বড় বাংলার রবীন্দ্রনাথ

আমাদের কথা

।। ফরহাদ মজহার ।।

সাম্প্রতিকতার আলোকে বড় বাংলার রবীন্দ্রনাথের পর্যালোচনা

রবীন্দ্রনাথ একত্ববাদী। তিনি বেদ ও উপনিষদ থেকে ঐ নির্যাসটুকুই নিয়েছেন যেখানে এক ও অদ্বিতীয়ই তাঁর নিরাকার ভজনার বিষয় হতে পেরেছে। একত্ববাদ মুসলমানদের একচেটিয়া নয়। বাংলার নিজের একটি শক্তিশালী একত্ববাদী ধারা আছে যার সঙ্গে আমাদের পরিচ্ছন্ন পরিচয় থাকা দরকার। অথচ সেটা আমাদের নাই। তাই, কেন রবীন্দ্রনাথে বেদ-উপনিষদ আছে বলে আজকাল যারা হঠাৎ প্রচার শুরু করেছেন এবং তাকে অনর্থক ‘হিন্দু’ বলে প্রমাণ করতে চাইছেন — তারা ভয়ানক ভুল এবং সাম্প্রদায়িক। দুই. ইসলাম ও মুসলমান রবীন্দ্রনাথের জগতে ও সাহিত্যে অনুপস্থিত বটে, কিন্তু বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তার অভাবও তিনি বোধ করতেন। সেটা তিনি ব্যক্তও করেছেন।

বড় বাংলার রবীন্দ্রনাথ

র বী ন্দ্র না থে র গা ন ? কী যে তা র মানে!
রা জে শ্ব রী দ ত্ত শু ধু জা নে’।


২৫ বৈশাখ যথারীতি আসে এবং ঘড়ির নিয়মে চলেও গেল যায়। বৈশাখের ২৫ রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বড় বাংলার আবেগ, বিরাগ, নিন্দা, ভালবাসা ইত্যাদি ফেইসবুকের নানান কমেন্ট থেকে টের পাওয়া যায়। প্রকাশভঙ্গীও হরেক কিসিমের। পশ্চিম বাংলায় রোদ্দুর রায়ের একটা স্টাইল আছে, সেটা বাবু সংস্কৃতিতে চলে না। কিন্তু রোদ্দুর রায়ের বাস্তব যুক্তি আছে। তিনি ফেলনা নন। রবীন্দ্রনাথ পশ্চিম বাংলার চিন্তাজগতের বিকাশে এক বিশাল বাধা হয়ে আছেন। কিন্তু তাকে মোকাবিলা করতে গিয়ে যখন সাহিত্য ও চিন্তার ময়দান ছেড়ে সাইড লাইনে খিস্তিখেউড় করে অপরের নজর আকর্ষণ করতে হয় তখন সেটা খুবই প্যাথেটিক এবং যারপরনাই করুণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অমান্য কোঁড়া কঠিন যে প্যারডি বলি কিম্বা খিস্তি খেউড় কোন কিছুকেই সমাজ সাহিত্য বা সংস্কৃতি থেকে বাদ দেওয়া যায় না।

বাবু বাঙালির ধারণা রবি ঠাকুরের আগে কোনও বাংলা সাহিত্য নাই, আর রবি ঠাকুরের পরে কিছুই প্রায় বঙ্গে ঘটে নি, কিম্বা ঘটবেও না। বাংলাদেশে দেখলাম প্রচার চলছে রবীন্দ্রনাথ কতো ‘খারাপ’ ছিলেন, সাম্প্রদায়িক ছিলেন, মুসলমান পছন্দ করতেন না, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চান নি, ইত্যাদি নানান কেচ্ছা। সীমান্তের দুইদিকে বাংলাভাষীদের আবেগ-বিরাগের গলিঘুঁজির মধ্যে ঢুকে পথ  হারিয়ে ফেলা যাবে না। এই এক প্যাথেটিক পিচ্ছিলতা যেখানে আছাড় খেয়ে মাজা ভাঙার ভয় আছে। তাই পুরানা কথা মুখে নিতে দ্বিধা করব না যে ঠাকুর  ‘হাল বাংলার সিদ্ধিদাতা গণেশ’। কিন্তু কোন অর্থে? “রামমোহন থেকে বঙ্কিমচন্দ্র পর্যন্ত অগ্রণীরা যে সার্বভৌম সংস্কৃতির  স্বপ্ন দেখেছিলেন, সন্ধান পান নি, সেই কল্পনা বিলাসকে এই পাণ্ডববর্জিত দেশের দৃষ্টিগোচরে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ; এবং আমরা সকলে যেহেতু সেই প্রবাহেরই বুদ্বুদ, তাই আমাদের পক্ষে তার গতি-অগতির বিচার অথবা উপকার-অপকারের আলোচনা শুধু অশোভন নয়, দুষ্করও”।

