আজ মঙ্গলবার, ২৩শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সহজ পথে আনন্দ: ভাণ্ড, ব্রহ্মাণ্ড ও আমাদের  সাধনা (পর্ব-১)

সাধনা কী?

নয়াকৃষি ও নবপ্রাণ আমাদের সাধনার ক্ষেত্র। আমরা নয়াকৃষি ও নবপ্রাণকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য আলোচনা করতে বসেছি। আলোচনা কোথা থেকে কিভাবে শুরু করলে ভাল হয়? আলোচনা শুরু করলে বুঝব নয়াকৃষি বা নবপ্রাণকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া খুব সহজও না। তবে সরল একটি প্রশ্ন দিয়েই নাহয় শুরু করি: সাধনা কি? সাধনা বলতে আমরা কী বুঝি?

‘সাধনা’ কথাটা আমরা প্রায়ই এমনভাবে শুনি যেন তা সাধারণ মানুষের দুনিয়া থেকে দূরের কোনো অজানা জায়গায় চলে যাওয়া; যেন সাধনা সংসার, মাটি, শরীর, খাবার, কাজ, সম্পর্ক, জমি, বীজ, নদী, সাগর, আকাশ, বাতাস, গ্রহ, নক্ষত্রের বাইরের কোন আসমানি ব্যাপার; যিনি সাধক তিনি বুঝি দুনিয়া থেকে দূরে, একা এবং নিঃসঙ্গ তপস্যায় রত, আর সাধারণ মানুষ এখনও দুনিয়ার ভেতরে রয়ে গিয়েছে, পড়ে রয়েছে।

সাধনা’ শব্দটি বাংলা, সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, আরবি-ফারসি ও বাংলার লোকায়ত ভাবচর্চার ইতিহাসে বহুস্তরীয় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন আমরা শব্দটিকে অধিকাংশ সময় ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অর্থে বুঝি, কিন্তু সাধনার ইতিহাস অনেক বিস্তৃত। আমরা এখানে নয়াকৃষি ও নবপ্রাণ নিয়ে আলোচনা করব, সেই আলোচনার প্রস্তুতি হিশাবে এই ইতিহাস বোঝা জরুরি, কারণ একটু পরই আমরা দেখব ‘সাধনা’কে রহস্যময় আত্মিক অভিজ্ঞতা হিশাবে বুঝলে চলবে না, বরং জগতের সঙ্গে মানুষের ব্যবহারিক সম্বন্ধের চর্চা হিশাবে বুঝতে পারা ও বোঝাই একালের প্রধান কাজ। এই বুঝটা সাফ হলে নয়াকৃষি ও নবপ্রাণের কাজও সাফ বোঝা যাবে।

আভিধানিকভাবে ‘সাধনা’ শব্দের মূল ধাতু হলো সাধ্ (√sādh)। সংস্কৃত সাধ্ ধাতুর অর্থ—সম্পন্ন করা, সিদ্ধ করা, অর্জন করা, সফল হওয়া, কোনো লক্ষ্য পূরণ করা, কোনো কাজকে তার উপযুক্ত পরিণতিতে পৌঁছে দেওয়া (Monier-Williams, 1899)। সেই অর্থে সাধনা মানে প্রথমত কোনো উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার লক্ষ্যে ধারাবাহিক প্রয়াস, অনুশীলন বা চর্চা। এখানে বিশেষ ভাবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, শব্দটির প্রাথমিক অর্থের মধ্যে আত্মা, পরকাল, অলৌকিকতা বা ধর্মীয় গোপন বিদ্যার কোনো বাধ্যতামূলক উপস্থিতি নাই। একজন সঙ্গীতশিল্পী সঙ্গীতের সাধনা করতে পারেন, একজন কবি ভাষার সাধনা করতে পারেন, একজন কারিগর তার কারিগরির সাধনা করতে পারেন, একজন কৃষকও কৃষির সাধনা করতে পারেন। কোত্থাও কোন রহস্য নাই
প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে সাধনা শব্দটি বিশেষ গুরুত্ব পায় যোগ, বৌদ্ধ, জৈন ও তান্ত্রিক ধারায়। কিন্তু সেখানেও সাধনার অর্থ কোনো বিমূর্ত বিশ্বাসে সম্মতি দেওয়া ছিল না; বরং ছিল নিজেকে একটি বিশেষ ধরনের চর্চার মধ্যে প্রবেশ ও যুক্ত করা। বৌদ্ধধর্মে ভাবনা (bhāvanā) ও সাধনা প্রায়শই ঘনিষ্ঠ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ভাবনা শব্দের আক্ষরিক অর্থও ‘উৎপাদন করা’, ‘বিকশিত করা’, ‘চাষ করা’। অর্থাৎ মনকে কৃষিজমির মতো চর্চা করা (Gethin, 1998)। এখানে জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল আছে: জ্ঞান কোনো প্রস্তুত বস্তু না; জ্ঞান চর্চার ফল।

মধ্যযুগে বাংলায় এসে ‘সাধনা’ শব্দটি নতুন জীবন পায়। বৈষ্ণব, সহজিয়া, নাথ, সুফি ও ফকির ধারায় সাধনা কেবল ধর্মীয় আচারের নাম হয়ে থাকে নাই; বরং জীবনযাপনের বিশেষ পদ্ধতির নাম হয়ে ওঠে। বিশেষত বাংলার ভাবুকেরা ‘সাধনা’কে এমন এক চর্চা হিসেবে বুঝেছেন, যেখানে দেহ, প্রেম, খাদ্য, গান, সঙ্গ, সেবা, ভাষা এবং জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একত্রে বিবেচিত হয়। এই কারণে বাংলার সাধনার ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই আরবি তরিকা (পথ), সুলুক (আচরণগত যাত্রা), মুজাহাদা (নিজের সঙ্গে নিজের সংগ্রাম), কিংবা রিয়াজত (অনুশীলন) ধারণার কাছাকাছি চলে আসে। বাংলার মুসলমান ফকির ও সুফিদের ভাষায় ‘সাধনা’ এবং ‘রিয়াজত’ প্রায়ই একে অপরের অনুবাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে (Ahmed, 2004)।

ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে, বিশেষত মধ্যযুগে, কৃচ্ছসাধনমূলক তপস্যা (asceticism) প্রায়ই দেহকে দমন, কামনা-বাসনাকে শাসন, এবং জাগতিক আসক্তি থেকে আত্মাকে আলাদা করার চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিল। অবশ্য খ্রিস্টধর্মের পুরা ইতিহাসকে দেহবিরোধী বলে ফেলা ঠিক না; অবতারতত্ত্ব, দয়ার কাজ, সেবা, শ্রম, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো—এসব ধারাও সেখানে আছে। তবু পশ্চিমের ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও সমাজ নির্মাণের ইতিহাসে ‘আমি’ চেতনা এবং তার কর্তা রূপের আবির্ভাবের নধ্য দিয়ে ‘আত্মা’ বা আত্ম-গঠনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসে দেহের চেয়ে আত্মা, সময়ের চেয়ে অনন্ত, পৃথিবীর চেয়ে পরকাল, এবং বাহিরের জগতের চেয়ে অন্তর্লোককে বেশি সত্য বলে ধরার প্রবণতা প্রবল ছিল। চার্লস টেইলর দেখিয়েছেন, অগাস্টিনীয় অন্তর্মুখিতা থেকে দেকার্তীয় বিচ্ছিন্ন আত্ম পর্যন্ত পশ্চিমা ‘self’ এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেখানে মানুষ জগত থেকে দূরত্ব রেখে নিজেকে চিনতে শেখে (Taylor, 1989)।

চার্লস টেইলরের Sources of the Self (1989) মূলত আধুনিক পাশ্চাত্য আত্ম-ধারণার (modern identity) ইতিহাস। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, আধুনিক মানুষ নিজেকে যেভাবে বোঝে, তা কোনো চিরন্তন মানব-সত্য না; বরং একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নির্মাণ। আমাদের আলোচনার জন্য তাঁর ‘inwardness’ এবং ‘disengaged reason’ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ । টেইলর লিখছেন: “Augustine’s turn was a turn inward. The road from things to God passes through our awareness of ourselves.” (Taylor, 1989, p. 129) বাংলায়: “অগাস্টিনের মোড় ছিল অন্তর্মুখী মোড়। জগতের বস্তুসমূহ থেকে ঈশ্বরের দিকে যাবার পথ মানুষের নিজের আত্মসচেতনতার মধ্য দিয়েই অতিক্রম করে।” টেইলরের মতে, গ্রিক দর্শনে সত্যকে মূলত বিশ্বজগতের শৃঙ্খলা (cosmos) পর্যবেক্ষণ করে খোঁজা হতো। কিন্তু অগাস্টিনের পর সত্যের উৎস ক্রমশ মানুষের অন্তর্লোকে স্থানান্তরিত হয়। মানুষ নিজের ভেতরে ফিরে গিয়ে ঈশ্বরকে খোঁজে। এইখানে প্রথম বড় পরিবর্তন ঘটে। জগৎ আর সত্যের একমাত্র ক্ষেত্র থাকে না; মানুষের অন্তরও সত্যের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পরে দেকার্ত এই প্রবণতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। টেইলর লিখছেন:The Cartesian view represents the fullest development of a punctual self, capable of objectifying and distancing itself from everything external.” (Taylor, 1989, p. 171)। বাংলায়: “দেকার্তীয় দৃষ্টিভঙ্গি এমন এক বিন্দুসদৃশ আত্মের পূর্ণ বিকাশ, যা নিজের বাইরে অবস্থিত সবকিছুকে বস্তুতে পরিণত করতে পারে এবং তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে পারে।” এই “punctual self” বা বিন্দুসদৃশ ‘আমি’ বা ‘আত্ম’ আমাদের আলোচনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে মানুষ নিজেকে দেহ, সমাজ, প্রকৃতি, ইতিহাস—সবকিছু থেকে পৃথক একটি জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করতে শেখে। জগৎ তখন হয়ে যায় পর্যবেক্ষণের বস্তু। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো টেইলরের “disengaged self” ধারণা। তিনি লিখছেন: “We think of ourselves as independent of the objects we examine and capable of remaking them through instrumental action.” (Taylor, 1989, p. 160)। বাংলায়: “আমরা নিজেদেরকে সেইসব বস্তুর থেকে স্বাধীন বলে ভাবতে শিখি যেগুলো আমরা পরীক্ষা করি, এবং যন্ত্রগত কর্মের মাধ্যমে সেগুলোকে পুনর্গঠন করতে সক্ষম বলে মনে করি।”

খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্য আধুনিকতার এই রূপান্তরের ইতিহাসের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখা জরুরি। না রাখলে আমরা নয়াকৃষি বা নবপ্রানকে ধরতে ও বুঝতে পারব না। কারণ খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বের এই আধুনিক রূপান্তরের নধ্য দিয়েই আধুনিক মানুষের এই বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নেয় যে প্রকৃতি তার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে; প্রকৃতি জ্ঞানের বিষয়; প্রকৃতি ব্যবহারের উপাদান; প্রকৃতি পুনর্গঠনের বস্তু। কিন্তু বাংলার সাধনা, বিশেষত ভাণ্ড-ব্রহ্মাণ্ডের ধারণা, সম্পূর্ণ বিপরীত জায়গা থেকে শুরু করে।

