উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রীর ট্র্যাজেডি

।। অতনু সিংহ ও আকৃতি তেওয়ারি ।।

হীরালাল সেনের জন্মদিনে বিশেষ প্রতিবেদন

১৯০৫ সালে কলকাতায় গড়ে ওঠা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ছিল বাঙালি হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি রাজনৈতিক সক্রিয়তা। বাঙালি নমঃশূদ্র ও বাঙালি মুসলমানরা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে দুটি বঙ্গীয় প্রদেশের দাবি করলে বাবু বাঙালিরা তার বিরোধিতা করে কারণ কলকাতার সমান্তরালে ঢাকা আরেকটি কেন্দ্র হয়ে উঠলে বঙ্গীয় রাজনীতিতে উচ্চবর্ণের ও জমিদার শ্রেণীর বাবু বাঙালির প্রভাব খর্ব হবে। অথচ ইতিহাসের পোস্টমর্টেম করলে দেখা যায়, ১৯০৫-এ বঙ্গের দুটি প্রদেশ হলে ১৯৪৭-এ রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাগ হত না। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ছত্রছায়াতেও ম্লান হতে হতো না বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক ক্যানভাসকে। হীরালাল সেনদের ট্র্যাজেডি এটা, তাঁরা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে সিনেমা বানালেন, কিন্তু ১৯৪৭- রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাগ হল। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গ্রাস করল বঙ্গের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বড় অংশকে। হীরালাল সেনও হারিয়ে গেলেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ মারাঠি চিতপাবন ব্রাহ্মণ দাদাসাহেব ফালকের নাম ভারতীয় সিনেমার জনক হিসাবে চিহ্নিত করল। অনেকেই জানল না উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রী হীরালাল সেন।

হীরালাল সেন

কেবলমাত্র পুঁজির জোরে আর দিল্লি নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কারণে অন্য কিছুর মতো উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসও কিছুটা বিকৃত। কেননা, উপমদেশীয় চলচ্চিত্রের গড ফাদার হিসাবে, জনক হিসাবে যাঁর নামকে উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্থাপন করা হয়েছে, তিনি হলেন দাদাসাহেব গোবিন্দ ফালকে, যিনি ছিলেন চিতপাবন মারাঠি ব্রাহ্মণ। দাদাসাহেব কৃত প্রথম নির্বাক স্বল্পদৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র চলচ্চিত্র ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ (১৯১৩)। পৌরাণিক ন্যারেটিভের স্বল্পদৈর্ঘ্যের এই কাহিনীচিত্র তৈরি হওয়ার বহু আগেই কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের যাত্রাপথ তৈরি হয়ে গেছিল হীরালাল সেনের মাধ্যমে। কেননা হীরালাল সেন ‘রাজা হরিশচন্দ্র’র বহু আগেই নির্মাণ করে ফেলেছেন বেশ কয়েকটি ছবি। এমনকি ১৯০৫ সালেই তিনি নির্মাণ করে ফেলেছিলেন রাজনৈতিক তথ্যচিত্র, যার বিষয় ছিল বঙ্গভঙ্গ বিরোধী প্রতিবাদ। ওই ছবির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘আমাদের নিজেদের স্বার্থে খাঁটি স্বদেশী সিনেমা’। এমনকি ১৯০১ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যেই বেশ কয়েকটি মঞ্চ নাটককে তিনি ক্যামেরায় রেকর্ড করেছিলেন, যার মধ্যে ‘ভ্রমর’, ‘হরিরাজ’, ‘বুদ্ধদেব’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। উপমহাদেশের চলচ্চিত্র অভিযোজনের কালানুক্রমিক ইতিহাসে তাই ফালকে নয়, উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার, চলচ্চিত্র প্রযোজক হীরলাল সেন (২ আগস্ট, ১৮৬৬— ২৬ অক্টোবর, ১৯১৭) 

