নবীর তরিকত ও মানুষ ভজনা

।। অতনু সিংহ ।।

বঙ্গ তথা উপমহাদেশে শ্রুতিনির্ভর জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে Revelation-এর ভাবগত মিল আছে। আমরা আজ অক্ষর-শব্দ-বাক্য-পুস্তক-গ্রন্থ-ইন্টারনেট ইত্যাদি দিয়ে সাহিত্য-শিল্প রচনা করছি তারা ভুলে যাবো না শ্রুতি নির্ভর জ্ঞানচর্চার বিকেন্দ্রিক প্রস্তাবনাগুলি। সেক্ষেত্রে মানুষই প্রধান বিষয়। বঙ্গের ভক্তি ধারাগুলির ক্ষেত্রেও মানুষই প্রধান। আমরা ভুলে যাবো না যে আরবে যেভাবে নবী মোহাম্মদ (সা.) একই সঙ্গে বর্ণবাদ, গোত্রবাদ, বিত্তবাদ বা ধনবৈষমা এবং লৈঙ্গিক বৈষম্য-সহ সকলপ্রকার অসাম্য ও বেইনসাফের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, ঠিক সেভাবেই নদীয়ার ‘তিন পাগল’ শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্য লড়াই করেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে, ধনী-নির্ধন বৈষম্যের বিরুদ্ধে ও তন্ত্রের নামে নারীদেহকে ‘উপায়; করে তুলে নারীকে এবিউজ করার বিরুদ্ধে।

যে সকল ঘটনার মধ্যেই আমাদের জীবন ও যাপন, পারিপার্শ্বের যেসকল ঘটনাপ্রবাহ থেকে আমাদের ভাবজগত, আমাদের চিন্তাপ্রক্রিয়া, এমনকি আমাদের নান্দনিকবোধ অবিচ্ছিন্ন, । এহেন ঘটনাবলী আমাদের কথা বলায়, কথা বলতে বাধ্য করে। এই যেমন মার্কিন নির্বাচন চলছে এখন। আমরা আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্ণবিদ্বেষী কারবার এবং নানাবিধ কৃতকর্ম বিষয়ে কথা বলছি। আমাদের মনের মধ্যে ফুটে উঠছে কিছুদিন আগে মার্কিন দুনিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গদের লড়াই: ব্লাক লাইভস ম্যাটার। মনে পড়ছে কালো মানুষদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংস্রতার কথাও। তবে বর্ণবাদ বলুন কিংবা ইসলামবিদ্বেষ বলুন, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদায় নিলেই মার্কিন দুনিয়ায় ইসলাম বিষয়ে কিংবা সামাজিক সমানাধিকার বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির খুব বেশি ফারাক ঘটবে। অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন মুলুকে কোনো বড়সড় সমাজ বিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা খুবই কম। বর্ণবাদ এবং ইসলামোফোবিয়ার ক্ষেত্রে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত খুব বেশি তফাৎ নেই, সেটা আমরা কমবেশী সকলেই জানি। এই দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা একা মার্কিন মুলুকেরও নয়। বরং গোটা পশ্চিমের। এমনকি আমাদের এই উপমহাদেশেরও। এই কথা মাথায় রেখেই একটু দেরীতে হলেও ফ্রান্সের ঘটনা নয়ে পর্যালোচনার সূত্রপাত করা যেতে পারে।

