আজ , ,

বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রেও জেন-জির বিপক্ষে দাঁড়ানো তসলিমার বিজেপি ঘনিষ্ঠতার ইতিবৃত্ত

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্বাধীন নয়া রাজ্য সরকার তথা শাসক পক্ষ তসলিমার জন্য কলকাতাকে ‘অবরোধমুক্ত’ করার ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ পূর্বতন বামফ্রন্ট ও তৃণমূল সরকার যেভাবে তসলিমাকে বাংলাদেশের মতোই পশ্চিমবঙ্গে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল, তার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বিজেপি সরকার ফের কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গে তসলিমার বসবাস ও গতিবিধিকে অবাধ করার ক্ষেত্রে অবস্থান নিয়েছে। তসলিমা ফের কলকাতায় ফিরছেন। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে স্বাগত। কারণ, কোনো ভুখণ্ডের কোনো অধিবাসীকেই সেখান থেকে বিতাড়িত করা মানবিক ও রাজনৈতিক থেকে অনুচিত বলে মনে করাটাই যেকোনো সংবেদনশীল নাগরিকের অবস্থান হওয়া উচিত। তসলিমার লিখনি, তাঁর রাজনৈতিক ও মতাদর্শীয় অবস্থানের যতই বিরোধী হইনা কেন, তাঁকে বিতাড়িত করার সময়েও যেভাবে সেই কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছি, সেভাবেই তাঁর ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার বিষয়টিকেও স্বাগত জানাই। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে স্বাগত জানাচ্ছি মানেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি আমরা এই ‘প্রতিপক্ষ’ পত্রিকা সংহতি জ্ঞাপন করছি। বরং উল্টোটাই। তসলিমা যেভাবে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা থেকেই প্রমাণ করেছেন তাঁর তথাকথিত লিবারালিজম আসলে কেবলমাত্র একটি সম্প্রদায় বা বৃহৎ বঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষপোষণ, তাঁর সেই বিদ্বেষী মনোভাবের এখনও অবধি কোনো পরিবর্তন হয়নি, বরং তিনি সরাসরি পক্ষাবলম্বন করেছেন ভারতের শাসক দল  বিজেপি ও তাদের পৃষ্ঠপোষক সংগঠন আরএসএস-সহ তামাম হিন্দুত্ববাদীদের প্রতি। আর এর স্পষ্ট প্রমাণ হিসাবে উঠে এসেছে ভারতব্যাপী চলমান ছাত্রজনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে লেখিকার অবস্থান। তবে আমরা বলতে চাই, যেভাবে এসআইআর এনআরসি করে কোনো ভুখণ্ডের মানুষকে বাস্তুচ্যুত তথা দেশত্যাগী করা যায় না, তেমনই কারও লিখনীর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তাঁকেও দেশান্তরিত করা যায় না। যদিও তসলিমা আসলেই এনআরসি-এসআইআর প্রক্রিয়া লাগু করা ফ্যাসিবাদীদেরই যে আপনজন তা কালচক্রে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশের ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পদলেহন করে যেভাবে ছাত্রজনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তসলিমা, ভারতের ক্ষেত্রেও তার ভিন্ন কিছু হয়নি। বরং বিজেপি-আরএসএস ক্যাম্পের সঙ্গে আরও বেশি করে সখ্য বাড়ছে তসলিমা নাসরিনের। দিলির যন্তরমন্তর-সহ গোটা ভারতে ছাত্রজনতার আন্দোলন প্রসঙ্গে ফেসবুকে তসলিমা নাসরিন লেখেন, “যন্তরমন্তরে ‘ককরোচ’দের জমায়েত দেখে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের কথা মনে পড়ছে। ছাত্ররা শুরু করেছিল ‘কোটা না মেধা? মেধা, মেধা’ স্লোগান দিয়ে; শেষ করেছিল সরকার পতনের দাবি তুলে। তারপর যা ঘটেছে, তার মাশুল আজ গোটা বাংলাদেশ দিচ্ছে। জঙ্গি-জিহাদিরা ক্ষমতা দখল করেছে। বর্বরতা, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, নারীবিদ্বেষ, সন্ত্রাস আর অরাজকতা দেশের সর্বনাশ করেছে।