কাব্য


ফাতেমা তুজ জোহরা || Friday 28 June 19

আফিয়ার জন্ম এক বনেদি ঘরে।

সুপ্রাচীন এক পাঁচিল ঘেরা বাড়ি, দিন মান কবুতর, হাঁস মুরগী হেঁটে-উড়ে বেড়ায়, মাঝে মাঝে শেয়াল দৌড়ে যায়। কুকুরেরা এসে ছোঁক ছোঁক করে, তবুও তার বাবার অত পরোয়া নাই। তিনি ঋষি মানুষ; পশুপাখি,লতাপাতা, পলেস্তারা খসে পড়া বাড়িতেই তিনি ঈশ্বর দেখতে পান। আফিয়ার মা বিপরীত, নিতান্ত জংলা ভিলাকে পরিস্কার করতে দিনমান ঝাঁটা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। এই বাড়িতে বউ হয়ে এসে তার জীবন কিভাবে নিঃশেষ হয়েছে! পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, ডাক্তার সবাই তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, এখন ভূতের বাড়িতে এসে পঁচে মরতে হচ্ছে; রাতে টিনের চালে ধুপধাপ শব্দ, টিন ভেঙে নিয়ে যায় পারলে, কে জানে বাদুড় না ভূত। এই পোয়াতি অবস্থায় যে বাপের বাড়ি যাবেন সেই উপায় নাই, এই ভূতের বাড়িতে দুইদিন লক্ষীর হাত না পড়লে অনর্থ হয়ে যাবে যে।

ঋষি স্বামী শুনেন, নীরবেই জমিজমার কাগজপত্র দেখেন, নিজের কাজ করেন। রাতে অনেক জোছনা পড়ে, অন্তঃসত্তা স্ত্রী গরমে উঠানে এসে বসেন, স্বামী তাকে বলেন, তোমাকে দুটো কবিতা শোনাই? যদিও আফিয়ার মা ম্যাট্রিক পাশ দেয়া মহিলা, দুকলম কবিতাও মুখস্থ করতে হয়েছে, তবুও কবিতায় তার অত আগ্রহ নাই। উনি ঝামটা মেরে বলেন, ভাবের কেত্তন রাখো দেখি। গরমে বাঁচি না, এলেন কবিতা নিয়ে। শান্ত স্বামী বিষন্ন হয়ে যান। ভাবেন, এইবার আরেকটা মেয়ে হলে মেয়েটাকে শোনাবেন, কবিতা ভালবাসতে শিখাবেন তাকে। অবশ্য তার স্ত্রী মেয়েরা একটু হাটতে শিখলেই হেশেলে লাগিয়ে দেয় এইটাই সমস্যা। বড়টারও এমন হল। কলেজে বসে এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন, মেয়েটার জন্য রাত জেগে কবিতা ও লেখা হয়েছিল, পড়ে শোনানোর খুব ইচ্ছা ছিল তাকে।

সেই মেয়েকে কখনো ভালবাসার কথা বলা হল না, একদিন পিছু পিছু চলে গেলেন, মেয়ে যেই ফিরে তাকালো, আর তৎক্ষণাত তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল। এলোচুলে ঝড় তুলে মেয়ে সামনে তাকালো, তিনিও ওইখানে থেমে রইলেন। মেয়ে চলে গেল, তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। সেই ফিরে তাকানো নিয়েও না কত কবিতা, অথচ কিছুই তাকে জানানো হয় নি কখনো। একদিন হঠাৎ মেয়েটি কলেজে আসা বন্ধ করলো, তিনি পাগল হয়ে গেলেন, অনেক খোঁজ শেষে জানতে পারলেন, মেয়েটা পানিতে ডুবে মারা গেছে। গ্রাম গঞ্জের মেয়ে, সাঁতার জানত না? --এইটা ভেবেই তার দিন কেটে যেতে লাগল। সন্ধ্যাবেলা পুকুরঘাটে গিয়ে আর ফিরে আসে নাই, কেন আসে নাই, সে ত পুকুরেই গোসল করত, তাহলে কেন আসে নাই? আরো খবর নিয়ে জানতে পারলেন, বিয়ের কথা চলছিল বাসায়। তাহলে কি গোপন প্রণয়ের সাথে সন্ধি হবে না ভেবেই এই বিসর্জন? সেই প্রণয় কে ছিল? নিজের নাম ভাবতে তার সাহস হল না। অন্য কারো নাম ভাবতেও কষ্ট হচ্ছিল। মৃত প্রেয়সীর মনে কে ছিল এই চিন্তা তাকে অস্থির করে ফেলল। মৃত প্রিয়তমাকে নিয়েও কবিতা লিখলেন অনেকগুলো। একদিন মনে চাইল, কবিতা গুলো সব সেই পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসবেন, যেখানে তার শেষ নিঃশ্বাস পড়েছিল। স্বপ্নে সেই মেয়ে আসত, হাত ধরে টানাটানি করে বলত, ওগো কবিতা গুলো তো শোনালে না। তিনি ঘেমে নেয়ে জেগে উঠতেন, সিগারেট ধরাতেন।

