আজ শনিবার, ৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিলায়েতই ফকিহ: ইরানের বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র ও সামরিক কাঠামোর তাত্ত্বিক ভিত্তি

ইরানের বাস্তবতা, প্রতিরোধ, দেশটির সামনে সাম্রাজ্যবাদী হুমকি, হামলা ও পালটা প্রত্যাঘাত এবং সাফল্য অর্জনের বিষয়গুলির ভিতর প্রবেশের আগে উল্লেখ কয়রা দরকার ১৭৫৭-এর পলাশীর সফল চক্রান্ত ও বাংলা সুবার বাণিজ্যিক কর্তৃত্ব থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্তরণের সূচনার কথা। এই প্রথম ইওরোপিয় কর্পোরেট কোম্পানিকে এশিয় বাণিজ্য করার জন্য ইওরোপ থেকে রূপো বয়ে আনতে হল না। পলাশীপূর্ব সময় বাংলা ছিল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অঞ্চল, পলাশীর বছর থেকে ইওরোপ হয়েগেল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অঞ্চল। বিশ্বের উর্বরতম অঞ্চলের মালিক হয়ে বসল ব্রিটিশ কর্পোরেট কোম্পানি।  এই ঘটনার পরের কয়েক দশকেই ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব তার পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। পলাশীর পর ভারত থেকে ইংল্যান্ডে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ (লুট, রাজস্ব, বাণিজ্য মুনাফা) প্রবাহিত হয়েছিল, তা ব্রিটেন এবং পরে সারা ইওরোপে শিল্পায়নের কাজে গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি সঞ্চয়ের উৎস হিসেবে কাজ করবে। উপনিবেশের প্রথম ৫ দশকে বাংলার রাজকোষ, কৃষি রাজস্ব, এবং স্থানীয় শিল্প (বিশেষ করে বস্ত্রশিল্প) ধ্বংস করে, বাজার দখল নিয়ে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল সরবরাহ ও উপনিবেশে পণ্যের বাজার নিশ্চিত করা হয়।  প্রক্রিয়াটি ইউরোপে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতানির্ভর জাতিরাষ্ট্রের উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ইউরোপের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির (১৬৪৮) পরবর্তীকালের সার্বভৌম, কেন্দ্রীয় শাসনাধীনে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা বিকশিত হয়েছিল, সেই ধারণার ভিত্তিতেই ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো নিজেদের সংগঠিত করে। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের শিল্পোৎপাদিত পণ্য ও সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে নিজেদের আইন, ভাষা, প্রশাসনিক কাঠামো জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়। এই কাঠামোটি ছিল সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত— সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল উপনিবেশের স্থানীয় জনগণের হাতে নয়, বরং সাম্রাজ্যের রাজধানীতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো দুর্বল হয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে আমেরিকায় পুঁজির কেন্দ্রীভবন ঘটতে থাকে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে। ব্রেটন উডস ব্যবস্থা আর নিউ ডিল এবং১৯৭৪ থেকে পেট্রোডলারের মাধ্যমে ডলার বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রায় পরিণত হল। এতদিন পশ্চিম ইওরোপে এশিয়া আফ্রিকার বিপুল সম্পদ সংহত হচ্ছিল পুঁজি রূপে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ঔপনিবেশিকতার সূচনা ঘটল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যমে। যদিও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক দখলবাদ (ঔপনিবেশিকতা) শেষ হয়েছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর মাধ্যমে পুঁজির প্রবাহ ও নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা ওয়াশিংটন-ভিত্তিক কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন তারা ইউরোপীয় মডেলের ওয়েস্টফালিয়ান সার্বভৌমত্ব ও কেন্দ্রীভূত জাতিরাষ্ট্রের আদলেই নিজেদের গঠন করে। কিন্তু এই কাঠামো অনেক সময় স্থানীয় ভৌগোলিক, জাতিগত, এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের সুবিধামতো সীমানা এঁকে দিয়েছিল (যেমন: সাইকস-পিকো চুক্তি), যার ফলে স্বাধীনতার পর বহু রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, জাতিগত দ্বন্দ্ব এবং শোষণমূলক শাসনকাঠামোর সৃষ্টি হয়। এই কেন্দ্রীভূত কাঠামোতে প্রায়শই উপনিবেশিক লুঠ ও গণহত্যার চোখ ধাঁধানো সাফল্য-কে ইন্ধন দেওয়া আদর্শগত কাঠামো (যেমন: জাতি-ভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ, শিল্প-সামরিক জটিলতা) উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায়ও প্রতিফলিত হয়েছে। অনেক নতুন রাষ্ট্র নিজেদের অভিজাত শ্রেণির স্বার্থে সেই একই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো ধরে রাখে।

উপনিবেশবিরোধী চিন্তাবিদদের মতে, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে যে রাষ্ট্রের কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত, কর্তৃত্ববাদী এবং সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। ঔপনিবেশিক শক্তি (ব্রিটিশ, ফরাসি প্রভৃতি) যখন এই অঞ্চল শাসন করত, তখন তারা স্থানীয় গণতান্ত্রিক বা অংশগ্রহণমূলক কাঠামো ধ্বংস করে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে তোলে। এই কাঠামোর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ। দেশগুলো যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব সেই একই কাঠামো দখল করে নেয়। ওসুনটোকুনের যুক্তি হল, এই শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকে দখল করাই হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য। এর ফলে রাজনীতি আর জনসেবার প্রতিযোগিতা থাকে না; বরং সাম্রাজ্যবাদের প্ররোচনায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ আর ক্ষমতার উৎস দখলের লড়াইয়ে পরিণত হয়। যেহেতু কেন্দ্রে বসেই সব সিদ্ধান্ত হয় এবং সম্পদ বিতরণ হয়, তাই বিভিন্ন অঞ্চল বা নৃগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখলকে নিজেদের বেঁচে থাকার শর্ত হিসেবে দেখে সামারজ্যবাদের পুতুল হিসেবে। এতে গৃহযুদ্ধ, অভ্যুত্থান এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটে। স্বাধীনতা আন্দোলন যা ধ্বংস করতে চেয়েছিল—শোষণমূলক, অস্বচ্ছ ও জবরদস্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা— সাম্রাজ্যবাদীদের অঙ্গুলিহেলনে জাতীয়তাবাদীরা সে সরকার দখল করেই নিজেদের ক্ষমতায় বসায়।

১৯৫৩-র ইরান থেকে সদ্য ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহে ভেনিজুয়েলা এবং তার মাঝখানের একের পর এক আফ্রিকিয়, এশিয়, আমেরিকিয় দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের প্ররোচনায় ক্ষমতা পরিবর্তন ঘটিয়ে পুতুল সরকার বসেছে। এটাই কেন্দ্রীভূত জাতিরাষ্ট্র কাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা। পিটার উডওয়ার্ড একে Structural Dysfunction, কাঠামোগত ব্যর্থতা বলেছেন। জাতিরাষ্ট্রের চারটে প্রধান দুর্বলতা উল্লেখ করেছেন তিনি। এগুলি হল, ১। ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ – রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্ত আর সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে একটাই কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ। নাইজেরিয়ার বিশ্লেষক ওসুনটোকুন এবং অন্যান্য উপনিবেশ-উত্তর চিন্তাবিদদের মতে, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে যে রাষ্ট্রের কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত, কর্তৃত্ববাদী এবং সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। ঔপনিবেশিক শক্তি (ব্রিটিশ, ফরাসি প্রভৃতি) যখন এই অঞ্চল শাসন করত, তখন তারা স্থানীয় গণতান্ত্রিক বা অংশগ্রহণমূলক কাঠামো ধ্বংস করে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে তোলে। এই কাঠামোর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ। দেশগুলো যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব সেই একই কাঠামো দখল করে নেয়। ২। ব্যক্তিনির্ভরতা – প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপ্রধানকে সরিয়ে দিলেই পুরো কাঠামো ধসে পড়ে; ৩। এককেন্দ্রিক আনুগত্য – সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের প্রতি নয়, বরং শাসকের প্রতি অনুগত থাকে। ফলে শাসক বদল মানেই আনুগত্য বদল; ৪। বিকল্প কেন্দ্রের অভাব – স্থানীয় বা আঞ্চলিক স্তরে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। ফলে কেন্দ্রে আঘাত এলেই গোটা ব্যবস্থা দিশাহারা হয়ে পড়ে। একে সামগ্রিকভাবে Decapitation Syndrome বলা যেতে পারে—অর্থাৎ, রাষ্ট্রপ্রধান বা শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলেই গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো শত্রুপক্ষের হাতে চলে আসে।

