ফকির লালন: বাংলার ভাব ও ভাষার ঐশ্বর্য

।। ফরহাদ মজহার ।।



ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবসকে জাতীয় পর্যায়ে পালনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদ প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর তাঁর তিরোধান দিবসকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিশাবে পালনের প্রস্তাব অনুমোদন করে; ৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিক ভাবে জানায় (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা [বাসস], 2025)। অর্থাৎ লালনের তিরোধান দিবস এখন আর কুষ্টিয়ার স্থানীয় স্মরণোৎসব মাত্র নয়; রাষ্ট্র একে জাতীয় তাৎপর্যের দিবস হিশাবে গ্রহণ করেছে। (BSS)

এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু এই নয় যে আরেকজন বিশিষ্ট মানুষের তিরোধান দিবস রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডারে জায়গা পেল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিজের ইতিহাসের এমন এক ভাবগত সম্পদের দিকে রাষ্ট্রীয় ভাবে ফিরে তাকাবার সুযোগ পেয়েছে, যাকে দীর্ঘদিন প্রধানত ‘লোকসংস্কৃতি’, ‘লোকগান’, ‘বাউলগান’ কিংবা গ্রামীণ বিনোদনের বিষয় হিশাবে দেখা হয়েছে। লালন নিঃসন্দেহে অসাধারণ গীতিকার; সঙ্গীতেও তিনি এক বিপুল জগৎ নির্মাণ করেছেন। কিন্তু তাঁকে শুধু গান দিয়ে বিচার করলে তাঁর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গুরুত্বই অধরা থেকে যায়।

বাংলা ভাষায় মানুষ, দেহ, জাত, ধর্ম, গুরু, সম্পর্ক, জন্ম, মৃত্যু, কাম, অপর এবং নিজেকে জানার যে প্রশ্ন লালন তুলেছেন, সেগুলো বিচার করলে বোঝা যায় বাংলার ‘ভাবচর্চা’কে সংস্কৃত ‘দর্শন’ কিংবা পাশ্চাত্য philosophy-র সহজ অনুবাদ ধরে নিলে তার স্বতন্ত্র জ্ঞানগত চরিত্র ধরা পড়ে না। সংস্কৃত ‘দর্শন’-এ সত্যের প্রশ্ন দেখা, উপলব্ধি, তত্ত্বগত প্রতিষ্ঠা এবং নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় পদ্ধতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত। পাশ্চাত্য philosophy-র গোড়ার অর্থে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও তার দীর্ঘ ইতিহাসে সত্য, জ্ঞান, যুক্তি, ধারণা ও বিচার প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বাংলার ‘ভাব’ অন্য পথে সত্যের কাছে যায়। এখানে সত্য কেবল কোনো প্রস্তাব সঠিক না ভুল, কিংবা কোনো তত্ত্ব যুক্তিসঙ্গত কি না—এই বিচারে শেষ হয় না। মানুষ কীভাবে বাঁচে, কাকে গুরু মানে, নিজের দেহ ও কামকে কীভাবে ধারণ করে, অন্য মানুষের সঙ্গে কী সম্পর্ক গড়ে, জন্ম-মৃত্যুকে কীভাবে নেয় এবং নিজের মধ্যে কী রূপান্তর ঘটায়—সত্য সেই জীবনচর্চার মধ্যেও যাচাই হয়।

‘ভাব’ শব্দটির সঙ্গে ‘ভূ’—হওয়া বা হয়ে ওঠার সম্পর্ক মনে রাখা তাই জরুরি। ভাব শুধু চিন্তার বিষয় নয়; হয়ে ওঠারও প্রশ্ন। যে সত্য জানলাম, সেই সত্যে আমি কী হলাম—ভাবের জিজ্ঞাসা সেখানেও। সেই কারণে মুখের ভাষা, সাধুসঙ্গ, কালাম, প্রশ্ন, জবাব, বাহাস, গুরু-শিষ্য সম্পর্ক এবং জীবনযাপনের মধ্যে বাংলায় সত্য অন্বেষণের একটি নিজস্ব দীর্ঘ ইতিহাস আছে। লালন সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ভাবুক। তাঁকে শুধু ‘দার্শনিক’ বললে তাঁর কাজের একটি দিক ধরা পড়ে; ‘ভাবুক’ বললে জানা, করা এবং হয়ে ওঠার সম্পর্কটিও সামনে আসে। দর্শন সত্যকে তত্ত্বে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, philosophy সত্যকে জ্ঞান ও যুক্তির প্রশ্নে বিচার করতে পারে, কিন্তু ‘ভাব’ সত্যকে জীবনের মধ্যে ঘটিয়ে যাচাই করতে চায়।

এই কারণেই জাতীয় পর্যায়ে লালনের স্বীকৃতি একই সঙ্গে সুযোগ এবং বিপদ। সুযোগ হচ্ছে বাংলাদেশ নিজের ভাব ও ভাষার ঐশ্বর্য নতুন করে চিনতে পারে। বিপদ হচ্ছে রাষ্ট্র যাকে স্বীকৃতি দেয়, তাকে প্রশাসনিক শ্রেণী, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী, পর্যটন ও বাজারের উপযোগী প্রতীকে পরিণত করার প্রবণতাও তৈরি হয়। জীবন্ত সাধনাকে ‘ঐতিহ্য’ বানানো যায়, সাধককে শিল্পী, কালামকে বিনোদনের গান এবং আখড়াকে পর্যটনকেন্দ্র বানানো যায়। তখন লালনের উৎসব বাড়তে পারে অথচ লালনের ভাব, ভাষা ও সাধনার জীবন্ত শর্ত ক্রমে নষ্ট হতে পারে।

তাই জাতীয় ভাবে লালনকে প্রতিষ্ঠার প্রথম কাজ কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিমা নির্মাণ নয়; বরং তাঁকে ঘিরে আমাদের নিজেদের জ্ঞানগত ভুল, ঐতিহাসিক বিকৃতি এবং সাংস্কৃতিক অভ্যাসের পর্যালোচনা। প্রশ্নটি সরাসরি করা দরকার: আমরা কাকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দিচ্ছি—ঐতিহাসিক ফকির লালন শাহকে, নাকি পরবর্তী গবেষণা, ভদ্রলোকি সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যব্যবস্থা এবং বিনোদনশিল্পের হাতে নির্মিত একটি সাংস্কৃতিক প্রতিমাকে?

আজ ‘বাউল লালন’, ‘বাউল সম্রাট’, ‘বাউল সাধক’—এই সব পরিচয় এত প্রচলিত যে আমরা এগুলোকে প্রায় ইতিহাসের স্বাভাবিক সত্য বলে ধরে নিই। সরকারি বিবরণী, সংবাদমাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক পরিসরেও একই নাম চালু। ইউনেস্কো ২০০৫ সালে Baul Songs-কে মানবজাতির মৌখিক ও অমূর্ত ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিশাবে ঘোষণা করে এবং ২০০৮ সালে বাংলাদেশের নামে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সেখানে ‘Bauls’কে ‘mystic minstrels’ হিশাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে (UNESCO, 2008)। (UNESCO Intangible Heritage)

কিন্তু একটি নাম দীর্ঘদিন ব্যবহার হতে হতে ইতিহাসের ব্যাখ্যা থেকে ইতিহাসের সত্যে পরিণত হতে পারে। তখন প্রশ্নই আর করা হয় না—‘বাউল’ কার দেওয়া নাম, কোন কালে তার অর্থ কী ছিল, যাঁদের এই নামে ডাকা হয়েছে তাঁরা নিজেদেরও সেই নামে চিনতেন কি না, এবং একটি সাধারণ নামের নিচে কত রকম আলাদা সাধনা, গুরুপরম্পরা ও আত্মপরিচয় চাপা পড়ে গেছে।

প্রামাণ্য বলে গৃহীত লালনের কালামসম্ভারে আত্মপরিচয় হিশাবে ‘বাউল’ নাই। তিনি নিজেকে ‘ফকির’ হিশাবে হাজির করেন; তাঁর গুরু সিরাজ সাঁইকে দরবেশি পরম্পরার মধ্যে স্মরণ করেন। এই তথ্য নিছক শব্দ নিয়ে খুঁতখুঁতে আপত্তি নয়। কারণ ‘ফকির’, ‘দরবেশ’, ‘বৈষ্ণব’, ‘কর্তাভজা’, ‘সাহেবধনী’ বা অন্য সাধনপরম্পরার নাম শুধু লেবেল নয়; নামের সঙ্গে গুরুপরম্পরা, সাধনরীতি, দেহ ও মানুষের ধারণা, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, কালামের ভাষা, সামাজিক ইতিহাস এবং সত্য যাচাইয়ের পদ্ধতিও যুক্ত।

এই জায়গাতেই ‘বাউলিকরণ’ কথাটির প্রয়োজন। এর অর্থ কোনো গোপন ষড়যন্ত্র নয়। বরং বিচিত্র সাধনধারাকে ক্রমে এমন একটি সাধারণ নামে পড়া, যার ফলে মিলগুলো দৃশ্যমান হয় আর ফারাকগুলো পেছনে চলে যায়। ‘বাউল’ আজ বাস্তব সাংস্কৃতিক পরিচয়; এমন মানুষও আছেন যাঁরা নিজেদের বাউল বলেন। কিন্তু কোনো পরিচয় আজ বাস্তব বলে দুইশ বছর আগেও একই অর্থে বাস্তব ছিল—এ কথা ইতিহাসসম্মত নয়। বর্তমানের শ্রেণীকে অতীতে ঠেলে দিয়ে লালনের নিজের আত্মপরিচয়ের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া তাই ইতিহাসচর্চা হতে পারে না।

