
।। অনামিকা বসুধা ।।
পশ্চিমি ভাবধারার জড়বাদের বাজার আধিপত্য গিলে খাচ্ছে প্রান্তিক ছোটো শিল্পগুলিকে। বারবার এ আক্ষেপ করেছেন ঋত্বিক। অযান্ত্রিক-এ অনায়াসে এর সাথে মিশিয়ে দিচ্ছেন উপনিবেশসূত্র। ভারতে খ্রিস্টীয় উপনিবেশ আগ্রাসনে হিন্দু সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ এবং আদিবাসী সমাজজীবনে, পরিচয়ে বড়ো প্রভাব পড়ে। তার উপস্থাপন হিসেবে অযান্ত্রিক-এ পাই কবরখানা। খ্রিস্টের ক্রস কলোনিয়াল আধিপত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আদিবাসী রমণীর বিলাপ অকালমৃত্যু ও হারিয়ে যাওয়ার কথা বলে। উপনিবেশ আগ্রাসনে হারিয়ে গিয়েছে তাদের সভ্যতা, পরিচয়। খ্রিস্টের ক্রস ধর্ম বদলের কথা বলে। হারিয়ে যাওয়া, মরে যাওয়া পূর্বজদের জন্য যেমন, তেমনই প্রান্তিক মানুষের ভবিষ্যৎহীনতার আশঙ্কা এই কান্নায় ভিজে আছে। মৃত শিশুর কবর এই মৃত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত করতে পারে। মূলস্রোতের বাইরে থাকা প্রিভিলেজ-হীন এই আদিবাসী সমাজ শাশ্বত ছন্দ হারানোর কান্না কাঁদে। মূলস্রোতের বাজারের পাশে তাদের এই কবরস্থল। সেখানে চাপা পড়ে আছে হারিয়ে যেতে বসা জনগোষ্ঠীর বেদনা। কান্নার বেদনার সুরটি তাই জোরদার হয়। সুবোধ ঘোষের গল্পেও কবরের অনুষঙ্গ স্পষ্ট আছে— জগদ্দল মারা যাওয়ার সময় অর্থাৎ তাকে ভেঙে যখন লোহার তাল করে তোলে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী, সব হারিয়ে শেষে বিমলের হাহাকারের সাথে মিশে যায় প্রান্তিক, হেরে যেতে থাকা জনগোষ্ঠীর হাহাকার। তাকে বহুস্তরীয় মহাকাব্যিক করে তোলেন ঋত্বিক। আদি অধিবাসীদের ঐতিহ্য হারানোর প্রতীক তাই এই কবর। মূল ভূমি-সন্তানদের অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের, অপস্রিয়মাণ কৃষিভিত্তিক সভ্যতার ক্রন্দন, যন্ত্রের গ্যারাজের অন্দরে প্রবেশ করে। একটি ইন্দুর (ইঁদুর) জেগে থাকে। ঋত্বিক সাউন্ডস্কেপে জলতরঙ্গ তোলেন। জগদ্দলের তন্ত্রী কেঁপে ওঠে।
অযান্ত্রিক— মহাবিশ্বের মাইক্রোকোজম ও ভুবনগান: জীবন সূত্র ও সভ্যতার বিলাপ
All that is solid melts into air, all that is holy is profaned, and man is at last compelled to face with sober senses, his real conditions of life and his relations with his kind.
—কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো
১
১৯৫৭-র গ্রীষ্ম-সময়। ঋত্বিক কুমার ঘটক শেষ পর্যন্ত শুরু করতে পারছেন তাঁর দ্বিতীয় চলচ্ছবি— অযান্ত্রিক। শেষ করছেন ১৯৫৮-এ। ইংরেজি নামকরণ শেষ অবধি ঠিক হল— প্যাথেটিক ফ্যালাসি। কাহিনিসূত্র সুবোধ ঘোষের চার পাতার ছোটোগল্প। ইংরেজি নামটা সম্ভবত জন রাসকিনের ১৮৫৬ সালের প্রবন্ধ ‘অফ প্যাথেটিক ফ্যালাসি’ থেকে নেওয়া হচ্ছে। আর ‘অ্যাডাপটেশন’ বলতে ঘটক নিচ্ছেন, শুধু যন্ত্রের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি। বাকি যা মহাবিশ্ব তৈরি করেছেন ঋত্বিক, তা আসলে সেভাবে সুবোধ ঘোষের গল্পের শস্য নয়। গল্পটির মূল অভিঘাত ছাড়িয়ে ঋত্বিক একে করেছেন— মহাজাগতিকভাবে বহুস্তরীয়। আদি, আধুনিক ও ঐতিহাসিক। ভারত ভূখণ্ডের নৃতত্ত্ব ও তার নির্যাস, মার্কসীয় অভিজ্ঞান, বাজার ব্যবস্থা, ইয়ুঙ্গীয় মনঃসমীক্ষণ, উপনিবেশবাদ, প্রান্তিক অ্যাবরিজিনাল জীবনচরিত— সব জারিয়ে তুললেন পরদায়। আমরা সাক্ষী থাকলাম দুই ঘণ্টা ধরে পরদায় ঘটে চলা এক স্ট্রিম অফ কনশাসনেস-এর। তাঁর ইতিহাসবীক্ষা ও মনঃসমীক্ষা পরতে পরতে ভাঁজ খুলছে ও তুলছে। তিনি এপিক নিয়ে কাজ করার অধিকারী। তাঁর হাতে পড়ে এ আখ্যান হয়ে উঠেছে, মহাভারতসম আধুনিক এপিক।
যদিও ঋত্বিক Some Thoughts on Ajantrik-এ সুবোধ ঘোষের গল্প সম্পর্কে অনেকটাই আলোচনা করেছেন। তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ আগ্রহের কথাও বলছেন। কিন্তু ওঁরাওদের অন্তর্ভুক্তি থেকে গাড়ির আরোহীদের চরিত্রসমূহ-সহ বাকি সব ঘটনাবলিই পরিচালকের নিজস্ব দেশবোধ ও কালজ্ঞানেরই মৌলিক অন্তর্ভুক্তি। বৃহৎ ভারত-মঙ্গলের এক মাইক্রোকোজম— ব্যাপ্ত ভুবনকে সংকোচ করে টেনে এনেছেন এই আধা মফস্সলে। তৎকালীন এক বিহার বাজারে। একটি গোটা সমকালীন বিশ্বকে ঠুসে দিয়েছেন এই লোক্যেলে (locale)। টেনে এনেছেন এমন ভৌগোলিক অবস্থানে, যেখানে ক্ষয়িষ্ণু মালভূমি বেয়ে গড়িয়ে গেলেই উঠে আসছে আদিবাসী গাঁও, অরণ্য, আবহমান সভ্যতা। তাঁর এই লোক্যেলে লোকোমোটিভ, রেলগাড়ি হয়ে উঠছে আধুনিকতার অন্যতম অবিচ্ছিন্ন মেটাফর। আর রয়েছে ভরা বাজার। সেখানে সবাই হয় ক্রেতা, নয় দোকানদার। ভুবনায়নের এই মডেল যখন তৈরি করছেন ঋত্বিক কুমার ঘটক, সাল তখন মাত্র ১৯৫৭।
ফিল্ম ক্রিটিক ও সিনেমার থিয়োরিবিদরা বারবার সাইকো-অ্যানালিসিসের কাছে এসেছেন, কারণ সিনেমা অনেক সময়েই মেটাযুক্তির কাছে এসে আপাত-অযুক্তির দিকগুলিকে সাইকো-অ্যানালিসিসের কাছে বুঝে নিতে চায়। এখানে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে— ঋত্বিক ছিলেন ইয়ুংপন্থী সাইকো-অ্যানালিসিসের অনুসারী, আর ফিল্ম স্টাডিজে যে সাইকো-অ্যানালিসিস আমরা ‘মূলত’ ব্যবহার করে চলি, তা হল লাকানিয়ান সাইকো-অ্যানালিসিস। মার্কসীয় সাইকোর অনুপ্রবেশ সিনেমার আলোচনায় ঘটছে— ১৯৬৯ থেকে। ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের হাত ধরে। আর লাকানিয়ান তত্ত্ব আসছে ১৯৭০-৮০-তে। যা ফ্রয়েডিয়ান থেকে আলাদা। আর ইয়ুঙ্গের সাইকো ডায়ানামিক থেকেও। লাকা ও ইয়ুঙ্গের পদ্ধতি দুস্তর পৃথক। কখনো কখনো বিরুদ্ধও বলা যেতে পারে।
