আমার এক নদীর জীবন (পঞ্চম পর্ব)

।। রওশন সালেহা ।।

রওশন সালেহার ‘আমার এক নদীর জীবন’ বাংলা আত্মজৈবনিক সাহিত্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ অধীন অবিভক্ত বাংলা এবং পাকিস্তান আমলের পূর্ব বাংলার নানা খণ্ডচিত্র উঠে এসেছিল এই গদ্য সাহিত্যে। বিশেষত অবিভক্ত বাংলায় নোয়াখালী, ঢাকা ও কলকাতার সমাজ জীবন, রাজনীতি, শিক্ষাপ্রসার ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ, ইতিহাসের নানা বাঁক ‘আলোকপ্রাপ্ত’ বাঙালি মুসলিম পরিবারের ভিতর থেকে আত্মজৈবনিক কথনের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছিলেন রওশন সালেহা। এই রচনার দ্বারা বাংলা সাহিত্যে রওশন সালেহা শক্ত স্থান দখল করে নেন। এছাড়াও ‘ফিরে এসো খামার কন্যা’ উপন্যাসের জন্য তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে পরিচিত। আমরা ‘আমার এক নদীর জীবন’ নামক আত্মজৈবনিক এই গদ্য সাহিত্যকে কয়েকটি পর্বে ধারাবাহিকভাবে ‘প্রতিপক্ষ’-এ পুণরায় প্রকাশ করছি। এই পর্বে রয়েছে, পুরুষতান্ত্রিক পরিবারের সমান্তরালে একটি মেয়ের স্বনির্ভরতার সংগ্রাম ও তার স্মৃতিকথা।

আমার এক নদীর জীবন (পঞ্চম পর্ব)

উপলব্ধি নতুন, তবে সংঘাত সেই পুরাতন

স্কুল শুরুর আগে শরীর চর্চা এবং পরে জাতীয় পতাকা তুলে বাঙালি মেয়েরা গাইত কবি গোলাম মোস্তফার গান, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’… ‘পূর্ব বাংলার শ্যামলিমায়’, পঞ্চনদীর তীরে অরুণিমায়… উর্দুরা গাইতো, ‘আও বাচ্চা শের খাড়ায়ে’… ‘তোমনে পাকিস্তানকে’… শ্রেণী শিক্ষিকা নিজ নিজ ক্লাসের ছাত্রীদের অতঃপর ক্লাসে নিয়ে যেতেন। অন্য স্কুলে এই শেষটুকু ছিল না, এ অংশ আমরাই স্কুলের ডিসিপ্লিন সুদৃঢ় রাখার ব্যবস্থা হিসেবে সংযুক্ত করেছিলাম।

দিনটি সাধারণ, তবে উজ্জ্বল আলোতে ভরে আছে। ১৯৫৮ সালের ১০ মার্চ। তেজগাঁ স্টেশনে ভোরে ভোরে চিটাগাং মেইল থামলো।চটপট নেমে পড়তে হলো, মালপত্র এবং বাচ্চাগুলোকে রিকশায় তুলে বোনের বাসায় (নুরজাহানের স্বামী তখন তেজগাঁ টেলিফোন ট্রেনিং সেন্টারে শিক্ষক, ওরা সেখানেই থাকতো) রেখে আমি মতিঝিল সেন্ট্রাল গভঃ স্কুলে হাজির হয়েছি। নতুন স্থান, আমি পরিশ্রান্ত, রাত্রি জাগরণের ছাপ মুখে স্পষ্ট। কিন্তু এর মধ্যে উৎসাহে মন ভরে গেল। প্রায় সকলকে আমি চিনেছি। প্রধান শিক্ষিকা যে প্রিয় জুঁই আপা; আমার ট্রেনিং কলেজের অধ্যাপিকা। উনি হাসিমুখে ধমক দিলেন, এত দেরি করে এসেছিস কেন মেয়ে? স্কুল খুলেছি সেই জানুয়ারিতে… কমসে কম দশ-পনেরো জন নতুন টিচার জয়েন করেছে। তার মানে আমি ওদের জুনিয়র হয়ে গেলাম। ভাগ্যের এ কপালে আমাকে ঝাঁটা মারে! তাই হোক, আমি তার বিরুদ্ধে লড়েছি। এখানেও লড়বো। শুধু স্কুলে পড়াতে নিজেকে আটকিয়ে রাখা নয়, ঢাকায় এসেছি, এখানে নিজেকে এবং স্কুলের পরিবেশকে গড়ে নিতে আমি সচেষ্ট হবো; দেখা যাক কোন ভাল কিছু হয় কিনা।

তখন মতিঝিল স্কুলটাকে প্রথম শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানে দাঁড় করার জন্য যুঁই আপা আমাকে নানাভাবে উৎসাহিত করেছিলেন। কাজটা বেশ কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক। ভিকারুন নেসা স্কুল তখনও নামকরা পাবলিক স্কুল। নিয়ম-কানুন কড়া, শিক্ষিকারা ইংরেজি শিক্ষায় পারদর্শিনী। ওদিকে শিকড় গেড়ে বসে আছেন মিসেস জাহানারা ইমাম তার সিদ্ধেশ্বরী স্কুল নিয়ে। আমরা নতুন, অনেকেরই অভিজ্ঞতা নেই। সুতরাং আমার অভিজ্ঞতাকে জুঁই আপা বেশ মূল্য দিলেন। আমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্কুলের মধ্যে কয়েকটি গ্রুপ করে নিয়েছি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ক্রীড়া সংঘ, হোম ইকনমিক্স প্র্যাকটিকাল, বাগান ও কৃষি সংসদ। শিক্ষিকারা যে যার পছন্দমতন ( যোগ্যতাও) গ্রুপের দলনেত্রী হলেন। আমি তো ঝোলের লাউ, সবটাতেই অ্যাডভাইজার এবং কাজের সময় ডানহাতি হয়ে গিয়েছি। আমার নিজের দায়িত্বে ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতি। তখন প্রতি বৃহস্পতিবারে আমরা ডিবেট ক্লাস করিয়েছিলাম বলে মতিঝিলের মেয়েরা পরবর্তী জীবনে অনেকেই বেশ দক্ষতার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে পরিচিত হতে পেরেছে। শিল্পকলা এবং সংগীতে এ স্কুলের যেমন নাম, খেলার জগতেও তাই রয়েছে।

স্কুলে ভর্তি হতে এসে কোন মেয়ে ফেরত যায়নি। যারা ভর্তি পরীক্ষায় টিকতো না; আমরা বিকেলে তাদের নিয়ে বসতাম, তৈরি করে ভর্তিও করে নিতাম। এসব কোনটাই অর্থের বিনিময়ে ছিল না, ছিল শিক্ষকদের কাজের প্রতি ভালবাসা এবং আন্তরিক উদ্যোগ। দুজন গৃহিণীকে আমি বিশেষ সুপারিশ এবং অতঃপর দায়-দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম, ইংরেজি এবং অংক শেখাতে আমি হয়রান হয়ে পড়তাম, কিন্তু ওরা সামান্যও শিখতে পারছিল না। এদিকে আমার জিদ-ওদের ম্যাট্রিক পাস করিয়ে তবে ছাড়বো। ভাগ্য ভাল ওরা পাস করেছিল শেষকালে। একজন পরবর্তীতে বিএ পাস করে বিএড করে শিক্ষকতা নেয়, অন্যজন শর্ট হ্যান্ড ইত্যাদি শিখে মতিঝিল কমার্শিয়াল অফিসে স্টেনোগ্রাফার হয়েছিল। সে মতামত এরূপ ব্যক্ত করে ও কি কষ্ট করেই না পড়লাম, পাস করলাম, কমার্শিয়াল অফিসে ভাল বেতনে চাকরি না করলে পাষাবে না। ঐ গৃহিণী পাঁচটি সন্তানের জননী, স্বামী স্টেট ব্যাংকের একজন সামান্য ক্লার্ক ছিল তখন। সংসারে বাড়তি আয়ের প্রয়োজন তাকে এভাবে যোগাতে হয়েছিল। কিন্তু মতিঝিল এলাকার বাসিন্দারা তখন স্ত্রীলোকের, বিশেষত ঘরের বৌ এ ধরনের চাকরি করবে, ভাল চোখে দেখেনি। তাদের অধিকাংশই কেরানি চাকুরে, ম্যাট্রিক, আইএ, বড় জোর বিএ পাস। আমার ছাত্রী মালতীকে স্বামীর বদলি করিয়ে ইসলামাবাদ চলে যেতে হয়েছিল। আমিও বোরখা পরা ছাড়া, পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম বলে গরিব মাস্টারনি ইত্যাদি ধরনের অবজ্ঞাসূচক কথা শুনতাম। কিন্তু আশ্চর্য! ওসবে আমার কোনদিন মন খারাপ করেনি। রিকশা ভাড়া ছিল মাত্র চারআনা। অনেক সময় অন্য শিক্ষিকাকে পেলে দু’আনা ভাড়ায় ভাগ করেও যেতে পারতাম। কিন্তু সংসারে তখন এতই খরচ ছিল, যার জন্য আমাকে ঐ দু’আনা-চার’আনার হিসাব করে মাসে কত বাঁচাতে পারি এবং তা দিয়ে কোন আবশ্যকীয় ব্যয় নির্বাহ করতে পারবো— তা ভাবতে হয়েছিল।