সম্প্রতি ফ্রান্সে নবী মোহাম্মদ (সা )-কে নিয়ে নতুন করে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ শুরু হয়েছে। তাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দুনিয়ায় আবারও ইসলামোফোবিয়া তথা ইসলাম বিদ্বেষের রাজনীতির বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। এটা পরিষ্কার চলমান বিশ্বের পুনর্পাঠ ও পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। সাহিত্যের দিকে থেকে আমাদের বিশেষ আগ্রহ থাকবে পশ্চিমা জ্ঞান এবং সৌন্দর্যচেতনা নির্ভর আধুনিক ও অধুনান্তিক চারু-রাজনীতির ( Politics of Art) ব্যবচ্ছেদের। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বিশ্ব ব্যবাস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য যে সকল মতাদর্শগুলো অধিপতির ভূমিকা পালন করছে তাদের চিহিত করা এবং তাদের পর্যালোচনা ত্বরান্বিত করা। এগুলির সঙ্গে নিরন্তর বাহাস জরুরি হয়ে পরেছে। যারা বিশ্ব মানব সমাজের স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখেন বিশ্ব ইনসানিয়াতের বা বিশ্ব উম্মাহর- তাদের নিজেদের চিন্তা, কল্পনা ও বাসনাকে আরও বৃহৎ পরিসরে অনুধাবন করতে শেখা এখনকার বড় কাজ। সেই ক্ষেত্রে গোলকায়িত বিশ্বের যে পুঁজিতান্ত্রিক চরিত্র- যেখানে লগ্ন পুঁজির প্রাধান্য অন্য সকল বৈশ্বিক বিবেচনাকে গৌণ করে তুলেছে- সেই আলোকে জাতিবাদ, বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং আমাদের পরস্পরের মধ্যে অপরিচয়ের যে পর্দা গাঢ় হয়ে নেমে আসে সেইসব পর্যালোচনার শক্তি দ্রুত অর্জন করতে হবে।

আমাদের শিল্প-সাহিত্য-নান্দনিকতার বিকট সমস্যা হচ্ছে পাশ্চাত্য আধুনিকতার অবিকল অনুকরণ, যার ফলে পাশ্চাত্যের বর্ণবাদী এবং প্রাচ্য বিরোধী অভ্যাস, জ্ঞানকাণ্ড এবং নান্দনিকতার আমদানি ঘটে নির্বিচারে। অন্যদিকে আমাদের নিজেদের সে সকল ভাবসম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা পাশ্চাত্যকে গ্রহণ-বর্জনের মধ্যে দিয়ে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারি, সেটা আমরা উপেক্ষা ও নষ্ট করতে থাকি নিয়মিত। একদিকে আধিপত্য অন্যদিকে অনুকরণ এই উভমুখী বাস্তবতা বর্ণবাদী পশ্চিমা আধুনিকতাকে আরও সবল করে। ব্যাপারে আমাদের সজাগ হতে হবে দ্রুত। সেই দিকে আমরা নজর রাখবো।

নজর রাখব কারন আমরা বড় বাংলার সাহিত্যের কথা বলছি, সাহিত্যের মাধ্যমে উপমহাদেশের বাংলাভাষী অঞ্চল ও মানুষের পারস্পরিক বোঝাবুঝি ও ঐক্যের দিক আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বিশ্বের বাঙলাভাষী মানুষের মধ্যে ভাষিক সেতুবন্ধনের মাধ্যমে বিশ্বজনীনতার সম্ভাবনা তৈরি বাংলাভাষীদের কাজ।

এই দিকটি খেয়ালে রাখলে আমাদের এই আলাপের সঙ্গে বড় বাংলার বঙ্গের ভাববৈচিত্র্যের ঐক্য ও তার পরম্পরার সঙ্গে ইসলামের ভাবগত সাদৃশ্যের বেশ কিছু জায়গাগুলো আমামদের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়। সেমেটিক ধর্মগুলোর মধ্যে ইসলামের সঙ্গে বঙ্গের ভাবের আদানপ্রদান, মিল-মহব্বতের ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। সেখানে দ্বন্দ্ব ও বিরোধিতাও রয়েছে। সেই দিকগুলোকে ইতিহাস হিশাবে আমাদের বুঝতে হবে। বঙ্গের ভাবাবৈচিত্র্য ও ভাবান্দোলনের পরম্পরা যেভাবে মানুষের জয়গান গায়, তার সঙ্গে ইসলামে মানুষকে মহিমা বা জয়গাঁথার সম্বন্ধ রয়েছে। হয়তো তা পথ হারিয়ে ফেলেছে নানান সময়। কিন্তু মানুষকে দুনিয়ার আল্লার প্রতিনিধি বা ‘খলিফা’ গণ্য করারা মধ্যে মানুষের যে মহিমার কীর্তন সেটাই বাংলার ভাব্জগতে ‘মানুষ ভজনা’র ধারণায় রূপ নিয়েছে। ফলে বড় বাংলা সহজেই বলতে পেরেছে:

অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
শুনি মানবের উওর কিছুই নাই
দেব দেবতাগন করে আরাধন
জন্ম নিতে মানবে।।

এই মানুষে হবে মাধুর্য ভজন
তাইতে মানুষ-রূপ গঠলেন নিরঞ্জন
এবার ঠকিলে আর না দেখি কিনার
অধীন লালন কয় কাতর ভাবে।।

তৈরি হয়েছে মানুষের দরবারে পরমের এবাদত। এবং নবী মোহাম্মদের তরিকাও আসলে সেই মানুষের দরবারে মানুষ ও পরমের সম্বন্ধ রচনার অভিসন্দর্ভ। নিপীড়িতের-মজলুমের ও আশিকের জন্যে এ বিশ্বকে বাসযোগ্য করে যাওয়ার।

ইসলাম একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক যেমন, তেমনই রাজনৈতিক। কারন ইসলাম ইনসাফ ও হক প্রতিষ্ঠার ভাব, ফলে বে-ইনসাফি ও জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই তার মর্মের বয়ান। মার্গ। ইসলাম সব সময় সেই ভাবের দাঁড়িয়ে তাকেছে তা নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে, কিন্তু তা মানুষকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করবার ঘোষণা নাকচ করে না। বাংলার নিপীড়িত সাধারণ মানুষ তাই সহজেই গেয়ে ওঠে:

তুমি মাটির আদমকে প্রথম সৃষ্টি করিয়া
ঘোষণা করিয়া দিলে শ্রেষ্ঠ বলিয়া
তাই নূরের ফেরেশতা
করে মানুষকে সেজদা
সবার চেয়ে দিলে মাটির মানুষকে সম্মান।।


এটা পরিষ্কার বোঝা যায় বড় বাংলায় ইসলামের একটি ওপূর্ব রূপ আছে যার সঙ্গে আমরা যথেষ্ট পরিচিত নই। এই অপরিচয়ের কারণ পাশ্চাত্যকেই সভ্যতার চূড়ান্ত বিকাশ গণ্য করা। ইসলামকে একাট্টা এখারা গণ্য করে তার বির্ধহে যা বর্ণবাদী জ্ঞহৃণা ও বিদ্বেষ তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অর্থ অতএব একই সঙ্গে বড় বাংলার বিকাশের সম্ভাবনাকে মজবুত করা। আমরা হাটেমাঠে মানুষের অন্তরে সে ইসলামকে দেখি সেখানে সকল জৈবিক সত্ত্বা, মানবসত্ত্বা, প্রকৃতি ও পরমের মধ্যে সম্বন্ধ তৈরির ঐশী বয়ান হিশাবে ইসলাম হাজির। সেই বয়ান নাজিল হচ্ছে মানুষের কাছে, মানুষের মাধ্যমে, নবী যে ঐশী বাণীর দূত। কিন্তু তার তাফসির চলেছে মানুষ থেকে মানুষে, মানুষের মাধুর্য ভজনার জন্য মানুষে থেকে মানুষে। চলছে প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্যের মাঝে মানুষের মধ্য দিয়েই পরমের ঐশীক্রিয়ার জাগতিক মীমাংসা নিশ্চিত করা। যেহেতু মানুষ জৈবিক ক্রিয়ার অতিরিক্ত আরো কিছু করে, যা সকল সৃজনশীল ভাবের প্রকাশ বা ভাব দিয়ে ভাব নিয়ে রাঙাচরণ প্রাপ্তির , সেই অতিরিক্তকে চিহ্নিত করা যায় ‘পরমার্থ’ শব্দে। এই পরমার্থের হদিশ মানুষ নিজে। মানুষের মধ্যে পরমার্থের প্রকাশের কথা ঐশীবানীতেই শুধু নয়, আছে নবী মোহাম্মদের (সা.) জীবনচরিতে, তাঁর সুন্নতেও।