ঋত্বিক নিজে ইয়ুং-পন্থী হলেও, আলোচনার জন্য ইয়ুংয়ের যথেষ্ট এম্পিরিকাল এভিডেন্স না থাকায়— আমি নির্ভর করতে চাইব— ঋত্বিক কী ব্যাখ্যা দিতে পারতেন— বা চাইলেন তার ওপর। আবারও, যদিও তা ইয়ুং-নির্ভর।
এ করতে গিয়ে ফাঁদেও পড়ব। কারণ আমাদের উন্মুক্ত ও গোপনেচ্ছায় কেবলই মনে হয়— সাইকো-অ্যানালিসিস এক প্যান্ডোরার বাক্স— তাহাতে চাবি ঘোরালেই মানে বাহির হয়। অধুনান্তিক, অনেকান্ত কালে সিগনিফায়ার, সিগনিফায়েড তামাদি হতে চললেও, আমাদের মস্তিষ্কে সে ভাবেই মানে-র জন্ম হয়। অতএব আমরা প্রতীক অন্বেষণে।
২
সারা ছবিতে সিম্বলিজমের যে খেলা চলে, তা প্রধানত ঘনিয়ে ওঠে যন্ত্র ও তার ‘অপর’ হিসেবে দাঁড় করানো আবহমান জীবনস্রোতকে ঘিরে। যন্ত্র প্রসঙ্গে ঋত্বিক জড়বাদ আনছেন। মার্কসীয় সমালোচনার ধারায় দ্বন্দ্বমূলক জড়বাদ। আনছেন মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি— লোকোমোটিভ-এর মোটিফ। আর জীবনসূত্র প্রসঙ্গে অবধারিতভাবে আনছেন— ‘মা’কে। তাঁর পছন্দের ইউঙ্গীয় মাদার কমপ্লেক্স। তাঁর ভাষায়— বেসিক প্রাইমর্ডিয়াল ফোর্স। আর আনছেন— Law of life বা জীবনসূত্র। সাঁকো নাটক থেকেই এই মতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ শুরু। ‘জীবনটা জীবিতের, যারা বেঁচে আছে তাদের জন্য’— সাঁকো নাটকে এ কথা ব্যবহার করা হয়েছিল। আর অযান্ত্রিক সম্পর্কে ঋত্বিক জানাচ্ছেন—
You can call my protagonist, Bimal, a lunatic, a child, or a tribal. At one level they are all the same. They react to lifeless things almost passionately. This is an ancient, archetypal reaction…. The tribal songs and dances in Ajantrik describe the whole cycle of life—birth, hunting, marriage, death, ancestor worship, and rebirth. This is the main theme of Ajantrik, this law of life.
এই ‘ল অফ লাইফ’— যা কিনা কৃষিভিত্তিক সভ্যতার (“which sets off the cycle of existence in an agrarian society—let the earth drink deep, let her be fruitful, let her nourish her children.”)। সারা ছবিতে একথা ঘনিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন এবং শেষ দৃশ্যে তাকে সরাসরি মান্যতা দিচ্ছেন। জগদ্দলকে লোহার দরে বিক্রি করে বিমল মুখ ধুতে যায় নদীতে। জলের পাড় থেকে সে মুখ তোলে— মনে হয় ঋত্বিক বলতে চাইছেন— লেট হার নারিশ হার চিলড্রেন। তাঁর চরিত্রনির্মাণ, আখ্যানের অংশ, মিজ-অন-সিন, সবই হয়ে ওঠে সিম্বলিজমের সমাহার। তাঁর ভাষ্যে উঠে আসে যে জীবনসূত্র— তা যেন একদিকে শাশ্বত সহজ ও যান্ত্রিক, আদি ও আধুনিক এই ধরনের বাইনারিরও আভাস দেয়। তাই জন্ম, মৃত্যু, প্রেম, বিবাহ, সন্তান, জীবিকা— জীবনচক্রের সব কিছুকে আলোচনায় আনছেন তিনি। এই আলোচনার দুই ধার বেয়ে বয়ে চলে— একদিকে আধুনিক যন্ত্র সমাজ, অপর দিকে আদি ভূমিসন্তান, বহমান আদিবাসী সভ্যতা। একদিকে অরণ্য, আদিবাসী গাঁও, হাট, অন্যদিকে ট্যাক্সিস্ট্যান্ড, গ্যারাজ, হোটেল, ভরা বাজার। এই দুইয়ের মাঝে হাইফেনের মতো দাঁড়িয়ে থাকে একটি ব্রিজ। আর তার তলা দিয়ে চলে যাওয়া টানেল। সেতুর তলায় টানেল দিয়ে যাতায়াত করে রেলগাড়ি। আর ব্রিজের ওপর দিয়ে যাত্রা করে জগদ্দল। এই এপার ওপার বন্দোবস্তে তার প্রো-ফিল্মিক-এ স্থানিককে আনার চেষ্টা। নানা খদ্দেরকে সে এই পারের ট্যাক্সিস্ট্যান্ড থেকে ওপারের আদিবাসী গাঁওয়ের দিকে নিয়ে যায়। কখনও পৌঁছে দেয় রেলস্টেশনে। কখনো বা আদিবাসী ওঁরাওরা তার খদ্দের হন। রোডমুভির ধাঁচায় সমস্ত সময় জুড়ে যাতায়াত জারি থাকে। বিমল যেন মূল সভ্য সমাজ আর প্রান্তিক আদি সমাজের মধ্যে যোগাযোগের ডাকহরকরা। কিন্তু উভয় সমাজেরই সে বাইরের লোক। তার আত্মীয়তা যান্ত্রিক। সে যান্ত্রিকতার ওপর ভরসা তাকে মানবিক আত্মীয়তায় যুক্ত করতে পারে না। হাসিকে সে পায়না। গ্যারাজের বাচ্চাটি তাকে ভালোবাসলে তাকে সে আঁকড়ে ধরতে পারে না। সে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু শেষ দৃশ্যে সে যান্ত্রিক আশ্রয়ের বদলে মানবশিশুর ওপর আস্থাশীল হয়ে ওঠে। এক মানবশিশু— যে যন্ত্রের ওপর নর্ভরশীল নয়, যন্ত্রকে সে খেলাচ্ছলে বাজায়। সম্ভবত এই উত্তরণের আখ্যানই বুনতে চেয়েছেন ঋত্বিক। কিন্তু তার উপাদান জটিল। শিশুর সারল্যকেও প্রশ্ন করেছেন আখ্যানে। এর আগে বিমলকে গেয়ে উঠতে শুনেছি— “কালো মেয়ের পায়ের তলায়” শ্যমাসংগীতটি। মাতৃশক্তি-বন্দনা, তাঁর প্রিয় মাদার আর্কিটাইপের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। বিমল তার কালো জগদ্দলের কাছে বসে এই গান গায়। ঋত্বিক প্রসঙ্গে মাদার-আর্কিটাইপ এক বহু আলোচিত বিষয়। আমি সরাসরি ঋত্বিক থেকেই উদ্ধৃতি রাখছি।
এবং এই Great Mother সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির চেতনায় আজও haunt করছে। এর দুই রূপ—এক হচ্ছে বরাভয়, Sophia, আর-এক হচ্ছে ত্রাসদাত্রী কালী, চণ্ডীর রূপ! আমাদের পুরাণে এই দেবীকে একত্রে দুই রূপে কল্পনা করা হয়েছে, ‘দেবীসূক্ত’! এবং আমাদের সমাজের মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে আছে এই মাতৃভাবরূপী archetypeটি। বাংলাদেশের সমস্ত আগমনী বিজয়ার গান, লোককথার সমস্ত গভীর দিকগুলো এই সাক্ষ্যই বহন করছে।