স্কুলের পরিবেশ বলতে মতিঝিল কলোনির এই মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকজন। তার মধ্যে অবাঙালি মহিলাদের বোরখা পরে রাস্তাঘাটে হাঁটাচলা করতে দেখতাম। করাচি, ইসলামাবাদ থেকে সালওয়ার-কামিজ, কাতান শাড়ি, ওড়না— এসব এঘর ওঘর বিক্রিও তারা করে হাতে বেশ পয়সা কামাই করতো। আচার তৈরি করে বিক্রি করতেও দেখেছি। কিন্তু বাঙালি ঘরের চেহারা অন্য। সর্বক্ষণ রান্নাঘর ও ঘরের কাজকর্ম, সন্তান পালনে ব্যয় করতো। মেয়েদের স্কুলেও সময়মত পাঠানোর দিকে তাদের খেয়াল ছিল না। উর্দু সেকশনে কিন্তু ছাত্রী বেশ ছিল। আমরা তখন বাড়িতে গিয়েও মেয়ে সংগ্রহ করেছি। তবে দু তিন বছরে বাঙালি সেকশনে মেয়ের সংখ্যা বেশ বেড়ে গেল। স্কুলের কর্মকাণ্ড সুনামের সাথে বিস্তার পেয়ে যায় অতঃপর। স্কুলের মেয়েদের পোশাকও আমরা সালওয়ার-কামিজ ঠিক করে দিলাম। সিলভার গ্রে রঙের কামিজের সাথে লাল বর্ডার হাতে, কলারে এবং কোমরের বেল্টে। আজও তাই আছে। বড় মেয়েদের জন্য ওড়না, কিন্তু শাড়ি পরে আসা মানা করে দিয়েছিলাম। আমরা শিক্ষিকারা শাড়ি পরেই স্কুলে আসতাম। উর্দু সেকশানের শিক্ষিকাদের ছিল সালওয়ার-কামিজ। সকালে ৭টা থেকে দুপুর বারটা পর্যন্ত তাদের স্কুল, হেড মিস্ট্রেস একজন বাঙালি থাকবেন-এই ছিল নিয়ম।

স্কুল শুরুর আগে শরীর চর্চা এবং পরে জাতীয় পতাকা তুলে বাঙালি মেয়েরা গাইত কবি গোলাম মোস্তফার গান, পাকিস্তান জিন্দাবাদ… পূর্ব বাংলার শ্যামলিমায়, পঞ্চনদীর তীরে অরুণিমায়… উর্দুরা গাইতো, আও বাচ্চা শের খাড়ায়ে … তোমনে পাকিস্তানকে … শ্রেণী শিক্ষিকা নিজ নিজ ক্লাসের ছাত্রীদের অতঃপর ক্লাসে নিয়ে যেতেন। অন্য স্কুলে এই শেষটুকু ছিল না, এ অংশ আমরাই স্কুলের ডিসিপ্লিন সুদৃঢ় রাখার ব্যবস্থা হিসেবে সংযুক্ত করেছিলাম।

ঢাকায় আসতে পারার আনন্দ আমার অনেকাংশে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। তেজগাঁ থেকে স্কুল করা অসম্ভব। রিকশায় দিনে চার টাকা খরচ করার সামর্থ্য আমার ছিল না। আমাকে চাকরিতে নেয়ার সময় কর্তৃপক্ষ বলেছিল কোয়ার্টার এখানেই পাবেন। হায় আল্লাহ। স্কুলের নামে কোনো বাড়ি নেই; সকলের জন্যে যা, তা পেতে হলে সিনিয়রিটি লাগবে— তা যে আমার নেই। বাস্তবে ছিল এমন ব্যবস্থা। এই দেখে বেদিশার মত বাড়ি খুঁজে মরছি, তখন দয়াপরবশ হয়ে স্কুলের কাছাকাছি অসমাপ্ত পিয়ন কোয়ার্টারে থাকার কথা জানিয়ে দিলেন ভারপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার। কিছু চিন্তা করলাম না। মোটে মায় রাঁধে না ভাত-পান্তা না তপ্ত’ ভাবতে কে যায়। এখানে বসবাস করতে এসে আমরা আবার বিপাকে পড়ি। পিয়নরা দল বেঁধে রাতের অন্ধকারে আমাদের আক্রমণ করে; তাদের জন্য নির্মিত কোয়ার্টার মাস্টারনিরা দখল করে নিচ্ছে— এই তাদের ভয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ (রাজারবাগ থেকে) এসে পড়ায় আমরা অক্ষত অবস্থায় বাড়িঘর ছেড়ে স্কুলে এসে প্রাণে বাঁচি। স্কুল কমনরুমে সাতদিন কিভাবে অতিবাহিত করেছি, ভাবলে আজও গা শিউরে উঠে। সাতটি শিশু-কিশোর। খাওয়া ছিল কলা, বিস্কিট, চিড়ে, মুড়ি জাতীয় শুকনো খাবার। রান্না করা যেত না।

আমার কথা বাদ। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে-হতদরিদ্র আমি অনেক সয়েছি। ভাগ্যকেও সে মতো দেখেছি। কিন্তু আমার অসহায় সন্তানদের কষ্ট আমার অসহনীয় বোধ হতে লাগলো। পাগলের মতো কমলাপুর, শাহজাহানপুর এলাকায় বাসা খুঁজে হতাশ। অল্প ভাড়ায় বাস করার উপযুক্ত বাসা পাচ্ছিলাম না। প্রায় বাসায় পানির জন্য কুয়া। আমার কান্না বুঝি আল্লাহর আরশ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নাহলে এ কঠিন সমস্যার সমাধান এত দ্রুত হতো না। কোয়ার্টার বন্টনের এক ইমারজেন্সি মিটিং ডাকা হয়েছিল। তাতে আমার এক ছাত্রীর বাবা মেম্বার। তিনি চেয়ারম্যান (উর্দুভাষী) কে আমার কষ্টের কথা বিশদ বুঝিয়ে দিলে, ভদ্রলোক আমাকে এবং হেডমিস্ট্রেসকে ডেকে পাঠান। বড় আপা মিটিঙে, আমি পাশের রুমে দুরু-দুরু বুকে অপেক্ষমাণ।

এক সময় আমার ডাক পড়ে। রুমে ঢুকতেই ভারিক্কি এক ব্যক্তি আসসালামু আলাইকুম … কনগ্র্যাচুলেশন, উই আর গ্লাড টু মিট ইউ, আই মাস্ট রিওয়ার্ড এ গুড টিচার ফর দি সেইক অফ আওয়ার চিলড্রেন। প্রবীণ মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানালাম। তিনি সিনিয়রিটির ওপরে একজন শিক্ষকের মর্যাদাকে স্থান দিয়েছেন।

তোপোড়া মন আমার! চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল। অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করলাম, শিশুদের কষ্ট আল্লাহ আর সহ্য করতে না পেরে আমায় রক্ষা করলেন। আমার মনেও আশার সঞ্চার হল; এদের গড়ে তুলতে হবে। আমার সর্বস্ব দিয়ে এদের মানুষ করার কাজটি অনেক বড়। আমার ঐ দুঃসময়ে ভাই সালেহউদ্দিন দেখাশোনা করতে, প্রায় কলা-বিস্কিট কিনে নিয়ে আসতো ভাগনা-ভাগ্নেদের জন্যে। ও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ইকবাল হলে থাকতো। এর মধ্যে আমার স্বামীরও চিটাগাং থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চিঠির পর চিঠি লিখে জানাতে ছিলেন, আমাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছ কিনা বুঝতে পারছি না। ঢাকায় কি এমন মধু যে তার জন্য আমাকে ফেলে যেতে হল? চাকরি তো সেই একই স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা। কোনো প্রমোশন তো নয়? আমাকে তোমার আর পছন্দ হয় না? ইত্যাদি।

বাড়ি পাওয়ার সংবাদ তাকে আমরা দিইনি; বোধ করি বাতাস বয়ে নিয়েছিল তার কাছে। ঠিক ঠিক বাসা খুঁজে হাজির হয়েছিলেন। মতিঝিল স্কুলের রওশন সালেহা আপার বাসা পেতে তাকে বেগ পেতে হয়নি। এসেই চোটপাট। তোমরা দেখছি ভাল আছো, বেশ আরামেই আছো। পুরুষ মানুষ কখনও পরিবার ছাড়া থাকতে পারে? শরীর বলতে আমার কী থাকলো … ইত্যাদি বলে ট্রেন থেকে কেনা কলা, চীনে বাদাম, বিস্কিট সন্তানদের হাতে তুলে দিয়েছেন। ওরাও মেঝেতে বসে উৎসবের মতো কাড়াকাড়ি করে খেতে শুরু করে। তাও ধমক, সব্বাই সমান ভাগ করে খা, দাঁড়া আমি ভাগ করে দেবো।

আমি হাসি চেপে রাখতে পারছি না; কোনো মতে বলেছিলাম, বাপ ছাড়া ছেলেমেয়ে লালন-পালন করা যায় না। দ্যাখো, তোমাকে পেয়ে ওরা কত খুশি। ওদের খুশিতে ধমক দিও না।