সেইসব দুঃস্বপ্নের দিন কেটে গেল, তিনি যথারীতি বিয়ে করলেন বাবার পছন্দে। স্ত্রীকে দেখার সুযোগ হল বাসর রাতে। সাধাসিধা চেহারা,কবিতা লেখার মত কোন রসদ খুঁজে পাওয়া গেল না।

তাতে তিনি হতাশ হলেন না, বরং খুশি ই হলেন।

কোন এক কাব্যময়ী ললনার বিরহে জ্বলে জ্বলে অনেকটা পথ পার করে এসে এই সাধারণ মুখ তার কাছে নিরাপদ মনে হল। সকল রহস্য,বিরহ, আকর্ষণের মায়াজাল থেকে মুক্ত,এই সঙ্গিনী বাস্তব,স্বাভাবিক,কোন বিকার গ্রস্ততার স্থান এখানে নেই।

তবুও মাঝে মাঝে তার কবিতা,পুরনো প্রেম জেগে ওঠে।

তখন তিনি স্ত্রীকে কবিতা শোনাতে চান,স্ত্রী তার স্বাভাবিকতার মধ্যে কোন রহস্যকে স্থান দেয় নাই শুরু থেকেই,কখনো দেয় না।প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি বিষণ্ণ হন,আবার নিরাপদ ও বোধ করেন,সেই বিকার বেড়ে উঠুক ভাবতে অস্বস্তি লাগে।

তবুও তার একটা কবিতার মত মেয়ের শখ কিন্ত রয়েই যায়।

আফিয়ার বাবার দ্বিতীয় কন্যাসন্তান জন্মাল যখন,তখন পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ চলছে। মেঘের আড়ালে চাঁদ ডুবে যেতে যেতে আকাশ টা আরো অন্ধকার, ঘরের ভেতর থেকে তার স্ত্রীর আর্তনাদ শুনতে শুনতে তিনি চন্দ্রগ্রহণ দেখলেন।

এই গ্রহণের রাতটা কেন বেছে নিলে মা? -সদ্যাগত সন্তানকে মনে মনে বললেন তিনি।

মেয়েকে দেখার সুযোগ হল আরো পরে,দেখে চমকে উঠলেন ,চন্দ্রগ্রহণের রাতে তার ঘরে চাঁদ নেমে এলো।

এই মেয়ে সাক্ষাৎ কবিতা। তিনি কাঁপা হাতে এক টুকরো চাঁদকে কোলে নিলেন।

দূর থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসল, রহস্যময় রাতটা শেষ হয়েছে।

মেয়ের নাম রাখা হল 'কাব্য'। কাব্যের সাথে দিন ভালই কেটে যেতে লাগল। খিল খিল করে হাসে,হাত পা নাড়ে ইতিউতি,মাঝে মাঝে হামা দিতে চায়।

কাব্যর চোখের সামনে ঝুনঝুনি ধরতে গিয়ে বাবা প্রায় ই খেয়াল করেন,কাব্য ঠিক সাড়া দিচ্ছে না।নতুন কোন জিনিস দৃষ্টির মধ্যে আসলে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়, কাব্যের মধ্যে সেটা অনুপস্থিত।

তার ভয় তৈরি হয়, অজানা ভয়।

কাব্যের মাকে বলতে উনি উড়িয়ে দেন,তোমার শুধু বাজে কথা। এইসব মোটা মোটা বই পড়ে মাথাটা খেয়েছ তুমি। চুপ থাকো।

ভয় কাটে না, একদিন ভয় সত্যি প্রমাণিত হয়ে ও যায়। কাব্য অন্ধ। কাব্যর মা জেনে কতক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন, এই প্রথম কোন বাজে সংবাদ শুনে তিনি বিলাপ অথবা শাপ-শাপান্ত করলেন না। তারপর বললেন, মেয়েটাকে বিয়ে দেব কিভাবে? -বলেই তিনি কান্না লুকাতেই হয়ত রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। কাব্যর ঋষি বাবা বিছানায় শায়িত দুষ্টুমি করতে থাকা কাব্যকে কোলে তুলে নিলেন। কাব্য একটু কেঁদে উঠলো। তারপর শান্ত হয়ে বাবার কোলে বসে হাত চুষতে শুরু করল। কাব্যকে শক্ত করে বুকে ধরে তার বাবা মনে মনে বললেন, মাগো, তোমার জীবনে আলো থাকবে না, রং থাকবে না, তবে কবিতা থাকবে। আলো না থাকুক, রং না থাকুক,তুমি আলোকিত থাকবা, রঙিন ও থাকবা। পারবা না?

কাব্য আরেকবার কেঁদে উঠলো....

 

 


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।

¬¬