(প্রবন্ধ: ‘মানব সমাজ, আমাদের ঐতিহ্য, ছবি করা ও আমার প্রচেষ্টা’)
সেই মাদার-কাল্ট থেকেই আবার জগদ্দল হয়ে উঠল বাৎসল্যর আইকন। মা ও সন্তানের সম্পর্কের। সন্তান ভালো থাকবে বলে মন্দিরে পুজো দিতে হয়, এ কথা জেনে বিমল আশীর্বাদি ফুল বুকপকেটে ঢোকায়। বিমল অকৃতদার। কিন্তু কে তার সন্তান, ঠিক তার পরের দৃশ্যেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। জগদ্দলকে লক্ষ্য করে শিশুরা কাদা ছোড়ে। তামাশায় মাতে। মূলস্রোতে বড়ো হওয়া শিশুদের আক্রমণ, উপহাসের পাত্র হয় বিমল ও জগদ্দল। সন্তানের মতো সে বুক পেতে আগলায় জগদ্দলকে। শিশুদের এই নিষ্ঠুরতার দিকটি মূলস্রোতের সাথে তার বিচ্ছিন্নতাকেই ইঙ্গিত করে। অপর দিকে শিশু শ্রমিক সুলতানের সাথে তার সরল বন্ধুত্বে সে সমাদর অনুভব করে। কিন্তু সুলতানও তারই মতো সমাজবিচ্ছিন্ন— একলা। একদিকে সমাজের মূলস্রোত-গোষ্ঠী যেমন তাকে কাদা ছুড়ে দেয়, আবার তেমনই শেষ দৃশ্যে একটি শিশু মৃত জগদ্দলের হর্নটিকে পরম আদরে বাজাতে থাকে। যন্ত্রের হাতে মানুষ না, মানুষের কোমল হাতে যন্ত্র— এই অদেখা সভ্যতার প্রতি আস্থাশীল হচ্ছেন ঋত্বিক। যন্ত্রের হাত থেকে ছাড়া পায় বিমল। তার অসুখ সেরে যায়।
The idea of the machine has always had an association of monstrosity for us. It devours all that is good, all that is contemplative and spiritual. It is something that is alien to the spirit of our culture—the spirit of ancient venerable India. It stands for clash and clangor, for swift, destructive change, for fermenting discontent.
— ঋত্বিক ঘটক, ‘Some Thoughts on Ajantrik’
মাদার আর্কিটাইপ থেকে বাৎসল্য থেকে বিবাহ ও মিলনের কাছে আসেন ঋত্বিক। বিমল হাসিকে পরিত্যক্তা অবস্থায় আবিষ্কার করে। তার প্রেমিক তাকে প্রতারণা করে চলে গেছে। প্রতারিতা হাসির সাথে বিমলের মিলনের আভাস তৈরি হয়। জগদ্দল এই মিলন মেনে নেয় না। সে পৌঁছে দেয় না বিমলকে হাসির কাছে। রাস্তায় বিগড়ে যায়। স্বাভাবিক মানবিক জীবনাচরণে যন্ত্র বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অপর দিকে আদিবাসী মূলভূমিসন্তানেরা চিরায়ত সভ্যতার অরণ্যের ভেতর অস্তিত্বের মিছিল করে। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, শিকার, এই নিয়ে জীবন বয়ে চলেছে। অরণ্যের শেকড়ে তাদের শেকড়। ক্ষয়িষ্ণু মালভূমি ফালাফালা করে ধরিত্রীর বুক চিরে চলে যাওয়া ইস্পাতের রেলগাড়ি বা জদদ্দল কেউই এই অবিচ্ছিন্ন জীবনস্রোতকে স্তব্ধ করতে পারে না।
“সভ্যতার মৃত্যু নেই। সভ্যতা পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সভ্যতা চিরদিনের। Individual মানুষ মরণশীল, কিন্তু মানুষ অমর।”— চিত্রবীক্ষণ (ঋত্বিকের সাক্ষাৎকার)
বিমলের গাড়ি-যন্ত্রপ্রীতির যে ফেটিশ, তার যে অসাড়তা, তা ঋত্বিকের সেই ঝাপট— “আরও ভালো মাধ্যম পেলে সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাবো”-কে মনে পড়ায়। যন্ত্র ও যান্ত্রিক মাধ্যম— যেমন সিনেমা, শিল্পকে ধরার ও মানুষের কাছে পৌঁছবার যোগাযোগের মাধ্যম, তার চেয়ে বেশি না। গাড়ি-যন্ত্র মানুষের পরিবহণের মাধ্যম। সে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। মানুষের সাথে যোগাযোগ ঘটাবে। বিচ্ছেদ নয়। জগদ্দল বিমলকে হাসির কাছে পৌঁছে দিতে পারে না। সে নিজেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার ফেটিশ তাকে সংকীর্ণ করে তোলে। সে জীবনের পরিসরটিকে দেখতে পায় না। আধুনিক মানুষের অটোমোবাইল অবসেশন, ডুলিটিল (Doolittle) একে বলবেন— “the silent, always-ready servant”। এডনা ডাফি তাঁর The Speed Handbook (2009) গ্রন্থে এক আশ্চর্য আলোচনা করেছেন আধুনিক মনোবিজ্ঞানে অটোমোবাইলের প্রভাব বিষয়ে। তাঁর মতে, “speed is the single new pleasure invented by modernity and the experience of speed is political”। তাই জগদ্দলকে দেখি দৌড়ে চলতে। সুলতান জগদ্দলকে খেলাচ্ছলে চালাতে চায়। কিন্তু তার গতি থামাতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তা উচ্ছলিত সহজ মেয়েটি— হাসিকে চাপা দেওয়ারও উপক্রম করে প্রায়। যন্ত্র সভ্যতার আক্রোশ, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার অসফলতার রাজনৈতিক ব্যাখ্যাটি ও তার ম্যানিফেস্টেশনকে এখানে ফুটনোটে ঢুকিয়ে দিলেন ঋত্বিক। রেলগাড়ির সাথে দৌড়েও জগদ্দলকে নিয়ে টেক্কা দিতে চায় বিমল। গতির সাথে তার প্রতিযোগিতা। অনেকবার সে সফল হয়। শুধু হাসিকে সে ধরতে পারে না। আদিবাসী মানুষের দৈহিক শ্রমের বিনিময়ে সে আবার বাজারে ফেরত আসে। শেষ পর্যন্ত মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর হাতে তার এন্তেকাল ঘটে।
৩
The moment an artist selects a frame, lays out his plan of montage, he has already started reshaping his raw material. His soul has entered there. A single composition is as finite as any Senecan tragedy. It is bound by the conscious and unconscious of the artist.
