
।। ফরহাদ মজহার ।।
‘বড় বাংলা’ কথার মধ্যে ‘দুই বাংলা’ মিলিয়ে দেওয়ার রোমাঞ্চ নাই। বাংলাকে এক রাষ্ট্রে গুঁজে দেওয়ার জাতিবাদী বাসনা নাই। সাহিত্যের পরিমণ্ডল কোনো রাষ্ট্রীয় সীমানা মানে না—এই কথাই ‘বড় বাংলা’ মনে করিয়ে দেয়। আমাদের সাহিত্যের ভাষা বাংলা—এতটুকুই। কিন্তু বাংলা ভাষার ভেতরও এক বাংলা নাই। নদীয়ার বাংলা, ঢাকার বাংলা, কলকাতার বাংলা, সিলেটের বাংলা, মেদিনীপুরের বাংলা, পুরুলিয়ার বাংলা, চাটগাঁর বাংলা, বরিশালের বাংলা, রংপুরের বাংলা, কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়ার বাংলা, চরাঞ্চলের বাংলা, পাহাড়ি বাংলার সঙ্গে মিশে থাকা ভাষা, প্রবাসী শ্রমিকের বাংলা, শহুরে ভাঙা বাংলা, নারীর গোপন ভাষা, কৃষকের বীজ-ভাষা, মাজারের দোয়া, আখড়ার গান—সব মিলেই বাংলা। ‘বড় বাংলা’ মানে এই বহুস্বরকে জায়গা দেওয়া। ভাষাকে এক প্রমিত মাপে পুলিশি ভাবে বাঁধা না; বরং চলতি, মিশ্র, বহমান, ঝগড়াটে, প্রেমময়, রুহানি ও দেহী বাংলার জগৎ খোলা রাখা।
‘প্রতিপক্ষ’ নতুন রূপে ‘বড় বাংলার’ পত্রিকা হিশাবে বের হওয়ার পর আমরা ইতিমধ্যে অনেক বছর পার হয়ে এলাম। এক বছর পার করার সময় আমি লিখেছিলাম ‘বড় বাংলা কোনো পরিচয়বাদী স্লোগান নয়’। এক বছর পার করা আমাদের জন্য ছিল আনন্দের খবর, কিন্তু শুধু আনন্দের খবর ছিল না; এক ধরনের দায়ের ভারও ছিল। আমরা চালিয়ে যেতে পারব কিনা ভয় ছিল। কিন্তু আমরা এখনও আছি। এই টিকে থাকাটুকুর মূল্য অনেক। আমাদের সামর্থ অনুযায়ী আমরা ‘প্রতিপক্ষ’-কে আরও সক্রিয় ও সচল করার কথা ভাবছি। তাই মনে হয়েছে পুরানা কথাগুলো আবাব্র সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া অপ্রাধ হবে না। অর্থাৎ ‘সাহিত্য’ বলতে আময়া কি বুঝি এবং ‘বড় বাংলা’ কথাটা কেন বলি?
‘প্রতিপক্ষ’ বের করার পেছনে যে ভাবনা কাজ করেছে, তার কিছু কথা আমরা ‘আমাদের কথা’ পাতায় আগে বলেছি। কিন্তু ‘বড় বাংলা’ কথাটার অর্থ, তার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক দিগন্ত, এবং তার রাজনৈতিক ভুলপাঠ ঠেকাবার কাজ আরও পরিষ্কার ভাবে করা দরকার। কারণ ‘বড় বাংলা’ যদি কেবল আবেগের কথা হয়ে থাকে, তাহলে তা সহজেই পরিচয়বাদী স্লোগানে নেমে যেতে পারে। আবার যদি ‘বড় বাংলা’-কে কেবল সাহিত্য-পত্রিকার নামচিহ্ন হিশাবে ধরা হয়, তাহলে এর ভেতরে থাকা বড় তাত্ত্বিক সম্ভাবনাও হারিয়ে যাবে। আমাদের কাজ দুই দিক সামলানো: একদিকে ‘বড় বাংলা’ কোনো জাতিবাদী, ধর্মীয়, রাষ্ট্র-সম্প্রসারণবাদী বা পরিচয়বাদী স্লোগান না—এই কথা স্পষ্ট করা; অন্যদিকে দেখানো, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাস, উপমহাদেশের সীমান্ত-বাস্তবতা, দেশভাগের ক্ষত, প্রান্তিক ভূখণ্ডের অভিজ্ঞতা এবং পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের চাপের মধ্যে ‘বড় বাংলা’ আগামির এক জরুরি কল্পনা। আমরা ‘প্রতিপক্ষ’-কে আরও সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা করছি। নিজেদের কাছে নিজেরা স্পষ্ট থাকা এবং যাঁরা আমাদের ভালবাসেন তাঁদের প্রতি দায় বোধ করে ‘বড় বাংলা’ ধারণাটা যথসম্ভব পরিচ্ছন্ন ভাবে আবার হাজির করবার দায় বোধ করছি। পুরানা লেখার সূত্র ধরে ‘বড় বাংলা’ বলতে আমরা কি বুঝি – অর্থাৎ বড় বাংলার সাহিত্য পত্রিকা হিশাবে ‘প্রতিপক্ষ; কি চিন্তা ধারণ করে তা আবার বলা আশা করি অপরাধ হবে না।