‘সার্বভৌম সংস্কৃতি’। কথাটা বলতে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কাদের সংস্কৃতির কথা বলেছেন সেটা খোলাসা করেন নি। কিম্বা খোলাসা করা তাঁর সাধ্যে ছিল না। বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে যাদের বাস তাদেরকে তিনি কলকাতার বাঙালি ধরে নিয়েই কথা বলেছিলেন। সেই ঘরে বাবুরা ছাড়া অন্যেরাও বাস করে, সেটা বাবু বাঙালি আজও বোঝে কিনা সন্দেহ। তাই সুধীন দত্তের দাবি তাদের চিন্তাশক্তি কিম্বা চিৎশক্তির মধ্যে কোন আলোড়ন তৈরি করতে পেরেছে তারও কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রতিভা ছিল তাঁর নিঃসন্দেহে, কিন্তু সংস্কৃত এবং অর্ধ তৎসম শব্দের বাহুল্যের মধ্যে সুধীন দত্তের দীপ্তি, কল্পনা ও বাসনাটুকু হারিয়ে গিয়েছে।

বাবু বাঙালির ধারণা রবি ঠাকুরের আগে কোনও বাংলা সাহিত্য নাই, আর রবি ঠাকুরের পরেও কিছুই প্রায় বঙ্গে ঘটে নি কিম্বা ঘটবেও না। বাংলাদেশে দেখলাম প্রচার চলছে রবীন্দ্রনাথ কতো ‘খারাপ’ ছিলেন, সাম্প্রদায়িক ছিলেন, মুসলমান পছন্দ করতেন না, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চান নি, ইত্যাদি নানান কেচ্ছা। সীমান্তের দুইদিকে বাংলাভাষীদের গলিঘুঁজির মধ্যে ঢুকে পথ  হারিয়ে ফেলা যাবে না। এই এক প্যাথেটিক পিচ্ছিলতা যেখানে আছাড় খেয়ে মাজা ভাঙার ভয় আছে।

সাধারণ ভাবে বর্ণ হিন্দুর হাতে যে বাংলা সাহিত্য গড়ে উঠেছে সেখানে মুসলমান অনুপস্থিত, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। ‘বাঙালী’র সাহিত্য বা বাংলা প্রমিত ভাষা কলকাতার কারখানায় তৈরি ভাষা। বাঙালির সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও ভাবভঙ্গী ঔপনিবেশিক আমলে একান্তই বর্ণ হিন্দুর হাতেই গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত পুরা ভারতব্যাপী আধুনিক জাতিবাদের প্রেরণায় যে হিন্দুত্ববাদ গড়ে উঠেছে তার জন্মভূমি বাংলা, অর্থাৎ কলিকাতা। বর্ণহিন্দুর সাহিত্য ও কল্পনার জমিনই হিন্দুত্ববাদের জমিন। সেই দিক থেকে সর্ব ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ যেমন উপমহাদেশে বাংলার বাবুদের অবদান, তেমনি বাংলাদেশে ‘বাঙালি জাতিবাদ’ আদতে হিন্দুত্ববাদেরই  বাংলাদেশী সংস্করণ। একাত্তরের স্বাধীনতার পর এই বাংলাদেশী হিন্দুত্ববাদ ও ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা করেই বাংলাদেশের ব্রাত্য জনগণ বঙ্গীয় ১৪২৮ সাল অবধি এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশের আসার বিরুদ্ধে চরম বিক্ষোভ এবং উনিশ জন তরুণের শহিদ হওয়া তারই ধারাবাহিকতা। সামনে বড় বাংলা ব্যাপী আরও বড় লড়াই অত্যাসন্ন। এখানে দাঁড়িয়ে অতীতের বিচার করতে হবে সামনে বা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। অতীতকে চিরায়ত জ্ঞান করে নয়, বরং অতীতের হিন্দু-মুসলমান বিভাজন অতিক্রম করে যাবার জন্য। ভবিষ্যত ভাবতে চাইলে শুধু ভাবলে হবে না, হাতে নাতে তাকে আমলে আনতে হবে।

