আজ , ,

বিড়াল পালনের নিয়মাবলী

শিশুর কান্নায় ঘুম ভেঙে যায় তার। সে একটা স্বপ্ন দেখতে ছিল। যেন সকাল বেলা উঠানে এক অল্পবয়সী মা তার শিশুর গায়ে তেল মাখছে। শিশুটিকে পাটিতে শোয়ায় রেখে মা কোথাও চলে যায়। তখনই বৃষ্টি নামে। বৃষ্টিতে ভিজে বাচ্চাটি কান্না করতে থাকে। তার মনে হয় বাচ্চাটি বুঝি তার। তখন তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙার পরেও, বাচ্চার কান্নার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পাইতেছে— এমন মনে হয় তার। ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করে সে। না, কিছু শোনা যায় না আর। ফের ঘুমায়ে পড়ে সে। বাহিরে তখন দুনিয়া ভাসানো তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।

মাঝের বাড়ি। বাড়িটিকে সবাই এই নামে চিনে। বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেত, তার মাঝে বাড়িটি। বাড়িতে অনেক দিন কেউ থাকেনি। মাস কয়েক থেকে একজন থাকা শুরু করছে। বছর কয়েক আগেও শাদা কোমর বাঁধানো বাড়িটাকে দূর থেকে নজর পড়তো। ফাল্গুনে বাড়ির চারপাশের মাটি তুলে আইল বাঁধা হত। চৈত্রের শেষে বৈশাখে কাঁচা মাটি শুকায়ে শাদা হয়। এ বিশেষত্ব ছাড়াও— বিরাট মাঠের মধ্য একাকী এক বাড়ি, নজরে পড়বে বইকি! এত বছরে মাটি নেমে গেছে। গাছের শিকড় বেরিয়ে পড়ে ঝুঁকে গেছে এদিক সেদিক। সবগুলো ফজলি আম গাছ। এক হাত সমান এক একটা আম। পাকলে হলুদ। বাড়িতে একটাই ঘর, কাঁচা ইটের পেল্লায় দোতলা ঘর। এ অঞ্চলে কাঁচা ইটের ঘরের প্রচলন নেই। এটাই একমাত্র ঘর। ঘরের এক পাশের দেয়াল বেয়ে উঠে গেছে একটা বট গাছ। দেখলে মনে হয় বট গাছটি ছাড়া বাড়িটা বুঝি অসম্পূর্ণ।

রাতে বৃষ্টি হবার ফলে মাটি কিছুটা পিচ্ছিল। আমিন সাবধানে হেঁটে পুকুর পাড়ে যায়। তার একপা খাটো, ফলে সে খুঁড়িয়ে হাঁটে। সে একটি মটকিলা ডাল ভেঙে দাঁতন করতে থাকলে শিশুর কান্না শুনতে পায়। তখন তার রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে। আমিন কান্নার উৎস খুঁজতে থাকে। বাড়িটা ঘনঝোপ আর বিরাট সব আম গাছে ভর্তি। সে এ বাড়িতে থাকা শুরু করলে প্রথম দিকে কিছুটা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে। তা আর কতটা পারে, এরপর ক্ষান্ত দেয়। হয়ত সেও চায় এই ঝোপ জঙ্গল বাড়ুক। সেও কি চায় তাদের অংশ হইয়া উঠতে? কান্নার উৎসটা খুঁজে পায় এটা আম গাছের খোড়লের মধ্যে। একটা বিড়ালের বাচ্চা থেমে থেমে মনুষ্য শিশুর মতো কাঁদতে ছিল ।

*
নওয়াব আলী খাঁর গুটি বসন্ত হয়। দেশের শেষ বসন্ত মহামারি। প্রতিদিন লাশ পড়ে। নওয়াব আলীর ঘরে এক বছর বয়সী ছেলে। এক কলস পানি আর একটা হোগলার মাদুর নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। বউকে বলে যায় তার খোঁজ না নিতে। তিন কানি ভূঁইতে গিয়ে শুয়ে পড়ে। তিন কানি ভূঁই নিয়ে নওয়াব আলী খাঁর একটা অহংকার আছে। এক দাগে এক খণ্ডে তিন কানি জমিন কার আছে আর। মরলে নিজ জমিনে মরবে এই মনের আশা। তিন কানি ভূঁইতে নওয়াব আলী খাঁ মরে, তবে তা বহুর বছর পর। ততদিনে তিন কানি ভূঁইতে নওয়াব আলী খাঁর মাঝের বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে।