বাংলার সাধক বলবেন না যে আমি জগতের বাইরে দাঁড়িয়ে জগতকে জানি। তিনি বলবেন, আমি জগতের মধ্যেই আছি। আমি মাটির উৎপাদন খেয়ে বাঁচি, পানি পান করে বাঁচি, বাতাসে শ্বাস নিই, খাদ্যের মাধ্যমে সূর্যের শক্তি গ্রহণ করি। আমি জগতকে জানি ঠিকই, কিন্তু সেই জ্ঞানের শর্তই হলো আমি জগতের অংশ। আমি জগত থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ‘punctual self’ না। আমি অনুমানে বাঁচি না, আম বর্তমান। আমি বর্তমানেই আছি।এই কারণে টেইলরের বিশ্লেষণ আমাদের জন্য শুধু পশ্চিমা আধুনিকতার সমালোচনা না; ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্বেরও সমালোচনা। কারণ ঔপনিবেশিক শিক্ষা আমাদেরও শিখিয়েছে যে জ্ঞান মানে জগতের বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে বিশ্লেষণ করা। কিন্তু বাংলার সাধনা বলে, জ্ঞান মানে সম্বন্ধের হুঁশ। তুমি জগতকে যত জানবে, তত বুঝবে তুমি জগতের বাইরে না। তুমিই জগত। যাহা ভাণ্ড তাহাই ব্রহ্মাণ্ড।

এইখানে টেইলারের পাশ্চাত্য চিন্তার ইতিহাস খেয়ালে রাখলে পাশ্চাত্যের সঙ্গে বাংলার সাধনার পার্থক্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। টেইলর মূলত পশ্চিমা আত্ম-ধারণার ইতিহাস লিখেছেন। কিন্তু বাংলার ভাবচর্চা আমাদের এমন এক বিকল্প পথ দেখায় যেখানে আত্ম-জ্ঞান মানে অন্তর্মুখী বিচ্ছিন্নতা না; বরং সম্বন্ধের গভীরে প্রবেশ। অগাস্টিনের পথ ভেতরের দিকে যায়; দেকার্তের পথ জগত থেকে দূরত্ব তৈরি করে; কিন্তু বাংলার সাধনা দেহ, খাদ্য, প্রেম, সেবা, মাটি, নদী, বীজ ও প্রাণের সম্বন্ধের দিকে ফিরে যায়। এই কারণেই নয়াকৃষির ‘সহজ পথে আনন্দ’ কেবল কৃষির নীতি না; এটি আধুনিক বিচ্ছিন্ন ‘আমি’ বা বিমূর্ত আত্মার বিরুদ্ধে অবস্থান: সম্বন্ধময় মানুষের পুনরাবিষ্কার। এইটুকু যদি বুঝি তাহলেও এটাও বুঝতে হবে যে বাংলার সাধনার ধারায় কোন ‘আধ্যাত্মিকতা’ নাই। তথাকথিত ‘আধ্যাত্মিকতা আমরা খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্ব ও আধুনিক পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করে এনেছি।

কিন্তু ভারতীয় সাধনার ধারাতেও কি দেহদমন নাই? অবশ্যই আছে। যোগ, সন্ন্যাস, ব্রহ্মচর্য, উপবাস, ইন্দ্রিয়সংযম, তপস্যা—ইত্যাদি বহু সংসার বিমুখতা, দেহ শাসন বা দেহ দমন রীতি ভারতীয় সাধনপথের কেন্দ্রে আছে। পতঞ্জলির যোগে ব্রহ্মচর্য ও তপ গুরুত্বপূর্ণ; গীতায় ইন্দ্রিয়সংযম, অনাসক্তি, কামনাজয়—এসব মুক্তির পথ হিসেবে আলোচিত (Patañjali, trans. 2009; Bhagavad Gītā, trans. 2008)। অর্থাৎ ভারতীয় সাধনার অনেক ধারায় দেহ, কামনা, সংসার ও নারীসঙ্গকে এমন শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে, যাকে নিয়ন্ত্রণ বা অতিক্রম না করলে জ্ঞান সম্ভব না। বাংলার সাধনার ধারা এর দ্বারা মাঝে মধ্যে পথ হারায় নি, তা না, কিন্তু মোটা দাগে বাংলার বৈষ্ণব রসধারা, নদীয়ার ভাব, সহজিয়া, ফকিরি, সুফি ও নানা লোকায়ত সাধনার স্রোত দেহকে কেবল দমন করার বস্তু হিসেবে দেখে নি।; বরং দেহকে জ্ঞানের ক্ষেত্র, প্রেমের ক্ষেত্র, সেবার ক্ষেত্র, রসের ক্ষেত্র, এবং জগতের সঙ্গে মানুষের সপ্রাণ সম্বন্ধের দরজা হিসেবে দেখা হয়েছে। এই কারণেই বাংলার সাধনা সাহিত্যে ‘দেহতত্ত্ব’ ফিরে ফিরে আসে। ফিরে ফিরে আসে। দেহ এখানে পাপের ঘর না; দেহ ভাণ্ড। আর ভাণ্ড ব্রহ্মাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন না। দেহকে অবজ্ঞা করলে জগতকে জানা যায় না—এই উপলব্ধিই বাংলার সাধনার নাভি (Dimock, 1966; Openshaw, 2002)। বাংলার ভাবসম্পদ – বিশেষত নদীয়ার ভাবের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধরতে না পারলে নদীয়ার ভাবের ধারা থেকে গড়ে ওঠা নয়াকৃষি ও নবপ্রাণকে পরিষ্কার বোঝা যাবে না।

