আজ বৃহস্পতিবার, ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

এই সন্ধিক্ষণে আবারও এক যুদ্ধের মুখে

২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিজেপি নেতা অমিত শাহ এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এতদ্‌সত্ত্বেও, যতক্ষণ না তারা পশ্চিমবঙ্গকে জয় করতে পারছেন, তাদের ‘ভারত জয়’ অধরা থেকে যাবে। আসলে, তারা বঙ্গদেশের অসীম গুরুত্বকে বোঝাতে চেয়েছিলেন এই অর্থে যে, তাকে জয় করা মানে ভারতবর্ষ থেকে নানাবিধ বৈচিত্র্য ও ‘যত মত তত পথ’এর ধারণাকেই মুছে ফেলা, যাতে দেশ জুড়ে তাদের একবগগা উগ্র বর্ণবাদী-হিন্দুয়ানার শাসন সম্ভব হতে পারে। সেদিনের সেই অতৃপ্ত বাসনা তারপর বারবার ধাক্কা খেয়ে আজ ক্রোধ ও প্রতিহিংসায় রূপান্তরিত হয়েছে। অতএব, ২০২৬’এ ‘বাংলা বিজয়ের’ উন্মত্ত লক্ষ্যে তারা ভয় ও রক্তচক্ষু দেখানোকেই পথ বলে সাব্যস্ত করেছে। উদ্দেশ্য, সারা দেশে বাংলা ও বাঙালিকে ‘বাংলাদেশি’ বলে বিদেশি প্রতিপন্ন করে তাদের নিজ ঘরে ঠেলো, দেশ জুড়ে তাদের প্রতি ঘৃণা জাগরিত করো যাতে তাদের একঘরে করে ঘিরে ফেলা যায়, তারপর আগুন জ্বালাও বাংলা জুড়ে, যে আগুনে ভস্মীভূত হবে বাংলার প্রাণসত্তা, আর সেই ধ্বংসস্তূপের মহীয়ান মসনদে আসীন হবে বর্গীরা।

তাদের এই দানবীয় প্রকল্প প্রায় সমস্ত বিজেপি শাসিত রাজ্যে গরিব, শ্রমজীবী নিম্নবর্ণ হিন্দু ও মুসলমানদের ওপর মূলত পুলিশি আক্রমণ দিয়ে শুরু হয়েছে। কারণ, তাদের অনুমান, গরিব মানুষের ওপর আক্রমণে প্রতিক্রিয়া হয় ধীরে ও দেরিতে!

কিন্তু কেন? কেন তারা মনে করে, বাংলা ও বাঙালিকে নিধন না করতে পারলে দেশ জুড়ে তাদের হিন্দু-হিন্দি-হিন্দিস্তানের ফ্যাসিস্ট মিশন পরিপূর্ণ হবে না? কারণ, বাংলা হল এমন এক মনন ও সত্তা যেখানে বিশ শতকের আগে কখনও কোনও দাঙ্গা দেখা যায়নি (বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু দ্বন্দ্ব ও বিভেদ কখনও সখনও বয়েছে যদিও, পরে ব্রিটিশদের বিভেদ নীতির ফলে, যেমন ১৮৯১ ও ১৮৯৬-৯৭ সালে কলকাতা ও বঙ্গের কিছু অংশে বিক্ষিপ্ত দাঙ্গা হয়েছিল), যার প্রাণবায়ুর মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে আছে বহু ধারার এক মিলনগাথা, যেখানে কতিপয় দুরাচারী ছাড়া বৈচিত্র্যের অপার রসে কেউ চোনা পর্যন্ত ফেলতে পারেনি। ব্রিটিশ প্রবর্তিত হিন্দু-মুসলমানের তথাকথিত দ্বৈরথকে যে সমস্ত ঔপনিবেশিক দালালরা সযত্নে লালন করেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম সেই আরএসএস ও হিন্দু মহাসভার আজকের উত্তরসূরীরা তাই এই সময়ে বারবার হাজির করতে চাইছে ইতিহাস-বিকৃত এমন এক মিথ্যা বয়ান যা বাংলা ও বাঙালির গত এক হাজার বছরের সমস্ত প্রয়াস ও কর্মকাণ্ডকে নিমেষে লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে। তাই ইতিহাসের দিকে এক ঝলক নজর দিয়ে আজ আবার বাঙালি সত্তাকে পুনঃজাগরিত করার সময় এসেছে।