প্রথম পর্যায়ে ‘প্রতিপক্ষ’ চারটি সংখ্যা বেরিয়েছিল। নানা কারণে পরে আমরা সেটি চালিয়ে যেতে পারি নাই। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যাই বিষয়-বাছাইয়ের কারণে আলোচিত হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ ছিল সময়ের বিচারে প্রবল সাহসের ব্যাপার। যেমন, বাঙালি জাতিবাদীদের রক্তচক্ষু ও বিরাগ উপেক্ষা করে বাংলাদেশে যাঁরা উর্দু সাহিত্য চর্চা করেছেন, তাঁদের ওপর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা। আমরা তখনও বলেছি, এখনও বলি: বাংলাদেশের উর্দুভাষীরা বাংলাদেশেরই নাগরিক। আমরা মাতৃভাষার জন্য লড়েছি; ফলে উর্দু যাদের মাতৃভাষা, এবং সেই ভাষায় যাঁরা বাংলাদেশে থেকে কবিতা, গল্প, স্মৃতি, আখ্যান, গান বা চিন্তা লেখেন, তাঁদের চর্চাও মাতৃভাষারই চর্চা। তাঁদের লড়াইও আমাদের লড়াইয়ের বাইরে না। আমরা সকলেই নিজ নিজ ভাষায় বাস করি। নিজ ভাষায় বাস করেও অন্য ভাষার মানুষের সঙ্গে সম্বন্ধ গড়ার চেষ্টা—এই চেষ্টাকেই আমরা ‘সাহিত্য’ বলি।
এই জায়গায় ‘সাহিত্য’ শব্দের দিকে ফিরে দেখা জরুরি। আমরা অনেক দিন ধরে বলে আসছি—‘সহিত’ থেকে সাহিত্য; অর্থাৎ একা থাকার ভাষা না, সকলের সঙ্গে থাকা, থাকা-যাওয়ার রকম, দূরের সঙ্গে নিকটের সম্বন্ধ, অপরের সঙ্গে বাসের বাসনা। পাশ্চাত্যের ‘লিটারেচার’ শব্দের অনুবাদ হিশাবে ‘সাহিত্য’কে আমরা অনেক সময় কেবল মুদ্রিত বই, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ বা রুচিশীল পাঠের জিনিস ভাবি। কিন্তু বাংলা ‘সাহিত্য’ শব্দটির ভেতরে ‘সহিত’ বা ‘সহবাস’-এর যে দিক আছে, সেটি আমাদের কাছে কেন্দ্রীয়। এই অর্থে সাহিত্য কেবল ভাষার শিল্প না; সম্বন্ধ রচনার কাজ। রিক্যুর দেখিয়েছেন, কাহিনি মানুষের ছড়ানো-ছিটানো অভিজ্ঞতাকে একটি সময়বদ্ধ অর্থে গেঁথে দেয়; কাহিনি শুধু ঘটনা বলে না, মানুষের সময়-অভিজ্ঞতাকে নতুন ভাবে গড়েও তোলে (Ricoeur, 1984, 1985, 1988)। তাই সাহিত্য আমাদের কাছে নিছক অলংকার না; মানুষ কিভাবে নিজেকে, অন্যকে, অতীতকে এবং আগামিকে বোঝে—সেই বোঝাবুঝির ক্ষেত্র।
এ কারণে আমরা দুটি কথা বলি। প্রথমত, সাহিত্য সকলের সঙ্গে বাস করবার ইচ্ছা। দ্বিতীয়ত, যে কোনো মাধ্যমে এই বাসনার হাজির থাকা সাহিত্যিক হতে পারে। সাহিত্য শুধু ছাপাখানার কারবার—এই দাবি আমরা নাকচ করতে চাই। ফটোগ্রাফি, সিনেমা, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, মঞ্চ, গান, দরবার, আখড়া, হাতের কাজ, কৃষির বীজ-রক্ষা, নৌকার কারিগরি, মাটির ঘর, পল্লির পালা, শহরের দেয়াললিখন—মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে মাটি-নদী-প্রাণের, মানুষের সঙ্গে গায়েবি ও রুহানি জগতের যে সম্বন্ধ রচনার