—Theory of Film, Dr. Sigfried Kracauer, An Attitude To Life And An Attitude To Art
ঋত্বিক বারবারই আমাদের বিস্মিত করেছেন তাঁর লং-শট ইমেজ, অদেখা ক্লোজ-আপ ও অসামান্য ডেপথ অফ ফিল্ড, ডিপ ফোকাস দৃশ্যগ্রহণের প্রয়োগে।
বিশালাকার ক্যানভাস, তাতে ডিপ ফোকাসে বহুস্তরীয় আয়োজন। যেমন— ফোরগ্রাউন্ডে হাসি ওরফে কাজল গুপ্তর মুখ, মধ্যবর্তীতে জগদ্দল ও বিমল, ব্যাকগ্রাউন্ডে পাহাড় এবং মালভূমি। এ জিনিস আমরা কোমল গান্ধার-এ আবার দেখব। কিন্তু ভারতীয় সিনেমায় এর আগে আর বেশি বা একদমই দেখব না। দ্বি-ডাইমেনশনে এই স্তরীয়-ক্যানভাস, এতে মিজ-অন-সিন সাজাচ্ছেন তিনি। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, শিল্পীর এটি দ্বিতীয় ছবি, প্রথম বললেও ভুল হয় না। কারণ নাগরিক করার সময় শিল্পের জোগান নিয়ে ঋত্বিক সন্তুষ্ট ছিলেন না। হাসি অর্থাৎ কাজল গুপ্তকে রাখছেন ফোরগ্রাউন্ডে, তার মুখোমুখিতে জগদ্দল— একেবারে ‘হেড অন’ পরিস্থিতি তৈরি করে চাইছেন। এই সূত্র ধরে রাখলে দেখব, জগদ্দলের ব্যবহারও সমানুপাতিক। হাসিকে নিয়ে গাড়ি চলবার সময় সে একাধিক বিশৃঙ্খলা প্রদর্শন করে। মিলনের যে আভাস তৈরি হয়, তাকে বানচাল করে ফ্যালে জগদ্দল। এর আগে জগদ্দলকে পাশে নিয়ে প্রতিকৃতি তুলতে দেখা গেছে বিমলকে। এই ঘটনা ঘটে বিবাহের বরযাত্রী নিয়ে যাওয়ার পরের দৃশ্যে। অর্থাৎ এক ধরনের বিবাহ ইচ্ছা ঘনিয়ে তোলা। আবার জগদ্দলের সাথে ছবি তোলার সময় সে নব বরের মতো সাজগোজ করে আসে, এখানেও রোম্যান্টিক ইচ্ছার আভাস গোচরে আসছে। একই চরিত্রের প্রেক্ষিতে তিনটি আলাদা মূল মানবিক সম্পর্কের একটা জটিল মিশ্রণ। এ জিনিস সুবোধ ঘোষ কেন, মহা বা পাতি কোনো ভারতেই নেই।

কিন্তু বিবাহ ইচ্ছা, প্রেম, সন্তান ইচ্ছা, কোনোটাই পূরণ হয় না বিমলের। এ শাস্তি সে কেন পায়?
এর সূত্র থেকে সরে যেতে যেতে দীপেশ চক্রবর্তীর থেকে একটি উল্লেখ রাখছি উত্তর-উপনিবেশ আধুনিকতা প্রসঙ্গে: “Modernity is easy to inhabit but difficult to define”। এই আর কী।
ঋত্বিক আধুনিকতা প্রসঙ্গে কমোডিটি ফেটিশিজম বারবার ভিন্ন প্রেক্ষিতে নিয়ে আসছেন। বিমলের গাড়ি-ফেটিশের পাশাপাশি নারীর গহনাও জড়বাদের বিষয় হচ্ছে। শহুরে সভ্যতা, করাপ্ট নাগরিকতা নারীর সেজে ওঠা রূপটি হরণ করে। প্রতারক প্রেমিক গহনা চুরি করে পালিয়ে যায় মেয়েটিকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সেই অনুষঙ্গ আবারও টেনে নিচ্ছেন আদিবাসী নারীর চরিত্রে। তা আরও জটিল হয়ে উঠছে— যখন দেখি জগদ্দল বিকল হয়ে পড়ায় আদিবাসীরা আধুনিক এই সভ্যতার প্রতীক এই যন্ত্রটিকে ঠেলা দিচ্ছে। তাদের কায়িক শ্রমে বলবান হচ্ছে যন্ত্রটি।
সারা ছবিতে একটি আশ্চর্য দৃশ্য বার বার আসছে। প্রায় রেফ্রেইনের পর্যায়ে টানেলের গহ্বর ভেদ করে দিয়ে রেলগাড়ি ছুটছে। ফ্যালিক সিম্বলিজম ঘনিয়ে ওঠে। আমি বলব— সরাসরি। ঋত্বিক ঘটক মাদার কাল্টের পাশাপাশি, ভারতীয় তন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন। এ ধরনের বই তাঁর সংগ্রহে ছিল। লিঙ্গ-যোনির এই সিম্বলিজমের এই অতি আধুনিকতম ব্যবহার সম্পর্কে তিনি একাধিক পাঠ ও পুনঃপাঠের অবকাশ আমাদের জন্য রেখে যাচ্ছেন।

তাকে আরও সুসংহত করতে এই দৃশ্য ও সংলাপ আনছেন ঋত্বিক। আদিবাসী নারীটি বসে আছে গাড়ির পাটাতনে। প্রেম ও শৃঙ্গারে পূর্ণ তার মন। সে বাক্যালাপ করে যায় তার প্রেমিকের সাথে। প্রেমিককে মজাচ্ছলে জানায়— তাকে রুপোর হাঁসুলি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যেন ভুলে না যায় তার প্রেমিক। সমাজ ও সভ্যতা ভেদে এই বস্তুবাদ স্বাভাবিক। কিন্তু সহজ জীবনের এই সহজ বস্তুবাদ পাশাপাশি মূলস্রোতের জড়বাদ অভিলাষকে অস্বস্তিকর ও কপট করে তোলে। অযান্ত্রিক এতই বহুব্যাপ্ত ও ঋত্বিক ঘটকের মতো দাউ দাউ জ্বলতে থাকা প্রতিভা এতই দুর্বার যে হাউইয়ের গতিতে তিনি একাধিক ডিসকোর্স আমাদের সামনে এনে ফেলতে থাকেন। দক্ষ ডুবুরি না হলে আমরা হাবুডুবুই খাই যখন দেখি ধনবাদ ও জড়বাদের গ্লোবাল ডিসকোর্সের ভাঁজে মাত্র একটি মাত্র সংলাপ খরচ করে তিনি ঢুকিয়ে দিচ্ছেন ক্ষয়িষ্ণু গ্রামীণ, দেশজ শিল্পের বাজার-অসফলতা। সারা আখ্যান জুড়েই আদিবাসীদের গ্রাম থেকে শহর ও শহর থেকে গ্রামে আসা যাওয়ার মাঝে আবহে আদিবাসী সংগীত ও বাদ্যের শব্দ জেগে থাকে। জগদ্দলের যাত্রাপথে পড়ে ছোটো ছোটো আদিবাসী হাট। এমনই এক হাট থেকে কিছু কেনার আবদার করে হাসি। সেই সামান্য দুল হাতে নিয়ে মুগ্ধ হয় সে। এবং প্রান্তিক শিল্পকে ট্রিবিউট করার সাথে সাথে বাহির বাজারে শিল্পটির সমাদরহীনতা ও প্রান্তিক মানুষের আর্থিক অসফলতাকেও এক আলোচনায় শামিল করেন ঋত্বিক। অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়ের জবানিতে একটি ছোট্ট সংলাপ— ‘আর দামেও কী সস্তা, মাত্র চার আনা’, প্রান্তিক ও মূল বাজার সভ্যতার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে এক ধাক্কায় আমাদের সামনে এনে ফেলে। এ প্রসঙ্গে অন্যত্র ঋত্বিক লিখছেন—
The destruction of a people’s art is the destruction of their life, by which they are reduced to the proletarian status of hewers of wood and drawers of water, in the interests of the foreign trader whose is the profit… We are irresponsible, in a way that the Orientals are not yet, for the most part, irresponsible.