কিন্তু অবাক উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী বিপরীত কাণ্ড দেখলাম ২০২৬-এর ইরানে। যে ইরান ৭৫ বছর আগে ব্রিটিশ সামরিক ক্যুদেতায় দখল হয়েছিল। ইজরায়েল-আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার প্রথম দিনেই ৪০ জন এবং তারপর ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্র আর সমর নেতৃত্ব খুন হয়েছেন। অথচ ইরান রাষ্ট্রের পতন হয় না; বরং অবাক বিষ্ময়ে দেখি, সে কুঁকড়ে না গিয়ে, পাল্টা আঘাতে ইজরায়েল, ইজরায়েল আমেরিকার বন্ধু আরব প্রতিবেশী দেশগুলো এবং সর্বোপরি আমেরিকাকে ব্যতিব্যস্ত করে যুদ্ধের রাশ নিজের হাতে তুলে নেয়। এই প্রবন্ধে আমি বুঝতে চাইব, কোন তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আর কোন বাধ্যবাধকতায় ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র, জাতিরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কাঠামোর বাইরে বেরোতে পারল এবং এই রাষ্ট্র ক্ষমতা নির্ভর করে সে তার সমর কাঠামোরও ভোলবদল ঘটানো নিশ্চিত করল। এই শিক্ষা আগামী দিনে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রায়োগিক হাতিয়ার হতে পারে। এটা যদিও আজকে প্রবন্ধের আলোচনার বিষয় নয়, কিন্তু এই প্রশ্নটাও তুলে দেওয়া গেল। 

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রকাঠামো বোঝার এই কাজে সহায়ক হয়েছে ইসলামি বিপ্লবের পরের আমলে বিকশিত বিলায়েতই ফকিহ (ولایت فقیه, Velayat-e Faqeeh) বা ইসলামী আইনবিদের শাসন তত্ত্ব। ১৯৭৯-এ ইসলামী বিপ্লবের পর এই তত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা গত চার দশকে  অনন্য কাঠামো তৈরি করেছে – যেখানে আমরা  একই সাথে কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব এবং বিকেন্দ্রীভূত কাজকর্মের সমন্বয় দেখি। ২০২৫-এর ১২ দিনের যুদ্ধ এবং আরও বড়ভাবে ২০২৬এর প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতে ইরানের এক ঝাঁক শীর্ষ নেতৃত্ব শহিদ হওয়ার পরেও, তার রাষ্ট্র ও সামরিক কাঠামো টিকে থাকার যে বিরল ক্ষমতা দেখিয়েছে, আমি মনে করছি, তার মূল ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে এই বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বতে। এবং আরও বড় কথা হল, এই তত্ত্বকে ইরানী নেতৃত্ব সময় এবং অভিজ্ঞতার আলোয় বদলেছেন, নিজেদের রাষ্ট্র, সমর ক্ষমতাকে ঢেলে সাজিয়ে  বিশ্ব ইতিহাসে দুটি অন্যতম ক্ষমতাশালী সমরসজ্জার দেশ ইজরায়েল আর আমেরিকার মুখোমুখি হয়েছেন আপন বাহুবলেই এবং আপন সীমাবদ্ধতাকে কলন করেই। 

আমি মূলত Dr. Hamid Algar-এর অনুবাদে Institute for the compilation and Publication of Imam Khomeini’s works-এর প্রকাশনায় আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি রচিত ‘Islamic Government: Governance of the Jurist: Velayat-e Faqeeh’ (২০১৭) গ্রন্থটিকে নির্ভর করে বোঝার চেষ্টা করেছি, ২০২৫-এর ইজরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের মিসাইল যুদ্ধ এবং ২০২৬-এ রমজান মাসে ইজরায়েল-আমেরিকার একতরফা চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের প্রথম দিনেই আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির উত্তরাধিকারী আয়াতোল্লাহ সৈয়দ আলি খামেনেই এবং সমর বাহিনীর থাকবন্দীর ওপরের দিকে প্রায় ৪০ রাষ্ট্র পরিচালকের মৃত্যু, পরে লারিজানি-সহ বেশ কয়েজন শীর্ষস্থানীয় সমর নেতার হত্যা সত্ত্বেও কীভাবে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র শুধু টিকেই থাকল না বরং ইজরায়েল এবং আমেরিকাকে পিছু হঠিয়ে তাদের রণনীতি নতুন করে নিরীক্ষণ করতে বাধ্য করল। সব থেকে বড় কথা আজ, ২০ মার্চ যখন  আমি এই প্রবন্ধটা লিখছি, তখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছে ইজরায়েলের বিলয় নিশ্চিত, একই সঙ্গে বিশ্ব মোড়ল হিসেবে আমেরিকার পতন নিশ্চিত করে গত ৩০০ বছরের এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা থেকে ইওরোপে সম্পদ প্রবাহক্রিয়া হয়ত পালটে দেবার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

১৭৫৭-র পলাশী চক্রান্তের পর এবং ১৭৬৫ সালের দেওয়ানি অধিকার অর্জনের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় যে শাসন কাঠামো চালু করে, যার উত্তরাধিকার আমরা লক্ষ্য করি বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোয়, সেটা ছিল মূলত সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়, বাজার দখল, বিশিল্পায়ন, ব্যবসায় একচেটিয়া কাঠামো প্রয়োগ, কারিগর চাষী এবং বিক্রেতাদের উদ্বৃত্ত লুঠ করার জন্য কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্র এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালের আগে থেকেই যে উপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামো নির্মাণের উদ্যম নেয় সেটা স্পষ্টভাবে বলেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায় দ্য ব্ল্যাক হোল অব এম্পায়ার, হিস্টোরি অব আ গ্লোবাল প্রাক্টিশ অব পাওয়ার বইতে। কিন্তু পলাশীর পর মুঘল বাংলা সুবায় ক্রুসেড যুদ্ধের উত্তরাধিকার বহন করা পশ্চিমের উপনিবেশিক রাষ্ট্র নির্মাণ প্রকল্প স্পষ্ট হয় লুক স্ক্রাফটনের রিফ্লেকশনস দ্য গভর্মেন্ট অব হিন্দোস্তান, হেনরি ভ্যান্সিটার্টের আ ন্যারেটিভ অব দ্য ট্রান্সজাকশনস ইন বেঙ্গল, ১৭৬০-১৭৬৪, উইলিয়াম বোল্টসএর কনসিডারেশনস অন ইন্ডিয়ান এফেয়ার্স এবং হ্যারি ভেরেলস্টের আ ভিউ অব দ্য রাইজ, প্রোগ্রেস, এন্ড প্রেজেন্টস স্টেট অব ইংলিশ গভর্মেন্ট ইন বেঙ্গল সূত্রে। আমরা দেখি কিভাবে বাংলায় সম্পদ লুঠ, ব্যাপক বিশিল্পায়ন, তাঁতি, চাষী এবং কারিগরদের ওপর সরকার থেকে নামিয়ে আনা অত্যাচার এবং ১৭৭০এর গণহত্যা এবং ১৭৯৩-তে চালু হওয়া চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, অমিয় কুমার বাগচী ‘কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ইকনম’ বইতে যে উপনিবেশিক সময় এবং তাদের নেওয়া বলবেন যে বিশ্বের প্রথম স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসি যা জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোকে সুসংহত করে।

এই জাতিরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উদ্দেশ্য ছিল, কার্ল মার্ক্স যাকে আদিম পুঁজি সঞ্চয় বলছেন, অর্থাৎ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদ্ভবের আগের পর্যায়ে জোর করে উৎপাদনের উপায় (যেমন জমি) থেকে উৎপাদককে (কৃষক, কারিগর, পশুচারক) বিচ্ছিন্ন করে শ্রমশক্তিকে পণ্যে পরিণত করে ইওরোপ, এশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকাজুড়ে ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন এবং এনক্লোজার আন্দোলনের মাধ্যমে সম্পদ কুক্ষিগত করে তাকে পুঁজিতে রূপান্তরিত করার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে কাঠামোবদ্ধ করা। যার একটা ছোট্ট উদাহরণ আমরা পাচ্ছি Peter Scriver and Vikramaditya Prakash-এর সম্পাদনায় ‘Colonial Modernities: Building, Dwelling and Architecture in British India and Ceylon-এ Swati Chattopadhyay’-এর The Other Face of Primitive Accumulation: The Garden House in British Colonial Bengal প্রবন্ধে। মার্কস, ক্যাপিট্যালের প্রথম পর্বের ১৯০৬-এর নিউইয়র্ক মডার্ন লাইব্রেরি সংস্করণের ৭৮৬, সূত্রে স্বাতী লিখছেন, মার্ক্স আদিম সঞ্চয়-এর ধারণাকে উৎপাদককে উৎপাদনের উপায় থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন, এবং কৃষকদের [এবং কারিগর বিক্রেতাদের] সম্পত্তিচ্যুতির ইতিহাস প্রসঙ্গে মার্কস বলছেন, এটা বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে এবং ভিন্ন ভিন্ন কালপর্বে, ভিন্ন ভিন্ন ক্রমপর্যায়ে এবং ধারায় এর ভিন্ন ভিন্ন ধাপ অতিক্রম করেছে। এর ধ্রুপদী রূপ দেখি ইংল্যান্ডে। পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে, নির্মম সন্ত্রাসের আবহে আবাদি জমিগুলোকে বেড়া দিয়ে ঘিরে চারণভূমিতে রূপান্তরিত করা হয় এবং বাস্তুচ্যুত কৃষকদের মজুরি-শ্রমিক হিসেবে শিল্পনগরীগুলোতে পাড়ি জমাতে বাধ্য করা হয়। স্কটল্যান্ডে ‘ডাচেস অফ সাদারল্যান্ড’-এর উচ্ছেদ অভিযানের উদাহরণ তুলে ধরে মার্কস দেখিয়েছেন যে, কীভাবে আদিম সঞ্চয়ের প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির ‘প্রদর্শনমূলক ভোগক্রিয়ায়’ পর্যবসিত হয়। আমরা বাংলা সূত্রে দেখব পলাশীর পর লুঠ করা উদ্বৃত্তের ছিটেফোটা বিলিয়ে নতুন সময়ের জমিদার আর উপনিবেশকে রক্ষা করা ভদ্রবিত্তের আনুগত্য নিশ্চিত করে কোলাবরেটর শাসকশ্রেণী তৈরি করা, যারা তার হয়ে লুঠ, বিশিল্পায়ন, কারিগরদের ওপর অত্যাচার করে তাদের উচ্ছেদ করবেন এবং যে অত্যাচার আর লুঠ আদতে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের নামে গণহত্যার জন্ম দেবে। দ্বিতীয়ত লবন, নৌকা তৈরি, কাপড় বোনা, সোরা তৈরি, আফিম চাষ ইত্যাদি উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থার ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে নিয়মিত উদ্বৃত্ত এবং ভূমি রাজস্ব আহরণ করে কৃষক, কারিগর এবং জমি থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের   কাঠামো তৈরি করে ইওরোপে পুঁজি সঞ্চয় করবে।