চেষ্টা সেখানে আছে, তা-ও সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরের অংশ হতে পারে। দেরিদা সাহিত্যকে এক ‘অদ্ভুত প্রতিষ্ঠান’ বলেছেন—যে প্রতিষ্ঠান নিজের আইন বানায়, আবার সেই আইনকে প্রশ্নও করে (Derrida, 1992)। আমরা এই কথাটিকে বাংলা ভাষার ভেতর থেকে পড়তে চাই: সাহিত্য এমন এক ময়দান, যেখানে ভাষা নিজেকে কেবল মান্য নিয়মে চালায় না; সে নিজেই নিজের সীমা পরীক্ষা করে।
মানুষ স্বভাবতই সম্বন্ধ রচনার প্রাণী—এ কথা বলা সহজ। কিন্তু সমাজে শত্রু-মিত্রের ভেদ, ঘৃণা, অপরায়ন, বিতাড়ন, ভাষাগত অপমান, ধর্মীয় দেয়াল, জাতিগত হিংসা কিভাবে তৈরি হয়? এই প্রশ্নের উত্তর দেবার পূর্ণ দায় সাহিত্যের ওপর চাপানো যায় না। কিন্তু সাহিত্য এই প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারে না। যেখানে দূরত্ব মাথা তোলে, যেখানে মানুষ মানুষকে ‘অপর’ বানায়, যেখানে ভাষা মানুষের থাকার জায়গা না হয়ে শাসনের অস্ত্র হয়, সেখানে সাহিত্য মনে করিয়ে দেয়: মানুষকে কেবল পরিচয়ের খোপে আটকালে তাকে বোঝা যায় না। সাহিত্যের ভিতরকার এক গভীর তাগিদ বরাবরই জারি থাকে: ভেদ রেখেও সম্বন্ধ খোঁজা, দূরত্ব জেনেও এক সাথে বসবাসের পথ সন্ধান ও রাস্তা বানানো — সাহিত্য এই স্বভাব থেকে বিচ্যুত হলে তা প্রপাগান্ডা হয়ে যায়, পুরানা রাজনৈতিক বিভাজনের হাতিয়ার বনে যায়। সাহিত্য এই দোষ বা অপরাধ করে নি, এমন দাবি আমরা করি না। করেছে, এখনও করে। কিন্তু সাহিত্যের অন্দরমহলে বসে এই দোষ কাটিয়ে ওঠার সাধনা থাকতে হবে। আমাদের দাবি এতটুকুই।
‘সামাজিক’ হওয়ার অর্থও এখানে নতুন করে ভাবতে হবে। মানুষ কেবল জৈবিক বা বৈষয়িক সম্বন্ধ স্থাপন করে না। মানুষ খাদ্য, শ্রম, জমি, বাজার, পরিবার, উৎপাদন, ভোগ—এসবের ভেতর বাস করে, সন্দেহ নাই। কিন্তু শুধু আর্থ-সামাজিক সম্বন্ধে বা উৎপাদন-সম্পর্কে মানুষকে নামিয়ে আনা যায় না। মানুষ কল্পনা করতে জানে। যা নাই তা নিয়ে ভাবতে পারে। এমনকি যা আপাতত অসম্ভব, সেই অসম্ভবের পায়ে শহিদ হতেও মানুষ ভয় পায় না। মানুষের এই কল্পনা, প্রতিশ্রুতি, স্মৃতি ও আত্মদান ছাড়া সমাজ বোঝা যায় না। রিক্যুর স্মৃতিকে ইতিহাসের কাঁচামাল মাত্র বলেন নাই; স্মৃতি, ইতিহাস ও ভুলে যাওয়ার জটিল সম্পর্কের ভেতর দিয়েই মানুষ নিজের অতীতের সঙ্গে দায়ী সম্বন্ধ রাখে (Ricoeur, 2004)। তাই সাহিত্য কেবল বর্তমানের বাজারি ভাষা না; স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার, ভুলে যাওয়া ফেরত আনার, এবং অসম্ভব আগামির জন্য ভাষা বানাবার কাজও সাহিত্য।
এই কারণেই প্রকৃতিস্থ বা অপ্রকৃতিস্থ, পাগল বা স্বাভাবিক, কেন্দ্রে থাকা বা বাদ পড়া—সকলের সঙ্গে সম্বন্ধ রচনার হিম্মত সাহিত্য ধারণ করে। সাহিত্য চর্চা সম্ভবত তাদের পক্ষেই সম্ভব, যারা সব কিছুকে একরকম করতে চায় না; যারা জানে মানুষ কেবল নিয়মে বাস করে না, ব্যতিক্রমেও বাস করে। যারা আবছা, অপরিচিত, স্ট্রেঞ্জ, সমাজের চোখে অস্বস্তিকর—তাদের হাতও ধরতে চায় ‘প্রতিপক্ষ’। বড় বাংলার যে কোনো সাধক-দরবারে গেলে আমরা দেখি পাগলদের জন্য জায়গা আছে। স্বাভাবিকতা ও পাগলামির সীমান্তরেখার দুই দিকেই সাহিত্য। ‘প্রতিপক্ষ’ দুই দিকেই হাত মেলে ধরতে চায়। ধরুক যার ইচ্ছা।