*
আমিন, বিড়ালের বাচ্চাটারে নিয়ে ঘরে তোলো। আমিন ভাত খায় দুই বেলা সকালে আর সন্ধ্যায়। ঘরে বিড়ালের বাচ্চারে খাওয়ানোর মতো কিছু নেই। বিড়াল আমিষ ভোজি আর খায় দুধ। এই দুই জিনিস কই পায় সে? যেহেতু সে নিজে নিরামিষ ভোজি। দুধের ব্যবস্থা নাই বাড়িতে। পাতলা মুসুর ডাল, আলু ভর্তা দিয়া সকালে ভাত খায় আমিন। বিড়ালের জন্য একই ব্যবস্থা। তবে আলু ভর্তা বাদে। ভাত ডাল মেখে খেতে দেয়। বিড়াল খায় না। আমিন বিড়ালের মুখ হাঁ করিয়ে কিছুটা ভাত ঢুকিয়ে দেয়। তিনদিন এভাবে খাওয়ায়। এরপর থেকে বিড়ালের বাচ্চা ডাল মাখা ভাত নিজ থেকে খেতে থাকে। কিছুটা সুস্থ দেখায়। তবু আমিনের বিরক্ত লাগে অসমান লোম, বিচ্ছিরি দেখতে বিড়ালেটারে। তবে বিড়াল তার পায়ে পায়ে ঘোরে আর মিঁউমিঁউ করে।

*
নওয়াব আলী খাঁর গুটি বসন্ত ভালো হয়। এটা তার কাছে একটি অলৌকিক ঘটনা। নওয়াব আলী খাঁ তিনকানি ভূঁইতে কতদিন পড়েছিল, তা মনে করতে পারে না। নওয়াব আলী খাঁ এ কয় দিন জীবন মৃত্যু তন্দ্রা জাগরেন মধ্যবর্তী ছিল। এক রাত্রে সে দেখে শাদা থান পরা এক লোক তার মাথার কাছে বসে আছে। নওয়াব আলী খাঁর মনে হয়, এই বুঝি মৌত। শাদা থান পড়া লোকটা কলসের পানিতে কনিষ্ঠা আঙুল ভিজায়ে ছিটায়ে দেয় নওয়াব আলী খাঁর মাথায়। এরপর নওয়াব আলী খাঁ কিছু মনে করতে পারে না। হুস ফিরে বৃষ্টির তোড়ে। খালি মাঠের মধ্যে দুনিয়া ভাসানো বৃষ্টির মধ্যে শুয়ে আছে সে। শারীরিকভাবে সে কিছুটা ভালো অনুভব করে। তবে কেমন ভয় আর শীত শীত করতে থাকে তার। জীবনকে ফিরে পাবার ভয় বুঝি। নওয়াব আলী খাঁ তেরোই চৈত্র ভালো হয়। তিন কানি ভূঁইতে সে বাড়ির পত্তন করে। বাড়ির মাঝ বরাবর কুপে দেয় পানি সমেত সেই কলস। এর পর প্রতি বছর তেরই চৈত্র নওয়াব আলী খাঁ তার মাঝ বাড়িতে ওরশ করে।

