চেনা গান অচেনা গীতিকার (প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব)

পর্ব ১

১৩৯৩ বাংলা। চৈত্র মাস। ভাটির ময়ালে খুব অভাব। গেরস্তকূল তাদের একমাত্র বোরোফসল তোলার অপেক্ষায় দিন গুনছে। ফসলের মাঠে বোরোধানের সবুজ শীষ এখনও মাথা নুয়ায়নি। শীষের সাদারেণু ঝড়ছে চৈতালি বায়ে। শাইল-গচি জাতের ধান কেবল ‘থউর’। জমিনে খুব ভালো ফলন হয়েছে। কৃষক সুখের স্বপ্ন নিয়ে চৈতের অভাব কাটিয়ে উঠতেছে বোরোফসল তোলার অপেক্ষায়। আদুরীর মা’র পরনের ছেঁড়া কাপড়টার পরমায়ুও যেন চৈতের অভাবের সমান। চৈতের অভাব শেষ হলেই বদলে যাবে আদুরীর মা’র ছেঁড়া কাপড়। ফসল উঠলেই পরিবারের সবার জন্য নয়া শাড়ী-লুঙ্গি-গামছা কিনে শুরু হবে অভাব জয়ের আনন্দ। এ আনন্দ লাভের আশায় অভাব সয়ে সয়ে আদুরীর মা’র দিন কাটে ফসলের দেবতার আরাধনায় উপবাস করে-করে। উপবাসের তাড়নায় মাঝে-মাঝে মনঃকষ্টে আদুরীর মা বলে ওঠে—‘পক্কি অইলেই ভালা আছিন! ইচ্ছাতম ঠুক্কিয়া-ঠুক্কিয়া খাইতাম, গাছের ডালে বৈয়া ঘুমাইতাম।’

স্বর্গপ্রাপ্তি নয়, খাদ্যপ্রাপ্তির জন্য দেব-দেবীর উপবাস করতে-করতে আদুরীর মা এখন ‘সুতিকার’ রোগী। কঙ্কালসার তার দেহ! মাথার তালুর চুল কেটে কবিরাজি ‘ভরণ’ দিয়ে মরণ জয় করতেছে ফসল তুলার আগ পর্যন্ত। আদুরীর বাবাও জানে তাদের অভাব পাকাধানের শীষের সমান। এ যেন ধানিজীবন। তাই জমির আইল ঘুরে আঙুলে দাগ গুনতে-গুনতে একা-একাই বলছে—‘শীষে বিশ, নুয়াইলে বারো, শাইল-গচি-বোরো কাটতে পারো।’

আঙুল গুনে ধানের এ হিসেব নগরে জানে না কেউ। এ আনন্দের বুকভরা সুখ কেবল কৃষকের থাকে। আদুরীর বাবা’র গুনগুন গানের সুর এ আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। একদিন বিকাল বেলা। আসমানের আইড়াকোনায় হঠাৎ কালোমেঘ জমেছে। শিলাবৃষ্টির আবাস। ফসলের বিপদ! ফসলের দেবতা নিরুদ্দেশ! আদুরীর মা বড় অসহায়। বাড়ির উঠোনে শিল-পাটা রেখে হিরালের দোহাই দিয়েও কাজের-কাজ হচ্ছে না। ঝিলকি মেরে আসমান থেকে মুহূর্তেই বিকট শব্দে শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। বিরামহীন শিলাবৃষ্টি। শিলা জমে সাদা হয়ে যায় বাড়ির উঠোন। উঠোনের পাশে লাউ গাছের থেতলে যাওয়া ডুগা-পাতা দেখে আদুরীর মার মন খারাপ। তার পরনের ছেঁড়া শাড়ির পরমায়ু বেড়ে যায়। আসমানি-শিলে তছনছ হয়ে যায় জমিনে গর্ভবতী ধানের ‘থউর’, ধানের শীষ। মাটিতে মিশে যায় ধানের শরির। সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলের শাইল-বোরো ফসল শিলান্তে নিল। সাপান্ত, বসন্ত ও শিলান্ত। এই তিনপ্রকার নিদানকালে ওঝা, বৈদ্য ও হিরালের ভরসা যখন আসমানি দেবতা চুরমার করে দেয়, তখন পাপ-পুণ্যের বিচারে অভাগার কপালমন্দ বলেই ধরে নেওয়া হয়। তাই আদুরীর বাবা শিলান্তে মারা জমিনে দাঁড়িয়ে থেতলে যাওয়া ধানের শীষ হাতে নিয়া আসমানের দিকে তাকাইয়া কয়—‘হগল শিলান্ত এমনে দিয়াই ঢাল্লিয়া দিলা? গরুর খেড়’ডাও রাখলা না?’