আমার কথায় তার ভ্রুক্ষেপ নেই। সোজা তিনি খাটের ওপর চোখ রাখেন, বাহ! একদম নতুন দেখাচ্ছে। খাঁটি বার্মাটিক। কলকাতার বউবাজার থেকে বানিয়েছিলাম। সানরাইজ ডিজাইন। সূর্যের মধ্যখানে আমার নামের আদ্যাক্ষর-এসএসইউ বেশ মজবুত করে লেখা।

বয়স আমার তখন ত্রিশও হয়নি, তাতে কি! দেখেছিতো অনেক। পক্বকেশ স্বামীর মনের খবর আমি পাই, তার নিজের কিছু আজও অবশিষ্ট আছে-সেই অহংকার তিনি গৌরবে জাহির করছেন। আমি যে এদিকে আমাদের জীবনের শুরুতে যা এখানে এসে কিছু পেয়েছি, এই খাট, আর এক সেক্রেটারিয়েট টেবিল অতি যত্নসহকারে রাখি, এবারে নতুন করে বার্নিস লাগিয়েছি। শুধু এই আশায়-ছেলেমেয়েদের দেখাব আগের সুখের সম্পদগুলোকে… আমরা হেলাফেলা ঘরের লোক নই, অনেক কিছু ছিল …। কিন্তু মনের এই নিভৃত আশা প্রকাশ করার অর্থ খুঁজে পাইনি তখন। ভগ্নস্বাস্থ্য ও অকাল বার্ধক্যের ধকল নিয়ে যে লোক আমার কাছে এসেছে-সেই আমার বড় সম্পদ। তাকেই এখন বেশি যত্ন করতে হবে আমাকে। অতএব সেদিকে মনোযোগী হই।

আমার শরীরও ঐ পর্যায়ে। শুকিয়ে কংকালসার, গায়ের বর্ণ মলিন, দাঁত বের হয়ে যাচ্ছে। যে দেখে আঁতকে জিজ্ঞেস করে, আপনার যক্ষ্মা হয়েছে মনে হয়, ডাক্তারি পরীক্ষা করেননি? সেন্ট্রাল গভঃ কত সুবিধা করেছে চিকিৎসার, ঐ তো ডাক্তারখানা!

আমি যে রোগ ধরা পড়ার ভয়ে যাই না! কিন্তু শেষে গেলাম। ডক্টর শকুন্তলা, এমবিবিএস কলকাতা, সাইনবোর্ড। সুন্দরী এবং সুবেশী। ডাক্তার আমাকে অল্পক্ষণের মধ্যে আপন করে নিলেন। এমন সুন্দর কথা বললেন; বয়স হিসেব করেন একবার; পড়ালেখা এবং সাত সন্তানের জন্ম তারিখ হিসেব করেন অন্যবার। হেসে বলেন, “হিসেবে মিলছে না! এতসব করলেন কিভাবে? শরীরের তো কিছু অবশিষ্ট রাখেননি।” জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি যক্ষ্মা রোগী? ডাক্তার ফিচকে হাসেন। “না, তবে রোগ আপনার অন্য। স্বামীকে বেশি ভালবাসেন। অত ভালবাসতে নেই। মুসলিম ধর্মে তেমন আছে কিনা আমার জানা নেই,আমাদের হিন্দুদের মধ্যে স্ত্রীর মাসিক হলে এবং তার ওপরে কয়েকদিন স্বামীর বিছানাতে স্ত্রীকে যেতে বারণ, পরিবারের অমঙ্গল হয় তাতে। আপনি ওসব মানেননি, এখন থেকে মেনে চলবে ন।”

এই উপদেশ মেনে চলার প্রাণপণ চেষ্টা করলাম, কখনও সফল হই, কখনও নয়। আমার একার পক্ষে জোর করে যতটা সম্ভব। কিন্তু অতঃপর ডক্টর শকুন্তলা আমার বান্ধবী হয়ে যান, বাসায় আসেন এবং স্বামীকেই পাকড়াও করেন এবং তিনি বুঝলেন, আমাদের সন্তান সংখ্যা এমনিতেই হিসেবের বাইরে চলে গিয়েছে, আর নয়। ডাক্তারখানায় পরিবারপরিকল্পনা কেন্দ্র তখন ছিল। তিনি নিজেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। আমাকে আর ঝগড়া-বিবাদ এবং পালিয়ে ছেলেমেয়ের মধ্যে শুয়ে থাকতে হয়নি। পারিবারিক বান্ধবীর ন্যায় ডাঃ শকুন্তলা আমার দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বলে রক্ষা। পুরুষ মানুষেরা নির্লজ্জ ও উন্মত্ত ব্যবহার করে কেন স্ত্রীর সঙ্গে? উনিও করতেন। একটা পথ পেয়ে তারও অশান্তি কমে গেল। সংসারও বাঁচলো।

ডাক্তার মেয়েটির জীবনেও দুঃখ ছিল। ভালবাসার মানুষটি ওকে বিট্রে করেছিল। তাই দেশ ভাগ হওয়ার পরে পশ্চিম বাংলায় থাকেনি। ঢাকায় (ওর বাড়ি) চলে এসেছিল। আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর খুব রসিয়ে কথা বলতো। “তুমি ভাই সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছ, স্বামীটিকে আঁচলে বেঁধে রাখলে। কারও দিকে চোখ তুলেও দেখে না। আমি এত সুন্দরী-তাও দেখলো না। ওর মুক্তোর মত শাদা দাঁতের হাসিতে কথাগুলো সেজে উঠেছিল বুঝি … আমি হেসে দিলাম; কলকাতা যাচ্ছ তো … কাউকে এবারে আঁচলে বেঁধে নেয়ার কাজটি সেরে নিও প্লিজ, একখানা কার্ড ছেড়ে দিও আমার নামে।

কারও কষ্টে আমার মন কাঁদে। শকুন্তলার মতো সুন্দর ও স্মার্ট ডাক্তার! ছেলেদের বঞ্চনার শিকার হলো? ওর কাছে শুনেছিলাম ওকে কেউ বিট্রে করেছে। পুরুষদের চাওয়ার কোন মাপ নেই! যত পায় তত চায়! জন্ম থেকেই পায়? আর মেয়েদের সব সময়েই একটা মাপ বাধা থাকে… তার বাইরে যেতে পারে না। এই নিয়ে পদে পদে কেবল লড়াই করতে হবে! সারাজীবন ধরে আমি সে যুদ্ধই সামাল দিলাম।

নিয়ত সংঘাতের মুখোমুখি ঘরে-বাইরে

ঐ সময় সংসারের আয় বৃদ্ধির উপলক্ষ নিয়ে আমি যে রেডিওতে প্রোগ্রাম করছিলাম, তাতেও স্বামীর সঙ্গে মতানৈক্য। প্রায় প্রত্যহ সংঘাত, ঝগড়াঝাটি। কী জানি! কলকাতার শিক্ষিত ব্যক্তি, রেডিও অফিসকে এত ভয় পেতেন কেন! বলে ওখানে খারাপ মেয়েরা যায়, নয়তো ভালরা গেলে খারাপ হতে বাধ্য সে। আমি তোমাকে ঐসব স্থানে যেতে দিতে পারি না। গুনাহ করবো আমি? আমি উচ্চৈঃস্বরে প্রতিবাদ করতাম।

ডক্টর শকুন্তলা চলে যাওয়ার পর সেই পূর্বের অসুবিধায় পড়লাম। পরিবার পরিকল্পনার জিনিসপত্র স্বামী অন্য কারও থেকে বলে আনতে রাজি নয়। লোকে কী বলবে! এই মুসুল্লী লোকটা কেন এসব নিচ্ছে। আমি নতুন করে সেই পূর্বের সমস্যায় নিপতিত হলাম। কী উপায়ে এর সমাধান সম্ভব, আমার কাছেও অজ্ঞাত। সুন্দর জীবনযাত্রার মধ্যে রাগারাগি, চোখ রাঙানি, জিনিস ভাঙচুর ইত্যাকার অনর্থ শুরু হলে আর করণীয় কী থাকলো। হতোদ্যম হয়ে পড়ি। সমস্যা ঘনীভূত হওয়ার একটা কারণ আমার স্বাস্থ্য ভাল হয়ে যাওয়া এবং তারও সেই একই কারণ। অথচ আমি কিছুতেই সংসার বৃদ্ধিতে আর একটুও ঝুঁকি নিতে চাচ্ছি না। এমনই জেদি হয়ে গেলাম, এবার আমি সত্যি ঘর ছেড়ে চলে যাব। আর সামলানোর ধৈর্য্য রাখতে পারছি না। এমন ঘটনাও একবার নয়, বারবার হচ্ছিলো। আমি গোঁ ধরে তাকে রিফিউজ করেছি তো মারধোর লাগিয়ে দিচ্ছেন। অশ্রাব্য গালিও শুনতাম। ঢাকা এসে ভাল স্বামী ধরার মতো রূপ আর স্বাস্থ্য খুলেছে; তাই তাকে অবজ্ঞা করছি। গাং পেরিয়ে নাইয়া শালা’- তাকে বিয়ে করেও আমার লেখাপড়ার কোন ক্ষতি হয়নি, চাকরি পর্যন্ত করছি, ষোল আনা সুযোগ নিয়ে তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি।