এখানে ‘জ্ঞান-রাজনৈতিক নির্মাণ’ কথাটির অর্থ পরিষ্কার করা দরকার। মিশেল ফুকোর জ্ঞান ও ক্ষমতার বিশ্লেষণের বড় শিক্ষা হলো, জ্ঞান শুধু আগে থেকে থাকা বাস্তবতাকে নিরীহ ভাবে বর্ণনা করে না; কোন জিনিসকে কী নামে চেনা হবে, কোন পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হবে, কোন মানুষকে কোন শ্রেণীতে ফেলা হবে—এই ব্যবস্থাও জ্ঞান তৈরি করে (Foucault, 1972, 1980)। (Google Books) একটি নামের চারপাশে গবেষণা, গ্রন্থ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ, আর্কাইভ, সরকারি তালিকা, উৎসব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তৈরি হলে একসময় সেই নামই আগাম সত্য হয়ে ওঠে। তখন যার পরিচয় নির্ধারণ করা হচ্ছে তার নিজের ভাষার চেয়ে তাকে নিয়ে উৎপাদিত জ্ঞানের ভাষা বেশি ক্ষমতাবান হয়ে যায়।

জিন ওপেনশ দীর্ঘ মাঠগবেষণায় দেখিয়েছেন, শিক্ষিত বাঙালি সমাজ যাঁদের এক কথায় ‘বাউল’ বলে, তাঁদের অনেকের আত্মপরিচয় এত সরল নয়। তাঁর বিশ্লেষণে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে শহুরে শিক্ষিত সমাজে ‘বাউল’-এর প্রতীকী মর্যাদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণীটির সারার্থ-নির্মাণ বা essentialisation ঘটে—অর্থাৎ বিচিত্র সাধকজীবনের পেছনে একটি স্থায়ী, অভিন্ন ‘বাউল সত্তা’ আছে বলে ধরে নেওয়া হয় (Openshaw, 1998, 2002)। ‘কল্পিত’ বললে এখানে অবাস্তব বোঝায় না; বোঝায় এমন একটি সামাজিক শ্রেণী, যা মানুষের ওপর ফিরে এসে তাদের পরিচয়ও গড়ে দিতে শুরু করে।

ঊনিশ শতকের শ্রেণীবিন্যাসী জ্ঞানচর্চা এই পরিবর্তনের একটি পূর্বশর্ত তৈরি করে। অক্ষয়কুমার দত্তের ভারতবর্ষীয় উপাসক-সম্প্রদায় এই ক্ষেত্রে স্মরণীয়। তাঁর কাজের মূল্য বিপুল। ১৮৭০ ও ১৮৮০-এর দশকে প্রকাশিত দুই ভাগে তিনি বিপুল সংখ্যক প্রান্তিক উপাসক ও সাধকসম্প্রদায় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও শ্রেণীবিন্যাস করেন (দত্ত, 1870/1883; হোসাইন, 2020)। (Bangla Journal) কিন্তু আধুনিক শ্রেণীবিন্যাসের একটি সীমা আছে: জীবন্ত সাধনার চলাচল, গুরুভেদ, স্থানীয় ফারাক, পারস্পরিক ধার নেওয়া এবং একই মানুষের জীবনে একাধিক ধারার প্রভাবকে স্থির ঘরে বন্দী করার প্রবণতা তৈরি হয়। অক্ষয়কুমারকে ‘বাউলিকরণের জনক’ বলা ভুল হবে; বরং তাঁর কাজ আমাদের শেখায়, নথিবদ্ধ করা জরুরি, কিন্তু গবেষকের তৈরি শ্রেণীকে সংশ্লিষ্ট মানুষের আত্মপরিচয় বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।

‘বাউলিকরণ’-এর পরের বড় বাঁক রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহে বসবাস, গগন হরকরার গান, কুষ্টিয়া-নদীয়া অঞ্চলের সাধকদের সঙ্গে পরিচয়, লালনের কালাম সংগ্রহ এবং প্রবাসী-তে প্রকাশ—এসবের মাধ্যমে তিনি শিক্ষিত ভদ্রসমাজে এই জগতের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। এই অবদান অস্বীকার করার প্রশ্ন নাই। কিন্তু তাঁর হাতেই ‘বাউল’ একটি নির্দিষ্ট সাধকজীবনের নাম থেকে উঠে নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক প্রতীকে পরিণত হয়। The Religion of Man-এ বাউল তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’-এর বৃহত্তর ভাবনার মধ্যে এমন এক মানুষ, যে নিজের মধ্যে অসীমের সন্ধান করে (Tagore, 1931)। পরবর্তী গবেষণায়ও দেখানো হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের প্রচার ‘বাউল’কে শহুরে মধ্যবিত্ত ও আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে, কিন্তু তার জন্য সাধকজীবনের অস্বস্তিকর, গুপ্ত বা সামাজিক ভাবে কঠিন দিকগুলোকে অনেক সময় নরম ও নান্দনিক করা হয়েছে (Lorea, 2014; Ferrari, 2012)। (Sage Journals)

এই জায়গায় সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্নটি সূক্ষ্ম। প্রান্তকে মুছে ফেলা হয় না; বরং কেন্দ্র এমন ভাবে স্বীকৃতি দেয় যাতে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রের ভাষাই প্রান্তের পরিচয় নির্ধারণ করে। রবীন্দ্রনাথের হাতে ‘বাউল’ বাংলার বিশ্বজনীন আত্মার প্রতীক হয়ে ওঠে, কিন্তু নদীয়ার নির্দিষ্ট ফকিরি ইতিহাস, গুরুপরম্পরা, দেহী মানুষ, নারী-পুরুষের সাধনা এবং স্থানীয় বাহাস তার কেন্দ্রে থাকে না। যে লালন নিজেকে ‘ফকির’ বলেছেন, পরবর্তী ইতিহাসে তিনিই ‘বাউল সম্রাট’ হয়ে ওঠেন।

এর সঙ্গে ‘বাউল’-এর দৃশ্যগত গেরুয়াকরণও যুক্ত হয়েছে। গেরুয়া বাংলার সাধনজগতে আগে ছিল না—এমন দাবি করা ভুল। নানা সন্ন্যাসী ও সাধনধারায় গেরুয়া বহু পুরানা রং। কিন্তু বিশ শতকে মেলা, শান্তিনিকেতন, সাংস্কৃতিক মঞ্চ, সংবাদমাধ্যম ও পরে পর্যটনের মধ্যে গেরুয়া বা মেটে আলখাল্লা, একতারা, দীর্ঘ বা খোলা চুল এবং নির্দিষ্ট দেহভঙ্গি মিলিয়ে ‘বাউল’-এর একটি সহজে চেনা দৃশ্যরূপ তৈরি হয়েছে। লিসা নাইট দেখিয়েছেন, জনপ্রিয় কল্পনায় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ‘বাউল’কে প্রায়শ প্রবহমান চুল, গেরুয়া পোশাক ও একতারায় চেনানো হয়; নারীর ক্ষেত্রেও মঞ্চের পোশাক ও খোলা চুল একটি বিশেষ প্রদর্শনমূলক পরিচয় তৈরি করে (Knight, 2011)। (OUP Academic) দৃশ্যমানতার এই রাজনীতি নিরীহ নয়। দূর থেকে দেখেই দর্শক যেন বুঝতে পারেন ‘এই ব্যক্তি বাউল’। ফলে পোশাক সাধনরীতির একটি সম্ভাব্য অংশ থেকে সাংস্কৃতিক ইউনিফর্মে পরিণত হয়, আর বাংলাদেশের ফকিরি ধারার স্বতন্ত্র রূপ ও নাম পেছনে সরে যায়।

ক্ষিতিমোহন সেন এই প্রক্রিয়াকে অন্য এক বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি দেন। তাঁর বাংলার সাধনাসহ নানা রচনায় হিন্দু-মুসলমান, সন্ত, বৈষ্ণব ও বিচিত্র সাধনধারার মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও মিল অনুসন্ধান করা হয়েছে (সেন, 1945)। (Wikisource) ঔপনিবেশিক সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এই বয়ানের মূল্য ছিল। কিন্তু বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য খুঁজতে গিয়ে নির্দিষ্ট সাধনভাষা, বিরোধ, স্থানীয় ইতিহাস এবং আত্মপরিচয়ের ফারাক গৌণ হয়ে পড়তে পারে। ‘বাংলার আধ্যাত্মিক ঐক্য’ তখন নদীয়ার নির্দিষ্ট ফকিরি ইতিহাসের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়।

উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাংলার বাউল ও বাউল গান এই দীর্ঘ ইতিহাসের নির্ণায়ক বাঁক। তাঁর বড় কৃতিত্ব মাঠগবেষণা। কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সাধক, গান ও স্মৃতি সংগ্রহ করে তিনি একটি বিরাট তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন। তাঁর কাজ ছাড়া বহু পদকর্তা ও কালামের তথ্য হয়তো হারিয়ে যেত (ভট্টাচার্য, 1957)। কিন্তু তাঁর শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধতাও আছে। মাঠ থেকে পাওয়া বিচিত্র ফকির, সাধক, বৈষ্ণব, আউল, দরবেশ ও অন্য পরিচয়ের উপাদানকে একটি বৃহৎ ‘বাউল’ কাঠামোর মধ্যে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ফলে বাংলার বাউল ও বাউল গান শুধু তথ্যভাণ্ডার থাকল না; ‘বাউল’ নামে একটি সুসংহত গবেষণাবস্তুর প্রতিষ্ঠাতা গ্রন্থে পরিণত হলো।