সেটা কেমন বুঝতে হলে পশ্চিমবাংলায় সবে মাত্র যে নির্বাচন হয়ে গেল সেই দিকে তাকালে কিছুটা আমরা বুঝব। । পরিচয়বাদী রাজনীতি মোকাবিলা করতে চাইলে বাংলাভাষীদের পরস্পরের মধ্যে বোঝাপড়ার দরকার আছে।  

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের দেওয়াল লিখন: ‘জয় বাংলা’

পশ্চিম বাংলায় ‘জয় বাংলা’ রণধ্বণি উঠেছে। মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল জিতেছে। এতে একটা দিক পরিষ্কার, সেটা হোল পশ্চিম বাংলার বাঙালি তাদের তরফ থেকে হিন্দুত্ববাদের একটা উত্তর দিয়েছে, যার সুদূর প্রসারী তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু ফাঁকির জায়গাও আছে। কংগ্রেস এখন মুসলিম লীগের মতোই অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু দীর্ঘকাল পশ্চিম বাংলায় শাসক দল হয়ে থাকার পরও বামদের ভরাডুবি কেন হোল সেটা বুঝতে হবে। বামের ভরাডুবি ভাল হয় নি। মমতা ব্যানার্জির একটি কথা আমাদের ভাল লেগেছে, বাম এমনকি কংগ্রেস থেকেও দুই একটি আসন থেকে জিতে আসা দরকার ছিল। কারণ লড়াইটা শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি না। বরং বড়বাংলার জনগণ বনাম হিন্দুত্ববাদ। তাই ‘জয় বাংলা’ পশ্চিম বাংলায় ‘ফার্স’ বা প্রহসন যেন না হয়। কিন্তু ইতিহাস বোধ না থাকলে এবং বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আমলে না নলে সেই দুর্দশা ঘটতে পারে। কারণ এখনও বাংলাদেশের ‘ট্রজেডি’ ফুরায় নি। মার্কস থেকে কথা ধার করে বললাম: History repeats itself, first as tragedy, second as farce। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রথমবার ট্রাজেডি হিশাবে পরে আবার ঘটলে সেটা হয় প্রহসন। একাত্তরে ‘জয় বাংলা’ জাতিবাদী ও সাম্প্রদায়িক বাঙালির ‘জয়’ ঘোষণা ছিল না। সেটা ছিল নিপীড়িত জনগোষ্ঠির রণধ্বনি। যে বাংলার ‘জয়’ ঘোষিত হয়েছিল সেটা একই সঙ্গে শূদ্র বা দলিত, মুসলমান এবং আদিবাসী সহ সকলের বাংলা। তাই এখন যখন আমরা প্রতিপক্ষে ‘বড় বাংলা’ কথাটা বলি তখন সেটা নিছকই ভূগোলের পরিসর না, বরং সবাইকে নিজের করে নেবার বড়ত্ব। বাঙালির আলিঙ্গন দীর্ঘ হোক। উপমহাদেশের সকল নিপীড়িত জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভাবের চিহ্ন হয়ে উঠুক। বড় বাংলাকে সকল ভাষা এবং জাতি গোষ্ঠির আশ্রয় ও ভরসার জায়গা করে গড়ে তুলতে হবে। বলা বাহুল্য ‘জয় বাংলা’ রণধ্বণি বাংলাদেশের ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের জাতিবাদী ফ্যাসিস্টদের হাতে এর কবর হয়ে গিয়েছে।  অতএব পশ্চিম বাংলার ‘জয় বাংলা’ যেন পরিচয়বাদ কিম্বা জাতিবাদী সাম্প্রদায়িকতায় ডুবে না যায়।

পশ্চিম বাংলায় বাম হারলো কেন? সেটা বাংলাদেশের বামদের দেখেই আমরা বুঝতে পারি। তাই শুধু পশ্চিম বাংলার জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও পশ্চিম বাংলার সাম্প্রতিক নির্বাচন বিশাল শিক্ষা। শুধু বড় বাংলায় নয়, দুনিয়ার সকল বাংলাভাষীর সঙ্গে সম্বন্ধ নতুন ভাবে করবার শর্ত সীমান্তের দুই পাশেই তৈরি হচ্ছে। ইতিহাস স্থির বা অনড় কিছু নয়। বাংলা একদা ঐতিহাসিক কারনে ভাগ হয়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু ইতিহাস সেই প্রাচীন মুহূর্তের ওপর স্থির দাঁড়িয়ে নাই। পশ্চিম বাংলায় ‘জয় বাংলা’ তারই জানান দিচ্ছে। আমাদের নতুন করে অনেক কিছুই আবার ভাবতে হবে। ইতিহাস মানে পাথরে খচিত অমোঘ বাণী নয়। ইতিহাস সবসময়ই নতুনের সম্ভাবনা। অতীতই একমাত্র সত্য নয়, কারন মানুষ একই সঙ্গে ভবিষ্যতও বটে। মানুষই ইতিহাস সৃষ্টি করে।