কিন্তু আমিও কম যাইনি। প্রতিজ্ঞা নিয়েছি তো ঠিক। সেটি বহাল রাখবো। আর একটি সন্তানও নয়। তখন আমি তাকে বললাম, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো। অপারেশন করিয়ে ফেলি। এতেও তার মত পেলাম না। তখন আমি প্রত্যক্ষ লড়াই করার মতো শক্তিশালী হতে মনস্থ করি। কিন্তু বুঝতে পারতাম না, পুরুষরা এত অবুঝ কেন! সংসারের ভাল কেন চায় না। এমন ইতরসর্বস্ব কেন? অথচ এই ব্যক্তি উচ্চ শিক্ষিত, মন উদার বলেই এ যাবত দেখেছি; আমাকে বোরখা পরে পথেঘাটে চলতে বলে না। তাহলে কি আমার সুন্দর স্বাস্থ্য নিয়ে সন্দেহবাতিকে আক্রান্ত? আসলে সেটাই তার মনে কাজ করছিল, ভয় পাচ্ছে আমি অন্যত্র যদি ভিড়ে যাই। গ্রামে থেকে থেকে, সঙ্গদোষে মেয়েদের প্রতি অত্যাচারী এবং অবিশ্বাসী হয়ে গিয়েছেন। আগের মতো আর সেই সুন্দর মনের মানুষটি নেই। আমারই কপাল। অর্থের কষ্ট সামলিয়েছি, এখন এই মানসিক নির্যাতন সামলাই কোন্‌ উপায়ে!

মেয়েদের চাকরি! বেতন হাতে পাওয়ার দৃশ্য বোধকরি পুরুষদের আক্রান্ত করে। ভাবে এই বুঝি কর্তৃত্ব গেল। আমি বেতনের সম্পূর্ণ টাকা তার হাতে তুলে দিয়েও কোনো মুক্তির স্বাদ পাইনি। আমার বেতনের টাকায় আমার দাবি নেই, আছে গৃহকর্তার। ভারি অদ্ভুত । লাগতো। তথাপি সারাজীবন সেটাই করেছিলাম শুধু সংসারে হৈ চৈ এবং অশান্তি হোক এটি রোধ করার একান্ত ইচ্ছা করতাম বলে। তবুও কি শেষ রক্ষা হয়েছিল? হলফ করে বলতে পারি, হয়নি।

আগেই বলেছি আমি থাকতাম মতিঝিল কলোনির নিম্ন মধ্যবিত্ত এলাকায়। এখানে ছেলেমেয়েদের পরিবেশ থেকে ভাল কিছু শেখার ছিল না; অস্বাস্থ্য ও অপরিচ্ছন্ন দৃশ্য চোখ খুললেই দেখতে হয়েছে। এখানে থেকে আমার ছেলেমেয়েদের কিভাবে বড় করবো; সঙ্গদোষ থেকে সরিয়ে আনবো-আমার ভীষণ চিন্তা হতো। স্বামী অবশ্য এদিকে খুবই সচেতন, সাথে করে মসজিদে নিয়ে যেতেন; খারাপ ছেলের সঙ্গে মিশতে দেখলে সাবধান করে দিয়েছেন। তবুও অনেক চিন্তা করতে হয়েছে আমাকে। স্বামী তো নিজের আর্থিক ও সামাজিক স্টেটাস অনেক খুইয়ে এখন সাধারণ একজন প্রুফ রিডার। এই সন্তানদের নিয়ে আমি ভবিষ্যত স্বপ্ন দেখতে চাই; ওরা লেখাপড়ায় ভালো। আমি বিচক্ষণতার সাথে ওদের এই প্রতিভাকে নিয়ে কিভাবে কাজে লাগবো-ভাবতে থাকি। প্রথমত আয়ের পথ আরও খোলাসা করা চাই। ম্যাট্রিক পরীক্ষার খাতা দেখা, রেডিওতে প্রোগ্রাম নেয়া, পত্র-পত্রিকায় লেখার দিকে মনোযোগ দিলাম। মাসে বাড়তি আয় শ’খানেক হতে লাগলো। ছেলেমেয়েদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিকে একটু নজর দিতে পারলাম। ভাল জামা-কাপড়ও দিতে চেষ্টা করলাম। বিশেষ করে বড় ছেলেটি আমার মা-বাবার অতি আদর-যত্নে পালিত। ভাল খেয়েছে, উত্তম পরেছে। তখন সে নটরডেম কলেজের ছাত্র। ওর জন্য বাড়তি খরচ আমাকে যোগান রাখতেই হয়েছে। আমার আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং ঘরের অভাব-অনটনজনিত মানসিক অশান্তি ওকে যেন খারাপ করে না দেয়। আমি ভেবে মরতাম। যতখানি সম্ভব নিজেদের পারিবারিক সম্মান এবং মর্যাদা বজায় রাখার জন্য আমি প্রাণপণ পরিশ্রম করেছি। একটি ঠিকে ঝি সম্বল করে, এই বিরাট সংসারের কাজকর্ম সম্পন্ন করেছি নিজে। তদুপরি স্কুলের কাজ তো আমার মাথায় পর্যাপ্ত। যে করে এবং করতে পারে তার ঘাড়ে ভূতেও বোঝা চাপায়-আমার ছিল তেমন বোঝা বইবার কপাল।

সন্তানদের গৃহশিক্ষার ব্যাপারে স্বামীর সাথে আমার কোনদিন একমত হয়নি। তিনি বলতেন, না মারলে ছেলেপান মানুষ হয় না; ওদের মধ্যে শয়তান কাজ করে বেশি, ফেরেশতা রক্ষা করতে পারে না। Spare the rod, Spoil the child। সকালে নামাজ আর কোরান শরীফ তেলাওয়াত করানোর জন্যে বসিয়ে কেবল বেত মারতেন, বলতেন, “যেখানটায় মার দিচ্ছি, সেখানটায় বেহেস্ত পাবে। তুমি কাঁদ কেন?” এদিকে আমি ভয়ে কাঁদতাম, “আহা … এমন সোনার মানিকদের গায়ে হাত! ।।কোনোদিন বেত লুকিয়ে রেখেছি। তখন শুনতাম তুমি যে স্কেল দিয়ে হাতে মারতে? অংক ভুল করলে! এখন তুমি মারধোর করা ভুলে গেলে? বিটি পড়তে যাওয়ার পর তুমি অন্যরকম হয়ে গেলে! আল্লাহ তালা মেয়েদের এজন্যই স্বাধীন করেননি, স্বাধীনভাবে পড়তে গেলে তো উল্টো শিখে আসলে। মা-বাপ মারলে দোষ নেই-বুঝলে বেহেস্তে যায় সন্তান।

ঐ সময় সংসারের আয় বৃদ্ধির উপলক্ষ নিয়ে আমি যে রেডিওতে প্রোগ্রাম করছিলাম, তাতেও স্বামীর সঙ্গে মতানৈক্য। প্রায় প্রত্যহ সংঘাত, ঝগড়াঝাটি। কী জানি! কলকাতার শিক্ষিত ব্যক্তি, রেডিও অফিসকে এত ভয় পেতেন কেন! বলে ওখানে খারাপ মেয়েরা যায়, নয়তো ভালরা গেলে খারাপ হতে বাধ্য সে। আমি তোমাকে ঐসব স্থানে যেতে দিতে পারি না। গুনাহ করবো আমি? আমি উচ্চৈঃস্বরে প্রতিবাদ করতাম। ভুল ধারণাকে ভেঙে ফেলার জন্যে বহুদিন হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ করেছি, “তুমি আমার সাথে সেখানে আসো। দেখবে, কত ভাল লোকের আসা-যাওয়া, শিল্পীরা গাইতে আসেন।” তার সেই অমূলক ভয়, সন্দেহ, মন খারাপ। আমি তখন এমনও করেছি, অতি চাওয়া ও পাওয়ার মূল্যবান সে কালের ত্রিশ টাকার প্রোগ্রাম ছিঁড়ে ফেলেছি। উপোষ দিয়েছি, কথা বন্ধ করেছি তবুও মনের কান্না ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। আমি তো অন্যায় পথে কাজ করছি না। নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি খাটিয়ে, প্রতিভার জোরে ভাল ভাল রচনা, গল্প ইত্যাদি পড়ার সুযোগ পাচ্ছি; সে সাথে সংসারের অভাব দূর করছি। এর মর্ম কাকে বোঝাব? কেমন করে? কুসংস্কারবিদ্ধ যে মানুষটির মন, তিনি আমার স্বামী-সন্তানদের পিতা। আমি যাব কোথায়! দুঃখে ক্ষোভে কখনও হতাশ হয়ে পড়েছি কিন্তু আত্মঘাতী হতে চাইনি। আমি ছাড়া এই অপগণ্ড ছেলেমেয়েদের যে কেউ নেই। ওদের জন্যই আমি সব যন্ত্রণাকে বুকে চেপে কাজ করবো। কষ্টকে আমল দেব না। আমি রেডিও প্রোগ্রাম আবার শুরু করে দিলাম। মাসে, ষাট টাকা। সরকারি চাকরি বলে কম পেতাম।