সেমেটিক ধর্মগুলোর মধ্যে একমাত্র ইসলামের সঙ্গে বঙ্গের ভাবের আদানপ্রদান, মিল-মহব্বতের ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। বঙ্গের ভাবাবৈচিত্র্য ও ভাবান্দোলনের পরম্পরা যেভাবে মানুষের যে জয়গান গায়, সেভাবেই ইসলামে আল্লার জয়গাথা তৈরি হয়েছে মানুষের দরবারে, মানুষের দরবারেই রয়েছে পরমের এবাদত। এবং নবী মোহাম্মদের তরিকাও আসলে সেই মানুষের দরবারে মানুষ ও পরমের সম্বন্ধ রচনার অভিসন্দর্ভ। নিপীড়িতের-মজলুমের ও আশিকের জন্যে এ বিশ্বকে বাসযোগ্য করে যাওয়ার।

ফরাসী বিপ্লব, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ, যুক্তিবাদ, আলোকায়ন- এগুলোর দার্শনিকতার সঙ্গে প্রাচ্যের দুনিয়ার এবং ইসলামের প্রায় সমান্তরাল অবস্থান। রেনেসাঁ, আলোকবাদ এগুলো একদিকে যেমন পশ্চিম নিয়ন্ত্রিত জগতের অগ্রসরতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থেকেছে, তেমনই এগুলোর দ্বারা উপনিবেশবাদ থেকে আধুনিক জাতিবাদ তৈরি হয়েছে অতি সহজেই। প্রকৃতিকে জানার বিদ্যার বদলে জ্ঞানের বিকার নিয়ে চর্চাকে বিজ্ঞান আখ্যা দিয়ে অতি-বিজ্ঞানবাদ পয়দা করেছে প্রযুক্তির দুনিয়া। ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে আজও শিল্প-সাহিত্য, গণমাধ্যম পশ্চিমা ধ্রুপদী দার্শনিক প্রস্তবনা ও সমাজবোধ নির্ভর। এই অবস্থার পরিবর্তনে, বি-উপনিবেশায়নের প্রেক্ষিতে আজ দরকার আত্মনুসন্ধান এবং পশ্চিমের সমান্তরালে নিজেদের চিন্তাজগতের, নিজেদের নান্দনিক পরিকাঠামোর বিকাশ। আমরা যারা বঙ্গের মানুষ, আমরা জানি, যাহা আছে ভাণ্ডে, তাহাই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে। এই আত্মনুসন্ধান ও অন্তর্জগতের প্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ‘চিহ্ন’ বা আয়াত।

মানুষ ও পরম। ছবি: মোহাম্মদ রোমেল

আমরা যারা গুটেনবার্গীয় টেকনোলজি প্রসূত শিল্প-সাহিত্যের ধারনাকে বদলে ফেলতে ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে বড় বাংলার সাহিত্য নিয়ে হাজির হয়েছি, আমরা জানি, আমাদের বঙ্গে বলুন কিংবা উপমহাদেশে বিদ্যা অর্জন বা জ্ঞানচর্চা ছিল শ্রুতি নির্ভর। ইসলাম-সহ সেমেটিক ধর্মগুলির ক্ষেত্রে ‘কেতাব’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইসলামের ওহি নাজিল হওয়া বা Revelation-এর বিষয়টি নিয়ে যদি আমরা ভাবি, তাহলে ভাবনার বড় একটা অংশে অবশ্যই হাজির থাকবে মানুষের কাছে ওহি নাযিল হওয়ার বিষয়টি। ইসলামে নবী করিম (সা.)-সহ অন্যান্য নবীরা কিন্তু মানুষ, তাঁদের কোথাও ঈশ্বর পুত্র বলে দাবি করা হচ্ছে না। ইসলামের নবীদের মধ্যে নবী ঈসাও সম্মানিত। কিন্তু পোপ পল প্রবর্তিত খ্রিস্টবাদে যীশুকে ‘ঈশ্বরপুত্র’ বলা হচ্ছে। এর মানে এই নয় যে গ্রিক-খ্রিস্টিয় চিন্তা ও পাশ্চাত্য ইতিহাসের কোন ইতিবাচক ভূমিকা নাই। অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু যদি বলা হয় পাশ্চাত্যই মানবেতিহাসের একমাত্র নিয়তি — এই বর্ণবাদী দাবির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আমাদের জন্য ফরজ হয়ে পড়ে।

