অনুবাদ ও অনুসৃজন

।। আর্যনীল মুখোপাধ্যায় ।।

প্রায় সমস্ত ভাষাসমাজেই চলমান কবিতা লেখালিখির বাইরে একটা বিকল্প কাব্যসাহিত্যধারা গড়ে ওঠে। এর অনেকটাই গড়পড়তা কবিতার আধেয়, বিষয়, রচনাশৈলি, ভাষাবিন্যাস, পদান্বয়, ছন্দগতিকে এড়িয়ে, বা তার বিরোধিতায় এক বা একাধিক সমান্তরাল ধারা নির্মাণ করে। পশ্চিমবঙ্গে এই সমান্তরাল ধারার বা পরীক্ষামূলক ধারার অন্যতম কবি আর্যনীল মুখোপাধ্যায়। নিজের ‘পরীক্ষা কবিতা’ ভাবনসমূহ ও তাঁর পরীক্ষামূলক কবিতার একাধিক প্রকল্প নিয়ে লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আর্যনীল। সেগুলি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে ‘প্রতিপক্ষ’ পত্রিকায়। এটি দ্বিতীয় পর্ব। এই পর্বে কবিতার অনুবাদ, অনুসৃজন নিয়ে আলাপ। এক সৃজনের ছায়া লেগে থাকে আরেক সৃজনে, কখনো সীমানা পার করে, দ্রাঘিমা পেরিয়ে, কখনও-বা নিজের সৃজনের ভিন্ন এক প্রকাশ ভিন্ন আলো-বাতাসে। এসব নিয়ে লিখতে লিখতে কবি আর্যনীলের এই গদ্যে উঁকি দিয়েছে কথাসাহিত্যের প্রসঙ্গও। এমনকি সিনেমা, গান…

অনুবাদ ও অনুসৃজন

আমেরিকায় নানান জায়গায় কবিতা পড়ার সময় একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হ’তে হয় সবসময়ে। ‘আপনার কাছে অনুসৃজন কী? কেন আপনি নিজের ইংরেজি কবিতাকে ‘অনুসৃজন’ বলেন?’ যেমন একদা ঘটলো মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্য পাঠাসরে। ইংরেজিতে কখনো লিখতাম না। যদিও অনুবাদ করতাম দু-তরফাই। যে সব জীবিত মার্কিন কবির কবিতা অনুবাদ করতাম, তাঁদের সাথে আলোচনার মধ্যে দিয়েই। এঁরা, বিশেষত সমকালীন ও তরুণতররা, এক সময় আমার নিজের লেখা সম্বন্ধে আগ্রহী হলেন স্বাভাবিক কৌতূহলে। যেহেতু দু’তরফাই অনুবাদ করতাম, একদিন নিজের কবিতাও অনুবাদ করতে বসলাম। মুহূর্তে বুঝতে পারলাম এ প্রায় অসম্ভব কাজ।

অনুবাদ সম্বন্ধে গড়পড়তা বাঙালির একটা নাক-শিটকানো আছে, যেমন পাঠকের, তেমনি লেখকের, যা এই শতকে খুবই সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গি মনে হয়। একদিন কথায় কথায় অঙ্কুরদা (সাহা) বলেছিলেন, ‘বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে অনুবাদক হলো তৃতীয়শ্রেণীর নাগরিক’। অনুবাদকর্মকে সৃষ্টিশীল ভাবা হয়না, যাকে  creative misreading বা সৃষ্টিধর্মী পাঠত্রুটি বল যায়, তার কোনো জায়গাই গড়ে ওঠেনি বাংলা সাহিত্যে। অথচ অতীত ভারতের বহু সাহিত্য ও শিল্পকর্ম এইভাবে, যৌথরচনা ও অনুরচনার মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে। যেহেতু আমাদের কবিতা শেখানো হয় – ‘এখানে কবি কী বলতে চেয়েছেন বা কবি কী ভেবেছেন’ শ্রেণীর জিজ্ঞাসার মধ্যে দিয়ে, তাঁকেই শ্রেষ্ঠ অনুবাদক ভাবা হয় যিনি আক্ষরিক অনুবাদ করেন বা তাতে বিশ্বাস রাখেন। অনুবাদ আর ভাষান্তর এক জিনিস নয়, অনুবাদ এক প্রক্রিয়া যা সেই বিচিত্র টানেলের মতো নদীর নীচ দিয়ে আমাদের ওপারে বা অন্য এক ভূখণ্ডে অন্য শহরে নিয়ে গিয়ে তোলে আর আমরা বাস বা ট্রেন থেকে নেমে চোখ মেলে চমকে যাই। আক্ষরিক অনুবাদ বেশিরভাগ সময়ে সেটা করতে ব্যর্থ হয়।