*
অসুখটা প্রথম দিকে পাত্তা দেয়নি আমিন। যখন ক্ষতটা বাড়তে ছিল তখন কেবল ডাক্তারের কাছে গেছিলো আমিন। বাঁ পায়ের ক্ষত। এই পা টা অনেক আগে জখমের ফলে ছোট হয়ে গেছে। জখম বলতে গোড়ালির রগ কাটা, ফলে বেঁকিয়ে গেছে। ডান পা-টাও কাটা হয়েছিল তবে জখম তেমন গভীর ছিল না বিধায় টিকে গেছে এবং চলন সই আছে। দুই পায়ের রগ কাটা হয়েছিল আমিনের। পায়ে জুতা পরে না সে। যেহেতু এক পায়ে জুতা পরার সুবিধা নেই তাই অন্য পায়েও পরে না। আমিন বছর কুড়ি বয়সে কাটা পা নিয়া বাড়ি ছাড়া হয়। দুই মাস আগে বাড়ি ফিরে তার মায়ের মরণের খবরে। এর পর থেকে সে এ বাড়িতে আছে। বাঁ পায়ের এ ক্ষতটা কর্কট রোগ। অসামান্য এ ব্যাধি। আমিন খালি পায়ে হেঁটেছে বহু বছর— তার পায়ের রগ কাটার পর থেকেই। বাঁ পা খাটো বেঁকিয়ে গেছে— ফলে পায়ের এক পাশ বেকিয়ে হাঁটতো। এতে বাঁ পায়ের এক পাশের চামড়ায় কড়া পড়ে শক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেটি ক্যান্সারে রূপ নেয়।

*
সেই দিন চলে গেছে নওয়াব আলী খাঁর। চরামদ্দীর হরেন, দুধালের করম, নলুয়ার জয়নাল। নওয়াব আলী খাঁর শাগরেদ এরা। শীতের রাতে নদী পার হয়েছে জোড়া গরুর পিঠে সওয়া হয়ে। সেই গরু দিয়ে ফজর ওয়াক্তে হাল জুড়ে দিছে ক্ষেতে। পুলিশ নিতে পারে নাই তারে। জোড়া মার্ডারের কিছুদিন শিয়রে ছাই আর গাছ কাটা দা নিয়ে ঘুমাতো তবু ঘর ছাড়া হয় নাই। তাও তো বিগত হইছে কত বছর। ফি বছর তেরোই চৈত্র ওরশ করে। লোক সমাগম হয় না তেমন— শুধু আমিন, যে আমিন নওয়াব আলী খাঁর পোলা সে কেবল তাম্বুরার নিচে নাচতে থাকে। নওয়াব আলী খাঁ নিজ হাতে রান্ধে সোয়া সের গুড় সোয়া সের চালের শিরনি। শেষ রাইতে তাম্বুরার তলে ঘুমানো পোলারে জাগায়ে কলার পাতায় খেতে বসে। পোলারে গায়েন বানাবে মনের আশা নওয়াব আলী খাঁর।

*
মৃত বাড়িতে কাউকে হাসতে দেখলে অবাক লাগে। তবে আমিনের মুখ এমনি হাসিহাসি ভাব চিরকালের। তার স্বভাব মানুষের সাথে হেসে কথা বলা। আমিন তার কাটা পা নিয়ে আর হাসি মুখ দিয়ে বিষয় বিত্ত গুছায়েছে বহু ভাবে আবার চলেও গেছে বিপথে কুপথে। বহু বছর সে কাঁদে নাই বা হয়ত তার কান্না লোপ পেয়েছে একেবারে। হয়ত সেই অন্যের কান্নার উছিলা হয়ে আসছে। আমিন শেষবার কাঁদছিল বুঝি তার বাপ নওয়াব আলী খাঁ যখন তার পায়ের রগ কেটে দেয়। ডাকু নওয়ার আলী খাঁ নিজ ঔরসজাত রক্ত দেখেও টলে না। কলার ভেলায় ভাসিয়ে দেয় আমিন রে। সেই আমিন মায়ের মৃত্যু দিন বহু সাধনার হাসিহাসি মুখটা ম্লান রাখতে পারে না।
নওয়া আলী খাঁ কী খোয়াব দেখছিলো তার পোলারে কুরবানি দেবার। তা অবশ্য একপ্রকার দেখে ছিলই। গায়েন বানাতে চেয়ে ছিল তো। তা গাইতো ভালো আমিন। তত দিনে নওয়ার আলী খাঁর বাৎসরিক ওরশ মশহুর। তবে আমিনের রক্তে পিতার পুরানো দিনের শিকারের নেশা চাপা ছিল—তা কেবল উসকে ওঠে। নওয়ার আলী খাঁর পুরনো সাগরেদের দলে ভিড়ে গেল কোন ভাবে। মাঝ বাড়ি থেকে আমিনের মা চলে যায় পুরানো বাড়িতে। নওয়ার আলী খাঁ একা পড়ে থাকে মাঝ বাড়িতে যখের মতো। একা একা হেঁটে বেড়ায় বাড়ির চার পাশে। সন্ধ্যায় বাড়ির আনাচে-কানাচে জ্বালিয়ে দেয় মোম। মাঠের মধ্যে বিরাট কোনো জন্তুর মতো মিটিমিটি চোখ নিয়ে জেগে থাকে বাড়িটা।