সমূলক দুঃখের কথা বাদ দিলাম। অমূলক দুঃখ আবার ঘাড়ে চাপলো। স্বামী রাগ করে আমাদের ছেড়ে ফেনী চলে যান। সেখানের লোকজন বিশ্বাস করলো; আমি আগের মতো ভাল মেয়ে নই। খারাপ পথে পা দিয়েছি, নাহলে বড় মিঞা চলে যাবেন কেন! আমার সেজ দেবর (উকিল সাহেব) আমাকে চরিত্র সংশোধন করার পরামর্শ দিয়ে চিঠি দিলেন।

প্রকৃতপক্ষে আমার স্বামীর পুনরায় দেশের বাড়িতে ফিরে যাওয়া তাদের বাঞ্ছনীয় ছিল না। এদিকে নিজের স্ত্রী সম্পর্কে লোকে কী বলে তাও স্বামী বুঝেন না। নামাজ ও মসজিদ নিয়ে পড়ে থাকেন। তখন বাড়িতে এবং ফেনীতে তাকে দেখাশোনা করার দরদী মানুষ কেউ ছিলও না। ঢাকাতেও আমাদের আত্মীয়-স্বজন তেমন ছিল না। লোকমুখে শুনতে পেলাম তার অসুখ। বড় ছেলে এবং মেয়েকে পাঠিয়ে দিলাম। তিনি অবুঝ হয়েছেন, আমরাতো তার মতন অবুঝ নেই, পায়ে ধরে সাধ্য সাধনা করে নিয়ে আসি। অবশ্য তিনি আসার জন্যে তৈরি হয়েছিলেন। ছেলেমেয়ে দুটোকে পেয়ে খুব আনন্দিত। কালবিলম্ব না করে ঢাকায় চলে আসেন। আমি তখন দেবরের (তার ভাইয়ের) চিঠি দেখাই। নিজের ভুল বুঝতে পারেন তিনি। তারই ভাই নিজের ভাবী সম্পর্কে কী করে এত খারাপ কথা লিখতে পারে। উনি আশ্চর্যবোধ করেন। সুযোগ পেলে মানুষ অন্যের কুৎসা কেমন গায়, আসলে ওরা আমার সাফল্য এবং ক্রমোন্নতি দেখে ঈর্ষাকাতর হয়েছিল। এ দুনিয়ায় আপনজনও কি আপনজনের ভাল সহ্য করতে পারে না? যা হোক, একটি ঝামেলা এভাবে গেল। তার মুখ থেকে। শুনলাম মনজুড়ানো কয়টি বাক্য। যেমন— ও তোমায় চেনে না, কত খুশি তাদের ‘শেখ সলিমউল্যার ফ্যামিলি ছারেখারে যাচ্ছে। The dog barks, and the caravan will pass on.

উনিশ’শ আটান্ন থেকে শুরু করে ষাট সালের কয়েক বছর জীবনটাকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলাম। চাটগাঁতে অভাব-অনটন এত তীব্র ছিল, এক বেলা আহার করা এবং রাতে শুকনো রুটি একটি চিনি মেখে খাইয়ে সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছিল। একদিকে চোখের পানি ঝরতো, অন্যদিকে ওদের পেট ভরেনি, আরও দাও যদি বলেছে, চড়থাপ্পড় মেরে থামিয়েছি। এই খেয়ে পানি খাও, দুধ নেই। কাল সকালে বেশি করে রুটি দেব, ছেলে ভোলানো কথা বলেছি। মাস্টারির বেতন দেড়শ টাকায় সব খরচ সামলাতে হতো। ঢাকায় এসে স্থিতি পেলাম। চাকরি ভাল, খাওয়া-দাওয়ায় কুলিয়ে উঠতে পারি। মাছ খুবই সস্তা, অথচ চাটগাঁয় মাছ পেতামই না। মুরগি কিনতে পারতাম না। গরুর গোস্ত তাও দাম বেশি। ঢাকায় প্রত্যেকদিন মুরগি নয়তো ডিমের ব্যবস্থা করেছি রাতে। দুধ, মাখন দিয়েছি সকালে-রাতে। জীবনকে বিভিন্ন প্রতিভায় সাজিয়ে তোলার এই তো সময়। তৈরি হয়েছিও। স্কুলের মেয়েদের পড়াতে গিয়ে নিজেও লেখালেখির চর্চা করতে থাকি। প্রতি বৃহস্পতিবারে স্কুলে তর্ক-বিতর্ক আলোচনা অনুষ্ঠান করতাম। আমরা এবং এসব আমরাই বাড়তি কাজ ইচ্ছা করে নিতাম। দেয়াল পত্রিকা বের করতাম প্রতি সপ্তাহে মেয়েদের মধ্যে। সে কি উৎসাহ, আমি আত্মহারা হয়েই কাজ করেছি। নিজেও রাত জেগে লিখে যেতাম। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা মাসিক-পাক্ষিক সবখানে লেখা পাঠিয়ে অধীর আগ্রহে দিন গুনতাম। কোথায় এবং কবে আমার কোন্‌ লেখা ছাপা হয়েছে। এভাবে আমার সাহিত্য চর্চা শুরু হলো।

আমার একটা সুবিধাকে আমি প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতাম। ছেলেমেয়েগুলো আমার কথা শুনতো; আমি লিখছি, পড়ছি দেখলে, ওরাও নিজ মনে বসে পড়তো। আমাকে জ্বালাতন করেনি। ফলে ওদের মধ্যে সুন্দর একটা ঘরোয়া মনও গড়ে উঠে আমার অলক্ষ্যে। লেখাপড়া করার মধ্যে প্রতিযোগিতায় ওরা পিছিয়ে থাকতো না। এদিক থেকে শান্তি পেয়েছিলাম, শত্রুকেও বলতে শুনতাম, “সালেহা আপার ছেলেমেয়েরা যেমন লেখাপড়ায়, তেমন এক্সট্রা ক্যালিকুলার একটিভিটিজে।” মায়ের কষ্ট এবং সাধনা দেখে ওদের অনুপ্রেরণা সহজাত স্রোতে মনের মধ্যে এসে যেত। স্বতস্ফূর্ত হয়েই ওদের দেখতাম স্কুল কলেজে খেলায়, নাচে, গানে, কবিতা আবৃত্তিতে অংশ নিতে এবং পুরস্কার নিয়ে আসতে।

সংসারের কাজের জন্যে একটি মাত্র ঠিকে ঝি রেখেছিলাম। ঢাকা এসে কপালগুণে ‘শরবত আলীর মা’ নামের একজনকেই পেলাম এবং ওর শেষ বয়স পর্যন্ত আমার কাছে ছিল। ওর ছেলে ঐ শরবত আলীকে (আসল নাম শরাফত আলী) ক্লাস এইট পর্যন্ত আমরা পড়িয়ে দেই। পরে সে ড্রাইভিং শিখে বর্তমানে এক করপোরেশনে ড্রাইভার হয়েছে। ওর মেয়ে জরিনাকে পড়াতে চেয়েছিলাম। বেশি পড়েনি, কার সঙ্গে বুঝি পালিয়ে চলে যায়। আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাড়ির ঝি-চাকরও পড়তে বসে যেত। এই দৃশ্য দেখে অনেকেই তফাৎ করতে পারতো না। এরা বাইরের, এরা বাড়ির ঝি-এর সন্তান। আসলে ঘরেও আমি একজন অরগানাইজার ছিলাম, টিমওয়ার্কে কাজ করেছি। স্বামী না শুনুক আমার কথা, অন্যরাতো শুনছে-এতেই আমি খুশি। রেডিওতে প্রোগ্রাম করার ব্যাপারটিতে কখনও স্বামীকে মানিয়ে নিতে পারিনি। সব সময় ঝগড়া বাঁধিয়ে আমার মন খারাপ করে দিতেন। কেঁদে, চোখ লাল করে রেডিও স্টেশনে হাজির হতাম। কারণ ঐ একটাই, এই সব কুসংস্কার ভাঙতে হবে। রেডিও স্টেশন খারাপ জায়গা নয়, টেলিভিশন স্টেশন হলে পরে সেখানেও প্রোগ্রাম করতে যেতাম। আমরা অমূলক দুঃখ-যন্ত্রণা সৃষ্টি করি। আমি এবং আমার মত যে সকল নারী এসব কুসংস্কারের শিকার, তাদের জন্য তখন এরকম সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে। পশ্চাৎপদ হইনি। এই আমার আজকের সাফল্য। সংসার সমরাঙ্গনের মাঝে যুদ্ধ করেছি দৃঢ় পণে।

আমার চারদিকে সন্ধ্যার ম্লান আলো

পড়ালেখার প্রতি আমার আকর্ষণ জন্মাবধি। অন্য কোনরূপ চিন্তা মাথায়ও আসে না। স্থির করলাম এ পথেই নেমে পড়ি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোনো বিষয়ে যদি একটা মাস্টার ডিগ্রি ভালভাবে নিতে পারি, তাহলে কলেজে ঢুকে যাব। আমার বোন নুরজাহান ইডেন কলেজে কী সুন্দর শিক্ষকতা করছে, আমি তবে পারব না কেন? লেখাপড়ার প্রশ্নে আমার অবস্থান ছিল অনঢ়। সন্তানদের মা পালন করেছেন, দুধ-ভাত খাইয়েছেন, মনে পড়লে অশ্রু ছাপিয়ে বুক হাহাকার করে। মা নেই। সেই খাওয়া-দাওয়া আর মায়া-মমতার দিনগুলো থেকে ছিটকে আমি দূরে এবং বহুদূরে। এখন আমি যুদ্ধ করছি অভাবের সঙ্গে, সমাজের পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের বিরুদ্ধে।