হয়তো কথাগুলোর মধ্যে আবেগ আছে, রোমাঞ্চ আছে। থাকুক। সাহিত্যের জমিন বা চাষাবাদ এই মাখামাখির মধ্যেই। বৈষয়িক সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, রাজনীতির শত্রু-মিত্র ভাগ, রাষ্ট্রের নাগরিক-অনাগরিক খাতা, বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক—এসবের ভিতর দিয়েই মানুষ থাকে। কিন্তু সাহিত্য সেই সীমা অতিক্রমের আকুতি, কল্পনা, ইচ্ছা ও বাসনাকেও ধারণ করে। দেশ, কাল, পাত্র, পরিচয়, ভাষা, ধর্ম, জাত, শ্রেণি—এসব বাস্তব; কিন্তু এগুলো শেষ কথা না। সাহিত্য সেই শেষ-কথা-না-হওয়ার জায়গা। এই জায়গা থেকেই আমরা ‘বড় বাংলা’ বলি। ‘বড়’ কথাটার বাড়ন্ত এখানে; ভূখণ্ড দখল বা রাষ্ট্র বড় করা না, বরং সম্বন্ধের পরিসর বড় করা।
তাই ‘বড় বাংলা’ কথার মধ্যে ‘দুই বাংলা’ মিলিয়ে দেওয়ার রোমাঞ্চ নাই। বাংলাকে এক রাষ্ট্রে গুঁজে দেওয়ার জাতিবাদী বাসনা নাই। সাহিত্যের পরিমণ্ডল কোনো রাষ্ট্রীয় সীমানা মানে না—এই কথাই ‘বড় বাংলা’ মনে করিয়ে দেয়। আমাদের সাহিত্যের ভাষা বাংলা—এতটুকুই। কিন্তু বাংলা ভাষার ভেতরও এক বাংলা নাই। নদীয়ার বাংলা, ঢাকার বাংলা, কলকাতার বাংলা, সিলেটের বাংলা, মেদিনীপুরের বাংলা, পুরুলিয়ার বাংলা, চাটগাঁর বাংলা, বরিশালের বাংলা, রংপুরের বাংলা, কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়ার বাংলা, চরাঞ্চলের বাংলা, পাহাড়ি বাংলার সঙ্গে মিশে থাকা ভাষা, প্রবাসী শ্রমিকের বাংলা, শহুরে ভাঙা বাংলা, নারীর গোপন ভাষা, কৃষকের বীজ-ভাষা, মাজারের দোয়া, আখড়ার গান—সব মিলেই বাংলা। ‘বড় বাংলা’ মানে এই বহুস্বরকে জায়গা দেওয়া। ভাষাকে এক প্রমিত মাপে পুলিশি ভাবে বাঁধা না; বরং চলতি, মিশ্র, বহমান, ঝগড়াটে, প্রেমময়, রুহানি ও দেহী বাংলার জগৎ খোলা রাখা।
সাহিত্য পরিচয়ের দেয়াল তোলে না—এ কথা বলা কঠিন। কারণ ইতিহাসে সাহিত্য, লিটারেচার, সংস্কৃতি—এসব অনেক সময় দেয়াল তুলেছে। উপনিবেশী শাসন তার ভাষা দিয়ে শাসিতদের ‘সভ্য’ ও ‘অসভ্য’ ভাগ করেছে। আধুনিক জাতিবাদ সাহিত্যকে জাতির আত্মা বানিয়ে অন্য জাতিকে অপর করেছে। ধর্মীয় পরিচয়বাদ পবিত্রতার নামে অন্যের ভাষা, গান, দেহ, খাদ্য, পোশাক, প্রেম—সবকিছুকে সন্দেহ করেছে। আমরা এই ইতিহাস অস্বীকার করি না। কিন্তু যাকে আমরা সাহিত্য বলতে চাইছি, তার কাজ দেয়াল ভাঙা; দেয়াল তোলা না। সাহিত্য যদি কেবল জাতির মহিমা, ধর্মের গর্ব, ভাষার অহংকার বা রাষ্ট্রের প্রচারপত্রে পরিণত হয়, তবে তা সাহিত্য-স্বভাব হারায়।
