
।। প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধ্যায় ।।
সময় যেমন তোমাকেও উলঙ্গ করে চাবকাবে একদিন
আমাকেও ছাড়বে না
এ আমাদের যৌথ নরক
যমদণ্ড হাতে নিয়ে প্রতিহার খুঁজছে শমন
সই করা বাকি শুধু
মূলভাষ লিখিতই আছে।
যৌথ নরক
আজকাল আর বাইরে থেকে ফিরতে হয় না
ভেতরেই থাকি
সুতোর সাথে সুতো বেঁধে সুতো বেঁধে
বিড়াল নখের অতিক্রম্য এক
চৌদিকের দেওয়াল বানিয়েছি
দেখতে চাই না আর
জানলা দিয়ে বাইরেও না
ক্রমশ গোটাও
তারপরেই খোলো
জড়িয়ে জড়িয়ে পাকে পাকে
গেঁথে বসুক সে সুতোর প্রহরা
আপাদমাথায় টান
চামড়াও দগদগে হল
প্রশ্বাস দীর্ঘায়িত হলে নিশ্বাস
অপেক্ষা করে
শ্বাস ধর্ম বিজ্ঞানের অধীন এক মায়াখেলা
এইরূপ মোহ শিক্ষা বিদ্যাক্রম
প্রাচীর ও প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক হাতযশ
গুরুত্ব ততোটুকুই
যতোটুকু মানব আবাস নিবাস কড়িকাঠ
তোমাদের ডাকাডাকি শুনতে পাচ্ছিলাম
ফেরি নাকি ছেড়ে দেবে ঘাট থেকে
সময় বহিয়া যায়
তোমার আসন শূন্য আজি
হে ডিগবাজী সাঙ্গ করো
কী দারুন মানিয়েছে তোমায়
কোথাও রক্তাল্পতার চিহ্ন নেই নখও মসৃণ
রাতারাতি সন্ধান পেয়ে গেছো
সেই বিচিত্র বৈভবের কাছাকাছি যাওয়ার
থেকে যেতে চাইছ ওখানেই
ঐশ্বর্যময়ী ম্যানিকুইন হয়ে
যাও তুমি ফ্ল্যাশগান পথে
আমি এই অন্ধ বন্ধ খন্দ দেওয়ালের ঘরে
দায়ভার নিয়ে কুঁজো হই
সময় যেমন তোমাকেও উলঙ্গ করে চাবকাবে একদিন
আমাকেও ছাড়বে না
এ আমাদের যৌথ নরক
যমদণ্ড হাতে নিয়ে প্রতিহার খুঁজছে শমন
সই করা বাকি শুধু
মূলভাষ লিখিতই আছে।
এসো
দরজাটা খোলা রেখো
যদি তোমার অতীত ফিরে এসে
দু’টো কথা বলতে চায়
তাকে যেন বলতে পারো সহজ নিঃশ্বাসে
এসো বসো
বলো কী বলতে চাও
দরজাটা খোলা রেখো
যদি তোমার উপদ্রুত বর্তমান নখ গুটিয়ে রেখে
মাথা নিচু করে বসে
একটু জিরোতে চায়
তার পাশে যেন নীরব জাগতে পারে
তোমার সমবেদন
দরজাটা খোলা রেখো
যেন তোমার আততায়ী ব্যর্থ
ফিরে না যায়
উদার বুকে যেন বলে যেতে পারো
এসো
ডায়রি যাপন
এক পা পাথরে আর
এক পা বাতাসে রেখে উঠতে হবে
বড়জোর খামচে ধরতে পারো তুমি
শূন্যতা
আর কোথাও কিছু নেই আর কোথাও
কিছু নেই
নেমে আসার সময় অবধি
বালি ঝরছিল
ফিরে আসার দিনক্ষণে পায়ে জলটান
আর যা যা ছিল
তাকে স্মৃতিকাতরতা বলে হয়ত ভুল বোঝে
অ্যালবামের রোমন্থন
এমন যাওয়া কেন
বাড়ি মনে রাখে না, চৌকাঠ, স্বজন, স্বদেশ
সবাই শুধু হাত নাড়ে আর হাতগুলো
ছিঁড়ে পড়ে যায়
জীবনের আর্তনাদ পেছন থেকে ডাকে
নোঙর ভাঙে শেকড় ওপড়ায়
তবু কোথাও কোনও চিঠি লেখার ব্যস্ততা নেই
একান্ত উচ্চারণ ছিল কিছু নাকি
শরীরের এমন কোনও ঘ্রাণ
যা তোমাকে ছেলেবেলার দিকে নিয়ে যায়
মরুভূমির কাঁটাঝোপ আর বাগানের ফুলগাছ
একসাথে তোমার ছায়ায় বেড়ে ওঠে
আর তুমি অহেতুক কেঁপে ওঠো
