
।। অত্রি ভট্টাচার্য ।।
সম্পাদকের নোক্তা: যে বঙ্গের ইতিহাসের যাত্রাপথে, গণযাপনে ভাবান্দোলন থেকে প্রাণ-প্রকৃতি-পরমের সম্মি্লনের বার্তা ছড়িয়ে গিয়েছিল ভূ-ভারতে, বৃহৎ সে বঙ্গের খণ্ডিত পশ্চিমাংশে এখন ক্ষমতার ফলিত রাজনীতিতে এখন উত্থান ঘটেছে অমানবীকরণের (Dehumanization) সংস্কৃতি। আইন ও বিচার প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো হচ্ছে মানুষকে। জনসমক্ষে চলছে হেনস্তা। ছোঁড়া হচ্ছে ডিম। শুধু দু’টি রাষ্ট্রের মাঝে শূন্যরেখায় শিশু-নারী-সহ নানা বয়সের নানা লিঙ্গপরিচিতির সবহারা মানুষকে বসিয়ে রাখার ছবি আমরা দেখতে পাচ্ছি। ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়ছি। আত্মহননই যেন-বা আমাদের অবধারিত পরিণতি, এমনটা মনে হচ্ছে। এহেন অমানবিকীকরণের সংস্কৃতির প্রথম আমদানি ঘটেছিল ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ উপনিবেশের পতন হলেও যেভাবে সমাজের ঔপনিবেশিক পরিকাঠামো বিদ্যমান, সেভাবেই উপনিবেশবাদের সাংস্কৃতিক চিহ্ন ও প্রকরণ সমূহ অপরায়ন প্রক্রিয়ার ভিতর থেকেই অমানবিকীকরণ প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। আমরা দেখেছি এই অমানবিকীরণ সংস্কৃতি প্রকটভাবে মাথা তুলেছিল উপনিবেশবাদেরই আরেক কদর্য রূপ ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের জমানায়। অবাক করা বিষয়, নাৎসীরা একদা যাদের মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকার চূড়ান্তভাবে লঙ্ঘিত করেছিল, সেই ইহুদীরাই জায়নাবাদী রাজনীতির ছত্রছায়ায় উপনিবেশবাদী রাজনীতির অধুনান্তিক কদর্য চেহারকে পুনরায় ইতিহাসের সামনে হাজির করেছে ফিলিস্তিনের জনতার ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে। দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে অমানবিকীকরণ সংস্কৃতির। আর সেই জায়ানবাদের মতাদর্শীয় ইয়ার-দোস্ত সংঘ পরিবারের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ ভারতীয় ভূখণ্ডের বঙ্গীয় অঞ্চলগুলিকে রাজনৈতিকভাবে দখল করে ক্রমেই অধিষ্ঠিত করছে এই Dehumanization সংস্কৃতিকে। পাশাপাশি বাংলার পশ্চিম ভুবনের গণমনস্তত্ত্বকে ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিস্মৃতিতে। ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতি-পরমের সহাবস্থান থেকে মানুষ ভজনার ঐতিহ্যকে। এই পরিস্থিতে মানুষ ভজনার সেই পরম্পরাকে এই বিমানবিকীকরণের যুগে স্মরণ করাতে কিছু কথা লিখেছেন বাংলারই এক ছাত্র। অমানবিকীকরণ সংস্কৃতির যুগে ‘মানুষ শরণে মানুষ ভজনায়…’ শিরোনামে লিখছেন অত্রি ভট্টচার্য।
বঙ্গীয় ব-দ্বীপের জন্য একটি উপনিবেশ-উত্তর মনুষ্য-দর্শন
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।।
এই মানুষে মানুষ গাথা
গাছে যেমন আলেকলতা।
জেনে শুনে মুড়াও মাথা
জাতে ত্বরাবি।।
দ্বিদলে মৃণালে
সোনার মানুষ উজলে।
মানুষ গুরুর কৃপা হলে
জানতে পাবি।।