এখানে একটি বর্ণনামূলক শ্রেণী ধীরে ধীরে অস্তিত্বগত সত্য হয়ে ওঠে। প্রথমে বিভিন্ন সাধককে গবেষণার সুবিধার জন্য ‘বাউল’ নামে একত্র করা হলো; পরে ধরে নেওয়া হলো, যেহেতু ‘বাউল’ নামে সম্প্রদায় আছে, তার অবশ্যই একটি ‘বাউলতত্ত্ব’ও আছে। তারপর বিচিত্র সাধনা, দেহ, নারী, গুরু, রস, বৈষ্ণবতা, ইসলামি শব্দভাণ্ডার, তন্ত্র ও নাথপন্থা—সব সেই বাউলতত্ত্বের উপাদান হয়ে গেল। যে শ্রেণী দিয়ে তথ্য সাজানো হয়েছিল, পরে সেই সাজানো তথ্যকেই শ্রেণীটির বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণ করা হলো। এটিই বৃত্তাকার জ্ঞানের বিপদ।

আহমদ শরীফের বাউলতত্ত্ব এই পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নজির। তাঁর শক্তি ছিল পুথি, মধ্যযুগীয় সাহিত্য, পাঠ ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে। কিন্তু জীবন্ত সাধকসমাজের আত্মপরিচয় ও পার্থক্য নিয়ে স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক মাঠগবেষণা তাঁর এই তত্ত্বের ভিত্তি ছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে আগেই প্রতিষ্ঠিত ‘বাউল’ গবেষণাবস্তুকে ধরে তার উৎপত্তি ও মতবাদ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে (শরীফ, 1973)। এখানে গবেষকের ব্যক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্ঞান-শ্রেণীর ক্ষমতা: যে মানুষকে নিয়ে তত্ত্ব বানানো হচ্ছে, সে নিজেকে কী বলে—এই প্রশ্নই আর জরুরি থাকে না।

এই ধারার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ইউনেস্কোর Baul Songs। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ইতিবাচক গুরুত্ব আছে—রেকর্ডিং, নথিবদ্ধকরণ, গুরু ও তরুণ শিক্ষার্থীর মধ্যে গানের হস্তান্তর, সংরক্ষণ প্রকল্প এবং বিশ্বপরিসরে পরিচিতি তৈরি হয়েছে। ২০০৮–২০১০ সালের সংরক্ষণ প্রকল্পের বাজেট ছিল ৬৭,৮০০ মার্কিন ডলার, অর্থায়ন আসে Japan Funds-in-Trust থেকে; প্রকল্পটি কুষ্টিয়া অঞ্চলের ওপর বিশেষ জোর দেয় এবং শুমারি, গুরু ও শিক্ষানবিশের নিবন্ধন, কর্মশালা, রেকর্ডিং, স্বরলিপি, বই ও মেলার পরিকল্পনা করে (UNESCO, 2008–2010)। (UNESCO Intangible Heritage)

কিন্তু এখানেই জ্ঞান-রাজনীতির কঠিন প্রশ্ন। ইউনেস্কোর ২০০৩ সালের সনদ বলে, অমূর্ত ঐতিহ্য সেই চর্চা ও জ্ঞান, যাকে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী নিজের ঐতিহ্য হিশাবে চিনে (UNESCO, 2003)। অথচ Baul Songs-এর সরকারি বিবরণ শুরুই হয় “The Bauls are mystic minstrels”—এই আগাম সংজ্ঞা দিয়ে। (UNESCO Intangible Heritage) অর্থাৎ আগে একটি অভিন্ন জনগোষ্ঠী ধরে নেওয়া হলো, পরে সেই জনগোষ্ঠীকে গণনা ও নিবন্ধিত করার ব্যবস্থা হলো। কেউ নিজেকে ফকির, দরবেশ, বৈষ্ণব বা অন্য নামে চিনলেও প্রশাসনিক শ্রেণীতে ‘Baul’ হয়ে যেতে পারেন।

ভালদিমার হাফস্টাইন দেখিয়েছেন, অমূর্ত ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শুধু আগে থেকে থাকা সম্প্রদায়কে সংরক্ষণ করে না; তালিকা, প্রকল্প, উৎসব ও প্রতিনিধি তৈরির মধ্য দিয়ে নতুন ‘heritage community’-ও গড়ে তুলতে পারে (Hafstein, 2018)। (Indiana University Press) বারবারা কিরশেনব্ল্যাট-গিম্বলেট এই প্রক্রিয়াকে ‘মেটাসাংস্কৃতিক উৎপাদন’ (metacultural production) বলেছেন: কোনো জীবনচর্চাকে ‘ঐতিহ্য’ ঘোষণা করা নিজেই তাকে নতুন সামাজিক বস্তুতে রূপ দেয় (Kirshenblatt-Gimblett, 2004)। (Wiley Online Library) লরাজেন স্মিথের ‘অনুমোদিত ঐতিহ্য-বয়ান’ (authorized heritage discourse) ধারণা আমাদের আরও বুঝতে সাহায্য করে—বিশেষজ্ঞ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ভাষা এত ক্ষমতাবান হতে পারে যে স্থানীয় আত্মপরিচয় ও বিকল্প স্মৃতি পেছনে পড়ে যায় (Smith, 2006)।

এই দিক থেকে ‘বাউলিকরণ’ একটি দীর্ঘ জ্ঞান-রাজনৈতিক ঘটনা: অক্ষয়কুমারের শ্রেণীবিন্যাসী আধুনিকতা থেকে রবীন্দ্রনাথের নান্দনিক প্রতীক, ক্ষিতিমোহনের সমন্বয়ী সাধনা, উপেন্দ্রনাথের গবেষণা-শ্রেণী, পরে ‘বাউলতত্ত্ব’, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য। এর ফলে ‘বাউল’ দৃশ্যমান হয়েছে, কিন্তু নদীয়ার শক্তিশালী ফকিরি ধারা এবং বিভিন্ন সাধনপরম্পরার স্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণ আড়ালে চলে গিয়েছে। লালনকে জাতীয় পর্যায়ে উদযাপনের ওর্থ তাঁকে তাঁর নিজস্ব পরিচয়ে – বিশেষত  বাংলার ফকিরি ধারাকে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও সাধন ধারা হিশাবে সামনে আনা এবং দেশে বিদেশে তুলে ধরা। এর দ্বারা নদীয়ার ভাবের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য তুলে ধরারা ওপর জোর দেওয়া কর্তব্য হয়ে উঠেছে।

তাই আমাদের পদ্ধতিগত নীতি হওয়া উচিত:  শ্রেণি থেকে মানুষে নয়, মানুষ ও তার কালাম থেকে শ্রেণির সত্যতা যাচাই করতে হবে ফকির লালনকে তাঁর নিজের নামে ফিরিয়ে দেওয়া কোনো পরিচয়বাদী দাবি নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি দায়।

লালনের স্বাতন্ত্র্য বুঝতে হলে ‘নদীয়ার ভাব’ বুঝতে হবে। এখানে নদীয়া আজকের ভারতের একটি জেলা নয়। আধুনিক রাষ্ট্রীয় সীমান্তের বহু আগে নদীয়া ছিল বিস্তৃত ঐতিহাসিক, ভাষাগত, অর্থনৈতিক ও সাধনগত ভূগোল। আজকের কুষ্টিয়া পুরানা নদীয়া জেলার অংশ ছিল; কুমারখালী, ছেঁউড়িয়া, শিলাইদহ, পদ্মা ও গড়াইয়ের জনপদ চলাচল, কৃষি, বাজার, নদীপথ ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের একই বৃহত্তর জগতের অংশ ছিল।

এই ভূগোলকে রাজনৈতিক মানচিত্র দিয়ে বোঝা যায় না। নদী ছিল পথ, হাট ছিল খবর ও বিনিময়ের জায়গা; কৃষক, কারিগর, তাঁতি, মাঝি, আখড়া, দরবেশি আস্তানা, কীর্তন, জমিদারি কাছারি ও মুদ্রণযন্ত্র—সব কাছাকাছি ছিল। চৈতন্যোত্তর বৈষ্ণব ভাব, ফকিরি, দরবেশি, কর্তাভজা, সাহেবধনী, সহজ সাধনা, শাক্ত ও তান্ত্রিক সঞ্চয় এবং ইসলামি ভাবভাষা পাশাপাশি থেকেছে, ধার নিয়েছে, বাহাস করেছে এবং নিজেদেরও বদলেছে।

‘নদীয়ার ভাব’ তাই নতুন কোনো সম্প্রদায়ের নাম নয়। এটি ইতিহাস বোঝার ধারণা। এই ধারণা আমাদের একক উৎস খোঁজার অভ্যাস থেকে বের করে আনে। নদীয়ার ভাবকে ‘হিন্দু’ নয়, ‘মুসলমানও নয়’ বলা যথেষ্ট নয়—কারণ তাতেও দুইটি স্থির ধর্মকে আগাম ধরে নেওয়া হয়। বরং ইসলাম, বৈষ্ণবতা, তন্ত্র, সহজ, কৃষিজীবন, কারিগরি ভাষা এবং বাংলার সামাজিক ইতিহাসের পরস্পর-সম্পর্কের মধ্যেই এই ভাবের গঠন। তার মধ্যে ইসলাম আছে, বৈষ্ণবতার সঞ্চয় আছে, তন্ত্র ও রসের স্মৃতি আছে; কিন্তু কোনো একটির মধ্যে তাকে নিঃশেষ করা যায় না।