এই কাঠামো ছিল সম্পূর্ণ এককেন্দ্রিক এবং লুঠেরা। এর বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে ওঠে ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনে (১৭৬০) উপনিবেশের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ হওয়া চাষী কারিগর বিক্রেতা শোষিত জোট তৈরি হয় ধর্মীয় নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে। এরপর ফরায়েজি আন্দোলন (১৮১২-১৯০৫) এই ধারাকে আরও সামনে নিয়ে যায়। জমিদার ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শোষিত কৃষকদের এককভাবে সংগঠিত করেছিল। এই আন্দোলনগুলোর ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতাই আমাদের বলে দেয়, কেন  সার্বিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রদর্শনের প্রয়োজন ছিল।

আমরা দেখব কীভাবে প্রায় ৪০ বছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ইরানী ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনে প্রথমে আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খেমেইনি এবং তাঁর উত্তরাধিকারী আয়াতোল্লাহ সৈয়দ আলি খামেনেই জাতিরাষ্ট্রের মৌলিক কেন্দ্রীয় কাঠামোকে অনেকটাই পরিবর্তিত করে প্রশাসনিক এবং সামরিক কাঠামোয় বিকেন্দ্রিকরণের শুধু ধারণা নয়, তাকে প্রয়োগের দিকে এমনভাবে নিয়ে গিয়েছেন, যখন ১৮ মার্চে এই লেখার মকশ তৈরি করছি আর ২০ মার্চ এই লেখার ফাইনাল টাচ দিচ্ছি, সে সময় পর্যন্ত বিশ্ব ইতিহাসের দুই প্রবল শক্তিওয়ালা সেটলার কলোনি, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগকে অকার্যকর করে তাদের পিছিয়ে যেতে শুধু বাধ্য করছে না, ইরানের ওপর একতরফা যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে নিজেদের দেশে বিপদে পড়া আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া যুদ্ধবন্ধের ডাক বাতিল করে বলছে, যুদ্ধ শুরু করেছে ইজরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু যুদ্ধ শেষ হবে ইরানের শর্তে।

বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্ব মূলত শিয়া ইসনা আশারিয়া (বারো ইমাম) সম্প্রদায়ের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। এই মতবাদ অনুসারে, দ্বাদশ ইমাম মাহদির গায়েবত (অদৃশ্য অবস্থা) চলাকালে ইসলামী সমাজের নেতৃত্ব দিতে যোগ্য ইসলামী আইনবিদ (ফকিহ) প্রয়োজন। তিনি ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি ১৯৭০-এ ইরাকের নাজাফ শহরে নির্বাসনে থাকাকালে বেশ কয়েকটা ধারাবাহিক বক্তৃতায় এই তত্ত্বকে সুসংহত রূপ দেন। ইসলামিক গভর্নমেন্ট– গভর্ন্যান্স অফ দ্য জুরিস্ট গ্রন্থে তিনি বলেন শুধু ধর্মীয় আইনে প্রশিক্ষিত পণ্ডিতরাই রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য।

বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বের দুটি প্রধান ব্যাখ্যা পাচ্ছি ১। সীমিত কর্তৃত্ব বা লিমিটেড গার্ডিয়ানশিপ। ফকিহের কর্তৃত্ব শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয়, সম্পত্তি সংরক্ষণ, বিচারিক কার্যক্রম এবং যেসব বিষয়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি দায়ী নয়, সেসব ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে । আর ২। পরম কর্তৃত্ব বা অ্যাবসলুট গার্ডিয়ানশিপ। খোমেইনীর প্রবর্তিত এই ব্যাখ্যা অনুসারে, ফকিহের কর্তৃত্ব নবী ও ইমামের যাবতীয় দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত করে, যার মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনাও পড়ে। ইরানের সংবিধানের ভিত্তি এই ব্যাখ্যা। 

সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি

১৯৭৯ সালের ইরানের সংবিধানে বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। সংবিধানের ৫৭ ও ১১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা (রাহবার) রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি সরকারের তিনটি শাখা (নির্বাহী, আইনসভা, বিচার বিভাগ) তত্ত্বাবধান করেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করেন। ১৯৮৯-এর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নেতার পদটি আরও শক্তিশালী করা হয়। আগের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় পর্যায়ের (মারজা-এ-তাকলিদ) হতে হবে এমন শর্তটি বাতিল করা হয় বলেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের পক্ষে খোমেইনির উত্তরসূরি হওয়ার পথ খুলে দেয় ।

বিলায়েতই ফকিহ ও বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ, বহুস্তরীয় প্রতিষ্ঠান কাঠামো

বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একে ভিত্তি করে ইরানী তাত্ত্বিকেরা বহুস্তরীয় ও জটিল প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছেন, যে পদ্ধতি বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইরান’স লুক ইস্ট পলিসি বইয়ের লেখক মেহরান কামরাভা বলছেন ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোতে সর্বোচ্চ নেতা কেন্দ্রীয় সংগঠক নীতি হিসেবে কাজ করেন, যার চারপাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আবর্তিত হয় ।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান:

ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC)
বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী
নিয়মিত সেনাবাহিনী (আর্তেশ)
গোয়েন্দা সংস্থা (MOIS)

২. তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠান:

গার্ডিয়ান কাউন্সিল (শূরা-এ-নেগাহবান)
এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিল (মাজমা-এ-তাশখিস-এ-মাসলাহাত-এ-নেজাম)
বিশেষজ্ঞ পরিষদ (মাজলেস-এ-খোবরেগান)

৩. সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান:

জুমার নামাজের ইমামগণ
কওম-কেন্দ্রিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
ধর্মযাজকদের জন্য বিশেষ আদালত
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতার

প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও আন্তঃসম্পর্ক

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষত্ব হলো এরা বাইরের চাপ ও প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে কেবল বিলায়েতই ফকিহের কাছে জবাবদিহি করে। এরা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতির বাইরে বা স্বাধীনভাবে কাজ করে। গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ১২ সদস্যের অর্ধেক সরাসরি নির্বাচিত হন সর্বোচ্চ নেতার হাতে এবং বাকি অর্ধেক নির্বাচিত হন প্রধান বিচারপতি সূত্রে যিনি নিজেও সর্বোচ্চ নেতার নিযুক্ত। ফলে পরোক্ষভাবে সর্বোচ্চ নেতা এই কাউন্সিলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন ।

একইভাবে, এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সব সদস্যকে সর্বোচ্চ নেতা নিযুক্ত করেন। এই কাউন্সিল মূলত গার্ডিয়ান কাউন্সিল ও পার্লামেন্টের মধ্যে আইনগত দ্বন্দ্ব নিরসন করে এবং সর্বোচ্চ নেতাকে নীতি নির্ধারণে পরামর্শ দেয়। 

সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বের সীমা ও অসীমতা

তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ নেতা কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করেন—জনগণ, সংসদ বা এমনকি বিশেষজ্ঞ পরিষদের কাছেও নয়। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ নেতাকে অপসারণের ক্ষমতা রাখলেও, বাস্তবে এই পরিষদ সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে কখনোই ব্যবস্থা নেয়নি এবং মূলত   আনুষ্ঠানিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে ।

তবে এই কর্তৃত্বের অসীমতা সত্ত্বেও, সর্বোচ্চ নেতা এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নেন না। বরং তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন এবং ঐকমত্য তৈরি করেন। এই কারণেই ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোকে ডিপ স্টেট হিসেবে অভিহিত করা হয়, যেখানে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের জটিল নেটওয়ার্ক কাজ করে ।