ধান-দূর্বা দিয়ে নতুন জামাই আশীর্বাদ করার মতো একমুঠো ধানও কেউ সংগ্রহ করতে পারেনি। আকাশের বাহাদুরী যেন আর থামে না। দেখতে দেখতে ঢলেঢলে তলিয়ে যায় মাঠ-ঘাট-জমি। হারিয়ে যায় ফসলের চিন। জমিশুদ্ধ গিলে খায় জলেশ্বর! ভাসাপানিতে আদুরীর বাবা নাউ এর গলুইয়ে বসে হাল ধরে ভাটিয়ালি গেয়ে আাবারও জানান দেয় নতুন করে যুদ্ধ জয়ের। থেমে থাকেনি ভাটির চিরাচরিত বর্ষাকালীন জনজীবন। থেমে থাকেনি অলস বেলার গান। অভাবের সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় গানেগানে তাদের দুঃখের বয়ান। কেননা গান যতটুকু না সুখের সাথী, তার চেয়ে অধিক দুঃখের সাথী। জীবন ঘনিষ্ঠ সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলো কথা হয়ে সুরে-সুরে গান হয়। যেখানে বিরহের গান সর্বাগ্রে। তাই ফসলহারা মানুষের বেঁচে থাকার আর্তনাদ প্রকাশ পায় গানে-গানে। বিশেষ করে বাড়ির উঠোনে মেয়েদের ধামাইল গান ভাটি ময়ালের সুখ-দুঃখের জনদলিল।

ধামাইল গান ভাটির নিজস্ব সম্পদ। ভাটি বাংলার আঞ্চলিক শব্দ ‘ধামা’ যার অর্থ ভাব বা আবেশ। আর এই ভাব বা আবেশ ভক্তি ও প্রেমে মজে যে গান পরিবেশিত হয় তার নাম ধামাইল। তাছাড়া ‘ধামা’ শব্দের অর্থ উঠোন বা মাটির আসর। ভাটির গেরস্ত বাড়ির বড়ো উঠোনে বা মাটির আসরে ধামাইল দলগতভাবে পরিবেশিত হয় বলে এই গানকে উঠোন বা মাটির আসরের গানও বলা হয়। আবার অনেকেই মনে করেন অবসরে গল্পগুজবের মুহূর্ত ‘ধুম্বইল’ আসর কালক্রমে গল্প থেকে গানে-গানে ধামাইল আসরে পরিণত হয়। যা সাধারণত ভাটি গায়ের লাজুক গেরস্ত বধুগণ দলগতভাবে চক্রাকারে ঘুরেঘুরে নেচে-নেচে হাতেতালি দিয়ে পরিবেশন করে থাকে। তাছাড়া ‘ধামা’ শব্দটি হাওর অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক সমাজে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও উপকরণের নাম। যেমন—ধান শুকানোর পর একত্রিত করার বস্তু বিশেষের নাম ‘ধামা’। যা দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শুকানো ধান একত্রিত বা কেন্দ্রীভূত করা হয়। আবার বাঁশের তৈরি ধারা বা চাটাইয়ে ধান রোদে শুকানো পর ভাড়ারে বা গোলায় তোলার উদ্দেশ্যে চাটাইয়ের কুনা টেনে যখন মাঝখানে ধান একত্র করা হয় সে প্রক্রিয়া বা কাজটিকেও ‘ধামা’ বলে। আবার ‘ধামা’ শব্দটির কৃষিকাজে ব্যবহৃত সহজে ধান বহনের জন্য বাঁশের তৈয়ারি একটি পাত্র বিশেষকেও বুঝায়। যা দিয়ে একসময় ধান মাপাও হত। লেনদেন বা ভাগবাটোরা হত ‘ধামা’ দিয়ে হিসেব করে। শ্রমিকের মুজুরি দেওয়া হতো ‘ধামা’ হিসেবে। তাই হয়তো শ্রমিকের মজুরিকেও ‘ধরমা’ বলা হয়। তাই এমনও হতে পারে ভাটির জনজীবনে ‘ধামা’ শব্দের ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা ও জীবন ঘনিষ্টতা থেকেই ধামাইল গানের নামকরণের যোগসূত্র।
ধামাইল গানে জীবনঘনিষ্ঠ ভাব প্রকাশ হয়। ধামাইল গান জীবনাচারনির্ভর। তাই আদুরীর মা ফসল হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে বাড়ির উঠোনে ধামাইল আসরে গেয়ে ওঠেন—