বলা ভালো, সেই সময় গোটা বিশ্বেই মঞ্চ নাটক বা থিয়েটার অথবা ম্যাজিক শো’কে ক্যামেরায় রেকর্ড করে তাকেই ‘চলচ্চিত্র’ আখ্যা দেওয়ার চল ছিল। এ প্রসঙ্গে ফ্রান্সের মারিয়ে জর্জেস-জঁ মিল্যেসদের নাম উল্লেখযোগ্য। ক্যামেরার কোনোরকম মুভমেন্ট ছাড়াই দৃশ্যকে সেলুলয়েডে ধারণ করাই ছিল চলচ্চিত্রের প্রাথমিক ধারণা। বিশ্ব চলচ্চিত্রে যাদের হাত দিয়ে সূচনা হয়েছে সেই ফরাসী লুম্যেয়ার ভাতৃদ্বয়ও স্থির ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণ করেই চলচ্চিত্র নামক মাধ্যমকে দর্শকের সামনে এনেছেন। উল্লেখ্য, ১৮৯৫ সালে ২৮ ডিসেম্বর লুম্যেয়ার ভাতৃদ্বয়ের মাধ্যমে সিনেমাটোগ্রাফিক মোশন পিকচার্স বা চলমান চিত্রমালা আত্মপ্রকাশ করে। তার ঠিক কয়েক বছরের মধ্যেই আজকের বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের ছেলে হীরালাল সেন চলচ্চিত্রচর্চা শুরু করে দেন। ১৯০১ সালের মধ্যেই উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এমনকি ফালকে যখন ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ তৈরি করছেন, সেই ১৯১৩ সালেই হীরালাল সেন বানিয়ে ফেলেছেন রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি যা ফালকে ফিল্মস কোম্পানির সমসাময়িক। দুর্ভাগ্যের বিষয় হীরলাল সেনের তৈরি করা রাজনৈতিক প্রামাণ্যচিত্রের প্রিন্ট একটি অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায় ১৯১৯ সাল নাগাদ। আর্থিক অনটন আর শারীরিক অসুস্থতার জেরে হীরালালের চলচ্চিত্র কেরিয়ারও থেমে যায় তার কয়েক বছর আগেই। ক্যান্সারে ভুগে ১৯১৭ সালে অকালে ঝরে যায় উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রীর জীবন।

ছবির প্রিন্ট নষ্ট হলেও, অকালে উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রীর জীবন ঝরে গেলেও ইতিহাসের ঘটনা ও ঘটনাক্রম তো নাই হয়ে যায় না, তাই গোটা উপমহাদেশের চলচ্চিত্র মহলের কর্তব্য ছিল হীরালাল সেনকে উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের জনক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার। কিন্তু দেখা গেছে ‘ভারতীয়’ চলচ্চিত্রের জনক হিসাবে দাদা সাহেব ফালকের নাম নিয়ে মাতামাতি করেছে ১৯৪৭-এ তৈরি হওয়া ভারত নামক যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র মহল। এমনকি ভারতের অপর হিসাবে ১৯৪৭-এ তৈরি হওয়া পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির চলচ্চিত্র মহলও উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসাবে দাদাসাহেব ফালকের কথাই স্মরণ করে এসেছে। বলা হয়েছে তিনিই জনক। যার সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং এসবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভারতীয় সিনে-ক্যাপিটালিজমের অবশ্যম্ভাবি নির্মাণ একদা বোম্বে ও আজকের মুম্বইয়ের বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।

দাদসাহেব ফালকে

প্রথমত যদি ‘ভারতীয়’ বলে কিছুর অস্তিত্ব থাকে তাহলে তা নেহাতই ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক পরিচিতি কেবল। ভারতীয় বলে কোনো সংস্কৃতি হতে পারে না। কেননা, ভারতীয় পরিচিতি একটি বহুজাতীয় রাজনৈতিক সত্তার নাম। আর সংস্কৃতি জাতি পরিচিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। হীরালাল সেন বাঙালি, তাঁর চলচ্চিত্রের আবহ ও প্রেক্ষাপট বঙ্গীয়। যেমন দাদাসাহেব মারাঠি, তাঁর ফিল্মের আন্ডারস্ট্যান্ডিং মহারাষ্ট্র কেন্দ্রিক। সুতরাং হীরালাল কিংবা দাদাসাহেব- কাউকেই ভারতীয় নামক কোনো সাংস্কৃতিক পরিচিত্র সঙ্গে একাত্ম করা অনুচিত, কেননা আবারও বুঝে নেওয়া দরকার ভারতীয় সংস্কৃতি বলে নির্দিষ্ট কিছু হয় না। যদি তর্কের খাতিরে উপমহাদেশীয় বিভিন্ন জাতীয় সংস্কৃতির কমন গ্রাউন্ডকে একত্ব করে উপমহাদেশীয় বলা যায়, সেক্ষত্রেও ভারতীয় শব্দটা খাটে না, কারণ আজকের আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারত তৈরি হয়েছে ১৯৪৭-এ। আর যদি ১৯৪৭-এ তৈরি হওয়া ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের সংস্কৃতিকে একত্রিত করে ‘ভারতীয়’ বলা হয়, সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গও (যা হীরালালদের অবিভক্ত বাংলার একটি খণ্ড) ভারতের আবার মহারাষ্ট্রও ভারতের। তাহলে কেন ভারতীয় সিনেমার জনক হিসাবে দাদাসাহেব ফালকের কথা উল্লেখ করা হবে? এটা কেমন বিবেচনা?