কিন্তু প্রশ্ন হল,এতক্ষণ আমরা ইরানের যে কেন্দ্রিভূত রাষ্ট্র কাঠামো, ক্ষমতাতন্ত্র আলোচনা করলাম, তার চরিত্র মূলত প্রাচ্যবাদী এবং উপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্রের অনুরূপ – কেন্দ্রীভূত কাঠামো। ২০২৬-এর ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর মূল লক্ষ্য ছিল একটাi, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে এলিমিনেট করে গোটা রাষ্ট্রকাঠামো ধ্বসিয়ে দেওয়া – যে পদ্ধতিতে তারা কয়েক মাস আগে ভেনিজুয়েলায় রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেফতার করে তার জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র নিজের পুতুল সরকার বসায়। যুদ্ধের প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই, আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহর মত প্রায় ৪০ শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হন। প্রচলিত রাষ্ট্রতত্ত্ব অনুযায়ী, এটাই হওয়ার কথা ছিল ৪০ বছরের আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধে পড়ে দুর্দশাগ্রস্ত ইরানের বৈপ্লবিক ইতিহাসের পরিসমাপ্তি। কিন্তু তার পরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বকে চমকে দিল। ইরান ধ্বসে তো পড়েইনি, বরং সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদী টানাপোড়েনের দিকে নিয়ে যায়। কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করল ইরান? তার উত্তর লুকিয়ে আছে বিলায়েতই ফকিহ (ইসলামী আইনবিদের শাসন) তত্ত্ব এবং মোজাইক ডিফেন্স কৌশলের গভীর সমন্বয়ে।

আইআরজিসির পুনর্গঠন (২০০৯)

বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, সামরিক কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ। ২০০৯-এর গণআন্দোলনের পর ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) পুনর্গঠিত হয় এবং বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামো তৈরি করা হয় । এই পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায়, ইরানের ৩১ প্রদেশের প্রত্যেকটাতে আইআরজিসির আলাদা সদর দপ্তর, কমান্ড-এন্ড-কন্ট্রোল স্ট্রাকচার এবং কমান্ড চেন তৈরি করা হয়। ভাবনা ছিল, প্রতিটি প্রদেশ এক একটা  স্বতন্ত্র ‘মোজাইক খণ্ড’ হিসেবে কাজ করে, যার নিজস্ব কমান্ডার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে ।

মোজাইক প্রতিরক্ষা(মোজাইক ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি)  কৌশলের মূলনীতি

মোজাইক প্রতিরক্ষা কৌশল হলো ইরানের সামরিক মতবাদের কেন্দ্রীয় উপাদান। এর মূলনীতি ১। স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট। প্রতিটা প্রাদেশিক আইআরজিসি ইউনিট তেহরানের কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও নিজস্বভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করা হল। যুদ্ধকালীন সময়ে স্থানীয় কমান্ডারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হল। ২। পূর্ব-নির্ধারিত সাধারণ নির্দেশনা রইল পদক্ষেপের ভিত্তি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাচি ২০২৬-এর মার্চে আল-জাজিরাকে জানান, “আমাদের সামরিক ইউনিটগুলো এখন স্বাধীন এবং অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। তারা পূর্বেই দেওয়া সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে” । ৩। আত্মরক্ষার ক্ষমতা। সমর কৌশলের মূল লক্ষ্য স্থানীয় আইআরজিসি আর বাসিজ ইউনিটগুলোকে বহিরাগত আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় সক্ষম করা। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ফারযিন নাদিমির মতে, প্রতিটি প্রদেশ এক একটা মোজাইক খণ্ড, এবং কমান্ডারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে ।

বাসিজ বাহিনীর ভূমিকা

বাসিজ (প্রতিরোধ সংহতি বাহিনী) হলো আইআরজিসির অধীনে পরিচালিত   স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী, যা ১৯৭৯ সালে খোমেইনীর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় । এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ । বাসিজ বাহিনীর বিশেষত্ব হলো এর বিকেন্দ্রীভূত ও সম্প্রদায়-ভিত্তিক কাঠামো। স্থানীয় পর্যায়ে এই বাহিনী মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করে, যা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি করে।

কুদস ফোর্স ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক

বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রয়োগ হলো কুদস ফোর্স (জেরুজালেম বাহিনী)। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনী ইরানের সীমানার বাইরে অপ্রতিসম যুদ্ধ ও গেরিলা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। ১৯৯০-তে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই কুদস ফোর্সের লক্ষ্য নির্ধারণ করে বলেন, এর উদ্দেশ্য মধ্য এশিয়া জুড়ে হিজবুল্লাহ সেল তৈরি করা। এই নীতিতে, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের হাশদ আল-শাবি, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ এবং সিরিয়ার স্থানীয় মিলিশিয়াদের সাথে ইরানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক   বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরোধ কাঠামো তৈরি করেছে; ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর আঘাত এলেও এরা স্বতন্ত্র কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম।

২০২৫-এর জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ ইরানকে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় – ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রাণ দিয়ে ইরানকে লড়াই করতে হলেও ইজরায়েলের যুদ্ধ ছিল তার এক্সিস্টেন্সিয়াল থ্রেট – তাকে আবার নতুন করে স্ট্রাটেজি সাজাতে হয়। ইসরায়েল আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত হামলায় ইরানের সামরিক আর পরমাণু কাঠামো বাঙ্কার বাস্টার বোমায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়; তার সামরিক দুর্বলতা হাট হয়ে খুলে যায়। ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা আর ভেদ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও দেখা দিল সর্বসক্ষে। ইসরায়েলি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সহজেই ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং একাধিক কমান্ডার নিহত হন, খামেনেয়িকেও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। সমস্যা হল ইরানের পাল্টা হামলা, যেমন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তেমন কার্যকর হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত হয় এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে পারেনি – ইজরায়েল এই যুদ্ধ ক্ষত সামলাতে পেরেছিল। ইরানকে শান্তিচুক্তি মেনে নিতে হয়।

যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক কাঠামোয় কৌশল বদল আনলেন ১। যুদ্ধের পর খামেইনি নতুন প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠন করলেন এবং তাঁর বিশ্বস্ত উপদেষ্টা আলী শামখানিকে প্রধান নিযুক্ত করলেন। কাউন্সিলের কাজ ছিল যুদ্ধক্রিয়া সমন্বয় করা এবং নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হলে তা পূরণের পরিকল্পনা করা। অর্থাৎ খামেনেয়ি শুধু ২০২৫-এর সংকট মোকাবিলাই নয়, ভবিষ্যতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করলেন, যাতে তার মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত থাকে। তাছাড়া আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নতুন প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনের সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই স্টেবিলিটি ফ্রন্টের মতো অতি-কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো থেকে মূল কোরে প্রতিনিধি রাখা হয় নি। এর ফলে যুদ্ধের সময় জটিল সিদ্ধান্ত নিতে মতাদর্শ জেদ বাধা হয়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কমে যায়। তাদের সম্পূর্ণরূপে বাদ না দিয়ে, মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে রেখে ইরানি নেতৃত্ব অভ্যন্তরীণ বিভেদ এড়াতে সক্ষম হয়। ২। নেতারা কূটনীতি আর প্রতিরোধের দ্বৈত নীতি নিলেন। ২০২৫এর যুদ্ধের পর খামেনেয়ি পশ্চিমের পরমাণু আলোচনা শুরু করেন। এই সময়টুয়কু তাঁর রাষ্ট্র ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, পরিবর্তন সাধন করার জন্য জরুরি ছিল। অন্যদিকে, শামখানির মতো কঠোর সমর্থকরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সীমিত হামলার হুমকি দিয়ে সক্রিয় প্রতিরোধের বার্তা দিচ্ছিলেন। তাছাড়া খামেনেই লারিজানির পুনর্বাসন নিশ্চিত করলেন। প্রবীণ, দক্ষ রাজনীতিবিদ আলি লারিজানিকে এসএনএসসির সেক্রেটারি নিযুক্ত করলেন। মাথায় রাখতে হবে তাঁর সঙ্গে অতীতে খামেনেয়ির মতানৈক্য ছিল। তাকে ফিরিয়ে এনে খামেনেয়ি প্রমাণ করলেন, তার কাছে মতাদর্শের চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্বের। লারিজানির কাজ ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা এবং কট্টরপন্থীদের একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা খর্ব করা। ৩। যুদ্ধের ফলে উঠে আসা দুর্বলতার দিকগুলো কাটিয়ে ওঠা এবং সম্ভাব্য অভ্যুত্থান ঠেকাতে দেশের অভ্যন্তরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হল। বিপ্লবী সেনা, আইআরজিসি এবং অন্য নিরাপত্তা সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করে খামেনেই নিশ্চিত করলেন যে, শত্রুর আক্রমণের সুযোগে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা যেন রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুর্বল করতে না পারে। অর্থাৎ ২০২৫-এর যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, খামেনেই নেতৃত্ব ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো চরম সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছেন। যদিও সক্রিয় প্রতিরোধের ধারণা সামরিক দুর্বলতার কারণে প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তবুও রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর কাঠামো ধ্বংস হয়নি। খামেইনির মৃত্যু পরবর্তী ইরান কেমন হবে, তা নির্ভর করবে তাঁর তৈরি করে যাওয়া এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কতটা সুসংহত ও কার্যকর হয় তার ওপর।