কেঁপে ওঠো স্থিরতা ও অস্থিরতার মধ্যবর্তী দোলনায়
কেঁপে ওঠো বিস্মরণের জ্বরে
সিঁড়ির তিন ধাপ দূরত্বে তার সাথে দাঁড়িয়েছিলে
উঁচু নিচুর সমতা রক্ষার বাহন হল ঠোঁট
যেন গলে গিয়েই জমাট বাঁধল লাভা
যেন স্রোত খুঁজে পেলো উৎস
যা যা বলার ছিল সব বোঝা হয়ে গেল
না বলেই
আর এই নীরব বাঙ্ময়তাকেই কবিতা বলে চিনলে তুমি
যারা শুধুই ভালবাসার কথা বলে চলে
তাদের শ্রদ্ধা করেও সন্দেহ করতে ছাড়ো না তুমি
নির্বিকার প্রেম ব্যাপারটাই স্বাদগন্ধহীন
বরং দাঁতেনখে অধিগ্রহণ ও প্রতিরোধের মধ্যেই
রয়ে গেছে আদি-অন্তের ইতিহাস
তামাদি দলিল থেকে আজকের কলম-চালু দস্তাবেজ
মানুষের জান্তব বেঁচে থাকার কলা ও কৌশল
লিপিবদ্ধ করে চলে শুধু
দিনশেষে আক্রমণগুলোই মনে রাখি আমরা
ক্ষমাগুলো ভুলে যাই
জীবন যখন বসন্ত পেরোয়
তখন লাফিয়ে লাফিয়ে পেরিয়ে যায় দিন রাত
কত সহজেই হাত ধরেছিল কেউ
তীব্র সে টানে কত উষ্ণতা ছিল
শিশিরের থেকে ভিজে যাওয়া শিখে নিয়েছিল শরীর
পায়ের আঙুলের ভরে এক পাক ঘুরে গিয়েছিল পৃথিবী
চোরাবালির ভেতর থেকে উঠে এসেছিল হাত
সযতনে পার করে দিয়েছিল সব চৌকাঠ
তোমার স্পর্ধাও ছিল বশীভূত
আলংকারিক স্তব্ধতায় কিছুটা নতজানু
কিছুটা শ্রান্ত এলানো
যেন ওঁ মধু বাতা ঋতায়তে স্তব পাঠেই মরু ও মড়কের দিনগুলো কেটে যাবে
যেন তোরঙ্গে গচ্ছিত আছে গ্রুপ ফটোগ্রাফ
কাজেই সব একসাথেই থাকবে
খাবে মাখবে সর হলুদ
অলক্ষ্যের হাসিটা তখনও কেউ শুনতে পায়নি
তুমিও না
ফলে ছুরি আর আগুনের যৌথ অনাক্রমণ চুক্তির
আড়ালে আবডালে গজিয়ে ওঠা
উইপোকাদের বিস্তৃত সাম্রাজ্য বাসনা সম্পর্কে
কোনও অভিজ্ঞতাই ছিলনা তোমার
আসলেই তোমাকে ঠকিয়েছে
শান্তি আর আশাবাদ
তোমাকে ঠকিয়েছে
সংঘ আবদ্ধ মানুষ আর তার
সীমাহীন লোভ
এখন এ রিক্ত প্রান্তরে
তোমাকে যতো বেমানানই লাগুক না কেন
এটাই তোমার আবাস নিবাস
অক্ষম চাষাবাদ
নিদ্রা ও দুঃস্বপ্নের রেতঃপাত নিয়ে
গড়ে ওঠা নক্ষত্রহীন রাতের বিফল সংগম
আপাতত এটাই তোমার পচন ও পতনের
ডায়রী যাপন
তোমার হতশ্বাস অপেক্ষার নরক সংগীত
তোমার ফলিত বর্তমান আর
গলিত ভবিষ্যত
মার্জানে সাত্রোপিকে মনে রেখে
মার্জিনের বাইরে থেকে
একটুকরো আলোর মতো অন্ধকার এসে
বিষাদ মৃত্যুর হাত ছুঁলো
আর মাথা নিচু করে মেয়েটা চলে গেল চৌকাঠ পেরিয়ে
ফেলে আসা মল্লিকা বাগানে তার
শেষ নিঃশ্বাস
উথাল-পাতাল গানের অন্তরায় বিভোর
যেখানে ভালোবেসেছিলাম আর ভালোবাসি
আসলে একটা সপ্তবর্ণা সেতু
উচ্ছল পারাপারে ঝামরে ওঠে নিষেধহীন রঙ
তবু তার সন্নিহিত শোক
যেন যমজ যাপন
যেন রেখাচিত্রের পৃথিবী পেরিয়ে মনখারাপের বিকেল
শুধু একটা জুঁই ফুলের শুভ্রতায় নিথর
অ্যাতো অ্যাতো অসূয়া
আর লোভ আর হাহাকার বুকে নিয়ে
তার এই উদাসীন চলে যাওয়ার দিকে
অপলক দেখি
বমির মতো বলাবলি
কে কোথায় কোন কথা বলে
কে কখন কোন দিকে যায়