নজরুল এই স্বাতন্ত্র্যকে এক অসাধারণ কাব্যিক মুহূর্তে ধরেছেন। “অরুণ-কান্তি কে গো যোগী ভিখারি”—এই ডাকে তিনি এক তেজোময় যোগী-রূপের সামনে ব্রজের রসবালা কণ্ঠকে দাঁড় করান। সেই কণ্ঠ বলে, “রাস-বিলাসিনী আমি আহিরিণী / শ্যামল কিশোর রূপ শুধু চিনি।” আহিরিণী এখানে যোগীর মহিমা অস্বীকার করে না; কিন্তু সে বলে, এই দীপ্ত, দেহনিরাসক্ত, গিরিজাপতি-রূপ আমার চেনা নয়। আমার চেনা রূপ হলো কৃষ্ণ, বাঁশি, রাধা, রস, লীলা, প্রেম, নীপমালা। তাই সে মিনতি করে—“হে শিব সুন্দর, বাঘছাল পরিহর, ধর নটবর-বেশ / পর নীপ-মালা।” এই আহ্বান শুধু রূপবদলের আবেদন না; এটি সাধনার দুই পথের মধ্যে এক গভীর দার্শনিক ফারাকের ভাষা। নজরুলের প্রশ্ন বাংলার সাধনার গভীর অন্দর মহল থেকে উঠে আসে। তিনি যেন বলেন: যে যোগ দেহের দীপ্তি নিয়ে দাঁড়ায় কিন্তু রসের সাড়া দেয় না, যে তপস্যা তেজস্বী কিন্তু প্রেমহীন, যে মহিমা ভক্তকে অভিভূত করে কিন্তু দেহ, সঙ্গ, প্রেম ও সেবার জগতে নামে না—বাংলার সাধনা তাকে নিজের পথ বলে মানে না। তাই গানের ব্রজবালা বলে, “পার্বতী নহি আমি, আমি শ্রীমতী / বিষাণ ফেলিয়া হও বাঁশরি-ধারী।” অর্থাৎ আমি সেই সাধনার মানুষ, যেখানে শিবকেও কৃষ্ণ হতে হয়; তেজকে রসে নামতে হয়; বাঘছালকে নীপমালায় বদলাতে হয়; বিষাণকে বাঁশিতে রূপ নিতে হয়। এখানে সাধনার লক্ষ্য দেহত্যাগ না; দেহের মধ্যে রস, প্রেম ও জগতের সুর খুঁজে পাওয়া।

এইখানেই বাংলার সাধনার স্বাতন্ত্র্য। ভারতীয় যোগ-তপস্যার বহু ধারা মুক্তিকে দেহ, কামনা, সংসার ও সম্পর্কের অতিক্রম হিসেবে দেখেছে; বাংলার বহু সাধনার ধারা মুক্তিকে দেখেছে সম্বন্ধের হুঁশ হিসেবে। এখানে দেহকে কীভাবে দমন করব সেটা প্রশ্ন নয়, বরং প্রশ্ন উলটা বা বিপরীত: দেহের ভেতর দিয়ে জগতের সঙ্গে সঠিক সম্বন্ধ কীভাবে চিনব? এখানে সাধনা মানে ইন্দ্রিয় নিভিয়ে দেওয়া না; ইন্দ্রিয়কে হুঁশে আনা। প্রেম দমন না; প্রেমকে সেবায় রূপ দেওয়া। খাদ্য ত্যাগ না; খাদ্যের হক বোঝা। জগত থেকে পালানো না; জগতে থাকার আদব শেখা। নয়াকৃষির সঙ্গে ঠিক এই জায়গার বাংলার – বিশেষত নদীয়ার ভাবের যোগ গভীর। নয়াকৃষি বলে, দেহের যত্ন মানে শুধু আমার শরীরের যত্ন না; মাটির যত্ন, বীজের হেফাজত, পানির সেবা, খাদ্যের নিরাপত্তা, প্রাণবৈচিত্রের রক্ষা—সবই দেহের যত্ন। কারণ দেহ ভাণ্ড, আর ভাণ্ড ব্রহ্মাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন না। বাংলার সাধনার দেহতত্ত্ব দেহকে জগতের দরজা হিশাবে দেখেছে; নয়াকৃষি সেই দেহতত্ত্বকে কৃষির মাঠে ফিরিয়ে আনে। তাই নয়াকৃষির ‘সহজ পথে আনন্দ’ কোনো কৃচ্ছসাধন না, আবার বাজারি ভোগও না; এটি দেহ, মাটি, খাদ্য, প্রেম, সমাজ ও প্রাণের সঙ্গে সজাগ সম্বন্ধে থাকার সাধনা।

নবপ্রাণ আখড়াবাড়িতে ফকির লবান শাহকে ভক্তের সেবা ও ভক্তি প্রদান, ২০০৮।

অতএব নজরুলের “অরুণ-কান্তি কে গো যোগী ভিখারি” কেবল ভক্তিগীতি না; এটি বাংলার ভাবচর্চার অসাধারন দার্শনিক ঘোষণা। এই গান বলে, যে সাধনা দেহ ভুলে যায়, সে জগত ভুলে যায়; যে জগত ভুলে যায়, সে প্রেম ভুলে যায়; যে প্রেম ভুলে যায়, সে প্রাণের খবর পায় না। বাংলার সাধনার পথ তাই নিষেধ, দমন ও কৃচ্ছকে চূড়ান্ত সত্য মানে না; সে দেহে ব্রহ্মাণ্ডের সাড়া, সেবায় জ্ঞানের জন্ম, আর রসে মুক্তির স্বাদ খোঁজে। এই পথেই নয়াকৃষি বাংলার হাজার বছরের সাধনার ধারাবাহিকতা হিশাবে নিজেদের দাঁড় করায়, সাধনা নতুন অর্থ লাভ করে।