ইরানের এই লিডারশিপ ডেলিগেশন, নেতৃত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে সফল মহড়া বলা যায়। তারা দেখিয়েছে যে, শাসনব্যবস্থা চরম সংকটে ভেঙে না পড়ে কীভাবে নিজেকে পুনর্গঠিত করল। তবে দুই যুদ্ধের মধ্যে রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের টিকে থাকার মূল্য অন্তত আমার কাছে অনেকটাই বেশি। ইরানের ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’ এবং অন্য মতাদর্শ ভিত্তি তৈরি করা প্রজন্ম এখন অবসর নিচ্ছে, মারা যাচ্ছে, এবং তাদের জায়গা নেওয়া নতুন প্রজন্ম তৈরি করা নিয়ে ক্ষমতায় থাকা মানুষের ভাবনা আমরা জানি না। শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ হলেও, দীর্ঘমেয়াদী বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়ে কোনও মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলাম।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে তেহরানের   গোপন বৈঠককেন্দ্রে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিমান হামলায় এক মিনিটের মধ্যে ৪০-এর বেশি শীর্ষ নেতা নিহত হন। খামেনেয়ির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গোটা বিশ্ব ধরে নিল ইরানের পতন অনিবার্য কারন প্রচলিত রাষ্ট্রতত্ত্ব অনুযায়ী, এই ধরনের শীর্ষ নেতৃত্ব বিলুপ্তি রাষ্ট্র ক্ষমতাস পতনের অন্যতম কারন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। বাস্তবে উল্টোটাই ঘটল।

রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেন। আইএসডব্লিউ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শীর্ষ কমান্ডারদের মৃত্যুর পর তিনি বেসামরিক ব্যক্তি হয়েও সশস্ত্র বাহিনীর   খুব সিনিয়র কমান্ডের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন । গালিবাফ একসময় আইআরজিসি-র বিমান বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন, তাই তার সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল। তার এই পদক্ষেপ দেখলাম ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের নেতৃত্ব এমনভাবে তৈরি করা আছে যে, তারা চরম সংকটে এগিয়ে আসতে পারে, এমনকি তা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গেলেও। 

একই সঙ্গে আইআরজিসি-র উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আহমাদ ভাহেদি দ্রুত আইআরজিসি-র নতুন প্রধান হিসেবে আবির্ভূত হন । যুদ্ধ শুরুর আগে পর্যন্ত তিনি শীর্ষ ১০ জনের মধ্যে না থাকলেও, ২০২৫-এর ডিসেম্বরে আইআরজিসি-র উপ-প্রধান হওয়ার পর তার উত্থান ঘটে । এটি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে প্রতিষ্ঠান কত দ্রুত এবং উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।

সামরিক নিয়ন্ত্রণ- মোজাইক কৌশলের সক্রিয়করণ

শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পরপরই ইরান তার মোজাইক প্রতিরক্ষা কৌশল সক্রিয় করে। স্থানীয় আইআরজিসি কমান্ডাররা নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করেন । ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক সাশা ব্রুকম্যানের মতে, “এর ফলে মনে হয় কমান্ডঅ্যান্ড-কন্ট্রোল সিস্টেম এখনও কার্যকর আছে, অন্তত আপাতত। যতদিন ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চার আছে, ততদিন ইরানের প্রতিশোধমূলক অভিযান চলতে থাকবে”।

বিলায়েতই ফকিহ ও বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর তাত্ত্বিক সমন্বয়:

বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বের সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন হল একই সাথে কর্তৃত্বের কেন্দ্রীকরণ এবং কার্যপ্রণালীর বিকেন্দ্রীকরণ। তত্ত্বগতভাবে সর্বোচ্চ নেতা (ফকিহ) হলেন ইমামের প্রতিনিধি এবং তার কর্তৃত্ব অসীম। কিন্তু বাস্তব কার্যপ্রণালীতে তিনি সরাসরি সব সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেন।

ইরানের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এটি ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যের চেয়ে মতাদর্শের প্রতি আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বে সর্বোচ্চ নেতা ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং   প্রতিষ্ঠান ও মতাদর্শের প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিহত হলেও মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠানটিকে থাকে। মেহরান কামরাভা তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্ব সমাজকে সুরক্ষা আর পথনির্দেশ দেওয়ার ওপর জোর দেয়। এই সুরক্ষা আর পথনির্দেশের ধারাবাহিকতা নির্ভর করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নয়, বরং প্রতিষ্ঠান ও মতাদর্শের ওপর।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর ইরান কৌশলগত গভীরতা (স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ) মতবাদ তৈরি করে। এই মতবাদ বলে ইরান চায় ভবিষ্যৎ যুদ্ধ তার সীমানা থেকে দূরে, শত্রুর ভূখণ্ডের কাছাকাছি সংঘটিত হোক । এই উদ্দেশ্যে ইরান লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে তার সমর্থিত মিলিশিয়ার (যেমন হিজবুল্লাহ, হাশদ আল-শাবি) ওপর নির্ভরশীল। এই আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক ইরানের সামরিক কাঠামোকে আরও বিকেন্দ্রীভূত করেছে। প্রতিটি মিলিশিয়া স্থানীয়ভাবে পরিচালিত হলেও বিলায়েতই ফকিহ মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখে। ফলে ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আঘাত এলেও এই নেটওয়ার্কগুলি স্বতন্ত্রভাবে কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম।

আগেই বলেছি মোজাইক ডিফেন্স হলো বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বের বাস্তব রূপ। ২০০৩-এ ইরাক যুদ্ধে ইরানি সামরিক বিশ্লেষকরা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছিলেন—সাদ্দাম হোসেনের অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত শাসনকাঠোমো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল মাত্র কয়েকটা শীর্ষ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মাধ্যমেই । এই শিক্ষা থেকে ইরান ২০০৫সাল থেকে বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা কৌশল তৈরি করতে শুরু করে, যা পরে মোজাইক ডিফেন্স নামে পরিচিত হয় । আইআরজিসির তৎকালীন কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ জাফরি এই কৌশলের স্থপতি। তার পরিকল্পনা ছিল সহজ: সারা দেশকে ৩১টি স্বায়ত্তশাসিত সামরিক অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়া ।

** আদর্শগত স্তর বিলায়েতই ফকিহ (সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্ব) মতাদর্শগত ঐক্য ও দিকনির্দেশনা প্রদান
** কাঠামোগত স্তর ৩১টি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসিত কমান্ড কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতেও কার্যক্রম সচল রাখা
** লজিস্টিক স্তর বিকেন্দ্রীভূত অস্ত্র মজুদ ও উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিটি প্রদেশে অস্ত্রের মজুদ ও মেরামতের ব্যবস্থা
** কমান্ড স্তর “চতুর্থ উত্তরসূরি” নেতৃত্ব মডেল নেতৃত্বের সাত স্তরের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ

প্রথম আঘাত: নেতৃত্বহীনতার মুহূর্তে সক্রিয় হয়ে ওঠা কাঠামো, প্রাদেশিক কমান্ডারদের স্বয়ংক্রিয় সক্রিয়করণ

মোজাইক ডিফেন্স কৌশলের মূল কথা—কেন্দ্রীয় কমান্ডের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও স্থানীয় কমান্ডাররা পূর্ব-প্রদত্ত সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাবেন । সিএনএম-এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইকেল কনেল সিবিসি নিউজকে বলেন, “ইরান সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বিকেন্দ্রীভূত করবে এবং নিচু স্তরের কমান্ডারদের স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী সাড়া দেওয়ার স্বাধীনতা দেবে, যদি তারা তেহরানের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে” ।

যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু হয়ে যায়। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক নিকোলাস কার্লের মতে, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী যুদ্ধ শুরুর পর প্রতিদিনই তাদের হামলা চালিয়ে গেছে—এটাই মোজাইক ডিফেন্সের কার্যকারিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ” ।

যুদ্ধের গতিপথ: মোজাইক কৌশলের ধাপে ধাপে প্রয়োগ ও প্রথম ৪৮ ঘণ্টা: সর্বোচ্চ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে ইরান তার সর্বোচ্চ সংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে । এই সময়ে ইরান ও তার প্রক্সি বাহিনী ৩,০০০-এর বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে । আমেরিকান স্থাপনা, তেল ও গ্যাস পরিকাঠামো এবং বিমানবন্দরগুলো ছিল এসব হামলার প্রধান লক্ষ্য ।

এই দ্রুত ও ব্যাপক হামলার মাধ্যমে ইরান দুটি কাজ করেছিল:

১. শত্রুপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত করা—এত বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা হয় যাতে সব কটা প্রতিহত করা সম্ভব যেন না হয়
২. আক্রমণের ধারাবাহিকতা—শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পরও হামলা চালানোর সক্রিয় ক্ষমতা দেখানো