ধর্মতাত্ত্বিক অনুমানগুলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের চিন্তাকে ভিন্নতা দিয়েছে। মানুষের মধ্যে ওহি নাযিল হওয়াকে যতো সহজ চিন্তা হিশাবে আমরা গ্রহণ করি, ততো সহজ কি? চিন্তার গোড়ায় ‘ঈশ্বরপুত্র’ নন, আছেন অতি সাধারণ অক্ষরের দোষ মুক্ত একজন মানুষ, যিনি নিজেকে আর দশজনের মতোই মানুষ বলে পরিচয় দিয়েছেন। সেই ওহির মধ্যেই ব্যক্ত হওয়া আল্লাহ আছেন মানুষের হৃদয়ে- এগুলির সঙ্গে বঙ্গের মানুষ ভজনার মধ্যে দিয়ে পরমের এবাদতের বঙ্গীয় ভক্তিধারার সম্পর্ক নিবিড়। এমনকি বঙ্গ তথা উপমহাদেশে শ্রুতিনির্ভর জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে Revelation-এর ভাবগত মিল চাইলে আমরা খুঁজে পাব। কারণ আছে। আমরা আজ অক্ষর-শব্দ-বাক্য-পুস্তক-গ্রন্থ-ইন্টারনেট ইত্যাদি দিয়ে সাহিত্য-শিল্প রচনা করছি তারা ভুলে যাবো না শ্রুতি নির্ভর জ্ঞানচর্চার বিকেন্দ্রিক প্রস্তাবনাগুলি। সেক্ষেত্রে রক্তমাংসের মানুষই প্রধান বিষয়। মানুষের চেয়ে বড় কোন ‘কিতাব’ নাই। বঙ্গের ভক্তি ধারাগুলির ক্ষেত্রেও মানুষই প্রধান। আমরা ভুলে যাবো না যে আরবে যেভাবে নবী মোহাম্মদ (সা.) একই সঙ্গে বর্ণবাদ, গোত্রবাদ, বিত্তবাদ বা ধনবৈষমা এবং লৈঙ্গিক বৈষম্য-সহ সকলপ্রকার অসাম্য ও বেইনসাফের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, ঠিক সেভাবেই নদীয়ার ‘তিন পাগল’ শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্য লড়াই করেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে, ধনী-নির্ধন বৈষম্যের বিরুদ্ধে ও তন্ত্রের নামে নারীদেহকে ‘উপায়; করে তুলে নারীকে এবিউজ করার বিরুদ্ধে। এই বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে আমাদের বড় বাংলার সাহিত্যকর্ম চলবে, যে সাহিত্য কর্মের লক্ষ্য মানুষের সঙ্গে সম্বন্ধ রচনা করা এবং আত্মভুবনের মধ্যে দিয়েই বহির্জগতকে পাঠ করা। আর তাই আমরা বুর্জোয়া পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব, গণমাধ্যম ইত্যাদির সঙ্গে নিরন্তর বাহাস চালাবো।

ওয়েস্ট, আধুনিকতা, গ্লোবাল গায়েবি লগ্নিপুঁজি, গ্লোবালাইজেশন, ওপেন মার্কেট — এগুলো পয়দা করা আর পৃষ্ঠপোষকতায় আগায়ে নিয়ে চলা — একই সাথে ইসলামোফোবিয়া, হিন্দুত্ববাদ, বর্ণবাদ ও ইসলামিক জাতীয়তাবাদের এই ভয়ঙ্কর সময়ে আমরা নবীর অপমানে অপমানিত বোধ করি। পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রাচ্যের সংঘাতের জায়গাগুলো এই সকল ক্ষেত্রে দগদগে ক্ষতের মতো উঠে আসে। নবীর তরিকতকে আমরা তাই পাঠ করি মানুষ ভজনার জায়গা থেকে। মানুষের বিশ্ব উম্মাহ গঠনের বয়ানে। যে উম্মাহ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ নয়, যে উম্মাহ মানুষের, সহজ মানুষের। আমরা ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, কোণঠাসা। নবীও তো তেমনই ছিলেন, একাকী, এতিম। নিজের গোত্রের বিরুদ্ধেই গোত্রবাদ বিরোধী সমতা ও সমানাধিকারের লড়াইয়ে তাঁকে নামতে হয়েছিল। মনে রাখবেন, কৃষ্ণাঙ্গ বেলাল ছিল আজান দেবার দায়িত্ব প্রপাত তাঁর প্রিয় সাহাবা। তিনি মাত্র আঠারো বছর বয়সী এক কৃষাঙ্গ তরুনের হাতে ইসলামের সেনাপতির ঝাণ্ডা তুলে দিয়েছিলেন। প্রিয় নবী (সা.) খর্বকায়/’বামুন’ জুলাইবিবকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন।