যেটা লক্ষ্যভাষা (target language) আর যেটা সূত্রভাষা (source language) – এই দুটো ভাষার তদানীন্তন সাহিত্যের রূপরেখা সম্বন্ধে অনুবাদকের একটা ভালো ধারণা থাকা দরকার। শুধু ইংরেজি ভাষা জানা থাকলেই ইংরেজিতে/ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা উচিত নয়। কোনো একটা ইংরেজি ভাষা এই পৃথিবীতে নেই। অস্ট্রেলিয়, মার্কিন, দক্ষিণ আফ্রিকান, কানাডীয়, ক্যারিবিয়ান, ভারতীয়, ব্রিটিশ – প্রত্যেকটা ইংরেজি ভিন্ন।  যেমন ধরা যাক, যাঁর ইংরেজি কবিতার বিদ্যা টি এস এলিয়টে এসে শেষ হয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন বা কানাডিয় (বা এমনকি ব্রিটিশ) কোনো কবিতার অনুবাদে হাত না দেওয়াই ভালো। একইভাবে কোনো সমসাময়িক বাঙালি কবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদও তাঁর করা উচিত না কেননা বিদেশী সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার কোনখানটাতে তিনি সেই বাঙালী কবিকে ফেলবেন সেই ধারণা তাঁর নেই। এ ছাড়াও অনেকে অন্য বিদেশী ভাষার কবিতার ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় ভাষান্তর/ভাবান্তর করেন মূল প্রথম ভাষাটার সম্বন্ধে এতটুকু ধারণা না রেখে। এই সমস্ত কারণে বুদ্ধদেব বসু, অরুণ মিত্র, জ্যোতির্ময় দত্ত – এমন ৫-৬ জন ছাড়া কারো অনুবাদ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে আজও।

নিজের কবিতার অনুবাদে হাত দিয়ে সবচেয়ে বড়ো যে অন্তরায় এলো সেটা সংস্কৃতি সংক্রান্ত। মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পাঠে এসব বিষয় নিয়েই প্রশ্ন উঠলো। অনেক ছাত্রছাত্রী এসেছিলো সেই সন্ধ্যায়। হলঘরে ঢুকে ভালো লেগেছিলো এত কবিতাপ্রেমী মানুষকে দেখে। কবিতা পড়ার সময় দেখলাম কোনো কোনো ছাত্র-ছাত্রী নোট নিচ্ছেন। মজা পেলাম। অনেক সময় আমন্ত্রণকারী অধ্যাপক বা অধ্যাপিকা ওঁদের বিশেষ কোর্সের ছাত্রছাত্রীদের এইসব পাঠের আসরে যেতে বলেন। পরের দিন ক্লাসে আলোচনা হয়, প্রশ্নোত্তরের আসর হয়। যেসব  ছাত্রছাত্রীরা কবিতাপাঠের আসরে এসেছিলেন তাদের একটু বেশি নম্বরও (ক্রেডিট) দেওয়া হয়। কবিতা বা পরীক্ষামূলক সাহিত্য সম্বন্ধে আগ্রহ জাগিয়ে রাখার এই সমস্ত পদ্ধতি খুবই কার্যকরী।

যেটা লক্ষ্যভাষা (target language) আর যেটা সূত্রভাষা (source language) – এই দুটো ভাষার তদানীন্তন সাহিত্যের রূপরেখা সম্বন্ধে অনুবাদকের একটা ভালো ধারণা থাকা দরকার। শুধু ইংরেজি ভাষা জানা থাকলেই ইংরেজিতে/ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা উচিত নয়। কোনো একটা ইংরেজি ভাষা এই পৃথিবীতে নেই। অস্ট্রেলিয়, মার্কিন, দক্ষিণ আফ্রিকান, কানাডীয়, ক্যারিবিয়ান, ভারতীয়, ব্রিটিশ – প্রত্যেকটা ইংরেজি ভিন্ন।  যেমন ধরা যাক, যাঁর ইংরেজি কবিতার বিদ্যা টি এস এলিয়টে এসে শেষ হয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন বা কানাডিয় (বা এমনকি ব্রিটিশ) কোনো কবিতার অনুবাদে হাত না দেওয়াই ভালো। একইভাবে কোনো সমসাময়িক বাঙালি কবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদও তাঁর করা উচিত না কেননা বিদেশী সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার কোনখানটাতে তিনি সেই বাঙালী কবিকে ফেলবেন সেই ধারণা তাঁর নেই।

অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘পরিবিষয় কবিতা আন্দোলন’-এর পোর্টফোলিও থেকে আমি কবিতা পড়ি – ‘ঘনবনজ’। ইংরেজি অনুসৃজনে ‘woodense’। প্রতি বসন্তে সুন্দরবনে প্রায় হাজারখানেক মৌলি বাঘের ভয় অগ্রাহ্য করে স্রেফ পেটের দায়ে, জীবিকার তাগিদে জঙ্গলে গিয়ে মধু সংগ্রহ ক’রে আনেন। যে কয়েক সপ্তাহ তারা জঙ্গলে মৌ খোঁজেন, মৌলি-স্ত্রীরা সাময়িক বৈধব্য পালন করেন। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করা কবিতায় জঙ্গল, মৌলি, মৌলি-স্ত্রী, বাঘ, বন, সরকার, বনবিভাগ, মৌমাছি, মধু, বনবিবি প্রভৃতি বস্তু ও বিষয়ভাবনার মধ্যে জালের মতোই জটিল সামাজিক, জাগতিক, রূপকী ও নান্দনিক সম্পর্ককে অবলম্বন করে এই কবিতা। এখানে স্বভাবতই অনেক সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ এসে যায়।        সুন্দরবনের গ্রামীণ সমাজের আর্থ-সামাজিক কাঠামো, স্বল্পোপার্জনী স্বামীদের ওপর মৌলি-স্ত্রীদের নির্ভরতা আমেরিকার লিবারাল আর্টসের অধ্যাপিকা কি ছাত্রীর পক্ষে কতোটা বোঝা সম্ভব? আবার পাশাপাশি সম্পূর্ণ উল্টো তাৎপর্য ও প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। মাতৃতান্ত্রিক, পৌত্তলিক বহু-ঈশ্বরবাদের দেশ ভারত। সেখানে অসংখ্য মাতৃরূপিনী দেবী আছেন যাঁরা সমাজের চোখে সামষ্টিক ও জাগতিক ক্ষমতার প্রতিভূ। যে বাঘের ভয়ে মৌলিরা ভয়ার্ত, সেই বাঘই বনবিবির বাহন। এই নারীপ্রাধান্যের সামাজিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বাস্তবের সম্পূর্ণ উল্টোমেরুতে। এবং সেটাও, বা এই বৈপরীত্য, বিদেশী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া কঠিন। এই সমস্ত উপাচার ও ধারণার কাঠামোকে আঁকড়ে ধ’রে যে কবিতা লতিয়ে উঠছে তার কেবল ভাষান্তর ক’রে কি লাভ! কি লাভ গাদাগাদা ফুটনোটে, উপাখ্যানে ভরিয়ে দেওয়া অনুবাদ-কবিতা লিখে! ফলে আমি যেটা করি, সাংস্কৃতিক বৈপরীত্যকে যখন লঙ্ঘন করা সহজ হচ্ছে না, কবিতার সেই অংশগুলো বাদ দিই। তার বদলে আসে নতুন ইংরেজি অংশ। সেটা কখনো হয়ে ওঠে বাংলা কবিতাংশের ইংরেজি অনুলিখন, কখনো সিনেমার ভয়েস-ওভারের মতো এক স্বরান্তর, কখনো বা নিজের লেখার পাস্তিশ আর নয়তো সম্পূর্ণ নতুন একটা ইংরেজি ছত্র। এইভাবে গড়ে ওঠে নিজেরই লেখার যেন এক বিদেশিনী সহোদরা।

মায়ামির এক অধ্যাপক আরো একটি উদাহরণ দিতে বললেন। তখন অন্য একটা প্রসঙ্গ এসে পড়লো। বুঝিয়ে বললাম ছাত্রদের। সেখানেও এক দেবী রয়েছেন – দুর্গা। ব্যাপারটা এইরকম। দেবী বিসর্জনের দিন গঙ্গার ঘাটে একটা চোরা ব্যাপার ঘটে যার কথা কেউ কেউ জানেন। মৃৎশিল্পীদের অনেকে সেদিন ঘাটে যান এবং কিছু লোক বা রাস্তার গরীব, অনাথ শিশুদের হাতে সামান্য কিছু গুঁজে দিয়ে ওঁরা, ওঁদেরই গড়া মায়ের বিসর্জিত মূর্তির মাথাটা কেটে আনতে বলেন। ধীমান চক্রবর্তীর বই ‘কাচ শহরের মানুষ’-এর মলাটে বাদল পাল কৃত এমন এক আলোকচিত্রও আছে। দুটো লোক ডুবন্ত মায়ের কেটে আনা মাথার অর্ধেকটা গামছায় ঢেকে জল থেকে তুলে নিয়ে আসছে। এই মাথাটাই পরের বছর আবার কোনো মাতৃদেহে পুনর্ব্যবহৃত হয়।

আমার একটা কবিতায় ২-৩ পংক্তি জুড়ে এই চিত্রকল্প ব্যবহার করি। নদীর মাটি দিয়ে গড়া নদীমাতৃক দেশের মায়ের মূর্তি সেই নদীতেই ফিরিয়ে দিয়ে মানবসমাজ যেমন জীবনচক্রের (circle of life) এক অপূর্ব, বিমূর্ত আচার গ’ড়ে তোলে, তেমনই ঐ বিসর্জিত মূর্তির মাথা তুলে এনে তাকে আবার মৃৎশিল্পে ব্যবহার করার মধ্যে আমি দেখতে পেয়েছিলাম – এক শিল্পচক্র – a circle of art । এখন প্রশ্ন হলো – কোন বিদেশী পাঠক বুঝতে পারবেন আমার ঐ দু-লাইনের স্বকৃত অনুবাদ পড়ে, আমি এখানে ঠিক কী করতে চাইছি? কাজেই এই সমস্ত জায়গায় আমি মূল পংক্তিগুলো বাদ দিয়েছি, বসিয়েছি সমভাবনার নতুন পংক্তি।