জুলাই আন্দোলনের পর থেকে কোথাও ছাত্রদের জমায়েত দেখলেই আমার আশঙ্কা হয়। সহজে আর ভরসা করতে পারি না। কারণ ২০২৪-এর জুলাই আমাকে শিখিয়েছে—সব ছাত্র জমায়েত গণতন্ত্রের পক্ষে নয়, সব শাসকবিরোধী আন্দোলনের গন্তব্য মুক্তি নয়, আর সব বিপ্লবও বিপ্লব নয়। কোনো কোনো বিপ্লব পুরোনো শাসককে সরিয়ে আরও ভয়ংকর অন্ধকারের জন্য দরজা খুলে দেয়।” যখন গোটা ভারতের ছাত্রজনতা মোদি-শাহ জমানার পতনের লক্ষ্যে উন্মুখ, যখন তীব্র গণআন্দোলনে কেঁপে উঠেছে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি মসনদ, ঠিক তখনই আগবাড়িয়ে তসলিমা ফেসবুকে এসব লিখে হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে ফের তাঁর উদাত্ত সমর্থন ব্যক্ত করলেন।

আমরা জানি, তসলিমার সঙ্গে ভারতের হিন্দুত্ববাদী ক্যাম্প ও ভারতীয় গণমাধ্যমের একাংশের নেক্সাস সম্পর্কে সাহিত্যিক, চিন্তক আহমদ ছফা তাঁর ‘আনুপূর্বিক তসলিমা এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ’ বইতে স্পষ্ট করে গিয়েছেন বহু আগেই। ওই বইতে তসলিমার ‘লজ্জা’ উপন্যাসটি প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, “বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেছেন। কিন্তু তার মনে একটি অভিসন্ধি ছিল। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী অনুভূতি চারিয়ে তোলার অভিপ্রায় নিয়ে বইটি যদি লিখতেন তাহলে বইটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে লিখতে হত। তিনি যে সমস্ত ঘটনা বিবৃত করেছেন সেগুলো উল্লেখ করার পরও মানবিকতার বিকাশ চর্চা এবং সংগ্রামের ক্ষেত্রটি যদি দেখাতে পারতেন, তিনি এই জাতির শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। তিনি অবলম্বন করলেন সম্পূর্ণ ভিন্নপথ। বাংলাদেশের দাঙ্গাকারীদের আবেগ এবং উত্তেজনা ভারতীয় দাঙ্গাবাজদের মধ্যে সঞ্চারিত করে দিলেন। মানুষের যে কোন কাজের ক্ষেত্রে নিয়ত বা উদ্দেশ্য শক্তির একটা মস্তবড় ভূমিকা রয়েছে। তসলিমা মনের গহনে ভারতীয় মৌলবাদীদের সমর্থন পেতে চেয়েছেন এবং পেয়েছেনও। তাদের প্রচারযন্ত্রের কল্যাণে তসলিমার নাম পৃথিবীর পাঁচ মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে…” ওই একি লেখায় ছফা আরও বলছেন, “তারও চাইতে বড় সত্য এবং নিন্দনীর ব্যাপার হল ভারতবর্ষে অযোধ্যা শহরের হিন্দু মৌলবাদীরা বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দেয়ার পর দু’আড়াই হাজার নিরাপরাধ মুসলমানকে হত্যা করেছে। তারই প্রতিক্রিয়ায় এই দাঙ্গাটি এখানে ঘটেছে। আমরা বলতে চাই না ভারতবর্ষে একটা দাঙ্গা হলে এখানে আর একটা দাঙ্গা ঘটিয়ে তুলতে হবে। আমাদের মাটি এবং সমাজ নিল রাখার দায়িত্ব আমাদের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল মানুষের।… বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং সংঘটিত গণহত্যার পর পৃথিবীর দেশে দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমুহে যেখানে ভারতের ব্যবসা – বাণিজ্যের স্বার্থ অনেক বেশি, সেকুলার ভারত রাষ্ট্রের ইমেজটি ভয়ঙ্করভাবে মার খেয়ে যায়। সকলে একবাক্যে ভারতকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে। তসলিমার বইটি যখন তাদের হাতে এল তারা পৃথিবীকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন আমরা সন্ত্রাসী নই। আসলে সন্ত্রাস চলছে বাংলাদেশে।” আর অনেক আগেই ইসলামবিদ্বেষী তথা আরএসএস-বিজেপি বান্ধব হয়ে ওঠা ‘গোদি মিডিয়া’ আনন্দবাজার পত্রিকা টাইপ গণমাধ্যমের সঙ্গে তসলিমার সখ্য সম্পর্কে ছফা উল্লেখ করেছেন, “এখন আনন্দবাজার পত্রিকাটি প্রসঙ্গে আসি। আনন্দবাজারের অন্যতম প্রকাশনা দেশ পত্রিকাটি বাংলাদেশে বিক্রির পরিমাণ যত পশ্চিম বাংলায় তত নয়… আনন্দবাজারের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘আনন্দ’ পশ্চিম-বাংলার মধ্যে সবচাইতে বৃহত্তম প্রকাশনা সংস্থা। আনন্দ প্রকাশনের প্রকাশিত বই-পত্রের সিংহভাগ বাংলাদেশের বাজারে বেচা হয়। আনন্দ প্রকাশনের বইপত্রের একটি বিরাট বাজার বাংলাদেশে রয়েছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।… বাংলাদেশের বিরাট বাজার আনন্দবাজার গোষ্ঠীর  লেখক-সাহিত্যিকদের উপার্জন রোজগারের একটা মস্ত উৎসও বটে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ বাজারটিকে আনন্দবাজার পত্রিকাগোষ্ঠী নিজেদের হাতে রাখার জন্য সর্বপ্রকার প্রযত্ন প্রয়াস চালিয়ে এসেছে। … আমরা আনন্দবাজারের মনস্তত্বটি বুঝতে পারি । আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট মতবাদের ভরাডুবির পর এবং বিজেপির সাম্প্রতিক উত্থানের পর পশ্চিম বাংলায় হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, আনন্দবাজার তসলিমার ‘লজ্জা’ বইটিকে মূলধন করে তাতে তরী ভাসিয়েছিলেন। আনন্দবাজারের ঠিকে ভুল হয়নি।” ছফা-সহ বহু লেখক-বুদ্ধিজীবীই তসলিমার লেখার সাহিত্যমূল্য যে শূন্য বা নেতিবাচক সেটিও বারবার বলেছেন। কিন্তু তারপরেও যুগযুগান্তের গোদি মিডিয়া তসলিমার বিদ্বেষ বয়ানকে সামনে রেখেই জাতিবাদী বিভাজন তথা ফ্যাসিস্ট রাজনীতি চালিয়ে যাবে, এ কথা উল্লেখ করারও খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না।

তসলিমা যে বারবার মিথ্যাচার করেন, সেটিও আমরা দেখেছি। আমরা দেখেছি আহমদ ছফা সম্পর্কে মিথ্যাচার করে বাজারে কুৎসা রটাতে। ছফা তাঁর লেখায় সেসবেরও জবাব দিয়েছেন। শুধু ছফা একা নন, ‘প্রতিপক্ষ’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক তথা কবি, দার্শনিক ফরহাদ মজহারকে নিয়েও নানা সময় ব্যক্তিগতস্তরে আক্রমণ ও মিথ্যাচার তসলিমা করেছেন। বিজেপির কায়দাতেই তসলিমার ফেইক প্রোপাগান্ডার শিকার দুই বাংলার আরও বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী। কিন্তু তসলিমার দুর্বল ও তৃতীয় শ্রেণির সাহিত্য ও বিদ্বেষীমনোভাবের পরেও আমরা তাঁকে পশ্চিম বাংলায় স্বাগত জানাই। আমরা জানি, তিনি শুভেন্দু অধিকারীর দলবলের মাউথ পিস হিসাবেই কাজ করবেন। ইতিমধ্যেই ‘মৌলবাদ বিরোধী’ সাহিত্য সভার ব্যানারে তসলিমাকে সামনে রেখে এক ছাতার তলায় জড়ো হয়েছেন কলকাতার বহু হিন্দুত্ববাদী লেখক। আগামী ১ আগস্ট সম্ভবত কলকাতার রবীন্দ্রসদনে তাঁদের একটি সভাও আছে। কিন্তু তারপরেও আমরা কারও বই নিষিদ্ধ করা কিংবা কাউকে দেশান্তরিত করার পক্ষে নই। বরং আমরা আগেও কলকাতায় তসলিমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধেই মুখ খুলেছি। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিতাড়িত করারও বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এবারও আমরা তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছি। কারণ, আমরা রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের বাসভূমি কেড়ে নেওয়ার এসআইআর-এনআরসির মতো সকল প্রকার উদ্যোগের বিরুদ্ধে।পাশাপাশি আমরা তসলিমা তথা আরএসএস-বিজেপি-সহ তামাম হিন্দুত্ববাদী ও মুসলিম জাতিবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top