নেহরুর ‘নেশন বিলডিং’ যুগের থেকেই আদিবাসী মূলভূমি মানুষের সম্পদ হারিয়ে ফেলার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল। “১৯৫০-এর শুরুতেই যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো করেই ভারত বেছে নিয়েছিল উন্নয়নের মডেল বিশাল বিশাল স্টিল-কারখানা (ভিলাই, বোকারো প্রকল্প) কিংবা বিশাল বিশাল বাঁধ বা জলাধারগুলো— যেগুলি অর্থনীতির মূল বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এমন একটি যুগ ছিল এটা যখন ব্যক্তিমালিকানাধীন ও কাঠামোগত সমন্বয় করার মাধ্যমে এসব ঘটনা ঘটছিল অকল্পনীয় গতিতে।” বলছেন অরুন্ধতী রায়। ঋত্বিক তাঁর অযান্ত্রিক-এ নিয়ে আসছেন ‘উন্নয়নের’ দৃশ্যসমূহ। রোপ ট্রলির আনাগোনা। আদিবাসীদের মজুর হওয়ার ইঙ্গিত। আজকের দিনে বসে— কী প্রফেটীয় ছিল সে ইঙ্গিত, তা আমরা পোস্ট ও আরও পোস্ট কলোনিয়াল, আরও ডিকলোনাইজেশনের হাড়-মজ্জায় বসে হিম হয়ে টের পাচ্ছি।
পশ্চিমি ভাবধারার জড়বাদের বাজার আধিপত্য গিলে খাচ্ছে প্রান্তিক ছোটো শিল্পগুলিকে। বারবার এ আক্ষেপ করেছেন তিনি। অযান্ত্রিক-এ অনায়াসে এর সাথে মিশিয়ে দিচ্ছেন উপনিবেশসূত্র। ভারতে খ্রিস্টীয় উপনিবেশ আগ্রাসনে হিন্দু সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ এবং আদিবাসী সমাজজীবনে, পরিচয়ে বড়ো প্রভাব পড়ে। তার উপস্থাপন হিসেবে অযান্ত্রিক-এ পাই কবরখানা। খ্রিস্টের ক্রস কলোনিয়াল আধিপত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আদিবাসী রমণীর বিলাপ অকালমৃত্যু ও হারিয়ে যাওয়ার কথা বলে। উপনিবেশ আগ্রাসনে হারিয়ে গিয়েছে তাদের সভ্যতা, পরিচয়। খ্রিস্টের ক্রস ধর্ম বদলের কথা বলে। হারিয়ে যাওয়া, মরে যাওয়া পূর্বজদের জন্য যেমন, তেমনই প্রান্তিক মানুষের ভবিষ্যৎহীনতার আশঙ্কা এই কান্নায় ভিজে আছে। মৃত শিশুর কবর এই মৃত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত করতে পারে। মূলস্রোতের বাইরে থাকা প্রিভিলেজ-হীন এই আদিবাসী সমাজ শাশ্বত ছন্দ হারানোর কান্না কাঁদে। মূলস্রোতের বাজারের পাশে তাদের এই কবরস্থল। সেখানে চাপা পড়ে আছে হারিয়ে যেতে বসা জনগোষ্ঠীর বেদনা। কান্নার বেদনার সুরটি তাই জোরদার হয়। সুবোধ ঘোষের গল্পেও কবরের অনুষঙ্গ স্পষ্ট আছে— জগদ্দল মারা যাওয়ার সময় অর্থাৎ তাকে ভেঙে যখন লোহার তাল করে তোলে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী, সব হারিয়ে শেষে বিমলের হাহাকারের সাথে মিশে যায় প্রান্তিক, হেরে যেতে থাকা জনগোষ্ঠীর হাহাকার। তাকে বহুস্তরীয় মহাকাব্যিক করে তোলেন ঋত্বিক। আদি অধিবাসীদের ঐতিহ্য হারানোর প্রতীক তাই এই কবর। মূল ভূমি-সন্তানদের অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের, অপস্রিয়মাণ কৃষিভিত্তিক সভ্যতার ক্রন্দন, যন্ত্রের গ্যারাজের অন্দরে প্রবেশ করে। একটি ইন্দুর (ইঁদুর) জেগে থাকে। ঋত্বিক সাউন্ডস্কেপে জলতরঙ্গ তোলেন। জগদ্দলের তন্ত্রী কেঁপে ওঠে। বিমল প্রাণপ্রতিষ্ঠা চায় জগদ্দলের। সে আপ্রাণ পরিশ্রম করে। সভ্যতার আত্মাটিকে স্পর্শ করাতে শুরু করেন ঋত্বিক ঘটক। শুরু সরোদ আর জলতরঙ্গের অভিনব ফিউশন।
বিমল জগদ্দলের যান্ত্রিক বিফলতা মেনে নিতে পারে না। জগদ্দলের কর্মশক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে। ঘনিয়ে আসে এন্তেকাল। এন্তেকালের আগে একবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে জগদ্দল। বিমল তাকে সর্বশক্তি দিয়ে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করে। সারা রাত কাজ করে সবাইকে চমকে দিয়ে সচল জগদ্দলকে নিয়ে ভরা বাজারের থেকে বিমল পাহাড়ের রাস্তায় গেলে সে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে। জগদ্দলকে শেষ চেষ্টা, সর্বস্ব দিয়েও বাঁচাতে পারে না বিমল। ক্ষোভে, যন্ত্রণায় সে উচ্চারণ করে ‘লোহার বাচ্চা’। যন্ত্রকে মানুষ ভাবার বিস্মরণটিরও শেষ হয়। বিমলের অসুখ সেরে যায়। একটি ক্লোজ-আপে তার আত্মা জলের কাছে, শস্যের ওপর মুখ তোলে। কৃষি সমাজ ও যন্ত্র সভ্যতা মিলেমিশে যায়।
ক্লোজ-আপ ঋত্বিকের পরীক্ষার বিষয়। বারবার এ নিয়ে পরীক্ষা করেছেন তিনি। করেছেন কোমল গান্ধার-এ, সুবর্ণরেখা-এ, মেঘে ঢাকা তারা-এ।
জগদ্দলের সাথে হাসির যে ক্লোজ-আপ, তা ঋত্বিকের সিগনেচার ক্লোজ-আপ। শুধু মুখটিকে ব্যবহার করে ডিপ ফোকাস ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করা। আবার রেলস্টেশনে হাসির মুখমণ্ডলকে ব্যবহার করেছেন কিয়ারোস্কিউরোর এফেক্টে। হাসির প্রায় সংলাপহীন চরিত্রে এই একটি শটেই আলোর ব্যবহার বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয় তার অন্তর্দ্বন্দ্বের জমিনটিকে।