এই মানুষ ছাড়া মন আমার
পড়বি রে তুই শূন্যকার।
লালন বলে মানুষ আকার
সেই রূপ ভজলে পাবি।।’
লালন সাঁইয়ের এই পদটি এই গানটি কোনো নিছক ভক্তিগীতি নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ভাব, যে ভাবের বয়ান ইউরোপীয় ‘হিউম্যানিজম’-এর সমান্তরাল কোনো তত্ত্বের অপেক্ষা রাখে না। গানের প্রতিটি পঙ্ক্তি জবাব দেয় সেই অমানবীকরণের ইতিহাসকে, যা ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ দিয়ে শুরু হয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ঔপনিবেশিক জনগণনা, এবং আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব-রাজনীতির মধ্য দিয়ে আজও বহমান। বঙ্গদেশের সবচেয়ে পিষ্ট মানুষগুলো—ভূমিহীন কৃষক, নমঃশূদ্র, বেদে, নারী—এই গানের ভেতরেই গেঁথে রেখেছে তাদের টিকে থাকার দর্শন। উপনিবেশ-উত্তর ‘অমানবীকরণ’-ধারণাকে যদি বাঙালি জ্ঞানকাঠামোতে দাঁড় করাতে হয়, তবে এই গানই তার মূল পাঠ। এই রচনা সেই পাঠকে একটি সুসংহত মতবাদ হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে ঔপনিবেশিক ক্ষতের নির্ণয়, মানুষ-বিষয়ক দেশজ জ্ঞানতত্ত্বের বয়ান, এবং ‘সোনার মানুষে’ পরিণত হওয়ার জীবিত সাধনা একই সূত্রে গ্রথিত।
ঔপনিবেশিক ক্ষত: ১৭৭০ ও মানুষ-বিরোধী শাসনতান্ত্রিকতা
‘মানুষ ভজো’ এই আদেশ কেন এত গভীর আধ্যাত্মিক জরুরি বাণী হয়ে উঠেছিল তা বুঝতে গেলে প্রথমে ফিরে তাকাতে হয় ১৭৭০-এর বাঙলার দুর্ভিক্ষের দিকে।
যে দুর্ভিক্ষে প্রায় এক কোটি প্রাণ নিঃশেষ হয়, তা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না। ১৭৬৫ সালের দেওয়ানি সনদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলার রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ পায়, তখন তার শাসনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সর্বোচ্চ নিষ্কর্ষণ। ভূমি-রাজস্ব বাজেয়াপ্তির মাত্রায় বাড়িয়ে তোলা হয়, এবং শস্য মজুত ও রপ্তানি করতে শুরু করে কোম্পানির দালালরা। ১৭৬৯-এর খরার পর যখন খাদ্যের ভাণ্ডার শূন্য, তখনো রাজস্ব আদায় থামেনি। সমসাময়িক বিবরণে বাংলা হয়ে উঠেছিল ‘হাড়ের জঙ্গল’। অথচ গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রতিবেদনে ‘হাজার হাজার হতভাগ্য’ মরছে লিখেও খাজনার হার কমানো হয়নি। কৃষক তখন খাদ্যপ্রার্থী মানুষ নয়; কৃষক ছিল রাজস্বের একক, যা ‘মানুষ’ হিসাবে ছিল পুরোপুরি প্রতিস্থাপনযোগ্য। এ ছিল আধুনিক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রথম বড় জৈবরাজনৈতিক আচরণ, রাজস্ব-সামরিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে লাখো মানুষকে মরে যেতে দেওয়া।