আমরা কী ভাবে ভুলতে পারি, বাংলার সেই দুই স্বর্ণযুগের কথা যখন কৃষিতে, বাণিজ্যে, সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে বাংলার গৌরবের দিকে সারা বিশ্ব চোখ মেলে তাকিয়েছিল— এক) পাল আমল (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক) ও দুই) বাংলার স্বাধীন সুলতান হুসেন শাহ ও তাঁর পুত্রের আমল (পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতক)। বৌদ্ধ যুগের পাল আমলে পাহাড়পুর, বিক্রমশীলার স্থাপত্য এবং কৃষি ও বাণিজ্যে তুমুল প্রসার এক সমৃদ্ধশালী বাংলার আকর হিসেবে এখনও সমুজ্জ্বল। আর সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ’এর শাসনকাল (১৪৯৪-১৫১৯) তো এখনও গৌরবের স্মারক; কেউ কেউ বলেন সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। এই সময়েই সুলতানের সেনাপতি পরাগল খানের উদ্যোগে কবীন্দ্র পরমেশ্বর ‘মহাভারত’এর আংশিক অনুবাদ করেন ও কৃত্তিবাস ওঝা ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ লেখেন। এই সময়েই ‘মঙ্গলকাব্য’এর রচনা এবং ‘মনসামঙ্গল’ খ্যাত বিজয় গুপ্ত সুলতান হুসেন শাহকে ‘নৃপতি-তিলক’ ভূষণে সম্মানিত করেন। চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলনের প্রসারও এই সময়েই। সকলেই জানেন, চৈতন্যদেবের নগর সংকীর্তন বন্ধ করতে কিছু ব্রাহ্মণ ও গোঁড়া মুসলমান একযোগে নবদ্বীপের শাসক চাঁদ কাজির কাছে দরবার করলে তিনি সেই সংকীর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সুলতান হুসেন শাহ’এর কাছে এই খবর যেতেই তিনি তাঁর উচ্চপদস্থ দুই রাজকর্মচারী রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী মারফত চাঁদ কাজিকে নির্দেশ পাঠান যে কোনও মতেই এই সংকীর্তন বন্ধ করা যাবে না। চাঁদ কাজি সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন এবং কথিত আছে যে তিনি স্বয়ং মহাপ্রভুর শিষ্যত্ব বরণ করেন। তখন পর্তুগীজদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। এই সমৃদ্ধশীল বাংলাকে দেখে তাদের টনক নড়ে যায় এবং ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ বলে তাকে তারা অভিহিত করে।

ব্রিটিশ পোষিত হাফ-প্যান্ট পরিহিত লাঠিধারী মুচলেকা-শিরোমণিদের দল কোন আক্কেলে বুঝবে এই বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। তাদের মুখে তাই, ‘গোলি মারো শালে কো’ বুলি ও বাংলা ভাষার অস্তিত্বকেই অস্বীকার। তারা তাই বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানকে আলাদা করতে চায়, বাঙাল ও ঘটিদের মধ্যে মারামারি বাঁধাতে চায়, সর্বোপরি, সুগভীরে প্রোথিত বাংলার পরম্পরাগত ঐক্যের মনোভূমি ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে উদ্গ্রীব। তারা মানতেই পারবে না যে, বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা ছিলেন রামপ্রসাদ সেনের একজন ভক্ত এবং তাঁকে জমিও প্রদান করেছিলেন। সুফি সাধক শাহ জালান, শাহ পরাণ, বাউল সাধক লালন সাঁই’এর এই বাংলায় ১৪১৫ সালে জমিদার গণেশ বাংলার সুলতান হন কিন্তু তাঁর পুত্র যদু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুহাম্মদ শাহ নামে সুলতানি শাসন চালিয়ে যান। এইভাবেই এই বাংলার জল, মাটি, বায়ুর সঙ্গে মিশে ছিল এখানকার সংস্কৃতি ও ভাবাদর্শ।