প্রথম সপ্তাহ: ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধরণ পরিবর্তন

৫ মার্চ নাগাদ মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হার প্রথম কয়েক দিনের তুলনায় ৮৬% কমে গেছে। অনেকে মনে করলেন ইরানের যুদ্ধ ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়া। কিন্তু ইরানের স্ট্রাটাজি ছিল ১। মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও মোবাইল লঞ্চার ধ্বংস করা ২। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ সংরক্ষণের কৌশল।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিমাণ কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আমেরিকার সেনাপতিরা ৬ দিনের মাথায় জানালেন ইরাক এখন আর বিশাল পরিমান মিসাইল পাঠাতে না পারলেও, মাঝে মাঝেই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর থেকে প্রমাণ হয় বিকেন্দ্রিভূত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ধ্বংস করে তাদের হামলা চালানোর ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ করা যায়নি” ।

দ্বিতীয় সপ্তাহ: নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা

যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই ইরান তার “চতুর্থ উত্তরসূরি” মডেল সক্রিয় করে । এই মডেল অনুযায়ী, ইরানি পরিকল্পনাকারীরা ধরে নিয়েছিলেন যে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তার প্রথম কয়েকজন উত্তরসূরিও নিহত হতে পারেন । তাই তারা নেতৃত্বের সাত স্তর পর্যন্ত প্রস্তুত রেখেছিলেন, যাতে শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পরও রাষ্ট্র পরিচালনা ও সামরিক কমান্ড অব্যাহত থাকে ।

মার্চের মাঝামাঝি আলি খামেইনির পুত্র মোজতাবা খোমেনেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিযুক্ত হন। এই সক্রিয়তা প্রমাণ করে যে, নেতৃত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার কৌশল ও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহনশীলতা

ইরানের মোজাইক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে শত্রুপক্ষকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্লান্ত করে তোলা । তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ হাদি সাজেদির মতে, “দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য রাজনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে—এটা ইরানি হিসাব-নিকাশের একটা অংশ”। এই কাঠামোয় ইরান ঠিক করে নেয়, তার প্রথম পর্বের আঘাত হবে শস্তার মিসাইল আর অসংখ্য ড্রোন, যেগুলো আটকাতে তার বিপক্ষকে অন্তত ১০০০ গুণ দামের মিসাইল দাগতে হবে। অর্থাৎ বিপক্ষের যুদ্ধের খরচ, তার যুদ্ধ্যের খরচের কয়েকশ গুণ হয়। এই লেখা যেদিন শেষ করছি, শুনলাম পেন্টাগন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য কংগ্রেসের কাছে আরও ২০০ মিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য চেয়েছে। আমি এখানে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ফলআউটনিয়ে আলোচনা করছি না কারন সেই আলোনায় অবশ্য আসবে গত ৩০০ বছরে ইওরোপিয় দেশগুলো থেকে ইওরোপ-আমেরিকার সম্পদ প্রবাহের যুগের সমাপ্তি, পেট্রোডলার বিনাম পেট্রোইউয়ানের লড়াই এবং ডলারের ৮০ বছরের বৈশ্বয়ক আধিপত্যের সমাপ্তি ইত্যাদি। এ সব প্রত্যেকটা আলাদা আলোচনার বিষয় হতে পারে।

এই কৌশলের সাফল্যের জন্য ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রস্তুতি নিয়েছিল -১। জনগণের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি; ২। প্রয়োজনীয় পণ্য ও স্যানিটেশন সামগ্রী মজুদ; ৩। সামরিক সরঞ্জামের বিকেন্দ্রীভূত মজুদ।

আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের সক্রিয়করণ

বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ হলো প্রতিরোধের অক্ষ। ইরানের সামরিক মতবাদে ফরোয়ার্ড ডিফেন্স ও এক্সটেন্ডেড ডিটারেন্স নামে   ধারণা রয়েছে, যার অর্থ হলো শত্রুকে নিজের সীমানা থেকে দূরে, তার কাছাকাছি এলাকায় মোকাবিলা করা । এই কৌশলের অংশ হিসেবে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের হাশদ আল-শাবি, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি), এবং সিরিয়ার স্থানীয় মিলিশিয়াদের সমর্থন দিয়ে আসছে । ২০২৬-এর যুদ্ধে এই প্রক্সি বাহিনীগুলো সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ১। হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলা চালায়; ২। হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজ লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে [যদিও ২০ তারিখ পর্যন্ত তারা সক্রিয় হয় নি; ইরানের ইঙ্গিতের অপেক্ষায় রয়েছে] ৩। ইরাকি মিলিশিয়াদের সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা।

ড্রোন যুদ্ধ ও অপ্রতিসম কৌশল

ইরানের আরেকটি শক্তি হল ড্রোন প্রযুক্তি। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে এলেও ড্রোন হামলা অব্যাহত ছিল । বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারে ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরান প্রমাণ করে যে, তাদের আক্রমণ সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়নি ।

ড্রোন যুদ্ধের বিশেষত্ব হলো এর খরচ তুলনামূলক কম এবং এগুলো গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলেও চালিয়ে যাওয়া যায়। নিউজ১৮-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এখন “গ্রাউন্ড-বেসড রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম এবং অটোনমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকল” (AUV) ব্যবহার করে নেটওয়ার্কযুক্ত হামলা চালানোর কৌশল নিয়েছে ।

বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্বের সাফল্য

মোজাইক ডিফেন্স ও বিলায়েতই ফকিহ-এর সমন্বয় ইরানকে যা দিয়েছে: ১। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা যার ফলে শীর্ষ ৪০+ নেতা নিহত হওয়ার পরও নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২। সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহেও ইরান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ৩। আঞ্চলিক প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখে প্রক্সি বাহিনীগুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিক চাপ সৃষ্টি অব্যাহত আছে। ৪। রাষ্ট্রীয় কাঠামো অটুট রয়েছে – সরকারি প্রশাসন ও সামরিক কাঠামো ধসে পড়েনি।

FILE — An air defense missile system, left, and tactical ballistic missile system, right, on display on the 45th anniversary of the Islamic revolution in Tehran, Iran, Feb. 11, 2024. The U.S., Europe, Russia and China worked together on a 2015 deal to limit Iran’s nuclear program. The arrangement’s unraveling and the spike in superpower tensions make this a dangerous moment. (Arash Khamooshi/The New York Times)

আমরা আয়াতোল্লা রুহুল্লাহ খোমেইনির বিলায়েতই ফকিহ তত্ত্ব ও তার প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করলাম। তার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী দার্শনিক, লাল মওলানা মরহুম আবদুল হামিদ খান ভাসনীর ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা বুঝে নেব।

 লাল মওলানার পালনবাদ ইসলামিক সুফিবাদের অন্তর্গত রবুবিয়াতেই এক্সটেইনশন। ভাসানী রবুবিয়াতের সঙ্গে শ্রেণিসাম্যের রাজনৈতিক ধারণার সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন।  তিনি বলছেন, সৃষ্টির একমাত্র মালিকানা আল্লাহর। মানুষ কোনো কিছুরই মালিক না, শুধু ধারক (Custodian)। তাই রাষ্ট্রের উচিত ব্যক্তিগত মালিকানা বিলুপ্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন করা। তিনি  উম্মাহ, হজ, বায়াতের পুনর্ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, ‘উম্মাহ’-কে তিনি শুধু মুসলিম সম্প্রদায় না ধরে বিশ্বের সব শোষিত-বঞ্চিত মানুষের বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব হিসেবে দেখেন। ‘হজ’ কে দেখেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলার   বার্ষিক সম্মেলন হিসেবে। আর ‘ব্ল্যাক মাওবাদ’ তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি অইওরোপিয় দেশুগুলোর মৈত্রী আর ব্ল্যাক মাওবাদের কথা বললেন ১৯৬০-এর দশকে চীন ও কিউবা সফর এবং ত্রিকোন্টিনেন্টাল সম্মেলনে যোগ দিয়ে। এইভাবে তিনি আফ্রো-এশীয় ঐক্য ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের   শক্ত ভিত গড়ে তোলেন।  তাছাড়া তিনি ছিলেন তিনি কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের নেতা। জমিদার, তালুকদার ও মহাজনের বিপরীতে তিনি সবসময় প্রজা ও কৃষকের পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর ধর্মীয় মর্যাদা (পীর) তিনি ব্যবহার করতেন কৃষকদের সংগঠিত করার জন্য। আর সম্রাট আওরঙ্গজেবের মতা গভীর ধর্মবিশ্বাসী হয়েও তিনি ছিলেন ঘোর সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী। ১৯৫৫-তে ‘ আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়ার পক্ষে যাঁরা ছিলেন, তিনি তাঁদেরই একজন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তান শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী সবার জন্য।