আমেরিকায় অজস্র পিয়ানো কারখানা আছে। তাঁরা খারাপ হয়ে যাওয়া পিয়ানোর কাঠ অনেক সময় ফেলে দেন, শস্তা দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেই কাঠ কিনেই আবাত ছোট একটা কারখানা, শিশু-ইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বেহালা বানায়। এই উদাহরণ আমায় একবার দিয়েছিলেন এক পিয়ানো কারখানার মালিক। তখন মনে হয়েছিলো শিল্পচক্র ভাবনার ঐ জায়গাটায়, মূল বাংলা দু-পংক্তি ফেলে দিয়ে, ইংরেজি অনুসৃজনে সমরূপক হিসেবে ওই পিয়ানোকাঠের পুনর্ব্যবহারের ভাবনাটা সরবরাহ করি। এইই হলো অনুসৃজন – যা শুধু নিজের কবিতার ক্ষেত্রে নয়, অন্যের কবিতা অনুবাদ করার কাজেও লেগে যায়। 

Ω      Ω      ∞      ∞      ∂       ∂

প্রায় বছর দশেক আগে একদিন সমীর রায়চৌধুরী জিজ্ঞেস করেছিলেন – আমেরিকায় ‘ইন্সটলেশন’-এর কাজ কেমন হচ্ছে আজকাল?  কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারিনি সেদিন সমীরদাকে। কেননা আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্সটলেশন বা সম্পূর্ণ ইন্সটলড্‌ কবিতা তেমন চোখে পড়েনি। ইন্সটলেশন বা অনুস্থাপনের ধারণাটা মূলত শিল্পক্ষেত্রে শুরু হয়, ১৯৫০ দশকের কোনো সময়ে (অন্তত আমেরিকায়)। অবশ্য এই তথ্যের বিরোধিতা করা খুব সহজ কেননা সাহিত্যের গোড়াকাল থেকে অনুস্থাপনের ব্যবহার চ’লে আসছে। পুরাণ বা ব্রহ্মসূত্রের অনেকটাই মৌলিক রচনা নয়, চ’লে আসা আপাতসূত্রহীন রচনা। ইহুদী তালমুদদের লিপিও মূলত তাই। আধুনিক যুগের বাংলা কবিতায় বিষ্ণু দে একদিন আচমকা লিখে বসলেন একটি কবিতায় – ‘কাল রজনীতে ঝড় হয়ে গেছে রজনীগন্ধা বনে’। বছর ত্রিশেক আগে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় একটা ছোটো আলোচনায় বিষ্ণু দে-র এই পংক্তিকে বলেছিলেন – ‘রিডিমিং লাইন’। সেটা সত্যিই সমর্থনযোগ্য, কেবল এই যে … পংক্তিটি রবীন্দ্রনাথের।      

সুতরাং অনুস্থাপন ব্যবহারের সত্যিই কোনো আদি নেই। ১৯৫০ দশকের যুক্তরাষ্ট্রে ও অন্যনায় দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষাসাহিত্যে অনুস্থাপনের ব্যবহার বাড়তে থাকে। কিন্তু খুব আনুষ্ঠানিকভাবে (যা সমীর ও মলয় রায়চৌধুরীর প্রভাবে ১৯৯০ দশকের শেষার্ধে বাংলা কবিতায় কিছুটা হলো) লেখা এমন কবিতা চোখে পড়েনি।   

পৃথিবীর নানা প্রান্তের, বালিঘড়ির নান লয়ের কাব্যসাহিত্য এলোপাথাড়ি পড়তে পড়তে আমার ‘মৌলিক সাহিত্য’ সম্বন্ধে ধারণাটা চ’টে গেছে। অস্ট্রিয়ার এক নামী সাহিত্যিক একদা বলেছিলেন যে সাহিত্য এক গোপন পাতালনদীর মতো – একটানা বয়ে চলেছে নিজের মতো; আমরা, সাহিত্যিকরা কেবল যে যার নিজের ঘটি-বালতি নিয়ে যে যার নিজের জায়গা থেকে তার অণুমাত্র জল তুলে নিই। এরিক ফন্‌ দ্যনিকের ধর্মশাস্ত্রমতো হয়তো সমস্ত কবি ও কবিতার কোনো ‘অ্যান্টিম্যাটার’ নেই এই পৃথিবীতে, কিন্তু ভাষা ও ভাবনার অজস্র সমব্যবহার আছে – সে জেনে হোক বা না জেনে। ফলে রবি আর ওয়ার্ডস্বার্থে যেমন মিল পাওয়া যায়, তেমনই ডিকিনসন আর রবিতে, বোদলেয়ার আর পো-তে, রবি ও আন্তনিও মাচাদোয়, কি জীবনানন্দ ও হুইটম্যানে, ঈভ বনফোয়া ও জর্জ অপেনে – এইভাবে তালিকা পৃথিবীর বৃহত্তম ট্রেন। তবু প্রশ্ন থেকে যায় – কখনো জেনেশুনে মানুষ কেন বহুশ্রুত বা পঠিত অন্যের পংক্তি লেখে? কেন বিষ্ণু দে-কে রবীন্দ্রনাথের আঁজলা থেকে জলপান করতে হলো সরাসরি? বিদগ্ধ, প্রাজ্ঞ, মনোজ্জ্বল বিষ্ণু কেন জেনেশুনে খোলাবাজারে এমন ‘আপাত-চৌর্যবৃত্তি’র নিদর্শন রাখলেন? 