১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এই অমানবীকরণকে আইনি স্থাপত্যে রূপ দেয়। জমিকে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ক্রয়-বিক্রয়ের বস্তুতে পরিণত করে, এবং জমিদারদের কোম্পানির রাজস্ব-মধ্যস্বত্বভোগী বানিয়ে, এই বন্দোবস্ত কৃষকের জমির সঙ্গে প্রথাগত, বহুপুরুষের সম্পর্ককে আইনিভাবে মুছে ফেলে। যে মানুষ জমিতে শ্রম দেয় সে হয়ে পড়ে ইচ্ছাধীন প্রজা, কোনো স্থায়ী ঠিকানাহীন সত্তা, ভূমি-রাজস্বের খাতা থেকে নিশ্চিহ্ন করার উপযুক্ত নামমাত্র। এরপর আসে ঔপনিবেশিক শাসনতান্ত্রিকতার পূর্ণাঙ্গ যন্ত্রপাতি: দশবার্ষিক জনগণনা যা বহমান সমাজকে জমাট ‘জাতি’ ও ‘সম্প্রদায়ে’ রূপান্তরিত করে; জাতিতাত্ত্বিক সমীক্ষা যা বাঙালিকে ‘ভীরু’ ও স্বশাসনের অযোগ্য ঘোষণা করে; যাযাবর-অপরাধী আইন যা সমগ্র জনগোষ্ঠীকে জন্মসূত্রে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। এ সবই ছিল পারস্পরিক মানবিক বন্ধনকে ছিন্ন করার কৌশল, যাতে কিছু মানুষ পূর্ণ-মানুষের মর্যাদা পায়, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ তলিয়ে যায় প্রশাসনিক মতে, চিরসন্দেহভাজনের বা নিছক দেহের কাতারে।
এই মানুষ-বিরোধী ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের বিরুদ্ধে সাধু-ফকির-বয়াতি-আউলিয়া-সহজিয়া ভাবের প্রকাশ ঘটেছিল রোমান্টিক প্রতিবাদ হিসেবে নয়; জেগেছিল সেই সব জনসমাজের ভেতর থেকে যারা দুর্ভিক্ষ, জাতিভেদ ও রাজস্ব জরিপে সবচেয়ে নৃশংসভাবে পিষ্ট হয়েছিল। এই ভাবই হয়ে ওঠে এক প্রতিরোধী শাসনতান্ত্রিকতা, যার কেন্দ্রে রয়েছে ‘মানুষ’ নামক একটি অনুবাদ-অক্ষম ধারণা।
মানুষের দেশজ জ্ঞানতত্ত্ব
‘মানুষ’ শব্দটি ইংরেজি ‘ম্যান’, ইউরোপীয় ‘হিউম্যান’ বা আইনের ‘ব্যক্তি’র সমার্থক নয়। সাধু-ফকির-বয়াতি-আউলিয়া-সহজিয়া ভাবজগতে মানুষ একই সঙ্গে একটি জৈবিক শরীর, একটি আধ্যাত্মিক পরমসত্তা, একটি সম্পর্কের বাঁধন, এবং একটি পবিত্র বাসস্থান অথবা আবাস।
প্রথমত, মানুষ মূর্ত পবিত্রতা। অবৈদিক বঙ্গয় ভাবের ধারা বা ঘরগুলিতে দেহের ধারনা খুব গুরুত্বপূর্ণ।, মানবদেহ জগতের অণুবিশ্ব। নদী, চন্দ্রকলা, মহাজাগতিক সূত্র—সবই এই ভৌতিক কাঠামোর ভেতরে বাস করে। প্রকৃত দেবতা কোনো পারলৌকিক স্বর্গে থাকেন না; তিনি মানব-দেহের ভেতরে ‘অচিন পাখি’ হয়ে আসেন-যান। অতএব পরম সেই সত্য জানতে গেলে এই দেহেরই ভজনা, সেবা ও উপলব্ধি করতে হবে—তপস্বীর পুরুষ্ট দেহ নয়, বরং লাঙল চষা, সন্তান ধারণ করা, গান গাওয়া সেই জীবিত ও কামনাপূর্ণ দেহকে। এই কাঠামোতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের কাছে দেহ নিছক অনাহারে মরার পাত্র হওয়া শুধু অবিচার নয়; তা সেই পরম সত্তার অপমান, যাকে আমরা ঈশ্বর ডাকি।
দ্বিতীয়ত, মানুষ মানে আমূল সম্পর্কময়তা। মানুষের সত্তা কোনো একক ব্যক্তির গুণ নয়; তা নির্মিত হয় পারস্পরিক স্বীকৃতির কাজে। মানুষ একমাত্র তখনই মানুষ, যখন সে অন্যের ভেতরের মানুষকে স্বীকার করে, বিশেষ করে সেই অন্য’কে যাকে রাষ্ট্র ও জাতিভেদ পতিত করে রেখেছে। এই সম্পর্ক-ভিত্তিক সত্ত্বার জন্ম হয়েছে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের বাস্তুসংস্থানে, যেখানে নদীভাঙন, বন্যা ও দুর্ভিক্ষের মুখে রক্তের আত্মীয়তার বাইরেও এক জীবনদায়ী সম্প্রদায় গড়ে তোলা জরুরি ছিল। এই বোধই জাত-ধর্ম-আইনের কৃত্রিম বিভেদকে অস্বীকার করে।