এই জায়গা থেকে লালনের ইসলামিকরণ এবং ধর্মহীনকরণ—দুই বিপরীত ফাঁদও বুঝতে হবে। একদিকে তাঁকে এমন ভাবে ‘ইসলামি’ প্রমাণ করার চেষ্টা হয় যেন প্রতিটি কালামকে আগে থেকে নির্ধারিত আকিদা, তরিকত, শরিয়ত বা সুফি মতবাদের সঙ্গে মেলাতে হবে; অন্যদিকে তাঁকে ইসলাম, কোরান, নবী, আদম, মুর্শিদ ও ধর্মীয় ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে আধুনিক সেকুলার বা ধর্মহীন মানবতাবাদের পূর্বসূরি বানানো হয়। বাহ্যিক বিরোধ সত্ত্বেও দুই পক্ষ একটি অনুমান ভাগ করে নেয়: ‘ধর্ম’ ও ‘সেকুলার’ দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘর, এবং লালনকে অবশ্যই কোনো একটিতে বসাতে হবে।

তালাল আসাদ দেখিয়েছেন, আধুনিক ‘ধর্ম’ ও ‘সেকুলার’ চিরন্তন দুই মানবীয় ক্ষেত্র নয়; আধুনিক রাষ্ট্র, আইন, নৈতিকতা ও ক্ষমতার নির্দিষ্ট ইতিহাসে এদের বর্তমান অর্থ গড়ে উঠেছে (Asad, 1993, 2003)। (Google Books) ফলে উনিশ শতকের নদীয়া-কুষ্টিয়ার সাধকজগতকে আজকের ধর্ম বনাম সেকুলার ভাগে মাপা শুরু থেকেই সমস্যাজনক।

লালনকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তাঁর কালামে আদম, নবী, রাসুল, আল্লাহ, নূর, মুর্শিদ, ফকির, দীন, কোরান, মক্কা, শরিয়ত ও ফানা প্রভৃতি শব্দের গভীর উপস্থিতি আছে। ক্যারল সলোমনের সংগ্রহ ও অনুবাদ এবং কিথ ক্যান্টুর গবেষণায় লালনের কালামে ইসলামি ও ফারসি-আরবি ভাবশব্দের বিস্তর উপস্থিতি চিহ্নিত করা হয়েছে (Salomon, 2017; Cantú, 2019)। ক্যান্টু জাহির-বাতিন, নূর মুহাম্মদ, আরবি হরফ, ফানা, ইসলামি গুপ্ততাত্ত্বিক ধারণা এবং বাংলার দেহকেন্দ্রিক সাধনার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। (Correspondences) কিন্তু এই শব্দগুলোর উপস্থিতি থেকে লালনকে আগাম ‘সুফি’ ঘোষণা করা যায় না। শব্দের বংশপরিচয় আর কালামের মধ্যে শব্দটির নতুন কাজ এক জিনিস নয়।

‘ফানা’ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সুফিবাদের বহু ধারায় ‘ফানাফিল্লাহ’ নিয়ে ব্যাখ্যার পার্থক্য আছে, কিন্তু বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যায় আগে আল্লাহ ও বান্দার ভেদ ধরে নিয়ে পরে বান্দার স্বতন্ত্র ‘আমি’-এর বিলোপ বা আল্লাহর মধ্যে ফানার কথা আসে। লালনের কালাম এই আগাম দ্বিত্বকেই প্রশ্ন করে।  তিনি বলেন:

“কোন নামে ডাকিলে তারে
হৃদাকাশে উদয় হবে
আপনার আপনি ফানা হলে
সে ভেদ জানা যাবে।”

তারপর আল্লাহ, খোদা ও গড—ভিন্ন ভাষার ভিন্ন নামের প্রসঙ্গ এনে বলেন ভাষার জন্ম “মনের ভাব প্রকাশিতে”, অথচ “মনাতীত অধরে চিনতে / ভাষাবাক্য নাহি পাবে।” এখানে প্রশ্ন কোন নামটি শুদ্ধ, তা নয়; নাম দিয়ে যাকে ধরা হচ্ছে তার সঙ্গে নামের সম্পর্ক কী। “আল্লাহ হরি ভজন পূজন / এ সকল মানুষের সৃজন”—এই পঙ্‌ক্তির অর্থও সস্তা নাস্তিক ঘোষণা নয়। নাম, নামের উচ্চারণ এবং নামকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানবিক উপাসনাব্যবস্থার নির্মিত চরিত্র এখানে প্রশ্নের মুখে পড়ে। যাকে নাম দিয়ে ধরতে চাই, সে নামের মধ্যে নিঃশেষ হয় কি?

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো “আপনার আপনি ফানা হলে।” লালন বলেন নাই, আল্লাহর মধ্যে ফানা হও; বলেছেন আপনার আপনি ফানা। এখানে এক সত্তার অন্য সত্তার মধ্যে বিলোপের চেয়ে যে ‘আমি’ নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ, আলাদা, নামযুক্ত এবং নিজের মালিক বলে স্থাপন করে—সেই বিভাজনকারী অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে। ‘আমি এখানে’, ‘তিনি সেখানে’—এই দ্বিত্বকে আগাম সত্য ধরে নেওয়া যায় না। ফানা তখন দুইয়ের পরবর্তী মিলন নয়; দুই বলে ভাববার শর্তের বিলোপের প্রশ্ন।

এই জন্য “স্বরূপে রূপ দেখ” লালনের ভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। দূরবর্তী অতিপ্রাকৃত সত্তাকে খুঁজে পাওয়ার বদলে যে দেহী হাজিরার মধ্যে আমরা ইতিমধ্যে বর্তমান, সেখানেই রূপের প্রশ্ন তুলতে হয়। এটি ‘নিজের ভেতরে ঈশ্বর’ ধরনের সহজ আধ্যাত্মিক স্লোগান নয়। বরং জানা ও জানবার বিষয়, আমি ও অপর, নাম ও নামী—এই দ্বিত্ব কীভাবে তৈরি হয় তার পরীক্ষা।

এই জায়গা থেকে জিকির বা নামকীর্তনের প্রশ্নও নতুন ভাবে আসে। ইসলামি জিকির ও বৈষ্ণব নামকীর্তনের নিজস্ব দীর্ঘ ইতিহাস আছে; লালন সেগুলোকে সাধারণ ভাবে নিষিদ্ধ করছেন—এ কথা বলা ঠিক নয়। কিন্তু তাঁর কালামের যুক্তি হচ্ছে, নাম উচ্চারণ আর নামীকে জানা একই কাজ নয়। নামের পুনরাবৃত্তি যদি ডাকনেওয়ালা এবং যাকে ডাকা হচ্ছে—এই দুইকে অক্ষুণ্ণ রাখে, তাহলে শুধু উচ্চারণ দিয়ে ‘সে ভেদ’ জানা যায় না।

লালন ভাষা বাতিলও করেন না। তিনি নিজেই তো কালাম করেন। বরং ভাষাকে তার সীমায় ফিরিয়ে আনেন। ভাষা দরকার, কিন্তু ভাষা সত্য নয়; নাম দরকার, কিন্তু নাম আর নামী এক নয়; ধারণা দরকার, কিন্তু ধারণা বাস্তবতাকে নিঃশেষ করতে পারে না। এই জায়গায় দেহের গুরুত্ব আসে। ভাষা শেখার আগেই মানুষ দেহী ভাবে বর্তমান। ক্ষুধা, স্পর্শ, কান্না, দুধ, নির্ভরতা, জন্ম—এসব ভাষার আগের হাজিরা। কাম, রোগ, ভালোবাসা, শ্রম, সন্তান, ক্ষয় ও মৃত্যু শুধু ধারণায় ঘটে না।

এই কারণেই লালনের ক্ষেত্রে ‘দেহতত্ত্ব’ আর ‘দেহী মানুষের তত্ত্ব’-এই দুইয়ের ফারাক জরুরি। শশিভূষণ দাশগুপ্তসহ বহু গবেষণায় তন্ত্র, সহজিয়া ও তথাকথিত বাউল সাধনার শরীর, রস, নারী, রজঃ-বীজ ও গুপ্ত সাধনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে (Dasgupta, 1962)। (Google Books) এই গবেষণার মূল্য আছে, কিন্তু দেহকে কেবল গবেষণার বস্তু করলে লালনের বড় প্রশ্ন হারায়। মানুষ কোনো বিমূর্ত চেতনা নয়, যা দুর্ঘটনাবশত একটি শরীরে ঢুকে আছে। মানুষ জন্মায়, ক্ষুধার্ত হয়, কামনা করে, শ্রম করে, ভালোবাসে, অসুস্থ হয়, অন্য মানুষের ওপর নির্ভর করে এবং মারা যায়। দেহ তাই কোনো রহস্যময় যন্ত্র নয়; মানুষের হাজিরার শর্ত।