সমাজে যা আছে, তার বাইরে যাওয়ার কথা আমি কখনও ভাবিনি। আমি সম্মানজনক চাকরি করছি, ভালো বেতন পাচ্ছি। স্বামীর চাকরির মর্যাদা তেমন নেই, আয়ও সামান্য। তাতে কখনও তাকে ছোট করে দেখতে মন চায়নি। ছেলেমেয়েদেরকেও সে কথা বুঝিয়েছি, তোদের বাবা কলকাতায় পড়েছেন, রাইটার্স বিল্ডিং-এ ভাল চাকরিও করতেন। দেশভাগ হয়ে আমাদের অবস্থা আগের মতো থাকলো না, সবাইকে দিয়ে সব হয় না। উনি খুব সৎ এবং স্পষ্টবাদী মানুষ। এদের চিনতে মানুষ ভুল করে।

আমার কথার মধ্যে ফাঁক ছিল না, কিন্তু সমাজের ব্যবস্থা এমন, গৃহকর্তার চাকরি, আয় নিয়ে সেখানে একটা শ্রেণীগড়ে ওঠে, সেটার গণ্ডি আমার কাছে মনে হয়েছে বড় শক্ত আবরণে বাঁধা। স্পষ্টত অনুভব করতাম, স্কুলের এবং অন্য কোথায়ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আমার দাওয়াত কোথায়ও হতো, কোথায়ও হতো না। হলেও কেউ চক্ষু লজ্জায় বলতেন, দু’একজন ছেলেমেয়ে নিয়ে আসবেন আপা। স্বামী-স্ত্রী একত্র দাওয়াত উচ্চবিত্ত সমাজে পেতাম না। আমার স্বামীকে তা খুবই আঘাত দিতো এবং উনি সে আঘাতে অন্যরূপ রি-এক্ট করা শুরু করলেন। অন্যদের সঙ্গে মিশতেন না, নিজের ছোট কাজের সঙ্গে যে দুটো টিউশনি করা ধরেছিলেন, এক সময় তাও ছেড়ে দিলেন। নিজের অতীত নিয়ে বড়াই করাও তার মুখ থেকে চুপ হয়ে যায়। এর পরিবর্তে আমার এবং ছেলেমেয়েদের উপর বেশি ক্ষ্যাপা হয়ে যান। আমরা তাকে অবমাননা করছি, কিন্তু আমার ও ছেলেমেয়েদের দিক থেকে এরকম ব্যবহার কখনও ছিল না। তার হাতে আমার সমগ্র অর্থ এবং ইচ্ছা সমর্পণ করেও কোন বিশেষ ফল পেতাম না। সমাজের পুরুষ জাতি একটা অহংকার নিয়ে থাকে, যা কখনও শিক্ষা ও বিদ্যা-বুদ্ধি দিয়ে নমনীয় হয় না। আমি ক্রমাগত চেষ্টা করেও এই অভিজ্ঞতাকে মিথ্যায় পরিণত করতে পারলাম না। স্বামী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিকার হয়ে নিজেকে সহনশীল এক সীমিত গণ্ডির মধ্যে ঢুকিয়ে নেন। মসজিদ, অবজারভার অফিস এবং ঘর- এই ছিল তার সমাজ ও যাওয়ার জায়গা। তার পরিণতির শিকার আমিও হলাম।

স্কুলের অন্যদের স্বামীর চাকরি, আয়, অবস্থান উপরে, আমি স্বামীর কারণে নিচে। প্রায় শুনতে হয়েছে, সালেহার ছেলেমেয়েদের ফ্রি করে দাও; বেচারির এত ছেলেমেয়ে ঠিকমত খাওয়াতে পারে না, স্কুলের পিকনিকে ওদের চাঁদা নিও না। অথচ আমি সব সময় চাঁদা দিয়েছি, স্কলারশিপে পড়তে বলে ওদের বেতনও ফ্রি ছিল। মন খারাপ করতাম, কিন্তু ঝগড়া করিনি। কথাতো সত্যি, আমার ছেলেমেয়ে বেশি এবং স্বামীর পদমর্যাদা তেমন নয়।

একটা কথা আমার মনকে পীড়িত করেবে। কলকাতায় স্বামীর আত্মীয়রা আমার বাসায় এসে কত খেয়েছে, সারাদিন গল্প করে কাটিয়েছে, তারাই এখন না চেনা অনাত্মীয়দের মত হয়ে গিয়েছে। দেশ ভাগের পর তারাই বড়লোক, ধনী, গণ্যমান্য। আমাদের আত্মীয় বলতে চায় না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওদের বাবা আমাকেসহ আত্মীয়দের বাড়ি যেতেন, কিন্তু সমাদর তেমন পাননি। নিচের তলায় বসিয়ে চাকরের হাতে চা-নাস্তা পাঠিয়ে দিয়ে তাদের আতিথেয়তা শেষ করতেন তারা। ঘরের বৌরা দেখা করতে নিচে নামেননি। কেউ হয়তো সময়ের অভাব বলে সটকে পড়েছিল। শেষে আমি আর যেতাম না। ছেলেমেয়েরাও যেতে চাইতো না। কিন্তু স্বামী মনে কষ্ট পেতেন, কলকাতায় যাদের নিয়ে এতো কাছাকাছি আনন্দ-আহলাদে ছিলেন, তারা কেমন করে এত পর হয়ে যায়! শেষে তারও মন উঠে গেল। স্নেহ-মমতা যদি টাকা-পয়সার বন্ধনে আটকা পড়ে তাহলে জীবনে থাকলে কি! শুধু তার একজন ভাবীকে দেখতাম যিনি দেবরের সাথে আগের মতই স্নেহময় ব্যবহার করেছিলেন (প্রফেসর শামছুল হকের মা)। তার আত্মীয়দের পারিবারিক দাওয়াত আসতো পিওন মারফত। অথচ আমাদের দেশে এরকম নিয়ম নেই। তবুও আমি স্বামীকে নিয়ে এ সব সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়েছি। শুধু স্বামীর মানসিক দিক খেয়াল করে। তাছাড়া সমাজ যা তাই, আমি তার বিচার করতে যাব কেন? অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাকে আমি দায়িত্ব মনে করেছি। এই মেলামেশা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, তা হল আমি ভাল নই। আগেও ছোট শিশু ফেলে রেখে কলেজে গিয়েছি, লেখাপড়া করেছি। তাদের সলিম চাচ্চু কিংবা ভাইয়াকে আঁচলে বেঁধে রেখেছি। আমি এমন এক হিংসুটে আর দাপটি মহিলা। এসব নিন্দা আর অপবাদ নিয়েও যারা এ ধরনের কথা বলতো, আমি তাদের সাথে সম্পর্ক রেখেছি। শেষে অনুভব করলাম, আমার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়ার কারণে তারা এসব বলে। তাছাড়া দরিদ্র আত্মীয়দের বড়রা অনুকম্পা দেখাবেই। এটি সমাজের নিয়ম। ফলে আমার ভেতর একটা জিদ ক্রমাগত দানা বেঁধে এটমের মতো কাজ করছে। সমাজে মাথা তুলে দাঁড়ানো চাই।

পড়ালেখার প্রতি আমার আকর্ষণ জন্মাবধি। অন্য কোনরূপ চিন্তা মাথায়ও আসে না। স্থির করলাম এ পথেই নেমে পড়ি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোনো বিষয়ে যদি একটা মাস্টার ডিগ্রি ভালভাবে নিতে পারি, তাহলে কলেজে ঢুকে যাব। আমার বোন নুরজাহান ইডেন কলেজে কী সুন্দর শিক্ষকতা করছে, আমি তবে পারব না কেন? লেখাপড়ার প্রশ্নে আমার অবস্থান ছিল অনঢ়। সন্তানদের মা পালন করেছেন, দুধ-ভাত খাইয়েছেন, মনে পড়লে অশ্রু ছাপিয়ে বুক হাহাকার করে। মা নেই। সেই খাওয়া-দাওয়া আর মায়া-মমতার দিনগুলো থেকে ছিটকে আমি দূরে এবং বহুদূরে। এখন আমি যুদ্ধ করছি অভাবের সঙ্গে, সমাজের পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের বিরুদ্ধে। স্বামী মারা গেলে এক কথা, কিন্তু তার এভাবে করুণ অবস্থা আমাকে নানাবিধ সামাজিক নির্যাতনের মধ্যেও টেনে এনেছে। যা করতে চাই, পথ দেখি না, অন্ধকার দেখি। সাহায্যের হাত কার আছে? দেখি না। আঘাত দেয়ার হাত অজস্র। আমি কেমন করে পড়ার কথা মনে করলাম! নিরাশ হই। আমার স্কুল থেকে ছুটি নেয়ার কোন উপায় নেই। তাহলে অনাহারে মরতে হবে, ছেলেমেয়েদের পড়া বন্ধ হবে। রোজগারের জায়গায় হাত দিতে পারবো না। তাহলে প্রাইভেট পড়িকেন? স্কুলের একজন শিক্ষক অর্থনীতি নিয়ে মাস্টার্স করলেন। উনি ভালো ক্লাস পাননি। আবার পরীক্ষা দিচ্ছেন। তার সাথে জুটে যাওয়ার ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হলাম। কিন্তু সে পুরুষ, যখন তখন আসলে ( অর্থাৎ তার প্রাইভেট টিউশনি শেষ করার পর স্বামী অত্যন্ত ক্রুদ্ধ আচরণ করেন। আমার উপর নয়, বেচারা ঐ মাস্টারকেও অশালীন উক্তি শুনিয়ে ছাড়েন। অতঃপর এ পথ পরিহার করা ছাড়া আমি কী আর করতে পারি। এম. এ পড়ার সাধকে বিসর্জন দিয়ে চুপ হয়ে যাই। ঘরের কাজ, স্কুলের কাজ এবং সাহিত্যকর্ম নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখি।