আর, কতটা ধৃষ্টতা থাকলে তারা প্রশ্ন তুলতে পারে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব নিয়েই। এই মূর্খের দল অথবা শয়তানের গুষ্টি ভেবেছিল, বাংলা ভাষা নিয়ে কটাক্ষ করে এর ইতিহাসটাকেই স্মৃতির অতলে চাপা দিয়ে দেবে। কিন্তু যে ভাষার বিবর্তন হাজার বছর ধরে, তার গোড়া ধরে উপড়ে ফেলা কি অতই সহজ (যতই পেশিশক্তি থাকুক না কেন!)। চর্যাপদের সেই আদি বাংলা বহমান হয়েছে বিবিধ ভাষার নানা শব্দকে আত্তীকরণের মধ্য দিয়েই। তাকে যতই ‘মুসলমানের’ হাত থেকে রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা তারা করুক না কেন, অথবা ত্রাস-সৃষ্টিতে তাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’র তকমা দিক, তা আরবি-ফারসি, তুর্কি-পর্তুগীজ, ইংরেজি, এমনকি চীনা শব্দকেও আত্মস্থ করেই নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। একটি জীবন্ত ভাষার প্রকাশ তো এভাবেই! তাই, ‘আ’মরি বাংলা ভাষা’ আজও বিশ্বে এক তরুণ নক্ষত্রের মতোই ঋদ্ধ ও উজ্জ্বল। যে শব্দগুলি আমরা কথোপকথনে, লিখনে আকছার ব্যবহার করি— কলম, আদালত, খবর, নগদ (আরবি থেকে আহরিত); দোকান, কারখানা, তারিখ, শায়েস্তা (ফারসি থেকে); বাবা, চাকর, কুলি, লাশ (তুর্কি থেকে); আলমারি, জানালা, সাবান, বালতি (পর্তুগীজ থেকে); হাসপাতাল, চেয়ার, বাস, পুলিশ (ইংরেজি থেকে); চা, চিনি, লিচু, লেবু (চীনা থেকে)— তাদের অন্তর্ভুক্ত করেই আমাদের ভাষার ব্যাপ্তি ও সর্বজনীনতা। আর এই ভাষাকেই আধুনিক হরফ ও বর্ণমালায় রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন উইলিয়াম কেরি, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রমুখ এবং তার এক ঋজু গদ্যরীতি গড়ে তুলেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, অক্ষয়কুমার দত্ত, বিদ্যাসাগর এবং সামান্য কিছু পরে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। সে আধুনিক ধারা তার আপন গতিতে সতত প্রবহমান। আর মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার ও মুদ্রণ শিল্পের প্রসারের পর উইলিয়াম কেরির নির্দেশেই পঞ্চানন কর্মকার ও মনোহর কর্মকার প্রথম বাংলার মুদ্রণ হরফ তৈরি করেন।

কিছুটা আশ্চর্যের হলেও সত্যি যে, এই বাংলা ভাষা আজ এক সুচতুর দানবের সামনে পড়েছে। যদিও এ ভাষার এক প্রস্থ দফারফা গত ৩০-৪০ বছরে ইতিমধ্যেই সাঙ্গ করতে চেয়েছিল বাংলারই এক শ্রেণির উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত শোভিত ‘ভদ্দরসমাজ’, যারা ইংরেজি ভাষার বানিয়া আধিপত্যে অতি-মোহিতরঞ্জনে ‘আমার বাংলাটা ঠিক আসে না’ গোছের অসভ্যতায় সোয়াস্তি পেত, সেই তারাই আজও বেশ উপভোগ করছে বাংলা ও বাঙালির এই হেনস্থা। কারণ, তারাও চায়, পরম্পরা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে লালিত বাংলা ও বাঙালি উচ্ছন্নে যাক, থাকুক কঠোর বর্ণবাদী, ধর্ম-বিদ্বেষী ও বিত্তলোভী একদল নির্মিত নয়া ‘বাঙালি’ যারা এখানে বর্গীদের সহায়তায় একচ্ছত্র ইজারা পেতে মরীয়া। অথচ, তাদেরও ঘরে-বাইরে বিপদ কম নয়, কিন্তু আজকের মীরজাফর-জগৎ শেঠদের মতিভ্রম ও লালসা ঠেকানোর সাধ্য কার? ফলে, বাংলা এখন এক গভীর সংকটের মুখে, যখন বাঙালি ভদ্দরসমাজের এক অংশ আজকের দিল্লির হিন্দু-হিন্দি-হিন্দিস্তানি শাসকদের সঙ্গে একাসনে দাঁড়িয়ে পড়েছে বাকী বাঙালিদের পাঙ্গা নিতে!

সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এই বিদ্বেষ এক মহামারীর রূপ পেয়েছে। যেহেতু ক্ষণিকের তাড়নায় কিছু টাইপ করে দিয়েই আগুন জ্বালানো যায়, তাই এক অস্থিরতা গ্রাস করেছে সমাজের প্রায় সমস্ত স্তরকে। সত্য আর মিথ্যার ফারাক বোঝার উপায়কেও এমন ভাবে গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, মিথ্যা বয়ানের সমর্থনে পরদেশি কোনও চলচ্চিত্রের ক্লিপ দেখিয়েও নির্মাণ করা যাচ্ছে হিংসার বাতাবরণ। আর সেই বাতাবরণে ঠিক এই সময়েই খুবই সুপরিকল্পিত ভাবে বিবেক অগ্নিহোত্রী নির্মিত ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস্‌’ নামক একটি থার্ড গ্রেড ভিডিও’তে (তিনি বলছেন বটে চলচ্চিত্র) গোপাল মুখোপাধ্যায়কে (ওরফে গোপাল পাঠা) ১৯৪৬’এর ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’এর আবহে হাজির করা হচ্ছে এক ‘হিন্দু মসিহা’ হিসেবে যে বজরঙ্গী পালোয়ানের মতো তরোয়াল ঘুরিয়ে কলকাতার রাজপথে নিকেশ করছে মুসলমানদের। কী ভয়ঙ্কর সে সব দৃশ্য! অথচ, ঘটনা একেবারেই তা ছিল না। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ সাংবাদিক Andrew Whitehead’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গোপালবাবু পরিষ্কার জানিয়েছেন, শুধুমাত্র আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধেই তিনি লড়েছেন, কখনও কোনও সাধারণ মুসলমানের গায়ে হাত পর্যন্ত দেননি; উপরন্তু, তাঁর পাড়া মলঙ্গা লেনে এক মেসবাড়িতে বসবাসরত ৩০০-৩৫০ জন মতো মুসলমান কর্মচারীকে সম্ভাব্য আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে বৌবাজার থানায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তবুও আইটি সেল দমেনি! ফলে, গোপালবাবু’র নাতি-নাতনিরা বিবেক অগ্নিহোত্রীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই উক্ত ভিডিও’তে (বিবেক বলছেন, ফিল্ম) মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে থানায় এফআইআর করেছেন ও তাঁকে আদালতের সমন পাঠিয়েছেন। তাঁরা আরও স্পষ্ট করেছেন যে, গোপালবাবু কস্মিনকালে হিন্দু মহাসভা বা ওই ধরনের কোনও সংগঠনের সঙ্গে কোনও সংস্রবই রাখেননি। তাতে কী! নিম্নবর্ণ হিন্দু ও মুসলমানদের চিরকাল অচ্ছ্যুত করে রাখা উচ্চবর্ণ ভদ্দরলোক বাঙালি এই অশ্লীল হানাহানিতে আবার যদি তার পুরনো বিদ্বেষের জমিদারি ফিরে পাওয়ার দুরাশায় উল্লসিত হতে চায়, তো কে রোখে। হাতের কাছেই যখন রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার উন্মুক্ত দেয়াল, লিখে ফেলাটাই যখন দস্তুর, তখন বিষের ভাণ্ডার কেন খালি রাখা!