এই রেলস্টেশনেই আরেকটি চমকপ্রদ ক্লোজ-আপের ব্যবহার বিস্মিত করে আমাদের। হাসির ট্রেন চলে যাওয়ার পর, বিমলের ক্লোজ-আপের মতো ধরে রাখা মুখ ও মাথা শরীর থেকে ছিন্ন মনে হয়। আর পুরো ফ্রেম জুড়ে তার মাথার ওপর থাকে অপরিসীম আকাশ, রেলস্টেশন, জমিন। সবার নীচে তলিয়ে যাওয়া মানুষের মতো বিমলের মাথাটুকু ভেসে থাকে। আসলে পুরোপুরি ক্লোজ-আপ এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে না। সমস্ত spatio-temporal পরিসর ভেঙে, ছিন্ন করে এই ফ্রেম রাখলেন তিনি। ঋত্বিক যে সময় এই ফ্রেম নিয়ে নিরীক্ষা করছেন সে সময় ইন্ডাস্ট্রিতে এহেন ফ্রেমকে এন-জি বলে বাতিল করাই জায়েজ ছিল। এই অসম্ভব আত্মবিশ্বাসের মানুষটির সিনে-ভাষা নিয়ে যত না আলোচনা হল, তারচে’ বেশি হল তাঁর মাতাল-মিথোলজির আর্বান বিক্ষেপণ নিয়ে। হল আসলে আমাদের আত্মবিশ্বাসের অভাবে। আমাদের অর্বাচীন রোগে।


৪
“তখন আসে শব্দ সংমিশ্রণের স্তর। বিভিন্ন শব্দকে বিভিন্ন স্তরে বাজিয়ে তা সঠিক স্থানটিতে পৌঁছে দিতে হয়। কোনটি বা খুব জোরে, কোনটিকে বা শুধু অনুভূতির স্তরে বাজিয়ে তবেই গিয়ে ব্যাপারটা দাঁড়ায়।… তাই বলছিলাম, স্থিরচিত্র মুক্তি খুঁজছে গতির মধ্যে। মূক চলচ্চিত্র প্রগল্ভ হতে চেয়েছে, সশব্দ চিত্র সে আয়তন বাড়িয়ে দিয়েছে, নগ্ন হয়ে গেছে, অন্য একটা কিছু খোঁজার মধ্যে।”—ঋত্বিক ঘটক
রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে ট্রেন ও হাসিকে ধরতে চেয়ে বিমল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ইস্পাতের যন্ত্রের আওয়াজ বিমলের উদ্দেশে বলা হাসির কথাগুলিকে চাপা দিয়ে দিল। সাউন্ডস্কেপে ভেসে এল কিছু অস্পষ্ট নারী কণ্ঠের ধ্বনি, আর রেলগাড়ির গতি-ঝাঁপ। হাসি ও বিমল কমিউনিকেট করতে ব্যর্থ হল। তার প্রাণাধিক জগদ্দলও তাকে আর হাসির কাছে পৌঁছতে দিল না। সরোদে বেজে উঠল রাগ— কাফি।
ঋত্বিকের ছবির শব্দ-স্কেপ পৃথক প্রবন্ধ দাবি করে বরাবর। তাঁর সাউন্ড-ডিজাইনের যে অধি-প্রয়োগ তা ১৯৫৭ সাল কেন, ২০১৮-তেও অভিজ্ঞতায় আসা একরকম কষ্ট-মুমকিন। ঋত্বিক ‘সাউন্ড ডিজাইনিং’ এই পরিভাষা ব্যবহার করে যেতে পারেননি, ভারতে এই শব্দবন্ধের প্রবেশ তখনও ঘটেনি। হলিউডে ১৯৬৯ নাগাদ এই পরিভাষা ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু র্যাডিকাল কাজ বলতে, (যেভাবে আমরা জন কেইজ বা ফিলিপ গ্লাসকে বুঝি) কয়েকজনের নিরীক্ষা বাদ দিলে এবং পিঙ্ক ফ্লয়েড যুগের ‘কনসেপ্ট অ্যালবাম’ শুরুর আগে পর্যন্ত শব্দ নিয়ে দুস্তর চিন্তাভাবনা খুব বেশি উদাহরণে আসবে না। আর সাইকিডিলিক শুরু হচ্ছে ষাটের পরে। ও সত্তরে। যে সময় থিয়েট্রিক্যাল অভিনয় ও রামলীলার লিগ্যাসিতে গানবাজনা ভারতের ছবির দস্তুর (পশ্চিমি জ্যাজ বা বিদেশি সুরের আদলে প্লেব্যাক বাদে), অল্প কয়েকজনকে বাদ দিলে আবহ ও সিনে-ভাষার সংগীত নেহাতই টডলারসম, সে সময় সিনেমার আবহ ও সংগীত নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা তাঁর সময়ের থেকে দুস্তর এগিয়ে। সিনেমায় শব্দ, সংগীতের ব্যাপারে যে তাঁর সিরিয়াস চিন্তাভাবনা ছিল, তার একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ— যখন দেখি শিক্ষক হিসেবেও স্পষ্ট নজর রাখছেন এর প্রতি।
“In so far as film music is concerned, I think this is very much neglected in our syllabus. I suggest ‘Film Music’ by Kurt London should be included in the text. They must have a basic grounding for the use of music in cinema.”
পুনায় ভাইস প্রিন্সিপাল থাকাকালীন লিখছেন এক চিঠিতে, সম্ভবত, ফিল্ম স্কুলের সিলেবাস গঠনের সময়।
অযান্ত্রিক-এর টাইটেল সংগীত ও টাইটেল আবহটি শোনার আমাদের সৌভাগ্য হয়নি। কারওর বা কারও-কারও বিশেষ এডিটিং-ইচ্ছায় সে সৃষ্টিটি চিরকালের জন্যে হারিয়ে গেছে। যান্ত্রিক শব্দপট ও হিন্দুস্তানি মার্গ সংগীতের অত্যাশ্চর্য মিশেলে অযান্ত্রিক আমাদের মুগ্ধ করে রাখে। মিলন, বিচ্ছেদ, যন্ত্রের অভিব্যক্তি ও তাদের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ রাগমালা, সব কিছু মিলিয়ে জটিল এক সাউন্ড-স্কেপ উপহার দিয়ে গেছেন ঋত্বিক।
বুলাকি পাগলের গামলা জগদ্দল পিষে ফেলার পর সেই ভাঙা ভিক্ষাপাত্র নিয়ে মুখ তোলে বুলাকি পাগল— তার আর্তনাদ বোঝাতে এখানে মোটরের নন-ডাইজেটিক শব্দ ব্যবহার করেন ঋত্বিক, যা তিনি জগদ্দলের অভিব্যক্তি বোঝাতে বারবার ব্যবহার করছেন। পাহাড়ি পথের বাঁকে যখন এগোতে অস্বীকার করে জগদ্দল, তখন সংগীতকে বিযুক্ত করেন তিনি। বদলে নৈঃশব্দ্য ও ঝিঁঝির আবহ ঘনিয়ে তোলেন। সবথেকে গবেষণামূলক ও জটিল সাউন্ড ডিজাইনের প্রয়োগ ঘটেছে জগদ্দলকে সারিয়ে তোলার দৃশ্যে। ভারতীয় হিন্দুস্তানি মার্গ সংগীতে বিপুল পাণ্ডিত্য না থাকলে সংগীতকে আখ্যানের সাথে এভাবে যুক্ত ও বিযুক্ত করা যায় না। অযান্ত্রিকের সংগীত ও শব্দ সম্পর্কে একটি মূল্যবান আলোচনা করে রেখেছেন ঋতবান ঘটক:
“গির্জার ঘণ্টায় রাত তিনটে শোনা যায়। বিমল লণ্ঠন হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে জগদ্দলের গ্যারেজে যায়। গান চলতে থাকে, সঙ্গে জগদ্দলের বিচিত্র আওয়াজ। ভোর হলে বিমল স্ট্যান্ডে যায় গৌর মিস্ত্রির কাছে নতুন পার্টসের অর্ডার নিয়ে। ফিরে এসে নতুন করে জগদ্দলের ইঞ্জিন সারানোয় মন দেয়। এসময়ে একটি কম্পোজিশন সংগীত শোনা যায়, যেখানে সেতার ও সরোদের সঙ্গে জলতরঙ্গের ব্যবহার লক্ষণীয়। গির্জার ঘণ্টার আড়ালে দেখা যায় বিমল চাদর জড়িয়ে বসে। হাতে জগদ্দলের আয়নাটা। আবহে আদিবাসী রমণীদের সমবেত সংগীত শোনা যায়। মারোয়ারি ব্যবসায়ীর কথোপকথনের সময় সংগীত সাময়িক স্তব্ধ হয়ে আবার শুরু হয়।
ভাঙা জগদ্দলের বনেটটার ওপর আবার আবহে বিলাসখানি টোড়ি ফিরে আসে।
বিমল একমুঠো ধুলো তুলে নেয় গ্যারেজের ঘরে। স্প্যানারটা হাত থেকে পড়ে যায় জগদ্দলের ভাঙাচোরার শব্দে। আবহে বিলাসখানি টোড়ি।
বাচ্চার হর্নটেপার দৃশ্যে আবার স্বল্পক্ষণের জন্য বিলাসখানি টোড়ি ফিরে আসে। ফিরে আসে গির্জার ঘণ্টা, আর আদিবাসী রমণীদের সমবেত সংগীত—যেন নতুন ফসল ফলাতে চলেছে তারা। বিমলের কান্না–হাসি ভরা মুখে পরিপূর্ণতার স্বাদ। সবশেষে শুধু সমবেত মাদলের শব্দ।”
এবং অযান্ত্রিক শেষ হচ্ছে অব্যর্থ, দ্ব্যর্থহীনভাবে সুপ্রাচীন আদিবাসী শিঙা ও মোটর গাড়ির হর্নের মসৃণ শাব্দিক কেমোফ্লেজে। সহজ। এবং প্রগাঢ়।
৫
অযান্ত্রিক মহাকাব্যিক। এমনকী এসব ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত কেবল ওঁরাওদের দৃশ্যটি ও তার প্রস্তুতিপর্বটুকুই সিনেমার ইতিহাসে ভারতের অবদানের এক পৃথক কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। আর তা ঘটছে ঋত্বিক ঘটকের হাতে। আবারও। মাত্র ১৯৫৭ সালে।
ক্রিশ্চিয়ান মেজ সিনেমাকে ইম্যাজিনারি সিগনিফায়ার বলছেন। আর বড্রির ‘Ideological Effects of the Basic Cinematographic Apparatus’-এর ভিত্তি প্রশ্নই হল— কীভাবে ফিল্ম-ক্যামেরা (যাকে বড্রি ‘প্রিভিলেজড’ বলে উল্লেখ করেন) তার সামাজিক কর্তব্যের স্থানটি অর্জন করে বাস্তবকে পরিবেশনের মাধ্যমে? বড্রি যুক্তি দিচ্ছেন— “that the film camera is functionally determined to adopt and improve this ideational standard of neutral space and appearance” (‘Ideological Effects’)।
এই নিউট্রাল স্পেসের প্রয়োগ কী চরম তা বিস্ময়করভাবে ঋত্বিক অযান্ত্রিক-এ করে দেখালেন। যে ভারতবর্ষে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালে বিপ্লব সেভাবে ঘটেই উঠল না, সেই ভারতবর্ষে কৃষিভিত্তিক সভ্যতার বুকে যেন হঠাৎই আছড়ে পড়েছে যন্ত্র-উৎসব। আধুনিক সভ্যতার মসিহা রেলগাড়ি চলে যাচ্ছে মালভূমি চিরে। ধোঁয়া তুলে। তার নীচে টানেল। হঠাৎ ঘটে গেছে কখন এই যন্ত্র-প্রবেশ প্রায় টানেলের মতোই তলা দিয়ে। ঊষর মালভূমির ভেতর দিয়ে ছুটে চলে বিমলের মোটর। লং শটে, ফ্রেম জুড়ে কৌণিক, জ্যামিতিক কম্পোজিশন— এ জিনিস কিয়ারোস্তামির আগে আমরা খুব বেশি দেখব না। আপামর রোডমুভির নামেও না। ঊষর পথ দিয়ে যন্ত্রগাড়ি যেতে যেতে একদিন— বিকল হয়। পাহাড়ি উপত্যকার বাঁকে সে ঘুরে তাকায়। ঘুরে তাকাতে বাধ্য হয়— আদি বহমান মূল-ভূমি সভ্যতার দিকে। যে সভ্যতা অরণ্যের গভীরে, যন্ত্র ও নাগরিক সভ্যতার আড়ালে ফল্গুর মতো বইছে। এখানেই ঘটে যাচ্ছে বিপ্লব। ভারতীয় সিনেমায়। ঘটে যাচ্ছে যখন আমরা প্রশ্ন করি— কে ঘুরে দাঁড়ায়? কার দৃষ্টিকোণ? বিমল তখনও চালকের আসনে। আর বিমল ছাড়া অন্য কোনো চরিত্রকে ঋত্বিক এই সিকোয়েন্সে উপস্থিত করেন না। মূল আলোচনায় আসছি। তার আগে— মনে রাখব যে প্রো-ফিল্মিককে হত্যা বা ব্যবচ্ছেদ করার বাসনা তাঁর ছবিতে যখন এসেছে, বিস্ময়কর অভিঘাত নিয়ে এসেছে। যেমন সুবর্ণরেখা-এ— ছোট্ট সীতা পরিত্যক্ত এরোড্রোমে এসে পড়ে মহাকালরূপী কালী ইমেজের সামনে। তেমনই নন-ডাইজেটিক সাউন্ডের ব্যবহারও ঋত্বিককে করতে দেখব সুবর্ণরেখা-এ। ঐতিহাসিক সে অভিঘাত। সীতার আত্মহত্যার মুহূর্তে আমরা শুনব— ‘হে রাম’। এ শুধু উচ্চারণ নয়। ঋত্বিক এখানে মহাকাল, ইতিহাসকে আহ্বান করেন। সে এসে উপস্থিত হয় তাঁর আখ্যানে, দৃশ্যে, সিনেমার এককে। স্বমহিমায়। আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। অযান্ত্রিক-এও পাচ্ছি। শব্দ এবং ইমেজ। এখানে সেই ভূমিকা নিচ্ছে পয়েন্ট অফ ভিউ-এর অবিস্মরণীয় উপযোগ। এক অভিনব সাবজেক্টিভ শট। রীতিমতো আয়োজন করছেন ঋত্বিক এখানে। কিন্তু তারও আগে তিনি পর পর শট সাজাচ্ছেন, তৈরি করছেন দর্শককে। ইঙ্গিত দিচ্ছেন— প্রশ্ন করার। এই বিশেষ সিকোয়েন্সটির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে অধ্যাপক মৈনাক বিশ্বাসের।