তৃতীয়ত, মানুষই জ্ঞানের উৎস। এবার আমায় ডাকলে লালন, কী জাত সংসারে?, এটিই একটি জ্ঞানগত বিপ্লবী ঘোষণা। জাত, ধর্ম, আর ঔপনিবেশিক জনগণনার যাবতীয় চিহ্ন বাহ্যিক ভ্রম; প্রকৃত জ্ঞান পাওয়া যায় মানব-দেহের অভ্যন্তরে ও মানব-সমাজের অভিমুখে ফিরে তাকানোর মধ্যে। যে জনগণনার খাতায় বাঁচে সে চির-পরাধীন; যে মানুষকে নিয়ে বাঁচে সে আগেই অতিক্রম করে ফেলেছে প্রশাসনের চাপিয়ে দেওয়া সমস্ত পরিচিতি।
এই জ্ঞানতত্ত্বের ওপর দাঁড় করিয়েই লালনের গানটি গেঁথে দেয় তার মূল প্রতিজ্ঞাগুলো, যা একই সঙ্গে দর্শন এবং জাগতিক অনুশীলনের নির্দেশ।
গানের ভাব
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি / মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’—এই চরণদুটি মতবাদের মূল প্রতিজ্ঞা। ‘ভজনা’ নিছক আরাধনা নয়, এটি বেঁচে থাকার কৌশল এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান। ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষে কোম্পানি দেখিয়েছিল, রাষ্ট্রের চোখে যে মানুষের কোনো ‘মূল’ নেই; তাকে রাজস্ব খাতা থেকে মুছে ফেলাই স্বাভাবিক। লালন তার সরাসরি উল্টো কথার ঘোষণা করেন, বলেন মানুষ ছাড়া তুই মূল হারাবি। রাষ্ট্র যে মূল্যহীনতাকে আরোপ করে, এই দর্শন তাকে ভ্রম বলে উড়িয়ে দিয়ে মানুষের অপরিবর্তনীয় সার্থকতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। ‘ক্ষ্যাপা’ সম্বোধনটি নিছক বিশেষণ নয়; এটি সত্তাতাত্ত্বিক সতর্কবার্তা—যে মানুষকে ছেড়ে অন্য কোথাও সার খোঁজে, সে ঔপনিবেশিক বাজার-মূল্যের ধাঁধায় আটকে পাগল হয়েছে।
‘এই মানুষে মানুষ গাথা / গাছে যেমন আলেকলতা’—এই পঙ্ক্তি সেই সম্পর্কময় পরম সত্তার ঘোষণা। আলেকলতা সেই লতা, যে গাছকে জড়িয়ে বাঁচে, কিন্তু ধ্বংস করে না; দুজনের সম্পর্ক পরস্পর নির্ভরশীল। বাঙলা ব-দ্বীপের মানুষ ঠিক তেমনই: বন্যা, নদীভাঙন, দুর্ভিক্ষের মুখে তারা একে অপরের সঙ্গে গাঁথা হয়ে টিকে থাকে। জাত-ধর্মের বিভাজন এই গাথুনির ওপর চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম জালমাত্র। এখানেই ঔপনিবেশিক খণ্ডীকরণের জবাব প্রয়োজন, অমানবীকরণ হলো সম্পর্কের জাল ছিঁড়ে দেওয়া, আর প্রতিরোধ হলো সেই গাথা পুনর্বয়ন।
‘জেনে শুনে মুড়াও মাথা / জাতে ত্বরাবি’—এটি জাত-অভিমানের বিনাশের আহ্বান। মাথা মুড়ানো এক আচারগত অথচ বিপ্লবী অঙ্গভঙ্গি, জাত-গোত্র-বংশের বাহ্যিক চিহ্ন সজ্ঞানে মুছে ফেলা। নদীয়ার তিন পাগল চৈতন্য-নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্যরা যে জাতপাত বিরোধী ভাবসংগ্রাস শুরু করেছিলেন, সেই ভাবান্দোলনের ধারা এক যুগ থেকে ভিন্ন যুগান্তরে লালনদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আর তাই ঢাক উঠল, জাত যে ভ্রম, তা জেনে তবেই সেই ভ্রমের চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে। ‘জাতে ত্বরাবি’—জাত-পরিচয় ত্যাগ করলেই তবে দ্রুত মুক্তি, তাৎক্ষণিক রূপান্তর। ঔপনিবেশিক জনগণনা ও জাতিভেদ যে গতি রোধ করেছিল, লালন দেখান, জাত-অভিমানের বোঝা নামিয়ে ফেললেই সেই গতি ফিরে আসে।