‘প্রাণসই সখি গো প্রাণ বাঁচে না অভাবের জ্বালায়।
১৩৯৩ সালে চৈত্রি মাসে নিলো শিলে,
এগো কত হাওর নিলো শিলে,
লোকে করে হায়রে হায়।
প্রাণসই সখি গো প্রাণ বাঁচে না অভাবের জ্বালায়।

৪০০ টাকা চাউলেরই মন,
কি করে বাঁচিবে লোকজন,
ছেলেমেয়ে ক্রন্দন করে পিতা-মাতার কাছে যায়।
প্রাণসই সখি গো প্রাণ বাঁচে না অভাবের জ্বালায়।

আদুরীর মা কান্দিয়া বলে,
আমার ইহজনম গেল বিফলে,
দারুণও অভাবের দায়।
প্রাণসই সখি গো প্রাণ বাঁচে না অভাবের জ্বালায়।’
(দীনবন্ধু, ১৯৮৬)

১৯৮৬ সালে ভাটি ময়ালে ধামাইল গানের আসরে আমার (দীনবন্ধু) এই গানটি নানাভাবে আরও কিছু কথা ও ভনিতাজুড়ে দিয়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যার মূল কারণ সময় উপযোগীতা ও জীবন ঘনিষ্টতা। যা ধামাইল গানের ধর্ম। রাধা-কানু, রাই-শ্যাম সংগীত কিংবা মহাজনদের বান্দা দরদী গানও তখন এইসব গানের বাস্তবতার কাছে হার মানে। শুধু কি তাই! আরও যে কত এমন সমকালিন বাস্তবতা নিয়ে গানের জন্ম হয় অভাবি ভাটি মায়ের কোলে তার হিসাব নগরে ক’জন রাখে? চরম অভাবেও তাদের সুরেলা স্বভাবে এতটুকু চিড় ধরেনি। অভাবি বধুগণ তখন হাসি-স্বভাবি হয়ে গান গেয়ে সংসারের অশান্তি তাড়ায়। তাই তো গাঁয়ের বধুগণ তাদের সংসার আগলিয়ে রাখতে, স্বামীর মনে শক্তি যোগাতে তাদের না বলা কথাগুলো ধামাইল আসরে সুরেসুরে গেয়ে ওঠে—

‘সাধের প্রাণপতি গো
কাজ নাই আমার নতুন শাড়ি,
সুতা আইনা দেও।
ছিড়া শাড়ি শিলাই করি
দিতে হবে বছর পারি,
চলব আমি সইয়া রইয়া জানবে না তো কেউ।
সাধের প্রাণপতি গো
কাজ নাই আমার নতুন শাড়ি,
সুতা আইনা দেও।

পুলায় কান্দে পুরি গো কান্দে ভাতের লাগিয়া,
ভাতের সাথে আলু দিয়া রান্দি ভাতের লেউ।
সাধের প্রাণপতি গো
কাজ নাই আমার নতুন শাড়ি,
সুতা আইনা দেও।

আদুরীর মা’র কপাল পুড়া
ভাঙছে সুঁইয়ের আগা,
শাড়ি সিলাই হইলো না তার
জানলো না তো কেউ।
সাধের প্রাণপতি গো
কাজ নাই আমার নতুন শাড়ি,
সুতা আইনা দেও।’
(দীনবন্ধু ২০১৭)

২০১৭ সাল। ভিন্ন আকাল। সাপান্ত, বসন্ত ও শিলান্ত এর কোনটি নয়। পাহাড়ি ঢলে অকালে তলিয়ে যায় হাওরের সমস্ত জমি। তাই আদুরীর মাকে উৎসর্গ করে সমকালিন বাস্তবতা নিয়ে ২০১৭ সালে ফসলহানীর পর এই গানটি আমি (দীনবন্ধু) রচনা করি। এখানে গানের ভনিতায় আদুরীর মা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম মাত্র। ধামাইল গানে একজন গায়ক নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে বা জীবনঘনিষ্ট গান মনে করে গায় বলেই দরদ বেশি প্রকাশ পায়। ধামাইল গানে ভনিতায় গীতিকারের নিয়ম ভাঙ্গার প্রচলন শুরু থেকেই। তবে সেটা কারো গান দখল করে বা গীতিকারকে আড়াল করে নিজের দখলে নেওয়ার জন্য নয়। ধামাইল গায়কগণ কখনো স্বেচ্ছায় নিজের নাম অন্যের রচিত গানের ভনিতায় জুড়ে দেন না। বরং ভালোবেসে নিজের লিখা গান অন্য ভনিতায় উৎসর্গ করেন। গীতিকার নিজের পরিচয় গোপন করে সকলের জন্য গান উৎসর্গ করেন এমন নজির ধামাইল গানে ভাটি গাঁয়ের বধুসমাজে অনেক। তাই পছন্দের গানে প্রকৃত গীতিকার এর পরিচয় খুঁজে না পাওয়ার বেদনাও আছে অনেক।