আমরা দেখব ইরানের ‘বিলায়েতই ফকিহ’ তত্ত্ব যেমন কেন্দ্রীভূত কাঠামোর বাইরে গিয়ে বহুস্তরীয়, মতাদর্শ-ভিত্তিক প্রতিরোধ কাঠামো তৈরি করেছে, ঠিক তেমনই পালনবাদ দক্ষিণ এশিয়ায় স্বদেশী ও বিকল্প রাষ্ট্রদর্শনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মওলানা ভাসানীর রাজনীতির শেকড় ছিল ইউরোপীয় ধ্যান-ধারণার বাইরে ব্রিটিশ-বিরোধী কৃষক প্রতিরোধের ইতিহাসে। তিনি মনে করতেন, সত্যিকারের স্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের প্রথম শর্ত হলো এই ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্তি, যার ভিত্তি পালনবাদ। তাছাড়া ইরানের মতো ভাসানীও   বহুস্তরীয় নেতৃত্বের ধারণা দেন। তিনি নিজে যেমন ছিলেন পীর ও রাজনৈতিক নেতা, তেমনি তার অনুসারীদের তিনি কৃষক-শ্রমিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে গড়ে তোলেন । ‘হক কথা’, ‘সত্য পত্র’র মতো পত্রিকার মাধ্যমে তিনি   বিকল্প বুদ্ধিজীবী ও সক্রিয়কর্মীর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক প্রচারণার বিপরীতে কাজ করত। ভাসানী দেখিয়েছিলেন, ধর্ম শোষণের হাতিয়ার হতে পারে, আবার মুক্তির জন্যও ব্যবহার করা যায়। তিনি লিবারেশন থিওলজির ইসলামী রূপ দাঁড় করান । ‘উম্মাহ’-র পুনর্ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার বৈশ্বিক শোষিত-মানবতার সংহতি গড়ার ডাক দেন। তিনি জামায়াত-ই-ইসলামীর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আধিপত্য কেড়ে নেন। তিনি দেখান, ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যালঘু নিপীড়ন নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোষিতের মুক্তিই হল আসল ইসলামী রাজনীতি ।

ইরান ১৬ দিনের যুদ্ধে পরিষ্কার করে দিয়েছে, তার লোকস্ট প্রযুক্তি, হাইএন্ড প্রযুক্তিকে শুধু বুড়ো আঙ্গুলই দেখায় নি, তার প্রাইডকে চরমতমভাবে আহত করেছে, কোটি কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র শারীরিকভাবে বিকল করেছে। ২০২৩এ অক্টোবরে হামাসের লোকস্ট মিসাইল একই কাণ্ড ঘটিয়েছিল। ২০২৬ সালে ইরান আরেকটু দামি মিসাইল ব্যবহার করে দুই মেসিন প্রযুক্তি নির্ভর রাষ্ট্রের যুদ্ধ কাঠামো পিছিয়ে যেতে, নতুন রণনীতি তৈরি করতে বাধ্য করেছে। সেই নবজাগরণের সময় থেকে পুঁজি, ল্যাবনির্ভর প্রযুক্তি প্রয়োগ করে এমন পণ্য, যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে যে প্রসেস মূলত খরুচে, কাম্বারসাম, সাধারণ মানুষ, সমাজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পশ্চিমের যে মিসাইলটা ইরানে রাস্তায় পেন্ট করা বিমান ধ্বংস করল, তার দাম ৩০ মিলিয়ন। এই মিসাইলগুলো এতটাই খরুচে আর তৈরি করতে এত দিন সময় লাগে যে স্টকপাইল শেষ হয়ে গেলে নতুন অস্ত্র তৈরি করা সমস্যার,  অনন্ত সময় লাগে। আমেরিকার যুদ্ধজাহাজকেই দেখুন কি জরদ্গব সে। আরও হাস্যকর, পশ্চিমের যুদ্ধযন্ত্র আর তার সমরবিদেরা এতটাই মাথামোটা যে কোনটা হাতে আঁকা বিমান/হেলিকপ্টার আর কোনটা আসল যুদ্ধ বিমান সে পার্থক্যটুকুও করতে পারে না। হাইএন্ড প্রযুক্তি এতটাই ডাম্ব – এতটাই মাথা মোটা। আমরা ভদ্রবিত্তরা কর্পোরেটের প্রচারে ডুবে থাকি, তাই এসব মাথায় আসে না। ইরান কিন্তু এই হাইকোড প্রযুক্তি ডিকোড করে যুদ্ধের ডিকয়ের খুব সাধারণ সমাধান বার করেছে। খুব সামান্য ব্যাপার না। 

এটাই এশিয়া-আফ্রিকার জোর – জনগণ, সমাজের উদ্ভাবনী ক্ষমতা। পুঁজিকেন্দ্রিক প্রযুক্তির আগ্রাসন আর কর্পোরেট দখলদারির মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু নিজের খোলসে ঢুকে গিয়ে সমাজকে বাঁচানোর রক্ষণ তৈরিই করে না, শত্রুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আগ্রাসনের রণনীতি তৈরি করে এই প্রযুক্তি ভিত্তি করে, সামাজিক জ্ঞান অবলম্বন করে। ক্ল্যাসিক্যাল উদাহরণ ৭১এর বাংলাদেশ আর ৭৫ সালের ভিয়েতনাম। আফগানিস্তানে তো সোভিয়েতের ছেড়ে যাওয়া যুদ্ধাস্ত্র ছিল, বাংলাদেশ আর ভিয়েতনামে কি ছিল? লিটারালি খালিহাতে সাম্রাজ্যের আগ্রাসন থেকে মুক্তি চাওয়া সাধারণ মানুষ, তাদের মত বুদ্ধি খাটিয়ে, বাস্তবকে ডিকোড করে সমানে সমানে শুধু লড়ে নি, সাম্রাজ্যবাদীদের দেশছাড়া করেছে। 

আমরা ভদ্রবিত্তরা বেসিক্যালি পশ্চিমের স্টুজ বলেই সাধারণ মানুষের এই উদ্ভাবনী শক্তিকে দেশ গড়ার কাজে যে ব্যবহার করা যায় বুঝিনি। যেটা পলাশীপূর্ব সময়ের শাসকেরা খুব স্পষ্টভাবে জানতেন। আমরা দাসের মত পশ্চিমের প্রযুক্তি, রাষ্ট্র কাঠামো, তার তৈরি করে দেওয়া উন্নয়নের ভাবনা স্রেফ নকল করেছি। হামাসের পরে ইরান প্রমান করল, বুদ্ধি থাকলে, লড়তে জানলে, ঠিকঠাক বন্ধু পাশে থাকলে লক্ষ কোটি টাকার জরদ্গব যুদ্ধযন্ত্র বেকার। আমরা এই শিক্ষাগুলো কাজে লাগাই না। কারন এই ছোট লোস্কেল ইন্ড্রাস্ট্রিতে ভদ্রবিত্তের চাকরি হয় না, দালালি করা যায় না। রাষ্ট্রযন্ত্র কর্পোরেট চালায় বলে কয়েক মাসের পরেই ভদ্রবিত্ত এই শিক্ষা ভুলে পুঁজির পুতুল হয়ে নাচতে থাকে।

বিশ্ব কি এই শিক্ষা নেবে?

হয়ত নেবে। কিন্তু ইরানের লড়াইতে বিশ্ব ক্ষমতা অক্ষ পরিবর্তনের বল রোল করে গেছে – সেটা গৌন। মূখ্যত ইরান দেখিয়েছে বিকেন্দ্রিভবন আর যৌথ নেতৃত্বের ফল কি হতে পারে – এবং এ যাবৎ সব থেকে বড় দুই মিলিটারি স্টেটের মাইটের বিরুদ্ধে সে একা লড়েছে, সফল লড়াই দিয়েছে – একা, এবং একা। তাত্ত্বিক না – হাতেকলমে লড়াই। প্রাণঘাতী লড়াই – চিরতরে বিলয় হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্যতা মাথায় রেখেই। চিন, রুশ, তার পিছনে অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে ছিল – কিন্তু সামনে থেকে লড়াই দিয়েছে ১৯৭৯এর বিপ্লবের শিক্ষা।

এ সবের লংটার্ম এফেক্ট থাকবেই। ক্ষমতায় থেকে প্রশাসনিক কাঠামোয় বিকেন্দ্রিভবনের বীজ রোপন করা খুব ছোট পদক্ষেপ না। বাংলাদেশ, আফগানিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক সরকার কিন্তু লড়াইতে ছিল না, ছিল গণজন – আদতে গণের তৈরি অদৃশ্য সরকার। 

ইরানে ইজরায়েল-আমেরিকা অক্ষের বিরুদ্ধে লড়েছে কিন্তু মজবুত সরকার। গণমানুষ না, আমলাতন্ত্র। আমরা যারা শহুরে হাতে গোণা মানুষ, সঙ্খ্যালঘিষ্ঠেরও সঙ্খ্যালঘিষ্ঠ, এদেশের বিকেন্দ্রিভূত ব্যবস্থার কথা বলি – হকার কারিগর চাষীদের কাজকর্ম, তত্ত্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে বিকেন্দ্রিভূত কাঠামোর কথা বলি, তাদের কাছে ২০২৬এর ইরান হিউজ শিক্ষা। কারন গত ৩০০ বছর ধরে জাতিরাষ্ট্র আর শিল্পবিপ্লব দুটোই কেন্দ্রিভবনের দিকে মানুষকে টার্ন করিয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া মার্ক্সিস্ট, মাওয়িস্ট এবং বামেরাও বিপ্লব করার জন্য কেন্দ্রিভবনের ভাবনার দিকে গিয়েছিল। 