পশ্চিম বাংলায় ‘জয় বাংলা’ রণধ্বণি উঠেছে। মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল জিতেছে। এতে একটা দিক পরিষ্কার সেতা হোল পশ্চিম বাংলার বাঙালি হিন্দুত্ববাদের একটা উত্তর দিয়েছে, যার সুদূর প্রসারী তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু ফাঁকির জায়গাও আছে। কংগ্রেস এখন মুসলিম লীগের মতোই অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু দীর্ঘকাল পশ্চিম বাংলায় শাসক দল হয়ে থাকার পরও বামদের ভরাডুবি কেন হোল সেটা বুঝতে হবে। এটা ভাল হয় নি। মমতা ব্যানার্জির একটি কথা আমাদের ভাল লেগেছে, বাম এমনকি কংগ্রেস থেকেও দুই একটি আসন থেকে জিতে আসা দরকার ছিল। কারণ লড়াইটা শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি না। বরং বড়বাংলার জনগণ বনাম হিন্দুত্ববাদ। তাই ‘জয় বাংলা’ পশ্চিম বাংলায় প্রহসন যেন না হয়, সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। একাত্তরে ‘জয় বাংলা’ জাতিবাদী ও সাম্প্রদায়িক বাঙালির ‘জয়’ ঘোষণা ছিল না। সেটা ছিল নিপীড়িত জনগোষ্ঠির রণধ্বনি। যে বাংলার ‘জয়’ ঘোষিত হয়েছিল সেটা একই সঙ্গে শূদ্র বা দলিত, মুসলমান এবং আদিবাসী সহ সকলের বাংলা। তাই এখন যখন আমরা প্রতিপক্ষে ‘বড় বাংলা’ কথাটা বলি তখন সেটা নিছকই ভূগোলের পরিসর না, বরং সবাইকে নিজের করে নেবার বড়ত্ব। যাদের জেনে বা না জেনে খারিজ করে রাখা বা ‘অপর’ করে দেওয়া হয়, তাদের বড় বাংলার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করে নেওয়াটাই এখনকার রাজনীতি। বাঙালির আলিঙ্গন দীর্ঘ হোক। বাঙালি যেন পরিচয়বাদ, জাতিবাদী ও সাম্প্রদায়িকতা কাটিয়ে উঠতে পারে।

সাম্প্রতিকতার আলোকেও যেন আমরা রবীন্দ্রনাথকে বোঝার চেষ্টা করি। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে মেলা অভিযোগ আছে আমাদের, অভিমানও থাকতে পারে। কিন্তু ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও বর্ণ হিন্দুর আধিপত্য যেখানে হিন্দু ও মুসলমানকে দ্বিখণ্ডিত করে রাখতে পারছে সেখানে বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে সেই বিভাজন রুখে দেবার দেয়াল তৈরি করার চেষ্টা করেছে সব সময়। বাংলাদেশের জনগনের এই লড়াইটা অসামান্য। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের এই রাজনৈতিক বাস্তব বোধের প্রতি যথাযোগ্য মনোযোগ পশ্চিম বাংলায় নাই। এখনও পশ্চিম বাংলার বাঙালির হুঁশ হয় নি। হিন্দুত্ববাদের হিংস্র উত্থান ও আগ্রাসন দেখে এখন যদি খানিক  হুঁশের হাওয়া বয় সেটা হবে দারুণ খবর।

তাই বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা পর্যালোচনা হোক। কিন্তু বড় বাংলার বড় পরিসর ও আরও বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে বাংলাদেশকে আরও দূরদর্শী হতে হবে। ইতিহাসবিচার বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে বিচ্ছিন্ন ভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো মারাত্মক ভুল রাজনীতি। এই ভুল করা যাবে না।