কারিগরি গণিত বা নিউমেরিকাল ম্যাথ্‌ম্যাটিস্কের লোক হিসেবে আমার প্রতিনিয়তই মনে হয় এ জগত চূর্ণ, ডিস্ক্রিট। একটানা প্রবহমান বলে সত্যিই কিছু নেই। ঐ যে পাতালনদী, সেও বিন্দু বিন্দু জল দিয়ে গড়া। ভাঙতে ভাঙতে এক জায়গায় গিয়ে আর কোনো ভাঙন নেই।  হ’তে পারে সে পরমার্থের আকার বিচিত্র ও আপেক্ষিক। এর কারণেই এক জায়গায় গিয়ে আকারের সাথে প্রকার মিলে যায়, নিজের ভাবনার সুপ্রকাশে অন্যের মৌল কাজে লাগে; আমরা যে বিচ্ছিন্ন নই, অন্যের দ্বারা বাহিত, পালিত ও প্রমাণিত – এই ধারণার এক জোরালো বহিপ্রকাশ দেখি পুনরুক্তি ও পুনঃপ্রকাশে। প্রলেপের ওপর প্রলেপ চড়ে। ‘রজনীগন্ধা’ শব্দটাও সম্ভবত রবির সৃষ্টি, ‘কাল রজনীতে … ‘ লাইনটাও তাঁরই, তবু বিষ্ণু সেটা নেন, এতে রবির প্রতি ওঁর শ্রদ্ধা ও আকর্ষণের প্রকাশই সোচ্চার হয়। একইভাবে হুবহু বিদেশী সুরে রবি নিজেই বেঁধেছিলেন – ‘পুরানো সেই দিনের কথা’র মতো অজস্র গান। একইভাবে সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শচীন দেব ও রাহুল দেব বর্মণের বহু গান ও গানাংশ। আর যখন সচেতনভাবে ‘মৌলিক’ সাহিত্য নির্মাণ করি আমরা, হয়তো দেখা যায় এমন ‘মৌলিক’ পৃথিবীর অন্যকোনোখানে অন্য একজনও এমন করে ব’সে আছেন। হয়তো আমাদের অনেক আগেই। এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। তেমন ‘মৌলিক’কে আর ‘অসীম মৌলিক’ও বলা যায় না। তার নাম হয় ‘অজ্ঞান মৌলিক’।  

এরিক ফন্‌ দ্যনিকের ধর্মশাস্ত্রমতো হয়তো সমস্ত কবি ও কবিতার কোনো ‘অ্যান্টিম্যাটার’ নেই এই পৃথিবীতে, কিন্তু ভাষা ও ভাবনার অজস্র সমব্যবহার আছে – সে জেনে হোক বা না জেনে। ফলে রবি আর ওয়ার্ডস্বার্থে যেমন মিল পাওয়া যায়, তেমনই ডিকিনসন আর রবিতে, বোদলেয়ার আর পো-তে, রবি ও আন্তনিও মাচাদোয়, কি জীবনানন্দ ও হুইটম্যানে, ঈভ বনফোয়া ও জর্জ অপেনে – এইভাবে তালিকা পৃথিবীর বৃহত্তম ট্রেন। তবু প্রশ্ন থেকে যায় – কখনো জেনেশুনে মানুষ কেন বহুশ্রুত বা পঠিত অন্যের পংক্তি লেখে? কেন বিষ্ণু দে-কে রবীন্দ্রনাথের আঁজলা থেকে জলপান করতে হলো সরাসরি? বিদগ্ধ, প্রাজ্ঞ, মনোজ্জ্বল বিষ্ণু কেন জেনেশুনে খোলাবাজারে এমন ‘আপাত-চৌর্যবৃত্তি’র নিদর্শন রাখলেন? 

