আজ মঙ্গলবার, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ধরার খুশি ধরে না যে…

সেদিন শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা যাওয়ার পথে সবুজ গালিচা বিছানো মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল— শুধুমাত্র চোখের আরামই নয়— কত ইতিহাস, কত ভূগোল এই চরাচরে এসে থেমে গেছে। ছোট-ছোট, ছোট-ছোট জনবসতির দেশ বীরভূম। বীরেদের ভূমি— রাঢ়বঙ্গ। এই বঙ্গের মানুষের মধ্যেও একটা ধুসর মাটির রঙের সোঁদা গন্ধ-বর্ণ আছে। দুপুরবেলা মাঠের কাজের শেষের পর যখন চাষিরা ঘরে ফেরেন, তখন তাঁদের গড়নে তামাটে রঙের প্রলেপ দেখলেই বোঝা যায়, ঝড়-বৃষ্টি-জল সহ্য করতে পারে এই শরীর। ওদিকে উত্তরবঙ্গ কিংবা দক্ষিণের অঞ্চলগুলোতে এক দৃশ্য দেখা যায়, কিন্তু রঙের একটা অদ্ভুত বদল লক্ষ্য করি। মেদিনীপুরে ছোটবেলায় হস্টেলে থাকাকালীন দেখেছি, একটা কৃষ্ণবর্ণের ছায়া পড়েছে জলে-স্থলে। আবার বাবার কর্মসূত্রে উত্তরে গিয়ে দেখেছি সেই বর্ণ ক্রমে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আপাতদৃষ্টিতে সুখের চেহারা এদের একরকম, তবুও কেন জানি না বড় মায়া হয়, এই জনগোষ্ঠীর ভিন্নতা যখন কাছ থেকে দেখতে পাই। একবার মনে পড়ে, বিকেলবেলা হস্টেলের পাশে মহুয়াগাছের ফল কুড়িয়ে খেয়েছিলাম বেশ অনেককটি। আর তারপর সেই যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, যখন ঘুম ভাঙল সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত নেমে এসেছে। হস্টেলের দিদিরা ‘এই কনু, এই কনা’ ডেকে ঘুম ভাঙিয়েছিল। আশ্চর্য হই, মহুয়া আর তাল-খেঁজুরের রসের তাড়ি খেয়ে যখন খেটে খাওয়া মানুষেরা নেশা করেন, শরীরের ব্যথা জুড়োতেই এইসব প্রাকৃতিক পথ্য ওঁরা খান। শুনে হয়তো কেউ কেউ কটাক্ষ করবেন, তবুও ওঁদের ওই যাপনের এক বড়সড় ইতিহাস আছে, তা গ্রামবাংলায় গেলে টের পাওয়া যায়।

ছিলাম সেদিন শান্তিনিকেতন থেকে হাওড়াগামী কুলিক এক্সপ্রেসে। গরমের জ্বালায় টিটিকে (টিকিট কালেক্টর) অনুরোধ করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় একটা সিট জুটিয়ে নিয়েছিলাম বাড়তি কিছু পয়সার বিনিময়ে। জানলার পাশে বসে সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, কতদিন দিনমজুর ওই ক্ষেতেখামারে ঘাম ঝরাচ্ছেন বলেই কি না আমরা আরামে দিন কাটাচ্ছি। একেকটা করে স্টেশন পেরোচ্ছে আর দেখছি, মাঠের ধারে জল-জঙ্গল-বসতি-নদী-নালা-খাল-বিলে শাপলা-পদ্ম-পানিফলের চাষ। এই চাষবাস থেকে যেটুকু উপার্জন হয়, তার কতটুকুই-বা ওঁদের ঘরে আসে!