ঋত্বিক যা করলেন, আসলে গুলিয়ে দিলেন আমাদের শট আর রিভার্স শটকে। টেম্পোরাল ও স্পেশিয়াল সম্পর্কে ব্যাঘাত সৃষ্টি করলেন। ওঁরাও দৃশ্যের শুরুর ঠিক আগে আমরা দেখব— বিমল হাসিকে ধরতে পারে না কারণ জগদ্দল যান্ত্রিক গোলযোগ প্রদর্শন করে। এরপর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে জগদ্দলকে আসতে দেখব। হঠাৎ কন্টিন্যুইটি ভাঙেন ঋত্বিক ঘটক। উলটো দিক থেকে ল্যাটারাল ট্র্যাকিং/প্যানিং শট এসে ফ্রেম ওয়াইপ করে দিয়ে যায়। ঠিক তার পরের শটেই আক্রমণ করছেন দৃষ্টিকোণ ও পয়েন্ট অফ ভিউ-এর কন্টিন্যুইটিকে। নতুন ভাষা তৈরি হচ্ছে সিনেমার, ভারতীয় সিনেমায়। এক অজানা চরিত্রের দৃষ্টিকোণ এক প্রকার সারভেইলেন্সের সূচনা করে। এক স্কোপোফিলিক পরিসর। নিউট্রাল স্পেস। ক্যামেরা চোখে কে বা কারা সমগ্র অরণ্য প্রকৃতির ওপর প্যান করে অপেক্ষা করে বিমল ও জগদ্দলের। পথের বাঁকে। এখানে কার বা কাদের উপস্থিতি ঘটল তা আমরা এখনও ঠাহর করতে পারি না। কিন্তু সেই দৃষ্টি ও দৃষ্টিপথের সামনে যন্ত্র-জগদ্দল এগোতে অস্বীকার করে। পিছিয়ে যায় যন্ত্র- আধুনিকতার মোটর গাড়ি। আমরা তখনও জানি না পিছিয়ে গিয়ে কোথায় যেতে চায় সে, যতক্ষণ না ইতিহাস-রূপ মহাকাল এসে পথ ভুলিয়ে বিমলকে টেনে নিয়ে যায় অরণ্যের গভীরে। মূলস্রোত, আধুনিক সভ্যতার আড়ালে বয়ে চলা আদি-সভ্যতার কাছে। মাটি ভেদ করার মতো শিঙা ফুঁড়ে ওঠে। পরদা জুড়ে উল্লম্ব। যেন সভ্যতা জারি আছে— এই ঘোষণা হয়। বিমল অজানা বোধে বাধ্য হয় মন্ত্রমোহিতের মতো জগদ্দলকে পরিত্যাগ করে রহস্যময় অরণ্যানীর গভীরে প্রবেশ করতে। যেন কেউ তাকে চালিত করে। এইভাবেই পরিচালক ঘনিয়ে তোলেন ইতিহাসের পরিসর, আমাদের প্রস্তুত করেন সভ্যতার অন্য প্রান্তে যেতে। কী দেখাতে চান আমাদের ঋত্বিক ?
ঋত্বিকের জবানবন্দিতে—
“…the innate harmony of the tribal form of society.”
কাজ ও অবসর, অর্চনা ও আনন্দ, এই সবকিছুই অত্যন্ত ভারসাম্যের সাথে রয়েছে আদিবাসী জীবনে, বলছেন তিনি।
…that the emotional disbalance, the greatest malady of civilized society, has very few chances to appear. Moreover, all age groups have a well defined and proper scope to take a place in the community. The feeling of neglect which comes with a certain age is totally absent in such a society. This intense pleasure of living checks the craving to go places, to have egoistic ambitions, by directing the individual’s attention to what nature and man’s harmonious surrounding offers.
Therein lies the one lesson, the message of the tribal societies, contentment, simplicity,— passionate love of life,—they are ingrained among them from the very birth.
আর অবিস্মরণীয় সে প্রদর্শন। মাদল ও শিঙা-ধ্বনির সাথে সাথে আকাশচুম্বী কিছু গম্ভীর নিশান পতপত উড়িয়ে হাজার বছর ধরে পথ চলার মতো অরণ্যের গভীর বনস্পতিকে সাক্ষী রেখে অগ্রসর হয়। বিমল তার সামনে এসে দাঁড়ায়। বহিরাগতের নিরাপদ দূরত্বে সে। সে-ও সাক্ষী হয়। মদ খেতে বসে এক যুবতী ও তার প্রেমিকের সংলাপ তার কর্ণগোচর হয়। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এই আদিবাসী নারী। নারীটি তার প্রেমিককে ভর্ৎসনা করে— বেইমান, দাগাবাজ বলে। প্রেমিকটিকে আমরা সেভাবে দেখতে পাই না। কিন্তু তার ক্ষমাপ্রার্থনার স্বরটি আমাদের কানে এসে পৌঁছয়। হাসি চরিত্রটির একেবারে বিপ্রতীপে অবস্থান এই আদিবাসী রমণীর। হাসি যেখানে আত্মবিশ্বাসহীন, অপেক্ষাকৃত দুর্বল এক নারী। সভ্যতায় নারীর অবস্থানের বাইনারিটিকেও আমাদের ইঙ্গিত দিয়ে যান ঋত্বিক। যন্ত্র, যন্ত্রের পেছনে ছুটে চলা, কমোডিটি সভ্যতার দাস বনে যাওয়া, থেকে প্রান্তিক বহমান হিউম্যান-সভ্যতার ধারাটিকে, মানুষের সহজ জীবনচর্চার সুখটিকে স্পর্শ করে দেখাতে চাইলেন। শুধু দর্শনের অভিনবত্ব না, আমরা পরাঙ্মুখ বিস্মিত হয়ে দেখি কীভাবে আমাদের, দর্শককে তিনি তৈরি করলেন, এই বিশেষ দৃশ্যটি অনুভব করার জন্য। কীভাবে এই মহিমময় সিনেম্যাটিক আয়োজন, অত্যাশ্চর্য সিনেভাষার ঐশ্বর্য উপহার দিলেন তিনি।
আমাদের সৌভাগ্য সত্যজিৎকে নিয়ে আমরা অন্তত তাঁর সমসাময়িক কালেই আন্তর্জাতিক আলোচনায় যোগ দিতে পেরেছি। আমাদের দুর্ভাগ্য— আমরা বিশ্বকে এখনও তেমন সোচ্চার ও সমস্বরে জানিয়ে উঠতে পারিনি— সুব্রত মিত্র ও ঋত্বিক কুমার ঘটক আমার দেশে জন্মেছিলেন— এই বাংলায়। মাত্র ১৯৫৭ সালেই তিনি, ঋত্বিক ঘটক, ভারতীয় সিনেমার ভাষা তথা আপামর সিনেমার ভাষা পালটে দিচ্ছিলেন। আমরা ভারতীয়। আমরা অপেক্ষা করব। পশ্চিমি সিনেমা-তত্ত্ব পড়ে সিনে-ভাষার ইন্ডেক্স-ফর্দ অনুসরণ করব। তুলনা করব। তারপর আমাদের শেক্সপিয়ার, আমাদের ফেলিনি, আমাদের বুনুয়েল পর্বে মোম ও প্রস্তর আইকন গড়তে থাকব। আর তিনি দ্রুত, অতি সত্বর, খ্যাতি-ফ্যাতি লাথি মেরে চলে যাবেন।
তাই তিনি আমাদের মুখে, ক্যামেরার চোখে চোলাই ঢেলে দেবেন। উই ডিজার্ভ ইট!
র্যাডক্লিফ লাইন থেকে বাবরি-রাম— আজ আমাদের আর ‘বিষক্রিয়াও’ হয় না।
অনামিকা বসুধা

চলচ্চিত্রী, অধ্যাপক, চলচ্চিত্র গবেষক, সমাজকর্মী ও কবি। আদিবাড়ি পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায়। বেড়ে ওঠা কলকাতায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক। বর্তমানে মার্কিন মুলুকে বসবাস। সেখানেই অধ্যাপনা করেন।

