalbari at its Golden Jubilee: Fifty recent books on the Maoist movement in India. Modern Asian Studies, 51(4), 1165–1219. https://doi.org/10.1017/S0026749X16000792
Singh, D. M. (2026). The Naxalbari Uprising of 1967: Causes, Course and Consequences. JOURNAL OF ADVANCE AND FUTURE RESEARCH, 4(7), a650–a656.
কত কথা, কত সুর. (2023, May 2). ক্যারে হেরা আমারে গাইতায় দিল না—দেবব্রত বিশ্বাস [Video recording]. https://www.youtube.com/watch?v=qAof7DW2gjY
ঠাকুররবীন্দ্রনাথ. (১৯৫৮). সাহিত্যের স্বরূপ. বিশ্বভারতী.
রবীন্দ্রনাথের ‘ন্যাশনালিজম’ বক্তৃতার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আমেরিকায় | The Daily Star. (n.d.). Retrieved August 22, 2026, from https://bangla.thedailystar.net/literature/news-671446
নাদিয়া ইসলাম

লেখক, গবেষক, ভিগান, অজ্ঞেয়বাদী, বিড়ালপ্রেমিক, নারীবাদী এবং কনস্পিরেসি থিওরির একনিষ্ঠ ভক্ত। জন্ম ১৯৮৫ সালে।