এই প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব  বসুর ‘স্মৃতির প্রতি’ কবিতাটির কথা আবার উঠবে। বহুকাল আগে পড়া এই কবিতার প্রতি আমার নজর কাড়ে এক আমেরিকান যুবক, ২০০৭ সালের সায়াহ্নে। জর্জ অপেনের সাথে ১৯৬০-৬১ সালে নিউ ইয়র্কে বুদ্ধদেব বসুর আলাপ ও পরে গভীর বন্ধুত্ব হয়। নিউ ডিরেকশন্স প্রকাশনী বুদ্ধদেবের একটা বই করার কথা ভাবছিলো। কিন্তু ওঁর বিলিতি ইংরেজিকে কিছুটা আমেরিকান ক’রে নিতে অপেনকে প্রকাশনীর কর্ণধার বুদ্ধদেবের পাণ্ডুলিপিটা দিয়েছিলেন। অপেনের সাথে বুদ্ধদেবের আলোচনা চলতে থাকে, এক সময় নিউ ডিরেকশন্স ও বুদ্ধদেব দুজনেই হয়তো পারস্পরিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু অপেনের মধ্যে সঞ্চারিত হতে থাকে বুদ্ধদেবের কবিতার কিছু বীজ। প্যালিম্‌টেক্সচুয়াল বা ‘অধিলিপিক’ এক পদ্ধতিতে অপেন বুদ্ধদেবের ‘স্মৃতির প্রতি’ কবিতা থেকে নিজস্ব এক কবিতা নির্মান করেন।  এসব আমাদের অজানা ছিলো, না জানতেন কোনো বাঙালী, না কোনো আমেরিকান। আমার এই তরুণ বন্ধু প্যাট ক্লিফোর্ড (Pat Clifford) নিজস্ব গবেষণার মাধ্যমে এসব তথ্য খুঁজে বের করেন। আমি যতটা সম্ভব সাহায্য করি, বিশেষত বুদ্ধদেব-কন্যা দময়ন্তী বসু-সিং-এর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে। এসব কথা প্যাট ও আমি – দুজনেই বারবার লিখেছি। দুই প্রয়াত কবির ঘনিষ্ঠতার ভূতটা যে আমাদের ঘাড়ে আজো চেপে বসে আছে সেই উত্তেজনা থেকে আমি অন্তত সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারিনি। সম্প্রতি আরো একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। আচমকাই।

অস্ট্রেলিয়ার এক নামী কবি পিটার বয়েল (Peter Boyle)। উনি একদিন লিখলেন যে আমেরিকার ফ্লোরিডায় এক কুবান কবি থাকেন – হোসে কোসের (José Kozer); ওঁর একটা বিখ্যাত কবিতা আছে – অ্যানিমা, জর্জ অপেনের জন্য। সেই কবিতা জর্জ অপেনের সেই কবিতার দ্বারা সংক্রামিত যা বুদ্ধদেবের ‘স্মৃতির প্রতি’ থেকে গড়ে উঠেছে। পিটার ইন্টারনেটে প্যাট ক্লিফোর্ডের প্রবন্ধটা খুঁজে পান, খুঁজে পান আমাকে। উনি হোসে কোসেরের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ আমায় পাঠান। কিছু প্রশ্নও পাঠান বুদ্ধদেব-অপেন প্রসঙ্গে। উত্তরে আমি লিখি – বাংলা থেকে মার্কিন ইংরেজি, সেখান থেকে এস্পানিওল হয়ে অস্ট্রেলিয় ইংরেজির মাধ্যমে হোসের কবিতাটা আবার ফিরে যেতে পারেনা বুদ্ধদেবের বাংলায়? এই ফিরতি-যাত্রার সম্ভাবনায় পিটার বয়েলও জোসে কোসের আনন্দ চেপে রাখতে পারেননি। কবিতাটা বাংলায় অনুবাদ করা হয়ে ওঠেনি আর, তাই বয়েলের অনূদিত ইংরেজিটাই দিলাম।

José Kozer

ANIMA FOR GEORGE OPPEN

Rugged landscape and, despite the excess of rugged landscape,
face like jagged rock, I spend
the morning (in transit)
reading George Oppen.

A piece of fruit the size of Buddha, I don’t dare open my mouth,
nothing is bite-size, it might
be wax or lead, fruit of a
Bodhisatva, the poem of
George Oppen based on
a poem of Buddhadeva Bose,
jagged as Oppen’s face, a
smooth-skinned fruit, the
flower’s ovary wrinkles to
transform into fruit, I know
for certain that in the shining
brilliance I’ve seen the apples
of Cezanne (red yellow
red in their darkness.)

There is this guy in the train to Munich reading
my book of
poems: no other voice can
be heard, a moment beyond memory,
you can hear a fly’s wing
brush the hardest rock, settle
among the black ash of Fujiyama:
its buzzing embed itself into the
intimacy of metal (railway track).
We go forward, nonetheless. Page 94.
The train furiously intent on the speed
needed to reach its destination
Oh Bodhisatva.

Invocation: George Oppen, concomitant light, lift one of Cezanne’s
apples to your mouth (the painting
stays intact: already it is beyond
memory): two cones of light, hunger
in unison (one omnimode) chew
the dodecahedron, from your
other side (you are dead):
(in any direction you like) spit
three seeds: three seeds, George
Oppen, and what then? Alight.
Kant has just kissed his servant
on the mouth. And in the heavens
Ephraim and Esther are the gills
of two fish opening on resurrection.
Everything is joined together. I close
the book. Next stop Marienplatz
(my fingers crossed against you,
Dachau): and beyond the tracks
as I go to meet it, where cows
graze, something extraordinarily new.