ব্যস্ত-জীবন নিয়ে যদি সান্ত্বনা খুঁজে পেতাম, তাহলেও কথা বাকি থাকে। রাতে ঘুমন্ত সন্তানদের নিরীহ মুখগুলো আমায় পীড়া দিচ্ছে। এফ টাইপ বাসা। জায়গা নেই। ওদের নিচে, মেঝেতে শুতে দিয়েছি। রাতের খাওয়া কেবলই ডাল আর আলুভর্তা, নয় তিনটে ডিম ভেজে সাতজনে ভাগ করে খাওয়া। এতজনের আহার আমার আয়ে একবেলা হয়। ওদের হাতে টিফিনের পয়সা কোনদিন দিলাম চার আনা, কোনদিন দিলাম না। নিজকে নির্দয় আর নিকৃষ্ট এক মা মনে করে, কতদিন হাত কামড়িয়ে ভেবেছি, আমি কী করে এ অবস্থার অবসান ঘটাব! ওদের বাপকে তখন হয়তো কোনদিন চরম ঘৃণার চোখে দেখেছি। নির্বোধ আর অবিবেচক এক পুরুষ ‘মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দিবেন তিনি’—এই বলে আমার অনিচ্ছার বিরুদ্ধে এদের জন্ম দিয়ে এখন নাক ডেকে ঘুমুচ্ছেন। কই! আমি তো পারছি না!আমার বিবেকের দংশন এত তীব্র কেন? নিজেকেই কেন আমি অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিচার চাই, ওদের যথার্থ লালন-পালন করছি না, করতে সামর্থ নেই! আল্লাহ তুমি আমায় ক্ষমা কর, দুঃখে কষ্টে পালিত সন্তানগুলোকে তুমি প্রভু দয়া কর; মানুষ করে গড়ে তোল। এসব বলে কাঁদতাম, চোখে ঘুম আসতো না। শেষে হাতে কলম নিয়ে বসে যাই। কিছু লিখে অন্ততঃ মনের বোঝা হালকা করি।

স্কুলের কাজের মধ্যে কয়েকজনের দেখাদেখি অকাজ টেনে আনতাম। একবার মিনাবাজার সাজালাম। হাতের কাজ এনে মেয়েরা সাজালো স্টল। হেডমিস্ট্রেস কাজী জাহানারা খানও উদ্যোগী মহিলা। আমাকে সাহায্য করলেন। সেখানে ভাগ্যগুণে একজন অফিসার শ্রেণীর মহিলার সাক্ষাৎ পাই। তিনি সমাজকল্যাণ দপ্তরে ক্লাস টু গেজেটেড অফিসার। আমাকে বললেন, আপনাকে দেখে আমার ইচ্ছা হচ্ছে-আমার অফিসে নিয়ে যাই।একটা পোস্ট খালি আছে। চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেবে-আপনি দরখাস্ত করবেন কিন্তু।এ মিনাবাজারে আরও কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম।সালেহা আপা আপনি? মেয়ের মুখে আপনার কথা লেগেই আছে।খুব ভাল পড়ান।আমার ছেলেমেয়েরাও খুব ভাল লেখাপড়ায়-আপনার স্বামী অসুস্থ। আপনার আয়ে সংসার চালান। আপনার মতো টিচার আর নেই। এত কষ্টের মধ্যেও কত যত্ন করেন মেয়েদের।

কার ভাল লাগে এসব শুকনা আলাপ! গাছের গোড়া কেটে আগায় জল দান। আমার সামাজিক, আর অর্থনৈতিক অবস্থাকে কটাক্ষ করে তারা কেন আমার প্রশংসা করছে। আমার চেহারা কি শ্রমজীবী মহিলার! তা হবে কেন? আমি নিজের কাজ নিজে করছি,নিজের সন্তানদের কাজের ফাঁকে পড়া দেখিয়ে দিই, কারও কাছে তো সাহায্য চাই না। মানুষের গা পোড়ে কেন!এই ‘কেন’ সর্বক্ষণ আমাকে খেঁদিয়ে রাখে। শান্তি পাই না।

এম. এ পড়তে সুযোগ নেই। তাহলে কবে ঐ চাকরির বিজ্ঞাপন। দেখবো। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। একদিন সেটাও হাতে এলো। ইন্টারভিউ দিয়ে নগদ মিলে গেল অফিসারের চাকরি। ডাইরেক্টর বললেন, আজই জয়েন করেন, সিনিয়রিটির অনেক দাম, মিছেমিছি সেটি নষ্ট করবেন কেন? চাকরি পেয়ে অনুভব করলাম, খুশির চেয়ে চিন্তাই বেশি। শিক্ষকতা দিয়েই যে জীবনের ব্রত শুরু করলাম, নিজের পড়ালেখা একধারে হটিয়ে রেখে নোয়াখালীর স্কুলটা আঁকড়ে ধরলাম। সেখানে মহিলা সমিতি (আপওয়া) গড়ে সফল হয়েছি। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ মেডেল পেলাম। কজন পেয়েছে। মিছে আমার এই অফিসার হওয়ার মোহ। মনস্থির করে ফেলি। ওসব আমার জন্য নয়। মেয়েদের নিয়ে থাকবো। ওদের প্রতিভার বিকাশ দেখতে আমার ভাললাগে। সমাজে ভাল পেতে কেন নিজের ভাল লাগার কাজকে ছেড়ে যাব? তা হয় না। নিজের ভালবাসার কাজ নিজেকে কিছু পাইয়ে দেয়। এ আমার বিশ্বাস।

এতেই কাপড়, এতেই ভাত

আমি শিক্ষকতা ছেড়ে যাব না! মেয়েদের নিয়ে একটা সমিতি গঠন করবো,কাজে লেগে যাব, কাজ করতে চাইলে, সমাজকল্যাণ দপ্তর লাগে না। খুঁজলে খোদার সন্ধান মেলে। আমার সুযোগ এসে গেল। তৎকালীন ডি. পি, আই মোহাম্মদ শামছুল হকের স্ত্রী তৈয়বা হক ‘গৃহিণী সমিতি’ House wife’s Association করতে চান, আমি তার সাথে ভিড়ে গেলাম। Constitution তৈরি করে সেটি সমাজকল্যাণ দপ্তর থেকে রেজিষ্ট্রিও করান হলো। আমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে ছিল গরিব শিশুদের জন্য স্কুল স্থাপন, স্কুলগুলোয় টিফিন সরবরাহ, রান্না ও সেলাইয়ের ক্লাস খোলা, লন্ড্রি করা শেখান ইত্যাদি। একটা ম্যাগাজিন ‘গৃহিণী’ নাম দিয়ে প্রকাশনার কাজও হাতে নিলাম। সেলিনা খালেকও আমাদের সাথে ছিলেন। আজিমপুর অগ্রণী স্কুলের মাঠে মহিলাদের হাতের কাজ ও শিল্পকলার প্রদর্শনী ও মিনাবাজার করার ব্যবস্থা খুব শিগগির করে ফেললাম। সমিতির সদস্যসংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কারণ আমাদের কাজের সুনাম ও চর্চা মহিলা মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। এই সমিতির একটি সুন্দর দিক ছিল, যা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে। চীফ সেক্রেটারির স্ত্রী আমাদের সঙ্গে ছিলেন। কিনতু তাকে আমরা প্রেসিডেন্ট বানিয়ে দূরে সরিয়ে রাখিনি, কিংবা তিনিও আত্মমর্যাদা ও অহংকার নিয়ে আলগা হয়ে ছিলেন না। তিন বছর পর ইলেকশনে যারা অফিস বেয়ারার হতেন, তাদের যোগ্যতা নিয়েই তারা হয়েছিলেন। এছাড়া অন্য একটা সুন্দর ব্যবস্থা ছিল; প্রত্যেক মাসে একটা মিটিং হতো এবং ঐ মিটিংয়ে গৃহিণীরা নিজেদের হাতে তৈরি খানাপিনা, সূচির কাজ, যেমন— শাড়ি, রুমাল, ন্যাপকিন, টেবিল ক্লথ বিক্রি করার জন্য সাজিয়ে রাখতেন। আমরা একে অন্যের তৈরি জিনিস নগদ অর্থে কিনে নিতাম। পালাক্রমে প্রত্যেক সদস্যের বাড়িতে আমরা মাসিক সভা করেছি। এই প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে সমিতি ক্রমাগত নানাবিধ কল্যাণমূলক কাজে অগ্রসর; আমি এ ধরনের কাজে থেকে নিজের মনের দুঃখ এবং সামাজিক শ্রেণীগত বৈষম্য ভুলে থাকতাম। গৃহিণীদের স্ব-উপার্জিত স্কীমের আওতায় আমার একটা দিক ছিল,‘পটারি’, মাটির ঘটি, ফুলদানি, ব্যাংক, ম্যাট—এসব কিনে তাতে ডিজাইন তুলে বিক্রি করতাম। বার্ষিক মিনাবাজার হতো আমাদের। আমার স্টলের আয় বেশ ভাল ছিল। আয়ের এক-দশমাংশ আমরা সমিতির ফান্ডে দিতাম। মিসেস তৈয়বা হক অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী। তার পরামর্শে গৃহিণী সমিতি সুপরিচালিত হয়েছিল। আমাকে তিনি একজন সৎ কর্মী এবং পরিশ্রমী বলে সব সময় কাজে ডাকতেন। সেই সময়টি বড় আনন্দের মধ্যে থাকতে পেরেছি। নিজকে মনের চাহিদার সঙ্গে ব্যস্ত রাখার কাজ করতে সুযোগ পেলাম। আমার সাথে হাত লাগাতে এগিয়ে এল বড় মেয়ে সাকী। আমাদের উভয়েরই ছবি আঁকার শখ, মাটির পাত্রে এবং পাকা বেলের শক্ত খোলের উপর রঙ তুলি দিয়ে ফুল-নকশা তৈরি করে রাখতাম আমাদের মিনাবাজারের স্টলের জন্য।