এইখানে ‘সাধনা’ শব্দের আরেকটি তাৎপর্য আমাদের আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার লোকভাষায় ‘সাধ’ মানে শুধু আকাঙ্ক্ষা না; ‘সাধ’ মানে কোনো কিছু অর্জনের জন্য দীর্ঘদিনের মমতা, যত্ন ও অধ্যবসায়। আমরা এখনও বলি, “অনেক সাধনার ফল”, “সাধ করে গড়া”, “সাধের বাগান”। খেয়াল করতে হবে, এখানে সাধনা মানে কেবল চিন্তা না; যত্ন, পরিচর্যা, লালন এবং ধারাবাহিক সম্পর্ক। একটি গাছ যেমন যত্ন ছাড়া বড় হয় না, তেমনি মানুষও সাধনা ছাড়া মানুষ হয়ে ওঠে না।

এই দিক থেকে কৃষি ও সাধনার মধ্যে একটি গভীর ভাষাগত ও ধারণাগত সম্পর্ক আছে। কৃষক জমি চাষ করেন; সাধক নিজের জীবন চাষ করেন। কৃষক মাটির খবর রাখেন; সাধক সম্বন্ধের খবর রাখেন। কৃষক জানেন বীজকে জোর করে অঙ্কুরিত করা যায় না; কেবল তার উপযুক্ত শর্ত তৈরি করা যায়। তেমনি সাধকও জানেন, সত্যকে জোর করে পাওয়া যায় না; তার জন্য হুঁশ, ধৈর্য, যত্ন ও সঠিক সম্বন্ধ দরকার। নয়াকৃষি ও নবপ্রাণের আলোকে আমরা ‘সাধনা’কে এই ঐতিহাসিক অর্থেই বুঝি। সাধনা কোনো অলৌকিক শক্তি অর্জনের পদ্ধতি না; কোনো গোপন জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার পথও না। সাধনা মানে জগতের সঙ্গে এমন ব্যবহারিক সম্বন্ধ গড়ে তোলা, যাতে আমরা ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ডের অভিন্নতা সম্পর্কে হুঁশ হারিয়ে না ফেলি। কৃষি তখন মাটির সেবা, বীজের হেফাজত, প্রাণবৈচিত্র রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, প্রকৃতির সেবা, নদী-সাগর-খাল-বিল-হাওর-বাওরের যত্ন, সমাজের সহযোগিতা, সর্বোপরি নিজের, পরিবার এবং সমাজের যত্ন ও পরিচর্যা হয়ে ওঠে। কৃষি তখন সাধনার রূপ নেয়। তাই এটা বুঝতে হবে নয়াকৃষির ‘সহজ পথে আনন্দ’ আসলে সাধনারই আরেক ভাষা। কারণ আনন্দ এখানে কোনো ভোগের উল্লাস না; বরং জগতের সঙ্গে সঠিক সম্বন্ধে থাকার ফলে যে প্রশান্তি, আস্থা ও প্রাণশক্তি জন্ম নেয়, তার নাম আনন্দ। আর সেই আনন্দের পথে চলার নাম সাধনা।

ধান ঝাড়া হচ্ছে। আরশিনগর বিদ্যাঘর, ঈশ্বরদী, পাবনা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, ২০১৯। ছবি- অতনু সিংহ

অথচ পাশ্চাত্য আধুনিকতার প্রতাপে সাধনা নানান কারনে সমাজের বাইরে ব্যক্তিগত, অজানা কিম্বা গোপন চর্চার ক্ষেত্রের ইঙ্গিত সেয়। কিন্তু বাংলার ভাবের জগতে সাধনার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও সেটা ঘটে ও ঘটছে। বাংলায় সাধনা কখনোই রহস্যগিরি, গোপন তরিকত, গুপ্ত বিদ্যা কিংবা দেহছাড়া আত্মার খোঁজ ছিল না। বরং সাধনা মানে ছিল দেহসম্পন্ন মানুষ হিসেবে জগতে আমরা কিভাবে আছি বা থাকি সেই তত্ত্ব অনুসন্ধান এবং তার খবর রাখা।
এই গুরুতর পার্থক্য সহজে বোঝা যায় না। কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, দর্শনচর্চা, এমনকি ধর্ম সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণার ওপরও দীর্ঘকাল ধরে এমন এক চিন্তার প্রভাব কাজ করেছে, যেখানে সত্যকে জগতের বাইরে, দেহের বাইরে, পরিবর্তনের বাইরে খোঁজা হয়েছে। পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে প্লেটো থেকে শুরু করে বহু ধারায় দেখা যায়, দৃশ্যমান জগৎকে ক্ষণস্থায়ী, অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর বলে গণ্য করা হয়েছে, আর সত্যকে ধরা হয়েছে কোনো এক অপরিবর্তনীয়, চিরন্তন, শুদ্ধ জগতের অন্তর্গত বলে (Plato, trans. 1997)। আগে উল্লেখ করেছি, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়। মানুষের প্রকৃত নিবাস পৃথিবী না, পরকাল; দেহ না, আত্মা; সময় না, অনন্তকাল—এই ধারণা পশ্চিমা সভ্যতার গভীরে কাজ করেছে (Taylor, 1989)। পাশ্চাত্য চিন্তার ইতিহাস এবং আমাদের কলোনিয়াল গোলামির হদিস না নিলে কিভাবে আমরা পাশ্চাত্য চিন্তার গোলামে পরিণত হয়েছি সেই দিকটা সহজে ধরা যায় না। এর দ্বারা এটাও বোঝা যায় বাংলাদেশে আমরা ইসলামের নামে যে ইহকাল অস্বীকারকারী প্রকট ‘পরকালবাদ’-এর উত্থান দেখছি তার পেছনে দারিদ্র্য এবং পুজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা্র মুখে অসহায় অবস্থার প্রতিক্রিয়া এবংমানুষের ইহলৌকিক জীবনের প্রতি আস্থা ও ভরসা হারিয়ে ফেলা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও মতাদর্শ হিশাবে এর আমদানি আধুনিক খ্রিস্টিয় পাশ্চাত্য থেকে।