হোসে কোসের (José Kozer)

‘বৃত্ত সম্পূর্ণ’ হলো – এমন কথা কক্ষনো বলবো না। Circle of life- ওটা বাজে কথা। অর্ধশিক্ষার কথা। বৃত্ত এক বিশুদ্ধ আকার। বাস্তব আসলে কুণ্ডলী। যার মধ্যে দিয়ে জীবন এগিয়ে যায় আবার পিছিয়েও যায় এক নতুন ঘাটে যেখানে আগেও কোনোদিন এক তরী এসে ভিড়েছিলো। হয়তো অন্য এক তরী, অন্য কারণে। একথাও মনে রাখতে হবে – যদি অপেন তাঁর কবিতার (যা কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর কবিতার চেয়ে বহুলাংশেই আলাদা, ভাবে, প্রকাশে ও ভাবনায়) শীর্ষে বুদ্ধদেবের ‘স্মৃতি প্রতি’র কাছে ঋণস্বীকার না করতেন এই কুয়াশাকুণ্ডলীর কথা আমরা জানতেও পারতাম না। সে হতো গবেষণার বিষয়। বেশিরভাগ কবিই এভাবে ঋণস্বীকার করেন না। আমরা আসলে ঐ ‘না পড়িলে ধরা’র দলে নাম লেখানো ‘মৌলিক’ কবি।     

Ω       Ω       ∞       ∞       ∂        ∂

এভাবেই উঠবে ‘পাস্তিশের’ (pastiche) কথা। রাতের পাস্তা, অর্থাৎ যা কিনা ইতালীয় খাবার, যেটুকু বাকী পড়ে রইলো, পরের দিন মধ্যাহ্নে সেই বাসী পাস্তার সাথেই অন্যান্য বাসী রান্নার টুকরোটাকরা মিশিয়ে, আরো কিছু নতুন মশলা বা উপাদান যোগ করে, ফুটিয়ে তৈরি হয় – পাস্তিচিও (pasticcio)।

অনেকটা ‘খিচুড়ি’ কি ‘ঘ্যাঁট’ কি ‘লাবড়া’র মতো। সেই পাস্তিচিও থেকেই এসেছে ‘পাস্তিশ’ শব্দ ও ধারণা। অতীতের শিল্পের সুতো-ফিতে, খড়কুটো আজকের শিল্পী দুভাবে ব্যবহার করেন – জেনে ও না-জেনে। জেনে ব্যবহার করা শিল্পকেই যে পাস্তিশ বলা যাবে এমন নয়। চলচ্চিত্রে তার উদাহরণ ভুরি ভুরি। এগুলোকে ‘রিমেক’, ‘অ্যাডাপ্‌টেশন’ ইত্যাদি বলা হয়। পিরানদেলোর নাটক থেকে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যে ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র’ করেছিলেন তাকে কতটা পাস্তিশ বলা যায় কতটা বাঙালীকরণ, এ নিয়ে তর্ক হতে পারে। একইভাবে শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এর একাধিক চলচ্চিত্রায়নকে পাস্তিশ বলা যায় না, ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘শুভ মহরত’ ছবিটাও আগাথা ক্রিস্টির গল্পের (The Mirror Crack’d from Side to Side, যার শীর্ষক কিনা আবার আলফ্রেড টেনিসনের কবিতা থেকে নেওয়া) ও সেই গল্পভিত্তিক ছবির (The Mirror Crack’d) বাঙালীরূপ, পাস্তিশ নয়, ঠিক যেভাবে ব্রিটিশ শিল্পী ডোরা ক্যারিংটন ও তাঁর সাথে লেখক লিটন স্ট্র্যাচের সম্পর্ক নিয়ে জীবনীভিত্তিক ছবি ‘ক্যারিংটন’-ও নয়। বরং; ববার্ট বার্নসের কথা-সুর রবি যেভাবে ব্যবহার করেছিলেন তাকে পাস্তশ বলা যায় কিছুটা; একইভাবে মোৎসার্তের প্যাস্টোরাল (সম্ভবত সিম্ফনি ৪০) থেকে সলিল চৌধুরী তালাত মাহমুদ ও লতা মঙ্গেশকারের জন্য ‘ইতনা না মুঝসে তু পেয়ার বড়া/ কে ম্যায় ইক আশিক আওয়ারা’ যে পদ্ধতিতে রচনা করেছিলেন তাকে পাস্তিশ না বলে উপায় নেই। 

পাস্তিশ বিভিন্ন দেশ ও কালের বেড়া টপকে গিয়ে একটা সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে অন্য রচনা বা অন্য স্মৃতির ওপর আরোপ করতে পারে। এটা কবিকে সাহায্য করে। প্রথাসিদ্ধ উচ্চারণ থেকে বেরিয়ে যাবার একটা গোপন দরজা খুলে দেয় পাস্তিশ, গাঢ় ঘনিষ্ঠতায় মিশতে দেয় আন্তর্জাতিক শিল্প-সাহিত্যের জগতের সাথে…