এখান থেকেই নারীর প্রশ্ন নতুন ভাবে আসে। নারীকে ‘রজঃ’, ‘প্রকৃতি’, ‘সাধনসঙ্গিনী’ অথবা পুরুষ সাধকের সিদ্ধিলাভের উপায় বানালে নারীর দেহ আবার পুরুষের সাধনার বস্তু হয়ে যায়। নারী নিজে দেহী মানুষ, নিজে সাধক এবং নিজে জ্ঞানধারক। নারী ফকির ও নারী সাধকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তাই লালন গবেষণার প্রান্তিক বিষয় নয়; কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র।

‘ফকির’ পরিচয়ের দার্শনিক গুরুত্বও এখানেই। আরবি faqīr শব্দের আক্ষরিক অর্থ অভাবী, দরিদ্র, প্রয়োজনময়। কিন্তু নদীয়ার ফকিরি ধারায় একে শুধু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যে নামালে চলে না। ফকির সেই মানুষ, যে নিজের স্বয়ংসম্পূর্ণতা, নিজের মালিকানা এবং অন্যের প্রয়োজনহীন ‘আমি’-এর দাবিকে সাধনার প্রশ্নে ফেলে। “আপনার আপনি ফানা” এবং ‘ফকির’ এই অর্থে পরস্পরকে আলোকিত করে। সত্য তখন মতবাদ মুখস্থ করার বিষয় নয়; নিজের দেহী নির্ভরতা, অহং, পরিচয়ের দাবি এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক পরীক্ষা করার অনুশীলন।

এই কারণেই লালনকে ‘সুফি’ বললে তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করা হয়। তাঁর সঙ্গে সুফি ইতিহাসের সম্পর্ক সম্পূর্ণ অস্বীকার করার দকার নাই, কিন্তু ‘সুফি’কে লালনের আগাম সংজ্ঞা বানালে তাঁর ভাবের স্বাতন্ত্র্য হারায়। একই ভাবে তাঁকে ‘ধর্মহীন মানবতাবাদী’ করলে তাঁর ধর্মীয় ইতিহাস ও ভাষা মুছে যায়। তাঁর “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে” ধর্ম বিলোপের ঘোষণা নয়; বরং পরিচয়ের সত্যদাবির পরীক্ষা। সুন্নত, পৈতা, মালা বা তসবিহ—যে দৃশ্যমান চিহ্ন দিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের সত্য দাবি করা হয়, লালন সেই দাবি দেহের কাছে যাচাই করেন। ধর্মের পর্যালোচনা আর ধর্মের বিলোপ এক কথা নয়।

এই জায়গাতেই বাংলা ভাষায় লালনের অসাধারণ অবদান। তিনি আরবি-ফারসি শব্দ শুধু ধার করেন নাই; শব্দগুলোর ভাবগত ক্ষেত্র বদলে দিয়েছেন। ‘ফানা’ শুধু কোনো প্রস্তুত সুফি পরিভাষা থাকে না; দুই বলে ভাববার শর্তের প্রশ্ন হয়। ‘মুর্শিদ’ শুধু ধর্মীয় পদ নয়; অন্য মানুষের সাহায্যে নিজেকে জানার সম্পর্ক হয়। ‘আদম’ শুধু কোরানি চরিত্র নয়; মানুষ হয়ে ওঠার প্রশ্নে হাজির হয়। ‘ফকির’ শুধু দারিদ্র্যের নাম নয়; জগতে বর্তমান থাকার একটি সাধনগত অবস্থান।

একই ভাবে বাংলা দেশজ শব্দও তাঁর হাতে নতুন ভাবশক্তি পায়। ‘পড়শি’ সাধারণ প্রতিবেশী থেকে নৈকট্য ও অপরের গভীর প্রশ্নে পরিণত হয়। ‘আরশিনগর’ নিজের নিকটতম অথচ অধরা মানুষকে ভাববার জায়গা তৈরি করে। ‘খাঁচা’ ও ‘পাখি’ দেহ, জীবন ও চলে যাওয়ার অনিশ্চয়তাকে এমন দৈনন্দিন ভাষায় হাজির করে যা শাস্ত্রীয় অধিবিদ্যার সাহায্য ছাড়াই মানুষকে অস্তিত্বের প্রশ্নে নিয়ে যায়। ‘হৃদাকাশ’, ‘স্বরূপ’, ‘রূপ’, ‘অচিন মানুষ’, ‘সহজ মানুষ’—এই সব শব্দকে তিনি এমন সম্পর্কের মধ্যে বসান যেখানে বাংলা ভাষা নতুন ভাবে ভাবতে শেখে।

তাই বলা যথেষ্ট নয় যে লালন কঠিন দর্শনের কথা সহজ বাংলায় বলেছেন। বরং তিনি বাংলা ভাষাকে নতুন প্রশ্ন করার ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি শুধু শব্দ ব্যবহার করেন নাই; শব্দের ভাবগত সম্ভাবনা বাড়িয়েছেন। এইখানেই তাঁর ভাষা-নির্মাণ।

লালনের রচনাকে আমরা সাধারণত ‘গান’ বলি। শব্দটি ভুল নয়, কিন্তু অপর্যাপ্ত। সাধকসমাজে ‘কালাম’ বলার মধ্যে অন্য অর্থ আছে। কালাম লিখিত বাক্যের সারি মাত্র নয়; তা কণ্ঠে হাজির হয়, শুনে শেখা হয়, গুরু ও সাধকের ব্যাখ্যার মধ্যে অর্থ পায়, প্রশ্নের জবাব হয়ে আসে এবং নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।

আধুনিক লিখিত জ্ঞানব্যবস্থা মনে করে কোনো রচনা বইয়ে ছাপা বা ডিজিটাল ফাইলে রাখা গেলেই তা সংরক্ষিত হলো। কিন্তু কালামের অর্থ শুধু শব্দে নাই। কোথায় জোর, কোথায় থামা, কোন প্রসঙ্গে কোন কালাম, কোন কালামের জবাবে কোন কালাম—এসবও জ্ঞানের অংশ। এই কারণেই ইউনেস্কোর সংরক্ষণ প্রকল্পে গুরু ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃপ্রজন্ম হস্তান্তরের ওপর জোর ছিল—এটি প্রকল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক (UNESCO, 2008–2010)। (UNESCO Intangible Heritage)

কিন্তু এই সত্য স্বীকার করলেই বর্তমান উৎসব-সংস্কৃতির সংকট সামনে আসে। লালনের কালাম যত জনপ্রিয় হয়েছে, ততই উচ্চশব্দের যন্ত্র, বিশাল মঞ্চ, আলো, ব্যান্ড, টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যম ও বিনোদনশিল্পের মধ্যে ঢুকেছে। এতে নতুন শ্রোতা তৈরি হয়েছে—এটা অস্বীকার করার দরকার নাই। কিন্তু সাধুসঙ্গ আর মঞ্চ একই পরিসর নয়।

সাধুসঙ্গে কালাম নিছক পরিবেশনা নয়। একজন কালাম ধরেন, প্রশ্ন ওঠে, অন্য সাধক জবাব দেন, ব্যাখ্যা হয়, আবার কালাম আসে। মানুষ, রাত, সময়, বসার ধরন, কণ্ঠ, সম্পর্ক এবং দীর্ঘ মনোযোগ মিলিয়ে ভাবের পরিবেশ তৈরি হয়। বিশাল মঞ্চে পাঁচ মিনিটে সেই কালামের সুর থাকতে পারে, কিন্তু তার জ্ঞানগত ও সাধনগত সম্পর্ক হারিয়ে যায়।

তাই আধুনিক বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করা বা ‘খাঁটি’ লোকগান রক্ষা করা মূল প্রশ্ন নয়। দরকার সাধুসঙ্গ এবং সাংস্কৃতিক মঞ্চকে আলাদা পরিসর হিশাবে স্বীকার করা। সাধুসঙ্গের নিজস্ব সময়, শব্দমাত্রা, স্থান, আবাস ও স্বাধীনতা থাকতে হবে। রাষ্ট্র যদি মেলার আয়তন বাড়ায় কিন্তু সাধুসঙ্গের পরিবেশ ধ্বংস করে, তাহলে লালনকে উদযাপন করতে করতে লালনের জগতই নষ্ট করবে।

‘সাধক’কে ‘লোকশিল্পী’ বানানোর মধ্যেও একই সংকট। একজন পেশাদার শিল্পী গান পরিবেশন করেন; সাধকও গান করেন, কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে কালাম গুরুপরম্পরা, জীবনযাপন, আত্মসাধনা, প্রশ্ন, সম্পর্ক এবং সত্য-অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত। সাধক তাই কেবল বিনোদন-শ্রমিক নন; তিনি জীবন্ত জ্ঞানসম্প্রদায়ের সদস্য। রাষ্ট্রীয় নীতিতে এই পার্থক্যের স্বীকৃতি দরকার। বছরে দুবার মঞ্চে ডেকে পারিশ্রমিক দেওয়া সাধকসমাজ রক্ষার নীতি হতে পারে না।