ইউরোপীয় বৌদ্ধিক ইতিহাসে ধীরে ধীরে এমন এক ধারা গড়ে ওঠে যেখানে মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার দেহগত, সামাজিক ও প্রাকৃতিক অবস্থানের মধ্যে না থেকে এক ধরনের অতীন্দ্রিয় বা আত্মগত সত্তার মধ্যে খোঁজা হয়। চার্লস টেইলরের Sources of the Self (1989) এই ইতিহাস বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। পাশ্চাত্য চিন্তার ইতিহাস এবং আমাদের ঔপনিবেশিক গোলামির হদিস না নিলে এই পার্থক্য সহজে ধরা যায় না। কারণ আমরা যে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বড় হয়েছি, তার অধিকাংশ ধারণাই ইউরোপীয় আধুনিকতার ভেতর থেকে এসেছে। ফলে আমরা অজান্তেই এমন সব প্রশ্ন করি, যা বাংলার ভাবচর্চার প্রশ্ন না; বরং ইউরোপের দীর্ঘ ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ইতিহাসের উত্তরাধিকার। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Sources of the Self–এ চার্লস টেইলর দেখিয়েছেন যে আধুনিক পাশ্চাত্যে ‘আত্ম’ (self) কোনো চিরন্তন বা স্বাভাবিক বিষয় না; ‘আত্ম’ বা আত্মাএকটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক নির্মাণ (Taylor, 1989)। প্রাচীন গ্রিক দর্শন, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব, মধ্যযুগীয় আত্মশুদ্ধির ধারা, এবং আধুনিক যুক্তিবাদের ভেতর দিয়ে এমন এক মানুষের ধারণা তৈরি হয়, যার সত্যিকার পরিচয় তার জাগতিক অবস্থানের মধ্যে না, বরং মানুষের অন্তর্গত কোনো এক গভীর আত্মিক সত্তার মধ্যে খোঁজা হয়। টেইলর দেখিয়েছেন, ইউরোপীয় খ্রিস্টধর্মে বিশেষত অগাস্টিনের (Augustine) পর থেকে মানুষের সত্যের অনুসন্ধান ক্রমশ বাহিরের জগত থেকে সরে ভেতরের আত্মার দিকে মোড় নেয়। সত্যকে প্রকৃতির মধ্যে নয়, মানুষের অন্তর্লোকে খোঁজা হয়। ঈশ্বরের দিকে যাত্রার মানে হয়ে ওঠে নিজের ভেতরে প্রত্যাবর্তন। এই ধারা পরে দেকার্তের দর্শনে নতুন রূপ পায়। দেকার্তের কাছে নিশ্চিত সত্য দেহ, সমাজ বা প্রকৃতির মধ্যে পাওয়া যায় না; পাওয়া যায় চিন্তাশীল আত্মসচেতনতার মধ্যে—”আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি” (Descartes, 1641/1996)। ফলে মানুষের জ্ঞান ও জগতের মধ্যে একটি মৌলিক দূরত্ব তৈরি হয়। জগত হয়ে ওঠে জানার বিষয়; মানুষ হয়ে ওঠে জ্ঞানের কর্তা। টেইলর এই ধারাকে ‘disengaged self’ বা বিচ্ছিন্ন আত্মের উত্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন (Taylor, 1989)। এই ‘আমি’ বা আত্ম নিজেকে প্রকৃতি, সমাজ, ইতিহাস, এমনকি নিজের দেহ থেকেও একধরনের দূরত্বে স্থাপন করতে শেখে। এই দূরত্বই আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক রাষ্ট্রের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। কারণ জগতকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আগে নিজেকে জগত থেকে আলাদা ভাবতে হয়। তাই নিজেকে জগত বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে আলাদা ভাবতেই আমরা শিখি। আর এই বিচ্ছেদই জগত ধ্বংস ও গ্রহীয় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে ওঠে। কারন আমরা আর বুঝতে পারি না আমরা জগতেরই অংশ। বুঝতে পারি না বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আমাদের দেহেরই সম্প্রসারণ। কিম্বা ভাবতে অসম্ভব মনে হয় যে আমরা ব্রহ্মাণ্ডের বাইরে না। বোঝার ক্ষমতা আমরা হারিয়ে ফেলি যে যা ভাণ্ড তাই ব্রহ্মাণ্ড।

আধুনিক যুগে এসে বিজ্ঞানের উত্থান এই ধর্মীয় কাঠামোকে ভেঙেছে বটে, কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তার উত্তরাধিকার বহাল থেকেছে। আত্মার জায়গায় এবার এসেছে চেতনা, মন, যুক্তি বা Subject। দেকার্ত যখন বললেন, “আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি”, তখন তিনি মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি দেহে নয়, চিন্তাশীল সত্তায় খুঁজলেন (Descartes, 1641/1996)। ফলে জগৎ হয়ে উঠল চিন্তার বিষয়, আর মানুষ হয়ে উঠল জগতের পর্যবেক্ষক। এখান থেকেই আধুনিক বিজ্ঞানের সেই শক্তিশালী ধারণা জন্ম নেয়, যেখানে মানুষ জগতের বাইরে দাঁড়িয়ে জগতকে মাপে, গণনা করে, ব্যাখ্যা করে, শ্রেণিবদ্ধ করে এবং শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বাংলার ভাবচর্চা এই পথে হাঁটে নাই। বাংলার সাধনা মানুষকে জগতের বাইরে নিয়ে যেতে চায় না; বরং জগতের ভেতরে ফিরিয়ে আনে। এখানে তাই এ ধরনের প্রশ্ন কখনই প্রধান হয় নি যে “জগতের বাইরে সত্য কোথায়?” বরং প্রশ্ন হচ্ছে, “আমি জগতের ভেতরে কোথায় আছি?” এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথম প্রশ্ন মানুষকে মুক্তির (Salvation) নামে জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে; দ্বিতীয় প্রশ্ন মানুষকে জগতের সঙ্গে তার সম্বন্ধের দিকে ফিরিয়ে আনে। এ কারণে পাশ্চাত্যের মতো মানুষের ‘মুক্তি’-র (Salvation) ধারণা প্রাচ্যে আমরা দেখি না বললেই চলে।