তাই পরিষ্কার বলা দরকার: ‘বড় বাংলা’ কোনো পরিচয়বাদী রাজনীতির স্লোগান না। অবশ্য আধুনিকতা ও জাতিবাদের যুগে আমরা অজান্তেও জাতিবাদী ব্যাকরণের মধ্যে আটকা পড়ে থাকি। ‘জাতি’, ‘ভাষা’, ‘রাষ্ট্র’, ‘সংস্কৃতি’, ‘মাটি’, ‘জনগণ’—এসব শব্দ সহজেই এক ধরনের পবিত্র পরিচয়ের ভাষা বানিয়ে ফেলে। অ্যান্ডারসন দেখিয়েছেন, আধুনিক জাতি অনেকাংশে কল্পিত রাজনৈতিক সমাজ; কিন্তু কল্পিত বলেই তা মিথ্যা না, বরং মুদ্রণ, ভাষা, বাজার, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে তা মানুষের বাস্তব রাজনৈতিক অনুভূতি গড়ে তোলে (Anderson, 2006)। তাই জাতিবাদী ব্যাকরণ থেকে বের হওয়া সহজ না। আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা জানি। কিন্তু ‘বড় বাংলা’ এই ব্যাকরণের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না; বরং অপরের সঙ্গে সম্বন্ধ রচনার আকুতির শক্তিতে সকল প্রকার জাতিবাদ ও পরিচয়বাদের কারাগারকে ভেতর থেকে প্রশ্ন করতে চায়।
বড় বাংলা সকলকে অন্তর্ভুক্ত রাখার সাধনা, বাদ দেওয়ার সংকীর্ণতা না। বড় বাংলা হিন্দি ভাষা বা হিন্দি সাহিত্যের বিরুদ্ধে বাঙালির সাহিত্যচর্চা না। নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়, ভাষাগত অধিকার রক্ষা, সাম্প্রদায়িক ও জাতিবাদী আধিপত্য মোকাবিলা—এসব রাজনৈতিক কর্তব্য আছে, থাকবে। সাহিত্য সেই দায় অস্বীকার করে না। কিন্তু সাহিত্যের কর্তব্য সেখানে শেষ হয় না; বরং সেখানেই শুরু হয়। বড় বাংলা বাংলা ভাষার বাইরে সকল ভাষার সঙ্গে সম্বন্ধ রচনায় আগ্রহী। হিন্দি ভাষাতেও জাতিবাদী অন্ধত্ব, বাজারি ভাষা-আধিপত্য এবং রাষ্ট্রীয় হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে সাহিত্য আছে। সেই সাহিত্য আমাদেরই আপন। বাংলা ভাষার মুক্তি হিন্দির ঘৃণায় না; বাংলা ভাষার মুক্তি ভাষার বহুত্বে, সম্বন্ধে, অনুবাদে, পারাপারে।
সবই আমাদের সাধ্য ও সামর্থ্যের মামলা। ভাষা ও সংস্কৃতি-ভিত্তিক পরিচয়বাদের বিপদ আমরা বাংলাদেশে চোখের সামনে দেখেছি। বাঙালি জাতিবাদ যখন রাষ্ট্রীয় ভাষা ও সংস্কৃতির নামে অন্য ভাষাভাষী, অন্য ধর্মাচারী, পাহাড়ি, সমতলের ছোট জাতিসত্তা, উর্দুভাষী বা নানা প্রান্তের মানুষের অভিজ্ঞতাকে ছোট করেছে, তখন তার পালটা ইসলামের নামে ধর্মীয় জাতিবাদ বা পরিচয়বাদের অসুখও দানা বেঁধেছে। কেন পরিচয়বাদ ও অপরায়ন মানুষের ইতিহাসে ঘটে, তার বিচার আলাদা। কিন্তু সাহিত্যের সাধনা হিশাবে বড় বাংলার দাবি এইটুকু: বৈচিত্রের মধ্যে মানুষ কোথায় এক, কোথায় একে অন্যের সঙ্গে জড়ানো, কোথায় স্মৃতি ও কষ্টের ভাগীদার—সেটা সাহিত্যচর্চার মধ্যে দেখানো। যেন বিভাজন, অপরায়ন, বিতাড়ন ও জিঘাংসার বিপরীতে দাঁড়ানো যায়।
এটা শুধু বাংলা সাহিত্যের কাজ না; হিন্দি, উর্দু, অসমিয়া, ওড়িয়া, নেপালি, তামিল, পাঞ্জাবি, পশতু, সিন্ধি, মারাঠি, মালয়ালম—সকল ভাষার সাহিত্যেরই কাজ। হিন্দি সাহিত্যও আমাদের ভাই, আমাদের বোন। তাই ‘বড় বাংলা’ বলার অর্থ এই না যে আমরা হিন্দি ভাষা বা সাহিত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। তবে একই সঙ্গে সত্য হচ্ছে, উপমহাদেশ জুড়ে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানি সম্প্রসারণবাদের দেয়াল উঠেছে; বহু জায়গায় ‘হিন্দু’ না হলে ‘হিন্দুস্তান’ থেকে বিতাড়নের রাজনীতি জোরদার হয়েছে। এই রাজনীতির মোকাবিলা উপমহাদেশের