এই ২০২৬এর ডিজিটাল কাঠামো বিশ্বকে ধাক্কা দিয়ে চূড়ান্ত কেন্দ্রিভবনের দিকে যাত্রা করানোর ২৫০ বছর আগের যে শিল্পবিপ্লবীয় আবহাওয়া ঘনিয়ে উঠছিল, সে সময় হাওয়ার গতি বদলে রাষ্ট্রীয়ভাবে যে বিকেন্দ্রিভবনের উদ্যম যে বাস্তবে নেওয়া যায় – তার প্রমান ২০২৬এর ইরান। অবিশ্বাস্য। 

জানি, পশ্চিমি ক্ষমতা এর পরেও শিক্ষা নেবে না। কিন্তু এর বীজ থেকেই যাবে বলেই মনে হয়। তবে আবারও বলব বাংলাদেশের ৭১, আর ভিয়েতনামের ৭৫-এর বিকেন্দ্রিভবন চয়েস ছিল না, বাধ্যবাধকতা ছিল – গণকে ইনোভেট করতে হয়েছিল – কারন তার বীজ গণের জীবনে হাজার হাজার বছর ধরেই ছিল। 

কিন্তু ইরান এই বিকেন্দ্রিভবনকে, যুদ্ধ চয়েস হিসেবে মেনেছে। এটাই বড় অসাম্রাজ্যবাদী-ইওরোপিয়, পশ্চিমি ব্যাপার। ইরানের বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কিছুটা আফগানিস্তানের শিক্ষা কাজে লাগাতে লাগাতে ৫০ বছর কেটে গেছে। ২০২৬এর ইরানের এই শিক্ষা বাস্তবায়িত করতে আরও হয়ত ১০০ বা ৫০০ বছর কেটে যাবে। জানি না।

কিন্তু কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে এভাবেই ঢাল হয়ে ওঠা যায়, এই ধারণার বীজ থাকবেই। ধারণার তো মৃত্যু নেই।

উপনিবেশের মৃত্যু দাবির তো মৃত্যু নেই, যা অনন্ত।

সূত্র

১। https://www.altaghyeer.info/en/2026/02/20/state-design-between-militarized-centralism-and-the-reproduction-of-domination-2/#go-to-tie-body

২। https://www.arise.tv/osuntokun-over-centralised-power-at-the-centre-is-nigerias-greatest-source-of-instability/

৩। https://www.linkedin.com/posts/donradoli_the-nation-state-system-under-strain-activity-7229502130506661891-hVph

৪। https://lrcdrs.bennett.edu.in/items/823b407b-104d-4c72-af13-5fa22fd805c3

৫। https://morningstaronline.co.uk/article/eternal-hunger-oil-how-west-has-been-strangling-iran-100-years

৬। https://en.mehrnews.com/news/177518/From-nationalizing-Iran-oil-to-CIA-backed-evil-coup-of-1953

ভাসানি

১। https://www.newagebd.net/post/opinion/283014/#content

২। https://my-mesa.org/program/abstracts/view/eyJpdiI6IkxoV3Evc3ZDanNPckxvVGF4MUlpTGc9PSIsInZhbHVlIjoiM3ZteGxaMXlCeUloYmJqdVV3WUNOZz09IiwibWFjIjoiMDIzODQ2ZGM0OGE1OWE5MDU2ZGRjMDhlY2U0MThlZGEzYzU5MDUzNWVjYmJlODE1YmZlYmQ1ZDZmN2ZmMjRiZiIsInRhZyI6IiJ9

৩। https://www.0-www.sciencedirect.com.cylis.lib.cycu.edu.tw/search~S1*cht?/i9780612846463/i9780612846463/47%2C-1%2C0%2CE/frameset&FF=i9780612852655&1%2C1%2C

৪। https://online.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/maulana-bhashani-and-the-islam-question-2009825

৫। https://revolutionarypapers.org/journal/haq-katha-satya-patra-bishwo-shanti/

৬। http://dhakacourier.com.bd/index.php/news/Featured_2/Maulana-Bhashani-Historical-roots-of-social-politics-and-Bangladesh/6791

৭। https://www.newagebd.net/post/opinion/283014/#content

৮। https://www.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/maulana-bhashani-and-the-transition-secular-politics-east-bengal-1995445

৯। https://www.qeh.ox.ac.uk/event/mao-lana-asia-bhashani-black-maoism-and-islamic-socialism-1960s

১০। https://pcp.gc.cuny.edu/event/red-mao-lana-of-asia-bhashani-black-maoism-and-islamic-socialism-in-the-1960s/

১১। https://online.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/maulana-bhashani-and-the-islam-question-2009825

১২। https://www.newagebd.net/article/151706/#tab_default_3

ইরান

১। https://www.theweek.in/news/middle-east/2025/10/27/iranian-regime-is-going-to-die-slowly-in-their-sleep-expert-on-how-iran-s-outdated-thinking-seals-its-fate.html

২। http://store.jpost.com/middle-east/iran-news/article-888327

৩। https://understandingwar.org/research/middle-east/iran-update-october-23-2025-2/

৪। https://v2.iranintl.com/en/202510249123

৫। https://english.news.cn/20260319/37df010ce70047f1a9304f06d316e311/c.html

৬। https://www.ariananews.af/iran-to-form-interim-leadership-council-as-officials-vow-retaliation-after-ayatollahs-death/

৭। https://www.theweek.in/news/middle-east/2025/10/27/iranian-regime-is-going-to-die-slowly-in-their-sleep-expert-on-how-iran-s-outdated-thinking-seals-its-fate.html

৮। https://www.clingendael.org/publication/strengthening-regime-resilience-tehran-prepares-conflict-and-succession#:~:text=The%20deeper%20significance%20of%20Iran’s,absence%20of%20its%20central%20helmsman.

৯। https://www.afpc.org/publications/special-reports/mapping-irans-alternative-futures

১০। https://www.thestar.com/news/world/middle-east/how-succession-works-in-iran-and-who-could-be-the-countrys-next-supreme-leader/article_71a7b612-c97e-5624-b48a-884a6aaa02b7.html

১১। https://app.al-monitor.com/originals/2026/02/surviving-strike-shamkhani-resumes-central-role-irans-war-room

১২। https://www.iranintl.com/en/202506244050

১৩। https://www.straitstimes.com/world/united-states/iran-was-not-rebuilding-nuclear-enrichment-us-intelligence-finds?ref=latest-headlines

১৪। https://www.theglobeandmail.com/world/article-iran-regime-attacks-overestimated-defences/

১৫। https://english.alarabiya.net/views/2025/07/02/a-year-of-setbacks-for-iran?utm_source=article&utm_medium=explore&utm_campaign=explore-more

১৬। https://www.theguardian.com/world/2026/mar/01/iran-military-options-limited-us-israel-attack

১৭। https://www.news18.com/world/wilayat-e-faqih-irans-govt-system-where-religious-leader-outranks-the-president-ws-dkl-9390388.html

১৮। https://wind-am.saleminteractivemedia.com/politics/irans-ruling-structure-explained/2baed606ab0101260f111487c6426e40

১৯। https://en.vijesti.me/world-a/globus/799041/rse-poslije-pogibije-vojnog-vrha-iran-primjenjuje-decentralizovanu-mozaik-strategiju

২০। https://ict.org.il/irans-power-structure/

২১। https://www.rferl.org/a/iran-irgc-israel-us-war/33697690.html

২২। https://hal.science/hal-05312526v1/tei

২৩। https://www.linkedin.com/posts/mehran-kamrava-a703a7a1_iran-war-enters-dangerous-phase-as-regime-activity-7440117783784226816-NLrr

লেখক, গবেষক, সংগঠক, প্রকাশক। উপনিবেশপূর্ব সময়ের সমাজ অর্থনীতিতে  কারিগরদের ইতিহাসের খোঁজে সর্বক্ষণের কর্মী। হকার, কারিগর সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় তিন দশক। বাংলায় পরম্পরার উৎপাদন বিক্রেতাদের বিষয়ে লিখেছেন নিরন্তর। বাংলার উপনিবেশপূর্ব সময়ের পরম্পরার চাষী-হকার-কারিগর-ব্যবস্থা বিষয়ে খোঁজ করছেন। দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ছাড়াও দেশীয় প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। ‘পরম’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। অড্রে ট্রুস্কের আওরঙ্গজেব, ম্যান এন্ড দ্য মিথ, স্বেন বেকার্ট এম্পায়ার অব কটন, যদুনাথ সরকারের মুঘল এডমিনিস্ট্রেসন, আহকমই আলমগিরি অনুবাদ করেছেন। পলাশীপূর্বের বাংলার ৫০ বছর, পলাশীপূর্বের বাংলার বাণিজ্য দুটি মৌলিক পুস্তকের রচয়িতা। 

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top