আমাদের ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কারণে খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্ব থেকে উদ্ভূত এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকে নাই। ঔপনিবেশিক শিক্ষা, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞানচর্চা এবং উন্নয়ন তত্ত্বের মাধ্যমে এই জগত-বিচ্ছিন্ন ‘আমি’ বা আত্মের ধারণা আমাদের মধ্যেও প্রবল ভাবে প্রবেশ করেছে। ফলে আমরা প্রায়ই মনে করি জ্ঞান মানে জগতের বাইরে দাঁড়িয়ে জগতকে ব্যাখ্যা করা; উন্নয়ন মানে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা; আর মুক্তি মানে দেহ, মাটি ও দৈনন্দিন জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া। ‘মানুষ প্রকৃতিকে জয় করবে আর মানবেতিহাসে প্রকৃতিকে জয় করাই মানুষের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে– প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের গর্জনও এই বিমূর্ত ‘আমি’ বা আত্মার আস্ফালন থেকে ঘোষিত হয়। পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকিও বাদ থাকে না। যুদ্ধ, বিগ্রহ, ধ্বংস, মিলিটারি-ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল কমপ্লেস্ক, ড্রোন, পারমাণবিক বোমা, জেনেটিকালি মডিফাইড অরগেনিজম এই সব কিছুর গোড়ায় রয়েছে জগতকে দখল, নিয়ন্ত্রণ শাসন করবার শর্তের আবির্ভাব। আর সেটা হোল নিজেকে জগত থেকে আলাদা ভাবতে শেখা ।

এইটুকু ধরতে পারলে আমরা বুঝব বাংলার ভাবচর্চা এই জায়গায় এক ভিন্ন পথের ইশারা দেয়। এখানে জগত থেকে পালিয়ে সত্য খোঁজা হয় না; বরং সন্ধান চলে জগতের মধ্যে নিজের অবস্থান বুঝে। এখানে আত্মজ্ঞান মানে দেহভোলা না; বরং দেহের হুঁশ। এখানে মুক্তি মানে সম্পর্ক ছিন্ন করা না; বরং সম্পর্কের প্রকৃতি বোঝা। এই কারণেই বাংলার সাধনা মানুষকে জগতের বাইরে নিয়ে যায় না; জগতের ভেতরে ফিরিয়ে আনে। বাংলার ভাবুকতা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ড আলাদা হলেও বিচ্ছিন্ন না, এবং মানুষের দেহ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বাইরে কোনো স্বাধীন সাম্রাজ্য না; বরং সজ্ঞান ও সচেতন ব্রহ্মাণ্ডেরই এক ক্ষণস্থায়ী কিন্তু সজাগ প্রকাশ। সাধকের সাধনা তাই হয়ে ওঠে সেই ভাষা রপ্ত করা যে ভাষায় ব্রহ্মাণ্ড স্বয়ং কথা বলে।

তাই নয়াকৃষি মানে দেহের যত্ন। আর যে আমি আমার দেহেই বাস করি তার রসতাত্ত্বিক উপলব্ধি এবং নিজেকে সেই উপলব্ধির জ্ঞানতাত্ব্বিক নিশ্চয়তার সাক্ষী হওয়ার সাধনাই নবপ্রাণের সাধনা। কিন্তু এই ‘দেহ’ বলতে আমরা কেবল ব্যক্তিগত শরীর বুঝি না। বাংলার ভাবচর্চার ভাষায় ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ড বিচ্ছিন্ন না; মানুষের দেহ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে আলাদা কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা না। আমি যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে পানি পান করি, যে খাদ্য খাই, যে আলো গ্রহণ করি—সবই পৃথিবী ও বিশ্বপ্রকৃতির অবিরাম প্রবাহের অংশ। ফলে আমার দেহের যত্ন এবং মাটির যত্ন, আমার স্বাস্থ্যের হেফাজত এবং নদীর হেফাজত, আমার খাদ্যের নিরাপত্তা এবং বীজের স্বাধীনতা—এগুলো আলাদা আলাদা বিষয় না। এরা একই সম্বন্ধের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ।