এই প্রশ্ন গ্রামসমাজের পরিবর্তনের সঙ্গেও যুক্ত। লালনের সময়ের সমাজ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। জমির সম্পর্ক বদলে গিয়েছে, কৃষি বাজারনির্ভর হয়েছে, গ্রামীণ কারিগরি পেশা ক্ষয়ে গেছে, মানুষ শহর ও বিদেশে শ্রম বিক্রি করতে যাচ্ছে, পরিবার ও পাড়ার সম্পর্ক বদলেছে, ডিজিটাল মাধ্যম সময় ও বিনোদনের ধরন পাল্টে দিয়েছে। এটাকে ‘আধুনিকতা খারাপ’ বলে আফসোস করলে হবে না। বুঝতে হবে ভাবচর্চারও বস্তুগত শর্ত আছে। সাধুসঙ্গের জন্য সময়, আবাস, খাদ্য, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং দীর্ঘ সম্পর্ক দরকার। সাধককে যদি বাজারে টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন মঞ্চের ‘পারফর্মার’ হতে হয়, কালামও ক্রমে বাজারযোগ্য পণ্য হয়ে ওঠে।

এ কারণে লালনের ঐতিহ্য রক্ষা মানে শুধু পুরানা গানের খাতা সংরক্ষণ নয়; জীবন্ত সাধকসমাজের পুনরুৎপাদনের সামাজিক শর্ত রক্ষা।

একই কারণে জাতীয় লালন আর্কাইভের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেটি মৃত আর্কাইভ হলে চলবে না। রবীন্দ্রনাথের সংগ্রহ, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের হারামণি, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সংগ্রহ, বসন্তকুমার পাল, আবুল আহসান চৌধুরী, শক্তিনাথ ঝা, ক্যারল সলোমন এবং সাধকদের নিজস্ব খাতায় পাঠভেদ, শব্দভেদ, রচয়িতার প্রশ্ন ও সুরের ফারাক আছে। একটি জাতীয় জীবন্ত লালন আর্কাইভে পুরানা খাতা, বিভিন্ন পাঠ, সুর, অডিও, ভিডিও, প্রবীণ সাধকের কণ্ঠ, মৌখিক ইতিহাস, শব্দার্থ, গুরুপরম্পরা এবং আখড়ার ইতিহাস একত্র করতে হবে। সাধক সেখানে গবেষণার ‘তথ্যদাতা’ হবেন না; আর্কাইভের সহ-নির্মাতা হবেন।

এই অংশটি আরও সতর্ক, তীক্ষ্ণ এবং দার্শনিক ভাবে এভাবে লেখা যায়:

লালনের দৃশ্যমান প্রতিকৃতি নিয়েও গভীর সতর্কতা দরকার। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে প্রচলিত যে স্কেচটিকে লালনের জীবদ্দশার প্রতিকৃতি বলা হয়, তার ঐতিহাসিক মর্যাদা প্রশ্নাতীত নয়। এটি যে লালনেরই প্রতিকৃতি—এই দাবি মূলত জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাম ও পরবর্তী প্রচলনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; লালন নিজে জমিদারের বোটে গিয়ে বসে মডেল হয়েছিলেন—এমন ঘটনার স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আমাদের হাতে নাই। বরং লালনের জীবনযাপন, সাধক-স্বভাব এবং জমিদারি পরিসরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিবেচনা করলে এমন মডেল হয়ে বসার কাহিনি সহজে বিশ্বাসযোগ্যও মনে হয় না। অতএব ওই স্কেচকে ঐতিহাসিক ভাবে যাচাইকৃত ‘লালনের মুখ’ হিশাবে ব্যবহার না করে, সর্বোচ্চ একটি দাবি বা আরোপিত প্রতিকৃতি হিশাবেই চিহ্নিত করা উচিত।

নন্দলাল বসুর আঁকা ছবির ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট। সেটি লালনের জীবদ্দশার প্রত্যক্ষ প্রতিকৃতি নয়; পরবর্তী শিল্পীর কল্পনা ও নির্মাণ। তাই তাকে ‘লালনের ছবি’ বলে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, স্মারক, বই, পোস্টার বা সাংস্কৃতিক প্রচারে ব্যবহার করা নিছক তথ্যগত ভুল নয়; এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি। নদীয়ার সাধনার ধারায় ‘গুরু-রূপ’ কোনো বাহ্যিক প্রতিমূর্তি বা ছবি মাত্র নয়। গুরু-রূপ স্মৃতি, কালাম, সম্পর্ক, সাধনা এবং নিজের মধ্যে গুরুকে ধারণ করার এক জীবন্ত প্রক্রিয়া। সেই জায়গায় কোনো শিল্পীর কল্পিত মুখকে ‘আসল লালন’ বলে প্রতিষ্ঠা করা গুরু-রূপ ভজনাকে ছবিপূজার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল হতে পারে। অর্থাৎ যে সাধনধারায় গুরুর রূপকে জীবন্ত সম্পর্ক ও অন্তর্গত সাধনার মধ্যে ধারণ করা হয়, সেখানে একটি বহিরাগত, শিল্পিত প্রতিকৃতিকে সত্যিকার রূপ হিশাবে রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠা করা সেই সাধনার নিজস্ব যুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এই কারণে প্রশ্নটি শুধু শিল্প-ইতিহাসের নয়, জ্ঞান-রাজনীতিরও। আধুনিক রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট মুখ চায়—পোস্টারে মুখ, ভাস্কর্যে মুখ, মঞ্চসজ্জায় মুখ, স্মারকে মুখ। এই প্রয়োজন থেকেই অনিশ্চিত স্কেচ ও কল্পচিত্র ক্রমে ‘আসল প্রতিকৃতি’র মর্যাদা পায়। কিন্তু লালনের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া তাঁর কালাম, গুরুপরম্পরা ও সাধনজগতের নিজস্ব সত্যবোধকে আড়াল করে একটি দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক প্রতিমা তৈরি করে। ফলে মানুষ লালনের কালাম ও সাধনাকে জানার আগেই একটি বানানো মুখ চিনতে শেখে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাই কোনো একটি মুখকে ‘সরকারি লালন’ হিশাবে প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং যে ছবি ঐতিহাসিক ভাবে নিশ্চিত নয় তাকে সেই অনিশ্চয়তাসহ চিহ্নিত করা, আর যে চিত্র পরবর্তী কল্পনা তাকে কল্পচিত্র বলেই উপস্থাপন করা। একই সঙ্গে সাধকসমাজের গুরু-রূপ, স্মৃতি ও সাধনার নিজস্ব ধারণাকে সম্মান করা জরুরি। লালনের মুখ নির্মাণের চেয়ে তাঁর কালাম, তাঁর ফকিরি পরিচয় এবং তাঁর জীবন্ত গুরুপরম্পরা সংরক্ষণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক প্রমাণের প্রশ্ন, গুরু-রূপের সাধনগত অর্থ, এবং আধুনিক রাষ্ট্রের দৃশ্যমান প্রতীক তৈরির জ্ঞান-রাজনীতি সম্পর্কে অবশ্যি আমাদের সচেতনতা দরকার।

জাত, ধর্ম ও সামাজিক ক্ষমতার প্রশ্নেও লালনকে নিরীহ করে ফেলা যাবে না। তাঁকে প্রায়শ ‘সম্প্রীতির কবি’ বলা হয়। কিন্তু তিনি শুধু সবাইকে ভালোবাসতে বলেন নাই; জন্ম, জাত, শুচিতা, ধর্মীয় চিহ্ন এবং সামাজিক মর্যাদার সত্য নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। কার সঙ্গে কে খাবে, কার সঙ্গে বিয়ে হবে, কে শুচি আর কে অশুচি—এসব বিশ্বাসমাত্র নয়; সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক। ফলে লালনের জাতবিচার রাজনৈতিক। রাষ্ট্র যদি তাঁকে জাতীয় প্রতীক বানিয়ে তাঁর অস্বস্তিকর প্রশ্ন বাদ দেয়, তাহলে ফুল থাকবে, গান থাকবে—ফকির লালন থাকবেন না।

জাতীয় স্বীকৃতির পরে সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হচ্ছে লালনের ধামকে নতুন ভাবে চিহ্নিত ও সুরক্ষিত করা। আজ ছেঁউড়িয়ার বর্তমান সমাধি ও লালন একাডেমির স্থাপনাকেই প্রধানত ‘লালন আখড়া’ বলে জানি। কিন্তু একজন সাধকের ধাম কেবল সমাধির ওপর নির্মিত ভবন নয়। কোথায় তাঁর বসত ছিল, শিষ্যরা কোথায় থাকতেন, কোন জমি সাধুসঙ্গের কাজে ব্যবহৃত হতো, কোন পথে মানুষ আসত, আশপাশের জলাশয়, বৃক্ষ, খোলা জায়গা, গ্রাম ও নদীর সঙ্গে এই আবাসের সম্পর্ক কী ছিল—এসব মিলিয়েই ধাম।

তাই সবার আগে পূর্ণ ঐতিহাসিক ও ভূমি জরিপ দরকার। পুরানা দলিল, মৌজা নকশা, খতিয়ান, প্রবীণ সাধকের স্মৃতি, স্থানীয় মৌখিক ইতিহাস, ছবি এবং প্রশাসনিক নথি মিলিয়ে ছেঁউড়িয়ার সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য চিহ্নিত করতে হবে। তারপর সুরক্ষার পরিকল্পনা।

শুধু সমাধি-ভবন রেখে চারপাশে নির্বিচার দোকান, বহুতল, যানবাহন, উচ্চশব্দ ও অপরিকল্পিত বাজার তৈরি হলে ধাম আর ধাম থাকে না। ইউনেস্কোর ২০১১ সালের ঐতিহাসিক নগর-ভূদৃশ্য নীতিও ঐতিহ্যকে বিচ্ছিন্ন ভবন হিশাবে না দেখে বৃহত্তর ভূগোল, জলব্যবস্থা, খোলা জায়গা, ভূমিব্যবহার, সামাজিক চর্চা, দৃশ্যগত সম্পর্ক এবং অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে দেখতে বলে (UNESCO, 2011)। (UNESCO)