প্রত্যেকের রাজনৈতিক কর্তব্য। কিন্তু সাহিত্যের কারবার বিভাজনের ব্যবসা না; সম্বন্ধ রচনার সমাজ বা পরিসর ক্রমাগত বড় করে তোলা। সাহিত্যের গোড়ার দায়—বাদ পড়াদের জায়গা দেওয়া, নিজের অন্তরে স্থান দেওয়া—কোনো ভাষাই এড়াতে পারে না। বাংলা যেমন পারে না, হিন্দিও পারে না। যে কোনো সাহিত্য যদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রসারণবাদ, ধর্মীয় ঘৃণা বা বাজারি কেন্দ্রের দাস হয়ে যায়, তবে সে নিজের সাহিত্য-স্বরূপ হারায়।
এখানেই ‘বড় বাংলা’কে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের আলোকে নতুন করে ভাবা দরকার। আজকের পৃথিবী ভাষা, নদী, শ্রম, খাদ্য, বীজ, গান, স্মৃতি—সবকিছুকে বাজারের জিনিস বানাতে চায়। গোলকায়ন নিজেকে মুক্ত চলাচল বলে হাজির করে, কিন্তু বাস্তবে পুঁজি চলাচল করে স্বাধীন ভাবে, আর মানুষ আটকে যায় ভিসা, সীমান্ত, শ্রম-চুক্তি, দালাল, যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয় ও দারিদ্র্যের মধ্যে। ওয়ালারস্টাইনের ভাষায়, আধুনিক বিশ্ব-ব্যবস্থা কেন্দ্র, অর্ধ-প্রান্ত ও প্রান্তের অসম সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; কেন্দ্র মুনাফা নেয়, প্রান্ত শ্রম, কাঁচামাল, শরীর ও পরিবেশের দায় বহন করে (Wallerstein, 2004)। বাংলা ভাষাভাষী ভূখণ্ড—বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, সুন্দরবন, উপকূল, চর, পাহাড়, নদীবিধৌত এলাকা, প্রবাসী শ্রমিকের ছড়িয়ে থাকা জীবন—এই বিশ্ব-ব্যবস্থায় গভীর ভাবে প্রান্তিক। এই প্রান্তিকতা দুর্বলতার নাম না; এখান থেকেই পৃথিবীর কেন্দ্রকে অন্য চোখে দেখা যায়।
প্রান্তিক ভূখণ্ড বলতে আমরা কেবল মানচিত্রের দূর প্রান্ত বুঝি না। প্রান্ত মানে এমন সব স্থান, মানুষ ও ভাষা, যাদের শ্রম ও স্মৃতি ছাড়া কেন্দ্র বাঁচে না, অথচ কেন্দ্র তাদের জ্ঞান, ভাষা ও জীবনকে তুচ্ছ করে। লেফেভ্র দেখিয়েছেন, স্থান কেবল প্রাকৃতিক পটভূমি না; সামাজিক সম্পর্ক স্থানকে উৎপাদন করে, আর উৎপাদিত স্থান আবার ক্ষমতার সম্পর্ককে ধরে রাখে (Lefebvre, 1991)। সেই অর্থে বাংলা নদীভূমি, চর, উপকূল, বন্দর, সীমান্ত, গার্মেন্টস-শহর, প্রবাসী শ্রমের গ্রাম—সবই পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের তৈরি-ভাঙা স্থান। ‘বড় বাংলা’ এই স্থানগুলোর সাহিত্যিক মানচিত্র বানাতে চায়; যে মানচিত্র রাষ্ট্রীয় মানচিত্র না, বাজারের মানচিত্রও না, বরং মানুষের বাস, স্মৃতি, ভাষা ও লড়াইয়ের মানচিত্র।
এইখানে দেশভাগের প্রশ্নও জরুরি। ১৯০৫, ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১—এসব বছর বাংলা ভাষা ও ভূখণ্ডকে শুধু মুক্ত করে নাই; কেটেছে, রক্তাক্ত করেছে, নতুন স্মৃতি বানিয়েছে, আবার পুরানা স্মৃতি চাপাও দিয়েছে। দেশভাগ ধর্মীয় রেখায় ভূখণ্ড ভাগ করেছে; ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাকে রাজনৈতিক মর্যাদা দিয়েছে; মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ রাষ্ট্র দিয়েছে; কিন্তু রাষ্ট্রের জন্মের পরও বহু ভাষা, বহু জাতিসত্তা, বহু প্রান্ত, বহু আখড়া, বহু রুহানি ধারা রাষ্ট্রীয় জাতীয়তার বাইরে পড়ে গেছে। বড় বাংলা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো অরাজক স্লোগান না; কিন্তু রাষ্ট্রের চেয়ে বড় ভাষা-স্মৃতি-সংস্কৃতির ধারণা। রাষ্ট্র সীমানা টানে; সাহিত্য পারাপারের ভাষা বানায়। রাষ্ট্র নাগরিক চেনে; সাহিত্য মানুষকে অন্যের কাহিনিতে ঢুকতে শেখায়।