ফলে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত বাংলা ও ভারতীয় বাঙালি এখন এক ঘোর সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে। উগ্রবাদী সন্ত্রাসীরা বুঝেছে, তারা শুধু বাইরেই বাঙালির বিপদের আয়োজন করেনি, ঘরের ভেতরেও তা ধূমায়িত— বামপন্থী উচ্চবর্ণের এক বড় অংশও মিশে গেছে এই সলতে পাকানোতে। কারণ, তাদের চলাবলায়, যাপনে ব্রাহ্মণ্যবাদ এখন এতটাই প্রকটিত ও সংশ্লিষ্ট যে, ভিন রাজ্যে বাঙালি নিম্নবর্ণ ও মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিকেরা যখন আক্রান্ত হন, তাঁদের পুশব্যাক করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়, কেউ মারাও যান, অথবা, আতঙ্কে রাজ্যে ফিরে আসেন, সে সম্পর্কে তাদের কোনও তাপ-উত্তাপই কাজ করে না। বরং, ‘সত্যিই যদি এমনতর কিছু ঘটে থাকে’ মনে হলে এর ভিন্নতর ব্যাখ্যা খোঁজার তারা চেষ্টা করে। অত্যন্ত গর্দভের মতো তারা প্রশ্ন তোলে, ‘কই ভিন রাজ্যে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের তো পেটাচ্ছে না!’ অর্থাৎ, আজকের আধা-অ্যাংলো উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত বাঙালি বরং আর্থিক কৌলিন্য ও বর্ণ-ধর্ম দিয়ে বিচার করে– কাদের মার খাওয়া উচিত, কাদের নয়। এইভাবেই হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানের ফেরেপবাজির সঙ্গে তারা নিজেদের একাত্ম করে ফেলে। গৃহের উপাসনায় ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি’ ফেলে ‘হনুমান চালিশা’ হাতে তুলে নেয়, বাড়ির ছাদে পতপত উড়িয়ে দেয় ‘জয় শ্রীরাম’ লেখা ত্রিকোণ পতাকা, ১লা বৈশাখের হালখাতার বদলে ধনতেরাস’এ ভিড় বাড়ে। অতএব, বাঙালি এখন মূলত দু’ ভাগে বিভক্ত। একদিকে বর্ণহিন্দুবাদী, একবগগা, ধনী তোষণকারী এক পদের বাঙালি, অন্যদিকে উদার, সর্বধর্ম সমন্বয়ে আস্থাস্থাপক, জনকল্যাণকর অর্থনীতির সুত্রে বিশ্বাসী অপর পক্ষ। এই দু’ পক্ষের অন্দরে আরও উপভাগ আছে, অন্তর্দ্বন্দ্বও আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আপাতত এমন একটা গোদা দু’ পক্ষীয় সমীকরণের উপরেই বাংলা ও বাঙালিকে একটা যুদ্ধ লড়ে নিতে হবে।

তাই, এই মুখরিত সন্ধিক্ষণেই আমরা স্মরণ করতে পারি স্বামী বিবেকানন্দকে যখন তিনি স্থির প্রত্যয়ে বলেন: ‘আমি নিশ্চিত, আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্যের উপর। … যদি হিন্দু ধর্মকে বাঁচতে হয়, তাহলে তাকে ইসলামকে তার শরীরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং মুসলিমদের কাছ থেকে কিছু জিনিস শিখতে হবে। একইভাবে, যদি ইসলামকে সফল হতে হয়, তাহলে তাকে হিন্দু ধর্মকে তার শরীরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং হিন্দুদের কাছ থেকে কিছু জিনিস শিখতে হবে।’ (১৮৯৮ সালে সিস্টার নিবেদিতাকে লেখা স্বামীজীর চিঠি’র অংশ)। ঠিক এই জায়গাতেই আঘাত আসছে, বার বার।

আমরা জানি, কারা চৈতন্যদেবকে নগর সংকীর্তনে বাধা দিয়েছিল, কারা তাঁকে হত্যা করে পুরীর সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিল, কারা নবাব সিরাজদ্দৌলা’র বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, কারা লালন সাঁই’এর আশ্রম ভেঙ্গেছিল, কারা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কলকাতা ছাড়া করেছিল, কারা রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ’র নামে অতি জঘন্য কুৎসা ছড়িয়েছিল, কারা নেতাজীকে ‘তোজোর কুকুর’ বলেছিল। সেই তারাই আজ এক পক্ষ। আর অপর পক্ষে সুফি সাধক থেকে ভক্তিরসে নিমজ্জিত সাধুসন্ত, পলাশীর প্রান্তরে আত্মবলিদানে মোহনলাল, প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের অগণিত শহীদ, ক্ষুদিরাম থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের ইত্তেহাদ ও কুরবানি, অবিভক্ত বাংলায় ১৯৩৭’এ প্রথম নিম্নবর্ণের সরকার, তেভাগা থেকে নকশালবাড়ি, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষক অভ্যুত্থান ও চলমান সমস্ত আত্মমর্যাদা ও বৈষম্য-বিরোধী লড়াই। প্রথম পক্ষের নেতৃত্ব যদি থাকে উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তদের হাতে, দ্বিতীয় পক্ষে তা আছে মূলত নিম্নবর্ণ, সংখ্যালঘু ও খেটে-খাওয়া মানুষের জনসমুদ্রের মাঝে। অতএব এই মুহূর্তের জরুরি প্রশ্নটি হল, নতুন ভাবে আমরা বর্ণভিত্তিক ফ্যাসিবাদী রাজ চাই নাকি আরও উন্নত গণ প্রজাতন্ত্র— যা আমাদেরই নির্ণয় করার দিন আজ।

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য
লেখক, কলকাতা থেকে প্রকাশিত একক মাত্রা পত্রিকার সম্পাদক।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top