১৯৯০এর দশকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কয়েকটা পাস্তিশ গদ্য লেখেন – যেমন মার্কেজের উপন্যাস ‘Love in the time of cholera’ থেকে ‘কলেরার দিনগুলিতে প্রেম’, যাকে অন্যত্র ‘স্পুফ নভেলা’ বলা হয়েছে, যদিও আমার মনে হয় পাস্তিশ-গদ্য হিসেবেই তার সাফল্য বেশি। এই উপন্যাসকে কেন্দ্র করে একটা মজার স্মৃতি আছে। ‘কলেরার দিনগুলিতে প্রেম’-এর একটা পার্শ্বচরিত্র তরুণ কবি আর্যনীল, যে নিয়মিত শ্মশানে যায় এবং মৃতমানুষের খুঁটিনাটি টুকে রাখে। সন্দীপন যখন বইটা লিখছিলেন সেই সময়ে আমার যাতায়াত ছিলো ওঁর চেতলার বাড়িতে। গদ্য সম্বন্ধে পারতপক্ষে অনাগ্রহী এক তরুণ কবির সঙ্গে সন্দীপনের সেই স্নেহবৎসল বন্ধুত্বের সত্যিই কোনো মাথামুন্ডু নেই। কেবল কোনো উপন্যাসে ঐ আমার প্রথম ও শেষ রোল-প্লে।  সেই সময় ওঁর আরো একটা জবাবী-প্রহসন উপন্যাস ‘জঙ্গলের দিনরাত্রি’ পড়তে দিতেন। খুঁটিয়ে পড়তে হতো, কেননা সন্দীপন সেখান থেকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন পরের দিন। এই উপন্যাসকেও নেতিবাচক পাস্তিশ বলতে দ্বিধা করবোনা আজ, কারণ বইটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র প্রতি-কাহিনি। একইভাবে কয়েকজন বিখ্যাত বিশ-শতকী লেখকের নানা রচনাকে পরবর্তীকালে পাস্তিশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে হোর্হে লুই বোর্হেস, মার্সেল প্রুস্ত, ফ্রান্‌জ কাফকা ও মিলান কুন্দেরা অন্যতম। পাস্তিশ নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে। সাম্প্রতিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জর্মান-বংশোদ্ভূত অধ্যাপিকা ইঙ্গেবর্গ হস্টারের বইটা পশ্চিমী হলেও কোনো বিশেষ দেশ ঘেঁষা নয়। নাম – Pastiche: Cultural Memory in Art, Film, Literature  (২০০১)।

কিন্তু প্রশ্ন এই যে পাস্তিশের প্রসঙ্গ কেন তুললাম। আসলে পাস্তিশ বিভিন্ন দেশ ও কালের বেড়া টপকে গিয়ে একটা সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে অন্য রচনা বা অন্য স্মৃতির ওপর আরোপ করতে পারে। এটা কবিকে সাহায্য করে। প্রথাসিদ্ধ উচ্চারণ থেকে বেরিয়ে যাবার একটা গোপন দরজা খুলে দেয় পাস্তিশ, গাঢ় ঘনিষ্ঠতায় মিশতে দেয় আন্তর্জাতিক শিল্প-সাহিত্যের জগতের সাথে। বেড়াহীনভাবে মিশতে দেয়। আর সেখান থেকেই আপাত-নতুন লেখার জন্ম। আজো যে অনেক সাহিত্য-পণ্ডিত মাইকেল মধুসূদনকে বাংলার প্রথম ও পরম পরীক্ষাকবি বলেন তার কারণ কিন্তু অনেকটাই এই প্রথার বেড়ামুক্তি।  কাজেই দেখা যাচ্ছে ‘বিশুদ্ধ সাহিত্য’ বলে কিছুই হয়না। আবার এও ঠিক টুকলি-সাহিত্য, বঙ্গায়ন ইত্যাদির সাথে পাস্তিশের একটা সূক্ষ্ম ভেদরেখা রয়েছে। কম-পড়ুয়া বা ফাঁকিবাজ সাহিত্যিকের সেটা চট করে নজরে পড়বেনা আর সেখান থেকেই শুরু, যাকে বলে লেখকের ‘প্রকৃত পদস্খলন’।

(প্রথম প্রকাশ: কবিসম্মেলন ২০১১)

আর্যনীল মুখোপাধ্যায়

দ্বিভাষিক কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, চিত্রনাট্যকার ও সম্পাদক। বাংলা ও ইংরেজী মিলিয়ে ৯টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Conversation about Withering (২০২১, ক্রিস্তিনা স্যাঞ্চেস লোপেসের সাথে), অনাম আন্দ্রেসের একক ইস্তাহার (২০২০), স্মৃতিলেখা (২০১৩, ২০১৫), সুনামির এক বছর পর (২০০৮), চতুরাঙ্গিক/SQUARES (২০০৯, প্যাট ক্লিফোর্ডের সাথে), late night correspondence (2008), হাওয়ামোরগের মন (২০০৪) ও খেলার নাম সবুজায়ন (২০০০,২০১১)। গদ্যগ্রন্থ ‘কিনারার রূপকথা’। চারটি প্রবন্ধের বই। ইংরেজী ও ইস্পানি কবিতা সংকলিত হয়েছে অসংখ্য বিদেশী কাব্য-আয়োজনে। কৌরব অনলাইন ও The MUD Proposal সম্পাদনা করেন। পেশা – কারিগরি গণিতের গবেষণা।

   

Share