এই কারণেই নয়াকৃষি কেবল কৃষির প্রশ্ন না। এটি জগতের মধ্যে মানুষের অবস্থান সম্পর্কে মৌলিক দার্শনিক অবস্থান। আধুনিক ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্বের ভিত্তি ছিল মানুষকে জগত থেকে আলাদা করে দেখা। মানুষ জ্ঞানের কর্তা, প্রকৃতি জ্ঞানের বিষয়; মানুষ সক্রিয়, প্রকৃতি নিষ্ক্রিয়; মানুষ ইতিহাসের নির্মাতা, প্রকৃতি কাঁচামাল—এই দ্বৈততার ওপর আধুনিক বিজ্ঞান, উন্নয়ন, রাষ্ট্র ও পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বড় অংশ গড়ে উঠেছে (Taylor, 1989; Escobar, 2018)। ঔপনিবেশিক শাসন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলে জমি হয়ে উঠেছে ‘সম্পদ’, নদী হয়েছে ‘জলসম্পদ’, বন হয়েছে ‘কাঠের মজুদ’, বীজ হয়েছে ‘জেনেটিক উপাদান’, আর মানুষ নিজেই হয়ে উঠেছে ‘মানবসম্পদ’। জগতের সঙ্গে মানুষের জীবন্ত সম্বন্ধকে এই ভাষা ধীরে ধীরে মুছে দিয়েছে। নয়াকৃষি এইখানেই আপত্তি তোলে। কারণ নয়াকৃষির মতে জ্ঞান মানে জগতের বাইরে দাঁড়িয়ে জগতকে কাঁচামাল বা ভোগের হাতিয়ার বানানো না। জ্ঞান মানে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা না; জ্ঞান মানে সম্বন্ধের হুঁশ। জ্ঞান মানে জানা যে আমি জগতের মালিক না, বরং জগতের অন্তর্গত; আমি প্রকৃতির বাইরে না, প্রকৃতিরই এক মুহূর্ত; আমি খাদ্য উৎপাদন করি বটে, কিন্তু খাদ্যও আমাকে উৎপাদন করে। এই অর্থে জ্ঞান কোনো বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষকের সম্পদ না; এটি সম্বন্ধের ভেতরে বাস করার সক্ষমতা।

এই অবস্থান বাংলার সাধনার ধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সাধনা মানে নতুন কোনো সত্য আবিষ্কার করা না; বরং যে সম্বন্ধের মধ্যে আমরা আগেই আছি, তার খবর রাখা। একই কারণে মার্কস ফয়েরবাখের সমালোচনা করতে গিয়ে মানুষকে বিমূর্ত চেতনা হিসেবে না দেখে ‘ইন্দ্রিয়সম্পন্ন ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত মানুষ’ হিসেবে ধরতে চেয়েছিলেন (Marx, 1845/1978)। মানুষ প্রকৃতিকে কেবল চিন্তা করে না; প্রকৃতির সঙ্গে ব্যবহারিক সম্বন্ধে লিপ্ত থাকে। পরে পুঁজি গ্রন্থে তিনি মানুষ ও প্রকৃতির এই অবিরাম আদান-প্রদানকে ‘মেটাবলিক ইন্টারঅ্যাকশন’ বা জৈব বিনিময় বলে ব্যাখ্যা করেন (Marx, 1867/1976)। মানুষ প্রকৃতির অংশ হয়েও প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করে; এই দ্বৈত অবস্থানই মানুষের বিশেষত্ব। নয়াকৃষি এই মার্কসীয় অন্তর্দৃষ্টিকে বাংলার ভাবচর্চার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে। ‘যাহা ভাণ্ডে তাহাই ব্রহ্মাণ্ডে’—এই উপলব্ধি এবং মার্কসের ‘ব্যবহারিক সম্বন্ধ’ শেষ পর্যন্ত একই দিকে ইঙ্গিত করে। উভয় ক্ষেত্রেই মানুষকে বিচ্ছিন্ন আত্মা বা প্রকৃতির প্রভু হিসেবে না দেখে, জগতের চলমান প্রাণপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বোঝা হয়। পার্থক্য হলো, বাংলার সাধনার ভাষা এই সম্বন্ধকে ‘ভাব’, ‘সেবা’, ‘হুঁশ’ ও ‘আনন্দ’ দিয়ে প্রকাশ করেছে; মার্কস তা প্রকাশ করেছেন শ্রম, জৈব বিনিময় ও ব্যবহারিক সম্বন্ধের ভাষায়।

এইখানেই আমাদের ‘সহজ পথে আনন্দ’ কথাটিরগভীর তাৎপর্য। সহজ মানে প্রকৃতির ওপর আধিপত্য না; প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান। আনন্দ মানে ভোগের উত্তেজনা না; বরং এমন এক জীবনযাপন, যেখানে দেহ, সমাজ, মাটি, পানি, বীজ ও প্রাণবৈচিত্রের মধ্যে বৈরিতা কমে আসে এবং সম্বন্ধের সুর ফিরে আসে। ফলে নয়াকৃষি কেবল কৃষকের উৎপাদনপদ্ধতি না; নবপ্রাণও শুধু ফকিরি গান চর্চার আখড়া না। উভয়েই জ্ঞানচর্চার শক্তিশালী বিকল্প ধারা, দেহ ও জগতের সম্বন্ধ পুনর্গঠনের শক্তিশালী চর্চা, এবং যুদ্ধবাজ জীবাশ্মভিত্তিক ঔপনিবেশিক-পুঁজিতান্ত্রিক সভ্যতার বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা ও প্রতিরোধ। এ কারনে এই লড়াই শেষ পর্যন্ত গ্রহীয় রাজনীতির প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়। জলবায়ু বিপর্যয়, প্রাণবৈচিত্রের ক্ষয়, মাটির মৃত্যু, খাদ্যের বিষাক্ততা, পানির সংকট—এসবের মূলে কেবল ভুল প্রযুক্তি নাই; রয়েছে মানুষ ও ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ভুল ব্যবহারিক সম্বন্ধ। নয়াকৃষি সেই সম্বন্ধের বৈপ্লবিক রূপান্তরের প্রস্তাব। অর্থাৎ নয়াকৃষি শুধু কৃষির নতুন পদ্ধতি না; বরং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নতুন করে ভাবা, নতুন করে চর্চা , এবং নতুন করে বেঁচে থাকার সাধনা। (Marx, 1845/1978, 1867/1976; Taylor, 1989; Escobar, 2018)।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top