পর্ব ২

ভাটির অনেক ধামাইল গানে ভনিতায় ব্যবহৃত ‘ললিতা’ একটি কোলপ্রচলিত লুকায়িত জনপ্রিয় গীতিকারের নাম। যদিও ললিতা নামে কোন গীতিকারের সন্ধান আজও কোথাও পাওয়া যায়নি। প্রচলিত জনপ্রিয় অনেক ধামাইল গানের ভনিতায় ললিতা নামটি ব্যবহৃত হলেও অদ্যাবধি কেউই জানতে পারেনি কে এই ললিতা? এ নিয়ে বিস্তর তালাশ করেছি কিন্তু কোন হদিস পাইনি। তবে হদিস না পেলেও গীতিকার ললিতার উদ্দিশ পেয়ে গেছি বলে মনে হয়। জানিনা গবেষক মহলের কাছে ললিতার এই উদ্দিশ পাওয়ার অনুসন্ধানটুকু কতটুকু যুক্তিযুক্ত বলে মনে হবে। তবে আমার যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। তাই বিষয়ের বিস্তারিত তুলে ধরলাম। ১৮৮৬ সাল থেকে ধামাইলের প্রতি আমার ভালোলাগা শুরু। বিশেষ করে ধামাইলের জলভরা পর্বের একটি গান আমার খুব মনে বিন্দে যায়। গানটি হল—

‘আমরা ভইরে আইলাম
শীতল গঙ্গার জল,
ও কালার কলসি ভইরা জল ডালিয়া
সে যে ঘাট করলো পিছল।

সে যে নন্দের ছেলে চিকনকালা
সে যে জানে নানান ছল,
সে যে আঁকিঠারে বারে বারে
আমার মন করলো পাগল।

ও এগো অঙ্গুলী হেলাইয়া কালায়
আমায় দেখায় কদমতল,
ও এগো ভাবিয়া ললিতা বলে
তরা যাইস না কদমতল।
আমরা ভইরে আইলাম
শীতল গঙ্গার জল।’

এই গানটি শোনার পর গীতিকার ললিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার প্রবল ইচ্ছা আমার মাঝে দেখা দেয়। যদিও তখন আমি ধামাইল কিংবা গীতিকারের মাহাত্ম্য তেমন বুঝিনা। তাই আমার মাসির বাড়ির দিকে আত্মীয় ললিতা নামে এক জেঠিমার কাছে যাই। তিনি একজন ভাল ধামাইল গান ও বিয়ের গীতের শিল্পী। সরাসরি তাকেই এই গানের গীতিকার ললিতা বলে উপস্থাপন করি। তিনি আপত্তি প্রকাশ করে বলেন—‘বাবারে এই কম্ম আমার না! এইতা মেলা পুরানা গান, আমার মা-খুরিরাই এই গান গাইছে। এই ললিতা! কার কিতা, খেলায় কইব?’
ললিতা সম্পর্কে আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল হয়ে গেল তাই জেঠিমাকে কৌতুহলি হয়ে অন্য প্রসঙ্গে বললাম—‘তাহলে কি জেঠিমা এই গান অনেক আগের লেখা?’
জেঠিমা কপালে চিন্তার রেখা এঁকে উত্তর দিলেন—“আগেরেই অইতে পারে, রাধার সখি ললিতার বান্ধা অইতে পারে! অন্নের লেখা এইরম না! ‘ললিতা’ আর ‘লীলাবালী’ ধামাইল আর গীতের শিরমণি!”
এই বলে মাসীমা একটি অহংকারী শ্বাস ছাড়লেন। হাসলেন! আমি একটু সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—‘লীলাবালী কে মাসিমা?’
মাসীমা মুখের পান সামলিয়ে হেসে উত্তর দিলেন, এই যে গীতে আমরা গাই—
‘লীলাবালী লীলাবালী
বর যুবতী সইগো
কি দিয়া সাজাইমু তরে…।’