পথ জানে হাওয়া জানে কিছু
তোমার আমার অগোচর
আপাদমাথা সন্দেহ আর প্যারানুইয়া আক্রান্ত তাই আর বিশ্বাসযোগ্য নয় কিছুই এমন কী সমস্ত সম্পর্কের মধ্যেও বিষজল যেমন বলেছিলাম সমস্ত বিশ্বাসের আগে অ বসিয়ে যাওয়া নিখোঁজ কম্পোজিটর কেন যে এখনও বেঁচে আছি কীভাবে যে এতোদিনেও ন্যাংটো হয়ে ঘুরিনি এসপ্ল্যানেডে অথবা ডিরেক্ট ক্ষুর চালাই নি গলায় হে কনফিউজড বাপঠাকুর্দা মরে হেজে যাওয়া ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট অ্যালবাম তোমাদের সামনে পেলে আরেকবার খিস্তি দিতাম প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে বমন বমন বমন
ঈষৎ হলুদ ডিম ভাসে এমন ভাবে ভাসে যার মায়ামুগ্ধ বিমূর্ত মুকুর আর অবয়ব ধরে না যেন সে মহাশূন্যতার অপরাপর এক ভাসমান প্রিয়তায় আক্রান্ত ওগো ও বাঁশিওয়ালা তোমার সুরের ধারা ঝরে যেন ড্রোনবাহিত
মড়ক অথবা প্রোগ্রামড কিল আর এ পণ্যখচ্চরবাহী
পৃথিবীর মাটি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে পড়ে থাকে শতধা চ্ছিন্ন সারি শিশুদের লাশ আর গুনে চলা এনজিও প্রোজেক্ট তার খয়রাত বিবরন লিপি
তীব্র যৌনতা বোধ আছে বলেই হয়ত এখনও স্থবির হয়ে যাই নি গুঙরিয়ে গুঙরিয়ে বমি করতে পারি বলেই হয়ত বোবা নই যেন রাতভোর এই ঘুরন্ত আওয়াজ ছাড়া আর কোনও সদর্থক শব্দ নেই গলা টেপা আর্তনাদ ছাড়া গান নেই কোনও মেনে নাও বেমালুম হেরে গেছো হাতের পতাকা নিয়ে এতো সন্দেহ পাশের লোকটা কে ও কেন তারা বাম পাশে নেই কেন ডান পাশে অচেনা স্বজন কেন কেন পথ বলতে অভিধান খোঁজা
ক্রমশ এক অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারের দিকে পিছলে যাচ্ছে ছায়া সাথে সাথে শরীরগুলোও নিক্ষিপ্ত হচ্ছে নিকষ গর্ভে যেখানে শুধুই টক্সিক তরল ফুটন্ত পারদ যেখান থেকে কোনও জাগরন হবে না নিষ্কাশিত হবে না কুসুম না ভ্রুণ না পরাগ অথচ চারপাশ থেকে এগিয়ে আসছে দেওয়াল ঘিরে ফেলছে ইঁট ও কংক্রিট চেপে ধরছে উত্তর দক্ষিণ পূর্ব ও পশ্চিম এবং ঊর্ধ এবং অধঃ সীতার পাতাল
স্নায়ুর কাঁটা চাবুকে যত না বিক্ষত করেছ নিজেকে তার অধিক আরক্ত সম্পর্কগুলো যা মায়োপিক চোখে তুমি দেখতেও পাওনি এবং বুঝতেও চাওনি যে এইভাবে বেশি দিন যায় না যেতে পারে না কেননা সব গরলই ফুটে বেরোয় চামড়ায় সব আত্মহত্যাই আসলে হত্যা আর সব হত্যা আসলেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া সতর্ক বিড়ালচরণ…
প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম ১৯৬০, নিবাস, পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, ভবানীপুর। স্বাক্ষর। সম্পাদিত পত্রিকা – শব্দ, ক্যানেস্তারা। প্রকাশিত কবিতার বই – অব্যয় সংহিতা (ধানসিড়ি) ‘ক্যাজুয়াল স্বৈরতন্ত্রী (অক্ষরযাত্রা)। ‘চালচিত্র’ (অক্ষর যাত্রা)