*
আমিনের মাঝ বাড়িতে বসবাস মাস ছয় হতে চলছে। বিড়ালটা বেশ নেওটা হয়েছে। আমিন বিড়ালটি পছন্দ করতে শুরু করেছে। বিড়ালটা সুন্দর হইছে। আমিনের গা ঘেঁষে ঘুমায়। প্রথমে বিরক্ত লাগলেও এখন মানিয়ে নিয়েছে আমিন। আমিনের বাঁ পায়ের ক্যানসার বাড়েনি আর—ব্যথাও যেন একটু কম আর স্থিতিশীল। ডাক্তার বলেছে পা কেটে বাদ দিতে হবে। এর আগে কেমোথেরাপি শেষ করতে হবে। সে আর ফিরে যায়নি রয়ে গেছে মাঝবাড়িতে।

কিছুদিন যাবৎ আমিন লক্ষ্য করছে বিড়ালের লোম পড়ে যাচ্ছে। বিড়ালের শাদা শাদা লোম বিশেষ করে বিছানায় বেশি দেখা যায়—সকালে ঘুম থেকে জাগার পর। বিড়াল আমিনের পাশে ঘুমায়। স্বাভাবিকভাবে বিড়ালের কিছু পশম ঝরে যায়। তবে এগুলো যেন অনেক বেশি। বিড়ালের কালচে চামড়াও বেরিয়ে পড়ছে কোথাও কোথাও। আমিন বিড়ালের গা থেকে পশম টান দিয়ে দেখে তা খুব আলগা। অল্প টানেই উঠে আসে।

আমিন একটা স্বপ্ন দেখে। বিড়াল নিয়ে। মানুষের সমান একটা বিরাট বিড়াল মাঝ বাড়ির উঠানে উবু হয়ে বসে আছে। তার শরীরে কোনো লোম নেই। কালো শরীর, পেশিগুলো ফুলে আছে। কী একটা গান বেজে চলছে। গানের তালে আমিন নেচে যাচ্ছে। নাচতে নাচতে আমিন খেয়াল করে বিরাট বিড়ালটার মুখটা যেন নওয়াব আলির মতো।

মাস খানিকের মধ্যে বিড়ালের সব লোম ঝরে যায়। অস্বাভাবিক ভাবে বিড়ালের পেশিগুলি বেড়ে যায়। ঈষৎ কালো চামড়া আর পেশি বহুল বিড়ালটাকে ছোট একটা মানুষের মতো লাগে। আর মুখটা লাগে কোন ভাঙা গালে জেগে ওঠা চোয়ালের এক বৃদ্ধ মানুষের মতো। বিড়াল আগের মতই দু’বেলা ভাত ডাল খায়। আমিনে পায়ে পায়ে হাঁটে। আমিনের পাশে ঘুমায়। আমিনের পাশে দুই থাবা পেতে বিড়ালের মতো বসে থাকে। দেখলে মনে হয় যেন দুইটা মানুষ পাশাপাশি বসে আছে।

কবি, কথা সাহিত্যিক। জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ সাল। বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানাধীন বোয়ালিয়া গ্রামে। সে গ্রামেই বসবাস। প্রকাশিত বই ‘হায়াতুননেছা’ (কবিতা ২০২১)

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top