গীতটি সুরেসুরে খানিকটা গেয়েও শোনালেন এবং ললিতা প্রসঙ্গে নানা অসামঞ্জস্যতার কথাও বললেন। বুঝিয়ে দিলেন যে, প্রচলিত এসব তথ্য সঠিক নাও হতে পারে। পড়ে গেলাম খুউব মুশকিলে। আমার জানার আগ্রহের তালিকায় নতুন করে যোগ হল—‘লীলাবালী’।
যাই হোক, ললিতার কথায় আসি। তারপর থেকে যতদিন, যতবার ললিতা ভনিতায় ধামাইল গান শুনেছি ততবারই ললিতাকে জানার আগ্রহ ভীষণভাবে আমাকে তাড়া করেছে। কিন্তু তা আর নানা কারণে তেমনভাবে খোঁজ নেওয়া হয়ে উঠেনি দীর্ঘদিন।

১৯৯১ সাল। একমাত্র মামার বিয়ে। নেত্রকোনা জেলার ভাটি অঞ্চল। আমি বিয়ের আয়োজন নিয়ে খুবই ব্যস্ত। আত্মীয়-স্বজন ও নাইয়রি অনেক এসেছে মামার বাড়িতে। গীতে-গানে মুখরিত সারা বাড়ি। বিয়ের লোকাচার ও শাস্ত্রাচার সমস্ত কিছু মেনে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হতে চলেছে। বিয়ের প্রতিটি পর্বেই চলছে বিষয়ভিত্তিক গীত ও গান। আমার দিদিমা (মা’র মা) খুব বেশি ভালো গাইতে পারতেন না কিন্তু গানে সঙ্গত দেওয়া ও আসর জমানোর কারিগর ছিলেন। বেশ জানাশোনা ছিল তার। বিশেষ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে লোকাচার পর্বের ধারণা খুব ছিল। বিয়েতে কোন পর্বের কোন বিধি-ব্যাপার হবে, কোন পর্বে কি গান গাইতে হবে, এই পরামর্শ তিনি দিতেন। বিয়ের অধিবাসের স্নানে যখন জলভরা ধামাইলে (আমরা ভইরে আইলাম…) ঐ গানটি গাওয়া হয়, আমি তখন দিদিমা’কে গানের রচয়িতা ললিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন—‘রাধিকার সই ললিতা। রাধা-কৃষ্ণ স্নানে জলখেলি শেষে যখন শ্রীরাধিকা সইসনে বাড়ি ফিরেন, তখন ললিতা এই গানটি গায়। এই থেকেই এই ধামাইল গান শুরু হয় বলেই আমরা মনে করি। এই ললিতাই ধামাইল গানের জননী। মা-খুড়ি’রা কইতা, রাধা-কৃষ্ণের স্নানের ঘাটে জলখেলি পর্ব থেকেই অষ্টসখি সমেত ধামাইল গানের দলীয় পরিবেশনা শুরু হয়। আমরা এইটুকই জানি।’ দিদিমার এই কথা শুনে মাথায় ঝিম ধরে যায়। বুঝে উঠতে পারতেছি না ঠিক-বেঠিক। তাই বিষয়টা সময়ের কাছে ছেড়ে দেই। সুযোগ পেলেই ললিতাকে জানতে চাই। নানাজনের নানা কথা শুনি। কিন্তু যুক্তি মিলে না।