এই কারণেই ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ মার্কা ধারণা বড় বাংলার ভিত্তি হতে পারে না। জাতীয় সংস্কৃতি অনেক সময় দরকারি রাজনৈতিক আত্মরক্ষার ভাষা দিয়েছে, বিশেষ করে উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদী অপমানের বিরুদ্ধে। কিন্তু একই সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতি সহজেই রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি, সংখ্যাগুরুর সংস্কৃতি, প্রমিত ভাষার সংস্কৃতি, রাজধানীর রুচি, মধ্যবিত্তের নৈতিকতা, পুরুষের দৃষ্টি হয়ে ওঠে। চ্যাটার্জি দেখিয়েছেন, উপনিবেশ-উত্তর জাতীয়তাবাদ বাইরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ও ভেতরের সাংস্কৃতিক-আত্মিক ক্ষেত্র আলাদা করে নিজের আধিপত্য গড়েছে (Chatterjee, 1993)। বাংলার ক্ষেত্রেও এই ফাঁদ আছে। বড় বাংলা সেই ফাঁদে পড়তে চায় না। এটি কোনো ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ বানাবার প্রকল্প না; বরং জাতীয় সংস্কৃতির ছাঁকনিতে বাদ পড়া ভাষা, স্মৃতি, গান, দেহ, শ্রম ও ভূখণ্ডকে জায়গা দেওয়ার চেষ্টা।
এই জায়গা থেকে ‘বড় বাংলা’ নামচিহ্নকে কেউ যদি ভারতীয় জাতিবাদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধী বাঙালি পরিচয়’ বানানোর প্রকল্প মনে করেন, সেটা অতিশয় কষ্টকল্পিত পাঠ। ভারতীয় রাষ্ট্রীয় জাতিবাদ, হিন্দুত্ববাদ, ভাষা-আধিপত্য, বাজারি কেন্দ্র—এসবের সমালোচনা অবশ্যই দরকার। কিন্তু সে সমালোচনা করতে গিয়ে যদি আমরা ‘বাঙালি’ পরিচয়কে নতুন পবিত্রতা দিই, তবে আমরা সেই একই ফাঁদে পড়ব। বড় বাংলা পরিচয় বানাতে চায় না; সম্বন্ধ বানাতে চায়। বড় বাংলা প্রতিরোধ করে, কিন্তু প্রতিরোধকে পরিচয়বাদে নামায় না। বড় বাংলা বলে: বাংলা ভাষা নিজের গরিমায় দাঁড়াক, কিন্তু অন্য ভাষাকে অপমান করে না; বাংলা নিজের স্মৃতি উদ্ধার করুক, কিন্তু অন্যের স্মৃতি মুছে না; বাংলা নিজের প্রান্তিক ভূখণ্ডের কথা বলুক, কিন্তু আরেক প্রান্তকে অন্ধকারে না ঠেলে।
আধুনিক জাতীয়তাবাদ ভয়ংকর জিনিস। এর হাত থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন। আমাদের সীমাবদ্ধতা আমাদের কাছে পরিষ্কার। আমরা এখনও পাহাড় বা সমতলের ‘আদিবাসী’ ও ছোট জাতিসত্তার সঙ্গে যথেষ্ট সম্বন্ধ গড়তে পারি নাই—সাঁওতাল, মুণ্ডা, কোচ, রাজবংশী, চাকমা, মার্মা, গারো, খাসি, হাজং, ওরাঁও—তালিকা দীর্ঘ। আমরা সিকিম, ভুটান, নেপাল, অসম, আরাকান, আফগানিস্তান, মিয়ানমার, উত্তর-পূর্ব ভারত, বঙ্গোপসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ বা প্রবাসী শ্রমের সাহিত্য-জগতের সঙ্গেও দৃঢ় সম্বন্ধ গড়তে পারি নাই। এই ব্যর্থতা ‘সহিত’ থেকে ‘সাহিত্য’ ধারণাটির গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রশ্ন করে। এই আত্মসমালোচনা আমাদের দরকার। যতক্ষণ না আমরা সম্বন্ধের পরিমণ্ডল আরও বড় করতে পারব, ততক্ষণ ‘বড় বাংলা’ দাবি অসম্পূর্ণ থাকবে।