‘দ্বিদলে মৃণালে / সোনার মানুষ উজলে’—দেহতত্ত্বের এই কেন্দ্রীয় প্রতীক একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক। ‘দ্বিদল’ মানে দ্বৈত—শোষক ও শোষিত, পুরুষ ও নারী, হিন্দু ও মুসলমান; ‘মৃণাল’ হলো পদ্মের সেই ডাঁটা যা পঙ্কের ভেতর থেকে উপরে ওঠে। গান বলছে, এই সমস্ত দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়েই, ইতিহাসের পাঁকের ভেতর থেকেই সোনার মানুষ জেগে ওঠে। সোনার মানুষ কোনো দেহাতীত স্বর্গের প্রাণী নয়; দেহের ভেতরেই, দ্বন্দ্বের ভেতরেই তার প্রকাশ। ১৭৭০-এর হাড়-জঙ্গল থেকে নীল বিদ্রোহ, দেশভাগের রক্তগঙ্গা থেকে নমঃশূদ্র নারীদের দল—এই সমস্ত পাঁকের ভেতর থেকে আসা যে মানুষ-সত্তা টিকে থেকেছে এবং জ্বলে উঠেছে, সেই তো ‘সোনার মানুষ’। পবিত্রতা ইহলোকেই, দেহেই; অমানবীকরণ সেই দেহকে ধ্বংস করতে চায়, কিন্তু দেহই মুক্তির একমাত্র ক্ষেত্র।
‘মানুষ গুরুর কৃপা হলে / জানতে পাবি’—এটি পুঁথিনির্ভর জ্ঞানতত্ত্ব বিরোধী ভাবের হৃৎপিণ্ড। ‘মানুষ গুরু’ কে? পুঁথির পণ্ডিত নন, ব্রাহ্মণ পুরোহিত নন, ঔপনিবেশিক শিক্ষকের দালাল নন। মানুষ গুরু সেই জন, যে নিজে মানুষের-পথে দীক্ষিত—যে লাঙল চষে, যার জাত নেই, যে গান গেয়ে বেড়ায়। এই গুরুর ‘কৃপা’ মানে তার জীবনচর্যার সঙ্গে সাক্ষাৎ, তার সঙ্গে বসবাস। ‘জানতে পাবি’—প্রকৃত জ্ঞান এখানেই নিহিত। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা বাঙালিকে ইউরোপের মানবতাবাদ শিখিয়েছিল; লালনের গান শেখায় যে মানুষের-জ্ঞান পেতে হলে নিপীড়িত মানুষের কাছেই ফিরতে হবে, তার কণ্ঠকেই গুরুর আসনে বসাতে হবে।
‘এই মানুষ ছাড়া মন আমার / পড়বি রে তুই শূন্যকার’—‘শূন্যকার’ এক ভয়াবহ শব্দ: ‘কার’ মানে কারাগার, মানুষ হারালে মন পড়ে যায় শূন্যতার কারাগারে। ১৭৭০-এর বাংলা হয়েছিল সেই শূন্যকারের মূর্ত প্রতীক, যেখানে গ্রামের পর গ্রাম উধাও। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ১৯৭১-এর গণহত্যা, এবং আজকের এনআরসি-সিএএর ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা—সবই এই শূন্যকারের পুনরাবৃত্তি। লালন এই ফাঁকা হয়ে যাওয়াকে নাম দিয়েছেন। এবং একই সঙ্গে মুক্তির শর্তও দিয়ে দিয়েছেন: মানুষ-ভজনার মধ্য দিয়েই কেবল সেই কারাগার ভাঙা যায়। অমানবীকরণ কেবল ন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি এক অতল শূন্যতা, যেখানে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েই ধ্বংস হয়।