এই বিবেচনার কারণ, উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় সংস্কৃতিকে ‘ভারতীয়’ সংস্কৃতি বলে সর্বত্র প্রোমট করা, যার সূচনা হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকেই। যখন পশ্চিম ও উত্তর ভারতীরা মুম্বইয়ের স্টক এক্সচেঞ্জ গড়ে তুলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতীয় পুঁজির নাম করে ঔপনিবেশিক হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি পুঁজির বিকাশের চেষ্টায় রত হল। যখন কলকাতা থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘুরিয়ে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হল, যখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বীজপত্তন হল। তার আগে অবধি বাংলার নিজস্ব জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী কিন্তু ভালোই বিকশিতও হচ্ছিল, কিন্তু বঙ্গের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্র, নিম্নবর্গের মানুষের রাজনৈতিক উত্থান, পূর্ববঙ্গে বাঙালি মুসলিমের আত্মবিকাশের সুচনা- এসকল কারণেই বঙ্গবিরোধী অবস্থান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপোষ করা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মধ্যে প্রকট হতে শুরু করে। মহারাষ্ট্রের নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচিতি ও জাতীয়তাবাদী চেতনা শক্তিশালী হলেও, যেহেতু ইতিহাসের পাতায় মুঘল বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান ছিল স্ট্রং, সেটাই কালক্রমে মুসলিম বিরোধী চেতনায় পর্যবসিত হয়, ৪৭ পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে শিবসেনা নামক রাজনৈতিক দলটি এই ব্যাপারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তো মহারাষ্ট্রের এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার কারণেই হিন্দুত্ববাদের তথা ব্রাহ্মণ্যবাদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রপট হিসাবে বোম্বে শহর ছিল উপযুক্ত। রক্ষণশীল চিতপাবন ব্রাহ্মণ দাদাসাহেব ফালকেকে তাই ‘ভারতীয়’ আধুনিক সংস্কৃতির আইকন হিসাবে তুলে ধরাটা একভাবে মারোয়াড়ি, গুজরাতি ও মারাঠি অব্রাহ্মণদের (ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের সেবক বড় অংশের অব্রাহ্মণরা, ক্ষত্রিয় ও বানিয়ারা) ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতি রাজনৈতিক কমিটমেন্টের নানাবিধ প্রোজেক্টের অন্যতম একটি।

কিন্তু এর দায় হীরালাল সেনদেরও রয়েছে। কেননা, ১৯০৫ সালে কলকাতায় গড়ে ওঠা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ছিল বাঙালি হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি রাজনৈতিক সক্রিয়তা। বাঙালি নমঃশূদ্র ও বাঙালি মুসলমানরা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে দুটি বঙ্গীয় প্রদেশের দাবি করলে বাবু বাঙালিরা তার বিরোধিতা করে কারণ কলকাতার সমান্তরালে ঢাকা আরেকটি কেন্দ্র হয়ে উঠলে বঙ্গীয় রাজনীতিতে উচ্চবর্ণের ও জমিদার শ্রেণীর বাবু বাঙালির প্রভাব খর্ব হবে। অথচ ইতিহাসের পোস্টমর্টেম করলে দেখা যায়, ১৯০৫-এ বঙ্গের দুটি প্রদেশ হলে ১৯৪৭-এ রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাগ হত না। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ছত্রছায়াতেও ম্লান হতে হতো না বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক ক্যানভাসকে। হীরালাল সেনদের ট্র্যাজেডি এটা, তাঁরা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে সিনেমা বানালেন, কিন্তু ১৯৪৭- রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাগ হল। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গ্রাস করল বঙ্গের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বড় অংশকে। হীরালাল সেনও হারিয়ে গেলেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ মারাঠি চিতপাবন ব্রাহ্মণ দাদাসাহেব ফালকের নাম ভারতীয় সিনেমার জনক হিসাবে চিহ্নিত করল। অনেকেই জানল না উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রী হীরালাল সেন।

অতনু সিংহ

‘প্রতিপক্ষ’র নির্বাহী সম্পাদক, কবি ও গদ্যকার

আকৃতি তেওয়ারি

তরুণ প্রাবন্ধিক। নিবাস- হাওড়ায়।

Share