ছেঁউড়িয়ার জন্য তাই সুরক্ষিত সাংস্কৃতিক বলয় দরকার। নির্মাণের উচ্চতা ও ধরন, শব্দের মাত্রা, যান চলাচল, বর্জ্য, জলাশয়, সবুজ এলাকা, সাধকদের আবাস এবং সাধুসঙ্গের জায়গা—সব একই পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। ধামকে পর্যটনকেন্দ্র নয়, সাধনার জীবন্ত আবাস হিশাবে রক্ষা করতে হবে।

কিন্তু লালনের ধামকে কয়েক একর জমির মধ্যে আটকে রাখলেও চলবে না। কুষ্টিয়া, ছেঁউড়িয়া, কুমারখালী, শিলাইদহ এবং পদ্মা-গড়াইয়ের এই জনপদ মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার একটি অসাধারণ সাংস্কৃতিক ভূগোল আছে। একই অঞ্চলে লালনের ধাম, রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ, কাঙাল হরিনাথের মুদ্রণ ও সাংবাদিকতার ইতিহাস, মীর মশাররফ হোসেন, গগন হরকরা, বাঘা যতীন এবং আরও বহু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্মৃতি রয়েছে। এগুলোকে আলাদা আলাদা ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ বানানোর বদলে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক নগর-অঞ্চল হিশাবে পরিকল্পনা করা যায়।

এই পরিকল্পনার অর্থ কুষ্টিয়াকে চকচকে পর্যটনশহর বানানো নয়। বরং শহর, গ্রাম, নদী, আখড়া, পুরানা হাট, কারিগরপাড়া, তাঁত, মুদ্রণ, সাহিত্য, সংগীত, খাদ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিকে একটি সাংস্কৃতিক ভূগোলের অংশ হিশাবে দেখা। পদ্মা ও গড়াই এখানে শুধু প্রকৃতি নয়; মানুষের চলাচল, কৃষি, বাণিজ্য, ভাষা, সাহিত্য ও ভাবের ইতিহাস।

ইউনেস্কোর ঐতিহাসিক নগর-ভূদৃশ্য পদ্ধতির মূল্য এখানে কাজে লাগতে পারে। এই পদ্ধতি নগর ঐতিহ্যকে শুধু পুরানা স্থাপনা নয়, বসতি, জল, ভূপ্রকৃতি, সামাজিক চর্চা, অর্থনীতি এবং অদৃশ্য ঐতিহ্যের সমন্বিত ব্যবস্থা হিশাবে দেখতে বলে এবং সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করে (UNESCO, 2011)। (UNESCO World Heritage Centre)

কুষ্টিয়াকে সাংস্কৃতিক নগরী করার কাজ তাই উৎসব দিয়ে নয়, সাংস্কৃতিক মানচিত্র দিয়ে শুরু করা উচিত। কোথায় লালনের ধাম, কোথায় সাধকদের আখড়া, কোথায় কাঙাল হরিনাথের প্রেস, কোথায় শিলাইদহের পুরানা নদীপথ, কোথায় কারিগরপাড়া, কোথায় আঞ্চলিক সঙ্গীত ও ভাষার কেন্দ্র—এসব চিহ্নিত করা দরকার। তারপর পথচারী চলাচল, নদীপথ, পাঠাগার, ছোট জাদুঘর, গবেষণাকেন্দ্র, সাধক-আবাস, অতিথিশালা, সংগীতশিক্ষা, কারুশিল্প এবং স্থানীয় খাদ্য-অর্থনীতিকে পরিকল্পনার মধ্যে আনা যায়।

এই পরিকল্পনার কেন্দ্র পর্যটক হবে না—কুষ্টিয়ার মানুষ হবে। সাংস্কৃতিক শহর সেই শহর নয় যেখানে বাইরের মানুষ ছবি তুলে চলে যায়; সাংস্কৃতিক শহর সেই শহর যেখানে স্থানীয় মানুষ নিজের ইতিহাস নিয়ে বাঁচতে পারে, সাধক ও শিল্পী কাজ করতে পারে, শিশু নিজের অঞ্চলের ভাষা ও ইতিহাস শেখে, গবেষক দীর্ঘদিন থাকতে পারেন, নদী ও জনপরিসর মানুষের থাকে।

এই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক নগরীর হৃদয় হতে পারে ছেঁউড়িয়ার একটি নতুন লালন ভাব, ভাষা ও সাধনা গবেষণা কেন্দ্র। বর্তমান লালন একাডেমির কাজকে শুধু উৎসব ও মঞ্চ পরিচালনা থেকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে হবে। সাধক সেখানে থাকবেন, তরুণরা গুরুদের কাছে কালাম শিখবেন, গবেষক পুরানা দলিল ও পাঠ নিয়ে কাজ করবেন, ভাষার অভিধান তৈরি হবে, নদীয়ার ভাব নিয়ে গবেষণা হবে। দেশ-বিদেশের দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম, নৃতত্ত্ব, ভাষা ও সংগীতের গবেষকেরা আসবেন—সাধকদের ‘বস্তু’ হিশাবে গবেষণা করতে নয় শুধু; তাঁদের সঙ্গে সমমর্যাদায় বাহাস করতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গ্রামের সাধকের সাক্ষাৎ একই জ্ঞানপরিসরে ঘটানো—লালনের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মানের সবচেয়ে অর্থবহ রূপগুলোর একটি হতে পারে।

জাতীয় পর্যায়ে লালনের তিরোধান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত তাই শুধু স্মরণোৎসবের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক নীতি নতুন করে ভাবার সুযোগ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দখলের ঝুঁকিও আছে। নীতি হওয়া দরকার: স্বীকৃতি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নয়; সহায়তা, কিন্তু দখল নয়; সংরক্ষণ, কিন্তু জাদুঘরীকরণ নয়।

রাষ্ট্র কোনো ‘সরকারি লালন দর্শন’ তৈরি করবে না। কোন ব্যাখ্যা সহিহ, কোন গবেষক সঠিক—এটা মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে এমন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত রক্ষা করা যাতে সাধক, গবেষক, ভাষাবিদ, ইতিহাসবিদ, সংগীতজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষ স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারেন।

সবার আগে রাষ্ট্রীয় নথি ও অনুষ্ঠানে লালনের নিজের ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। তাঁকে ফকির লালন শাহ বলা উচিত। ‘বাউল’ শব্দ নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নাই; কিন্তু ‘বাউল’কে তাঁর নিজের পরিচয় হিশাবে রাষ্ট্রীয় ভাবে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ গবেষণা ও ঐতিহ্য প্রকল্পে আগাম ‘Baul community’ ধরে শুমারি না করে সাধনপরম্পরার নিজস্ব মানচিত্র তৈরি করা দরকার—কারা নিজেদের ফকির বলেন, কারা বাউল, কারা দরবেশ, কারা বৈষ্ণব বা অন্য পরিচয়ে আছেন; তাঁদের নিজেদের ভাষায় সেই তথ্য নথিবদ্ধ করতে হবে।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতিও বাতিল করার প্রশ্ন নাই। বরং তার ইতিবাচক অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে জ্ঞানগত সংশোধন দাবি করতে হবে। Baul Songs একটি আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যশ্রেণী হতে পারে; কিন্তু সেই নামের নিচে নদীয়া-কুষ্টিয়ার ফকিরি, দরবেশি এবং অন্য স্বতন্ত্র সাধনপরম্পরাকে অদৃশ্য করা যাবে না। আন্তর্জাতিক ব্যাখ্যায় লালনের নিজের ‘ফকির’ পরিচয়, কালাম, গুরুপরম্পরা এবং নদীয়ার ভাবকে জায়গা দিতে বাংলাদেশেরই উদ্যোগী হওয়া দরকার।

কারণ আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় বিপদ সব সময় ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়া নয়। কখনও একটি পরিচয় এত বেশি দৃশ্যমান হয় যে তার পাশে থাকা ইতিহাসগুলো আর দেখা যায় না। আমাদের ক্ষেত্রে ‘বাউল’ দৃশ্যমান হয়েছে; ফকির আড়ালে গেছে। গান দৃশ্যমান হয়েছে; কালামের জগৎ আড়ালে গেছে। একতারা দৃশ্যমান হয়েছে; গুরুপরম্পরা অদৃশ্য হয়েছে। মঞ্চ দৃশ্যমান হয়েছে; সাধুসঙ্গ পেছনে গেছে। ‘Baul culture’ আন্তর্জাতিক ভাবে সহজপাঠ্য হয়েছে; নদীয়ার ভাবের দার্শনিক ইতিহাস আড়ালে পড়েছে।

জাতীয় স্বীকৃতি সেই ভারসাম্য সংশোধনের সুযোগ।

এখন দরকার লালনের কালাম ও ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় গবেষণা কর্মসূচি; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাধকদের মৌখিক ইতিহাস; ছেঁউড়িয়ার পূর্ণ ঐতিহাসিক ও ভূমি জরিপ; ধামের সুরক্ষিত সাংস্কৃতিক বলয়; শব্দদূষণমুক্ত সাধুসঙ্গের জায়গা; পুরানা খাতা ও দলিলের ডিজিটাল সংরক্ষণ; পাঠভিত্তিক নির্ভরযোগ্য কালামসংগ্রহ; লালনের ভাষার অভিধান; উচ্চমানের অনুবাদ; এবং কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক নগর-পরিকল্পনা।