ইসলাম তাই কোনো গোত্রবাদের নাম হতে পারে না। কোনো জাতিবাদের বা বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের নাম হতে পারে না, মানুষকে বিভক্ত ও বিভাজনের তরবারি হতে পারে না। ইসলাম অপরের ওপর বলপ্রয়োগের নাম হতে পারে না। ইসলাম ইনসাফ ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার এক আধ্যাত্মিক রাজনৈতিক দর্শন।

লালন সাঁইজীর একটি কালাম কালাম স্মরণ করে শেষ করছি।

নবীর তরিকতে দাখিল হলে
সকল জানা যায়
কেনরে মন কলির ঘোরে
ঘুরছো ডানে বাঁয়ে।।
আউয়ালে বিসমিল্লা ব্যক্ত
মূল বটে তার তিনটি অর্থ
আগমে বলেছে সত্য
ডুবে জানতে হয়।।
নবী আদম খোদ বে খোদা
এ তিন কভু নহে জুদা
আদমকে করিলে সেজদা
আলেক জনে পায়
নবীর তরিকতে দাখিল হলে
সকল জানা যায়।।

লেখক পরিচিতি:
অতনু সিংহ
শূন্য দশকের কবি ও গদ্যকার। জন্ম ১৯৮২ সালের ২২ আগষ্ট। স্থায়ী বসবাস পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায়। পড়াশুনা, পেশা ও বন্ধুসঙ্গের কারণে নানা সময় অস্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন কলকাতার যাদবপুর অঞ্চলে এবং ঢাকার মিরপুরে। ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ছিলেন প্রায় দুই বছর। এখনও মিরপুর-সহ গোটা ঢাকা শহরটাকে তিনি তাঁর নিজের শহর বলেই মনে করেন। কবিতা ও ভাব-যাপনের দিক থেকে অতনু বৃহৎ বঙ্গের। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্রবিদ্যা বিষয়ে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণজ্ঞাপন (মাসকমিউনিকেশন) বিষয়ে স্নাতকোত্তর। কিছুদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশুনা করেছেন। এখন অবধি কবিতার বই মোট ৪টি। ‘নেভানো অডিটোরিয়াম’(২০০৯ সাল, ‘লালন’ প্রকাশনা, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ), ‘ঈশ্বর ও ভিডিও গেম’ ( ২০১৪ সাল, ‘হুডিনির তাঁবু’ প্রকাশনা, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ), ‘বন-পাহাড় থেকে সে কেনই-বা ফিরবে এ কারখানায়’ (২০১৭ সাল, ‘কবীরা’ প্রকাশনা, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ) এবং অবধি সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ঘুমের চেয়ে প্রার্থনা শ্রেয়’(২০১৯ সাল, ‘বেহুলা বাংলা’ প্রকাশনা, ঢাকা, বাংলাদেশ)। কবিতা লেখার পাশাপাশি নানা বিষয়ে নিয়মিত গদ্য লেখালেখি করেন। একটি ছোটগল্প সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে প্রায় এক দশক আগে, নাম ‘অপর লিখিত মনোলগ ও কয়েকটি প্যারালাল কাট’ (‘হুডিনির তাঁবু’ প্রকাশনা, ২০১০ সাল) কাব্যচর্চার পাশাপাশি চলচ্চিত্রচর্চা ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত। ২০১২ সালে নির্মাণ করেন ‘প্রিয় মরফিন’ নামক পূর্ণদৈর্ঘ্যের একটি স্বাধীন চলচ্চিত্র। এক সময় কবিতা পত্রিকা ‘লালন’-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে অনলাইন ‘প্রতিপক্ষ’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। আরেকটি পরিচয়, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একজন সমাজকর্মী। পেশা মূলত সাংবাদিকতা। আগ্রহ বঙ্গের ভাবান্দোলন পরম্পরায়।

Share