বাঙালি মুসলমানদের দুটো কথা আমরা  মনে করিয়ে দিতে চাই।


এক. রবীন্দ্রনাথ একত্ববাদী। তিনি বেদ ও উপনিষদ থেকে ঐ নির্যাসটুকুই নিয়েছেন যেখানে এক ও অদ্বিতীয়ই তাঁর নিরাকার ভজনার বিষয় হতে পেরেছে। একত্ববাদ মুসলমানদের একচেটিয়া নয়। বাংলার নিজের একটি শক্তিশালী একত্ববাদী ধারা আছে যার সঙ্গে আমাদের পরিচ্ছন্ন পরিচয় থাকা দরকার। তাই কেন রবীন্দ্রনাথে বেদ-উপনিষদ আছে বলে আজকাল যারা হঠাৎ প্রচার শুরু করেছেন এবং তাকে অনর্থক হিন্দু বলে প্রমাণ করতে চাইছেন — তারা ভয়ানক ভুল এবং সাম্প্রদায়িক। দুই. ইসলাম ও মুসলমান রবীন্দ্রনাথের জগতে ও সাহিত্যে অনুপস্থিত বটে, কিন্তু বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তার অভাবও তিনি বোধ করতেন। সেটা তিনি ব্যক্তও করেছেন।

শক্তিমান মুসলমান লেখকেরা বাংলা সাহিত্যে মুসলমান জীবনযাত্রার বর্ণনা যথেষ্ট পরিমাণে করেন নি, এ অভাব সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সমস্ত সাহিত্যের অভাব।এই জীবন যাত্রার যথোচিত পরিচয় আমাদের পক্ষে অত্যবশ্যক। এই পরিচয় দেবার উপ্লক্ষে মুসল্মান সমাজের নিত্যব্যভৃত শব্দ যদি ভাষায় স্বতই প্রবেশ করে তবে তাতে সাহিত্যের ক্ষতি হবে না, বরং বলবৃদ্ধি হবে, বাংলা ভাষার অভিব্যক্তির ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত আছে” (আবুল ফজলকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি। ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থবিভাগ। ১৯০৯)

এই সবে রাজেশ্বরী দত্ত কেন? মুক্তিযুদ্ধের আগে পুরা সত্তর দশক আমরা যারা তরুন কবিরা কবিতা লিখতাম তারা এভাবেই রাজেশ্বরীকে স্মরণ করতাম। রাজেশ্বরী দত্ত ছিলেন কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী। সেটা একটা কারণ। কিন্তু বড় কারণ ছিল তিনি বাঙালি ছিলেন না। জন্ম সূত্রে ছিলেন পাঞ্জাবি। পারিবারিক নাম রাজেশ্বরী বাসুদেব। বাবা অর্জুনদাস বাসুদেব ছিলেন লাহোর হাই কোর্টের বিচারক। রাজেশ্বরীর স্কুল-কলেজ জীবন লাহোরেই কেটেছে। বারো বছর বয়সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের কথা শুনেছিলেন যেখানে মেয়েরাও গান শেখে। মেয়েদের গান শেখা সেই সময় অতো সহজ ছিল না। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন রাজেশ্বরী। স্নাতক হওয়ার পর শান্তিনিকেতনে চলে আসেন সঙ্গীতশিক্ষার জন্য। আন্দাজ করা যায় কাজটা কতো কঠিন ছিল। সেটা ছিল ১৯৩৮ সাল। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত চার বছরে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখেন। শিক্ষক ছিলেন শান্তিদেব ঘোষ, শৈলজা রঞ্জন মজুমদার, ইন্দুলেখা ঘোষ, অমিতা সেন (খুকু) প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের কাছেও সরাসরি তালিম পেয়েছিলেন।

কিন্তু তাতে কী? সত্তর দশকে বাংলাদেশের তরুণ উঠতি কবিদের তিনি প্রিয় ছিলেন কেন? কারন আমরা বাংলাদেশের জনগণের লড়াইকে সেই সময় পাঞ্জাবি বনাম বাঙালির লড়াই হিশাবে হাজির করবার সাম্প্রদায়িক ও জাতি বিদ্বেষী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়ছিলাম। তাই পাঞ্জাবি মেয়ে রাজেশ্বরী আমাদের আরাধ্য হয়ে উঠেছিলেন। সেই সময়ের বাঙালি জাতিবাদীদের রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আদিখ্যেতার উত্তর হিশাবে আমরা বলতাম তোমরা রবীন্দ্রনাথ কি বুঝবে। বুঝেছিলেন বটে রাজেশ্বরী, তাই

‘রবীন্দ্রনাথের গান? কী যে তার মানে
রাজেশ্বরী দত্ত শুধু জানে’

ফরহাদ মজহার

বৃহৎ বঙ্গের কবি, গদ্যকার, সমাজচিন্তক ও ‘প্রতিপক্ষ’ এবং ‘চিন্তা’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক।

Share