শান্তিনিকেতনে পড়াকালীন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের শিক্ষা যতটুকু জীবনে অর্জন করেছি, তার কতটুকু সমাজে ফিরিয়ে দিতে পারছি, তা নিয়ে মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করি। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার গুণ যদি না আমাদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়, তবে তো আমারা যারা বিশ্বভারতীর সাবেক ছাত্রী, আমাদের জীবন বৃথা। সমাজ-রাজনৈতিক জীবনের পটবদলের চেহারার সঙ্গে আমরা অবগত যেমনভাবে হই, তেমন করে যখন দেখি অনেকের মুখোসগুলো একটু খসে পড়ে চেনামুখ বদলে যাচ্ছে, ততই মনে মনে কখনও ভয় হয়, কখনও বিবমিষা জাগে। আসলে ‘নিয়তি’র কথা ভেবে দিন কাটানোর চেয়ে, যা করণীয় সেটা করাই শ্রেয়। আর ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’ নতুন জন্মলাভের ভাবনাই তো রবীন্দ্রনাথ আজীবন শিখিয়েছেন। মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করে এসব ভাবলেই। সেখান থেকে পরিত্রাণ পেতে রবীন্দ্রপাঠচর্চায় নিমজ্জিত হই। পশ্চিমবঙ্গে এই তথাকথিত ‘পরিবর্তন’-এর জমানায় ‘রাশিয়ার চিঠি’ পাঠ করলাম আবার। আবারও সাম্য-মৈত্রী-সহাবস্থানের বার্তাকেই অন্তরে স্থিত করলাম। স্বৈরাচার আর ফ্যাসিবাদের যুগে ভয় না পেয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে রবীন্দ্রনাথ যে বড় ভরসা, তা আবারও বুঝলাম। তাই রক্তকরবীর রাজার শৃঙ্খলার বাইরে থাকা ভূমিহীন কৃষকের ফসল কাটার যে গান, সেই গানই আমরা গাইব, ‘ধরার খুশি ধরে না যে, ওই-যে উথলে, মরি হা য় হা য় হায়’।

গুরুগম্ভীর প্রসঙ্গ ছেড়ে, একটা মজার গল্প বলি, আমাদের এক অধ্যাপিকা বাংলা নববর্ষের উৎসবের দিনে ছাত্রীদের বলেছিলেন, “মঞ্জরী রঙের শাড়ি পড়ে এসো।” কিন্তু সেই সময়ে হস্টেলের মেয়েরা কোথায় পাব সেইসব! অবশেষে ওনার কাছে গিয়ে ‘ধন্না’ দিয়েছিলাম। যখন সেই রঙের শাড়ি প্রথম দেখেছি, তখন বুঝেছি কেন এমন নামকরণ! আসলে আমগাছের কচি মুকুলের রঙ হল মঞ্জরী। আর ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর শাড়ির রঙ ছিল বোধহয় ‘ধানি’। সবুজের মায়া চোখে লেগে থাকে যেমন, নন্দিনীর মায়াও তেমনই ছিল হয়তো রবীন্দ্রনাথের কল্পনায়। ট্রেনের জানালার পাশের সিটে বসে দেশলাই বাক্সের মতো ছোটছোট বাড়িগুলো দেখতে অনেক দূর পৌঁছে গেলাম। মাঝে চোখ জুড়োলো। বর্ধমান পেরোতেই সেই তন্দ্রা ভাঙল। ট্রেনের সহযাত্রীরা শোরগোল জুড়ে দিয়েছিল, ঘুগনি, সিঙারা, ছোলাসিদ্ধ, মিহিদানা, সীতাভোগ, লুচি আর ‘চায়ে-চায়ে’ অর্থাৎ লেবু-চা ও দুধ-চা বিক্রি করা হকারদের কাছ থেকে কেনাকাটার জন্যে। আমি ট্রেনে উঠলেই কফি সঙ্গে নিয়ে উঠি। কে জানে বাবা কে কী মিশিয়ে দেবে— ছোটবেলা থেকেই মা-বাব শিখিয়েছিলেন, ‘ট্রেনের খাবার নৈব-নৈব চ’। বড় হতে হতে সেটাই মনে ধরে গেছে। যতই লোভ লাগুক, ‘নৈব-নৈব চ’। কিন্তু যেদিন ব্যতিক্রম ঘটে সেদিন পাশে অবশ্যই পরিচিত কাউকে চাই। একা একা ঠকতে কার ভালোলাগে!

ইতিমধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছল ট্রেন। বই বন্ধ করে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে ট্রেন থেকে নামলাম। ইতিটানলাম গল্পে। আজ রবীন্দ্রজয়ন্তীতে মনে পড়ছে, রবীন্দ্রভাবনায় বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে একদিন শান্তিনিকেতনে পড়তে এসেছিলামম। কতকটা যদিও স্বপ্নপূরণ হয়েছে, যেন শেষ অবধি এই সুরে গাইতে, ‘ধরার খুশি ধরে না যে ওই-যে উথলে মরি হায় হায়’!

প্রচ্ছদের ছবি: শিল্পী হরেন দাস

বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী, বর্তমানে বোলপুর কলেজের বাংলার অধ্যাপক, বসবাস শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীতে। গবেষণা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। ভ্রমণে বিশেষ আগ্রহ।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top