এগুলো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিশাবে না দেখে লালন–নদীয়ার ভাব–ধাম–কুষ্টিয়া সাংস্কৃতিক অঞ্চল—এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে ভাবা দরকার।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু লালনকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা নিজেদের কীভাবে চিনব। আমাদের আধুনিক শিক্ষা এমন ভাবে গড়ে উঠেছে যে দর্শন বললে আমরা গ্রিস, জার্মানি, ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডের দিকে তাকাই। বাংলা ভাষায় চিন্তার ইতিহাস খুঁজলেও সংস্কৃত শাস্ত্র কিংবা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই। অথচ বাংলার মানুষের জীবন, সাধনা, গান, কালাম, প্রশ্ন, বাহাস ও মুখের ভাষার মধ্যে যে বিপুল চিন্তার ইতিহাস তৈরি হয়েছে, তাকে এখনো যথার্থ মর্যাদা দিতে শিখি নাই।

ফকির লালন সেই ঐশ্বর্যের একটি শিখর।

তাঁকে জাতীয় ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া তাই অতীতের একজন মহান মানুষকে সম্মান করার চেয়েও বড় কাজ হতে পারে। এটি বাংলাদেশের নিজের ভাষায় চিন্তা করার ক্ষমতা নতুন করে আবিষ্কারের সূচনা হতে পারে। কিন্তু তার জন্য লালনকে আমাদের নিজেদের বানানো খাঁচা থেকে বের করতে হবে—‘বাউল সম্রাট’-এর খাঁচা, লোকশিল্পের খাঁচা, ধর্মহীন মানবতাবাদের খাঁচা, সংকীর্ণ ধর্মীয় ব্যাখ্যার খাঁচা, প্রস্তুত সুফিবাদের খাঁচা, রহস্যময় দেহতত্ত্বের খাঁচা, মঞ্চবিনোদনের খাঁচা এবং রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতীকের খাঁচা।

তখনই আমরা বুঝতে শুরু করব কেন লালন শুধু গান নন। কেন তাঁর কালামের সামনে দাঁড়ালে মানুষ সম্পর্কে আমাদের আবার প্রশ্ন করতে হয়। কেন দেহ, নারী, গুরু, জাত, ধর্ম, জন্ম, মৃত্যু, নাম ও ভাষা নতুন অর্থে হাজির হয়। কেন তিনি বাংলার দৈনন্দিন শব্দকে সত্য অন্বেষণের ভাষায় রূপ দিতে পেরেছিলেন।

লালনকে বিশ্বে হাজির করার জন্য তাঁকে কোনো ইউরোপীয় দার্শনিকের পূর্বসূরি বানাবার দরকার নাই। তাঁর বিশ্বজনীনতা তাঁর নির্দিষ্টতায়। বাংলা ভাষায় দেহী মানুষকে তিনি কীভাবে প্রশ্ন করেছেন, পরিচয়ের সত্য কীভাবে পরীক্ষা করেছেন, নাম ও নামীর সম্পর্ক কীভাবে অস্থির করেছেন, গুরু ও মানুষের সম্পর্ক কীভাবে ভেবেছেন এবং দৈনন্দিন ভাষাকে কীভাবে ভাবের ভাষায় রূপ দিয়েছেন—এটাই তাঁর বিশ্বগত গুরুত্ব।

জাতীয় পর্যায়ে ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস পালনের সার্থকতা এখানেই। আমরা তাঁকে ‘জাতীয় সম্পত্তি’ বানাব না; তাঁর কারণে নিজের ইতিহাসের অবহেলিত ভাবসম্পদ নতুন করে চিনব। তাঁর ধাম রক্ষা করব, কারণ ধাম ছাড়া সাধনার স্মৃতি থাকে না। জীবন্ত সাধকসমাজ রক্ষা করব, কারণ সাধক ছাড়া কালামের ধারাবাহিকতা থাকে না। কুষ্টিয়াকে সাংস্কৃতিক নগরী হিশাবে ভাবব, কারণ লালন কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির নাম নয়; তিনি একটি ভূগোল, ভাষা, জীবন এবং বহু শতকের ভাব-ইতিহাসের মধ্যে হাজির হয়েছেন।

এই আত্মবিশ্বাস নিয়েই বিশ্বকে বলা যায়: বাংলা ভাষা নিজেই ভাবের ভাষা; নদীয়ার ভাব তার একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক বিকাশ; আর ফকির লালন শাহ সেই ভাব ও ভাষার বিপুল ঐশ্বর্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাজিরা।

গ্রন্থপঞ্জি

আবুল আহসান চৌধুরী। (সম্পা.). (২০০৮)। লালনসমগ্র। পাঠক সমাবেশ।

আবুল আহসান চৌধুরী। (সম্পা.). (২০০৯)। রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গানের পাণ্ডুলিপি। পাঠক সমাবেশ।

আসাদ, টি. [Asad, T.]. (1993). Genealogies of religion: Discipline and reasons of power in Christianity and Islam. Johns Hopkins University Press.

Asad, T. (2003). Formations of the secular: Christianity, Islam, modernity. Stanford University Press.

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)। (২০২৫, ২৮ আগস্ট)। লালন শাহের তিরোধান দিবস  শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে ঘোষণা

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)। (২০২৫, ৪ সেপ্টেম্বর)। লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসকে  শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত

ভট্টাচার্য, উপেন্দ্রনাথ। (১৯৫৭)। বাংলার বাউল ও বাউল গান। ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি।

Cantú, K. (2019). Islamic esotericism in the Bengali Bāul songs of Lālan Fakir. Correspondences, 7(1), 109–165.

Dasgupta, S. B. (1962). Obscure religious cults (2nd rev. ed.). Firma K. L. Mukhopadhyay.

দত্ত, অক্ষয়কুমার। (১৮৭০/১৮৮৩)। ভারতবর্ষীয় উপাসক-সম্প্রদায় (১ম ও ২য় ভাগ)। কলকাতা।

Ferrari, F. M. (2012). Mystic rites for permanent class conflict: The Bauls of Bengal, revolutionary ideology and post-capitalism. South Asia Research, 32(1), 21–38. https://doi.org/10.1177/026272801203200102

Foucault, M. (1972). The archaeology of knowledge and the discourse on language (A. M. Sheridan Smith, Trans.). Pantheon Books.

Foucault, M. (1980). Power/knowledge: Selected interviews and other writings, 19721977 (C. Gordon, Ed.). Pantheon Books.

Hafstein, V. T. (2018). Making intangible heritage: El Cóndor Pasa and other stories from UNESCO. Indiana University Press.

হোসাইন, মো. নাজমুল। (২০২০)। অক্ষয়কুমার দত্তের ভারতবর্ষীয় উপাসক-সম্প্রদায়: কর্তৃত্ববাদবিরোধী বয়ান। সাহিত্য পত্রিকা, ৫৬(১)।

Kirshenblatt-Gimblett, B. (2004). Intangible heritage as metacultural production. Museum International, 56(1–2), 52–65. https://doi.org/10.1111/j.1350-0775.2004.00458.x

Knight, L. I. (2011). Contradictory lives: Baul women in India and Bangladesh. Oxford University Press.

Lorea, C. E. (2014). Searching for the divine, handling mobile phones: Contemporary lyrics of Baul songs and their osmotic response to globalisation. History and Sociology of South Asia, 8(1), 59–88. https://doi.org/10.1177/2230807513506629

মনসুর উদ্দীন, মুহম্মদ। (সম্পা.). (বিভিন্ন বছর)। হারামণি (বিভিন্ন খণ্ড)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়/বাংলা একাডেমি ও অন্যান্য প্রকাশক।

Mozumder, M. G. N. (2017). The body, subjectivity, and sociality: Fakirs in contemporary Bangladesh [Doctoral dissertation, University of Pittsburgh].

Openshaw, J. (1998). ‘Killing’ the guru: Anti-hierarchical tendencies of ‘Bāuls’ of Bengal. Contributions to Indian Sociology, 32(1), 1–28.

Openshaw, J. (2002). Seeking Bauls of Bengal. Cambridge University Press.

পাল, বসন্তকুমার। (১৯৫৫)। মহাত্মা লালন ফকির

Salomon, C. (2017). City of mirrors: Songs of Lālan Sā̃i (K. Cantú & S. Zakaria, Eds.). Oxford University Press.

সেন, ক্ষিতিমোহন। (১৯৪৫)। বাংলার সাধনা। বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ।

শরীফ, আহমদ। (১৯৭৩)। বাউলতত্ত্ব। বাংলা একাডেমি।

Smith, L. (2006). Uses of heritage. Routledge.

Tagore, R. (1931). The religion of man: Being the Hibbert lectures for 1930. George Allen & Unwin/Macmillan.

UNESCO. (2003). Convention for the safeguarding of the intangible cultural heritage. UNESCO.

UNESCO. (2008). Baul songs. Representative List of the Intangible Cultural Heritage of Humanity. (Originally proclaimed in 2005.)

UNESCO. (2008–2010). Action plan for the safeguarding of Baul songs. UNESCO Intangible Cultural Heritage.

UNESCO. (2011). Recommendation on the historic urban landscape, including a glossary of definitions. UNESC

ফরহাদ মজহার : কবি, চিন্তক, দার্শনিক ও প্রতিপক্ষ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top