‘লালন বলে মানুষ আকার / সেই রূপ ভজলে পাবি’—এ ‘মানুষ আকার’—এই রূপ, এই শরীর, এই মুখ, এই শ্রমক্লান্ত হাত—এ কোনো মায়া নয় যা ত্যাগ করে মোক্ষ খুঁজতে হবে। আকারকেই যদি ভজনা কর, তবেই তুমি ‘তারে’, সেই অরূপ সত্যকে, পাবে। বাউল ফকির মতবাদে আকার ও অরূপের দ্বন্দ্ব নেই; সত্য এই রক্তমাংসের মানুষের ভেতরেই বাস করে। উপনিবেশবাদ বাঙালির আকারকে ‘ভীরু’, ‘অলস’, ‘দুর্ভিক্ষের দেহ’-এ পর্যবসিত করেছিল। লালন সেই আকারকেই আবার পবিত্র করলেন: এই দেহই পথ, এই দেহই গন্তব্য। নমঃশূদ্র যে শরীরকে ‘অস্পৃশ্য’ বলা হয়, সেই শরীরকেই ভজনা করতে হবে, তবেই সোনার মানুষ বাস্তব হবে।
উপনিবেশ-উত্তর আচরণ: ভাবকে জীবিত করা
এই ভাব কোনো পুঁথির দর্শন নয়, এটি জাগতিক অনুশীলনের পথনির্দেশ। দুর্ভিক্ষ ঘটানোর যুক্তির বিরুদ্ধে, এটি দাবি করে শস্যের সাধারণ সম্পদ ও সাম্প্রদায়িক ভাণ্ডার গড়ে তোলা, যেখানে জাত বা নাগরিকত্বের কাগজ না জিজ্ঞেস করে মানুষকে খাওয়ানো হয়—প্রতিটি এমন আহারই মানুষ-ভজনার উপাসনা। জনগণনা ও পাসপোর্টের বিরুদ্ধে সোনার মানুষ প্রশ্নটিকেই প্রত্যাখ্যান করে: ‘তোমার পরিচয় কী?’ সে ইতিমধ্যেই পারস্পরিক সেবার আগুনে সমস্ত লেবেল দ্রবীভূত করে ফেলেছে। ‘ভীরু বাঙালি’র ঔপনিবেশিক রূপকথা ও জাতীয়তাবাদী বলিষ্ঠ পুরুষত্ব—দুই মিথ্যাকেই সোনার মানুষ অতিক্রম করে, কারণ বাউল ফকির দেহতত্ত্বে পুং ও নারীশক্তির মিলন স্বীকৃত। আর আজকের এনআরসি-সিএএ-র ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমার জবাবে মতবাদ জানায়, কোনো আইন এই বাঁধন রদ করতে পারে না। সোনার মানুষ আগে থেকেই বাস করে এমন এক রাষ্ট্রে, যা রাষ্ট্রের মানচিত্রে ধরা পড়ে না।
ইতিমধ্যেই-উপস্থিত ভবিষ্যৎ
এই মতবাদ কোনো সুদূর স্বপ্নের প্রতিশ্রুতি নয়। এটি ঘোষণা করে যে প্রতিটি পরস্পর স্বীকৃতির মুহূর্তে, প্রতিটি ক্ষুধার্তকে খাওয়ানোর কাজে, প্রতিটি জনগণনার খোপে নাম না-লেখানোর অস্বীকৃতিতে, সোনার মানুষ ইতিমধ্যেই জন্ম নিচ্ছে। ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ প্রমাণ করতে চেয়েছিল মানুষকে রাজস্বখাতার কঙ্কাল বানিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়; কিন্তু লালনের গানগুলি, মতুয়া সমাবেশগুলি, নীলচাষির বিদ্রোহ, নমঃশূদ্র নারীদের দলবদ্ধতা—সবই বারবার সাক্ষ্য দিয়েছে মানুষ ফিরে আসে, অস্বীকার করে রাজস্বের খাতায় শুধু দেহ হয়ে থাকতে।
অমানবীকরণকে উপনিবেশের আওতা থেকে মুক্ত করার অর্থ তাই নতুন কোনো মানবতত্ত্বের অপেক্ষা নয়। এর অর্থ স্বীকার করা যে, বঙ্গদেশের সবচেয়ে লাঞ্ছিত মানুষেরা ইতিমধ্যেই সেই তত্ত্ব দিয়ে গেছেন, যা গেঁথে আছে একটি গানের চরণে। কাজ হলো তাযে বাঁচিয়ে তোলা, মানুষ ভজো। মানুষকে সেবা দাও। সেই মানুষকেই গাও। আর সেই কাজের ভেতরেই, সাম্রাজ্য যে সীসা তোমার সত্তায় জুড়ে দিয়েছিল, তা গলে যাবে—এখনই, এখানেই, এই ধ্বংস ও পুনর্জন্মের ব-দ্বীপে— তা সোনায় রূপান্তরিত হবে।
লালন বলে মানুষ আকার / সেই রূপ ভজলে পাবি।