কিন্তু অসম্পূর্ণ বলেই দাবি বাতিল হয় না। বরং অসম্পূর্ণতা স্বীকার করাই বড় বাংলার নৈতিক শুরু। বড় বাংলা কোনো সমাপ্ত পরিচয় না; চলমান কাজ। এটি কোনো পতাকা না; এক ধরনের আহ্বান। কোনো ভূখণ্ড দখলের মানচিত্র না; বরং ভাষা, স্মৃতি, গান, শ্রম, নদী, প্রান্ত, আখড়া, শহর, কৃষি, প্রবাস, অনুবাদ ও আগামির মিলিত জগৎ। বড় বাংলা সেই সাহিত্যিক দিগন্ত যেখানে বাদ পড়া মানুষের ভাষা, ভুলে যাওয়া ইতিহাস, ভাঙা ভূখণ্ড, ছিন্ন স্মৃতি এবং পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের নিচে চাপা পড়া জীবনেরা আবার কথা বলতে পারে।
অতএব ‘বড় বাংলা’ কোনো পরিচয়বাদী স্লোগান নয়। এটি পরিচয়ের দেয়াল থেকে ভাষাকে উদ্ধার করার চেষ্টা; সাহিত্যকে আবার ‘সহিত’—সকলের সঙ্গে বাস, সম্বন্ধ, পারাপার, দায় ও আনন্দের ময়দান—হিশাবে ভাবার চেষ্টা। বাংলা যদি বড় হয়, তবে তা রাষ্ট্র বড় করার মধ্যে না; ভাষার দরজা বড় করার মধ্যে। বাংলা যদি বড় হয়, তবে তা অন্য ভাষাকে ছোট করার মধ্যে না; অন্য ভাষার সঙ্গে সহবাসে। বাংলা যদি বড় হয়, তবে তা অতীতের অহংকারে না; স্মৃতি, দায়, আত্মসমালোচনা ও আগামির কল্পনায়। ‘প্রতিপক্ষ’ সেই বড় জায়গার পত্রিকা হতে চায়—যেখানে সাহিত্য দেয়াল তোলে না, দেয়াল ভাঙার সাধনা করে; যেখানে প্রান্ত নিজেকে কেন্দ্রের অনুমতিতে না, নিজের ভাষা ও কাহিনির জোরে প্রকাশ করে; যেখানে বাংলা নিজের মিশ্র, বহমান, রুহানি, দেহী ও রাজনৈতিক প্রাণ নিয়ে আগামির দিকে হাঁটে।
বইপত্রের হদিস:
Anderson, B. (2006). Imagined communities: Reflections on the origin and spread of nationalism (Rev. ed.). Verso.
Chatterjee, P. (1993). The nation and its fragments: Colonial and postcolonial histories. Princeton University Press.
Derrida, J. (1992). Acts of literature (D. Attridge, Ed.). Routledge.
Lefebvre, H. (1991). The production of space (D. Nicholson-Smith, Trans.). Blackwell.
Ricoeur, P. (1984). Time and narrative (Vol. 1; K. McLaughlin & D. Pellauer, Trans.). University of Chicago Press.
Ricoeur, P. (1985). Time and narrative (Vol. 2; K. McLaughlin & D. Pellauer, Trans.). University of Chicago Press.
Ricoeur, P. (1988). Time and narrative (Vol. 3; K. Blamey & D. Pellauer, Trans.). University of Chicago Press.
Ricoeur, P. (2004). Memory, history, forgetting (K. Blamey & D. Pellauer, Trans.). University of Chicago Press.
Wallerstein, I. (2004). World-systems analysis: An introduction. Duke University Press.