২০১২ সাল। হাওরে ‘ধামাইল উৎসব’ আয়োজন উপলক্ষে এলাকায় লোকগান ও লোকশিল্পীদের নিয়ে কাজ করছি। বিমান তালুকদারসহ এলাকার অনেকেই ছিলেন এই আয়োজনের সাথে যুক্ত। বিশেষ করে উৎসবের বিশেষ অংশ জুড়ে ধামাইলগানের প্রাধান্য ছিল। তাই গ্রামে-গ্রামে গানের মহড়া এবং দল নির্ণয় নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। পাশাপাশি ধামাইল গান সংগ্রহ, গানের সুর, নৃত্য, তাল, গান পরিবেশনের নিয়মকানুন ও শিল্পীদের নাম সংগ্রহ করি। দীর্ঘ এই পথচলায় বেশকিছু গানের ভনিতায় ললিতা নামটি আসে। ফলে আমার অতীত আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। কিন্তু কারো কাছ থেকেই জানা সম্ভব হয়নি কে সেই ললিতা?
একদিন বাড়িবাড়ি কাজ করতে গিয়ে গন্তব্যে ফেরা সম্ভব হয়নি। ভগ্নিপতি ডাক্তার অরুণ কুমার সামন্ত দাদার বাড়িতে রাত্রিযাপন করি। তিনি একজন ভাল কীর্তনীয়া, ভাল গানও লিখেন। কবিতা, ছড়া লিখেছেন অনেক। সাহিত্যজ্ঞান আছে। আমাকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। একসময় কলেজে শিক্ষকতার সুবাদে আমাকে ‘প্রফেসরবাবু’ ডাকতেন। আমাকে পেয়ে তিনি বেশ আনন্দিত হলেন। ভাগ্নে অমৃত সামন্ত খাওয়া-দাওয়ার বেশ আয়োজন করল। শুরু হলো রাত জেগে সাহিত্য আড্ডা, গল্প। মাঝে মাঝে গান। এক পর্যায়ে ধামাইল ও ললিতা প্রসঙ্গ উঠে আসে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বললেন— ‘শ্রীরাধা-কৃষ্ণলীলায় শ্রীরাধিকা যমুনার জলে সখি-সহচরী সঙ্গে ধামালি দিয়ে স্নান করে, ডুবাইয়ে লাই খেলে, মনোরঙ্গে হাত-পা নেড়েচড়ে যে গান গেয়েছিলেন তাই জলধামালি গান। জলধামালি গানে সখি ললিতা তাই হবে। ললিতা অন্য কেউ নয়। যমুনার জলে নেমে রাধা-কৃষ্ণের স্নান ধামালি হতে ধামাইল গানের উৎপত্তি। তাই এটি জলধামালি গান। যে গানটি সখি ললিতা গেয়েছিলেন। এজন্য বিয়ে উপলক্ষে বর-কনের স্নান অনুষ্ঠানে জলধামালি গাওয়া হয়। শুনেন প্রফেসর বাবু, আরো বলি—যে গানে অবরুদ্ধ মনোভাব অতি সহজে প্রকাশ পায় এবং চিত্তকে প্রফুল্লিত করে তাই ধামাইল গান।’
ললিতার বিষয়ে আগ্রহ এখন কমতে শুরু করল। মনে হল, এর কোন আগা-মাথা পাওয়া যাবে না! তবে তাঁর সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় এতটুকু বুঝলাম ভাটি অঞ্চল ধামাইল গানের উর্বর মেদেনী। নারী সমাজ তার জননী।

২০১৪ সাল। সুনামগঞ্জ জেলাধীন মধ্যনগর পুনরায় হাওর উৎসবের আয়োজন হয়। এ আয়োজনটিও হয়েছিল ‘হাওরপারের ধামাইল (হাপাধা)’ সংগঠনের ব্যানারে। উৎসবে ধামাইলের অনন্য শিল্পী চন্দ্রাবতী রায় বর্মণ সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি ধামাইল গান গেয়ে শোনান। উৎসব শেষে ধামাইল গান নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। এক পর্যায়ে ললিতার প্রসঙ্গ আসে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন—‘বাবারে, শ্রীরাধিকার সই ললিতা, বিশখা, বৃন্দা এরাই তো জলের ঘাটে রাধা-কৃষ্ণের স্নানে জলকেলিতে জলধামাইল গায়। এই গান তার কিনা বলা মুশকিল! ললিতা নামে কত গান আমরা মা-খুড়ির মুখে শুনি। কিন্তু কে সেই ললিতা? কে জানে? এমনও হইতে পারে গাঁও-গেরামে যে মহিলারা গোপনে গান লেখে তারাই ললিতা! … অবাক হওয়ার কিছু নাই। গান লিখলে সাধনা লাগে, লেখাপড়া লাগে। তাই আগে গাঁয়ের সাধারণ মহিলারা গান লেখলেও লজ্জায় প্রকাশ করছেন না। শুনছি তারা নানাজনের নামে গান চালাইয়া দিছে। কি আর করবে বলো? গান তো গাইতে হইবো। নিত্য-নতুন এত গান পাইতো কই? না লিখে উপায় আছে!’

চলবে…

হাওর গবেষক ও ‘হাওরপারের ধামাইল (হাপাধা) বাংলাদেশ। মধ্যনগর, সুনামগঞ্জ, বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top