ছোটবেলায় ইচ্ছামতন ছবি আঁকলেও বড় হয়ে প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু মতিঝিল স্কুলে আসার পর আর্ট কলেজ থেকে তিনমাসের একটি ট্রেনিং নিলাম। স্কুল ছুটির পর। এটি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের একটি সৃজনী প্রকল্প ছিল। তিনি নিজেই শেখাতেন। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে তার ট্রেনিং ক্লাস। আমার উৎসাহ এবং শিল্প-চেতনার বিষয়াদি দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন এবং একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করার পরামর্শ দিলেন। তার কথায় ময়মনসিংহের একটা টান ছিল এবং প্রায়শ আঞ্চলিক ভাষায়ই কথা বলতেন। সেজন্যে আমারও খুব ভাল লাগতো। স্টীল লাইফ ছবি এবং বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্যের উপর চিত্র অংকন ছাড়াও আমি মাটির কাজ করতে ভালবাসি। তাই দুটো মূর্তি করলাম,একটা চুড়িওয়ালী এবং অন্যটা দইওয়ালা। কলোনিতে এই পেশার লোকজন দেখে তাদেরকে মডেল করে নিয়েছিলাম।জয়নুল স্যার আমাকে বললেন,এই দুর্লভ গুণটি নষ্ট করবেননা,আরও কোর্স করতে আসবেন।কিন্তু আর সে রকম সুযোগ পেলাম না। ভাবলাম ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই গুণ বিকশিত করার দিকেই মনোযোগ দেব, আমি তো শুধু ওদের মা নই,শিক্ষকও।

গৃহিণী সমিতির কাজ দ্রুত প্রসার লাভে আমরা প্রত্যেকেই আন্তরিক ছিলাম। ইস্কাটন গার্ডেনের দিকে সদস্য বেশি, সেখানে মিসেস হক দরিদ্র শিশুদের নিয়ে নিজেদেরই একটা ঘরে অবৈতনিক স্কুল খোলেন। ছিন্নমূল অসহায় শিশুদের আমরা পোশাক দেয়ারও ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। “শিশু বিতান’ স্কুলটির গোড়াপত্তন তখনই হয়েছিল।

সে সময় আমাদের কলোনিতে একটি স্কুল খোলার প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম। কলোনির সম্প্রসারণ হয়েছে। সরকারের আইডিয়েল প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টারের কক্ষে আমরা কলোনিবাসীরা একত্রিত হই। সোশাল ওয়েলফেয়ার অফিসার জনাব কামরুল হুদা সাহেব ছিলেন এই উদ্যোগের মূল ব্যক্তি। আমাকে এক্সিকিউটিভ কমিটিতে তিনি ঢুকিয়ে দিলেন। শিক্ষকতার সাথে আমার যে সমাজকল্যাণমূলক কাজের প্রতি উৎসাহ এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে, তার জন্য আমিও আগ্রহসহ কাজে লেগে যাই। সেই সময়ের সরকারী প্রাইমারি স্কুলের প্রভাতকালীন বেসরকারী আইডিয়েল স্কুলটি বর্তমানে বিশাল মহীরুহের মত দাঁড়িয়ে বছরের পর বছর বহু ছাত্রছাত্রীর হৃদয়ে শিক্ষা বিস্তারের কাজ করে যাচ্ছে। টিমওয়ার্ক করার মতো কাজ করলে জীবনের চলার, সাহস পাওয়া যায়; বিপদ, বাধা, অসুবিধা কাটিয়ে ওঠা সহজতর হয়। জীবন সম্পর্কে এই উপলব্ধি আমার এক দুর্লভ অনুভূতি। কলোনিতে একটা স্কুল? আন্তরিকভাবে লোকজন এগিয়ে এসেছিল।

মতিঝিল মডেল স্কুলের কাজ যদিও স্বাধীনতার পরের ঘটনা, তবুও তখনকার কলোনির পরিস্থিতি কোন রকমেই উন্নত বলা চলে না।। স্কুলের সংখ্যা কম ছিল কিন্তু ডি টাইপ কোয়ার্টারের অফিসারদের। চাকর-চাকরানীদের ছিল বরাদ্দকৃত কোয়াটার। নাম সার্ভেন্টস কোয়ার্টার। অফিসারদের স্টাফরা যদি থাকেও সেখানে তারা সাবলেট করছে, নয়তো কোয়ার্টারের মালিকরা ভাড়া দিচ্ছেন। সেকালে দেড়শ দু’শ টাকা এভাবে পাওয়া গেলে কে এই সুবিধা ভোগ করবে না? কিন্তু এই ভাড়া লেনদেন হওয়ার উপলক্ষে এই এলাকা ছিন্নমূল, উদ্বাস্তু এবং ভিখিরিদের আস্তানাতে পরিণত হয়ে গেল। দুর্গন্ধ, ময়লাযুক্ত ও জনাকীর্ণ এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। সবচেয়ে সর্বনাশা দিক ছিল এখানে রাতের অন্ধকারে নানান অসামাজিক কাজ চলছিল। আমি থাকি অনতিদূরে দুই নম্বর ডি টাইপে। ওখানকার অশ্রাব্য ঝগড়াঝাটিতে – রাতে ঘুমানো যেত না।

এই সার্ভেন্ট কোয়ার্টার উঠিয়ে দেয়ার বিষয় নিয়ে আমরা হন্যে হয়ে উঠি। রাজনৈতিক কর্মী মেজবাহ্উদ্দিন সাবু আমাকে মুরুব্বি মানে। তখন আমি মতিঝিলের হেডমিস্ট্রেস। একটি প্রস্তাব তৈরি করা হল। পরিবেশকে সুস্থ এবং বাস উপযোগী করার লক্ষ্যে অবিলম্বে সার্ভেন্টস কোয়ার্টার তুলে দিতে হবে এবং সেখানে একটা স্কুল স্থাপন আবশ্যক। সাবু স্বাক্ষর নিতে শুরু করে এবং আমি প্রথম সারির স্বাক্ষরদাতা একজন। আজকের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর বিদ্যাপীঠ স্থাপনের সময় আমার অংশগ্রহণের সাহস এবং কাজ করার অনুপ্রেরণা আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে। মানুষের ভাল করার সদিচ্ছা কখনও কাউকে প্রতারণা করে না।

আমার নিজের পাওয়া তো কম হল না। স্বামীর ছোটখাট মর্যাদার চাকরি নিয়ে কলোনিতে আমি মাথা তুলে চলতে পারলাম। ছেলেমেয়েদের সুখ্যাতি। ভাল ঘরের শিক্ষিত মায়ের ছেলেমেয়ে ওরা। ভাল না হয়ে পারে না। শুনতাম এসব মূল্যবান মন্তব্য। পরোক্ষে এ সত্যই প্রচার হতে লাগলো একজন মা শিক্ষিত হলে একটা পরিবার শিক্ষিত হয়। সমাজ শিক্ষিত হয়। উনিশ’শ বাষট্টি সনে Agency for International Development (I. D. A), U. S.-এর বৃত্তি পেলাম American University of Beirut Lebanon। Masters in Education. পূর্ব পাকিস্তান থেকে আমি, সেলিমা খাতুন (আমার সহকারী প্রধান। শিক্ষিকা), মতিঝিল বালক বিদ্যালয় থেকে একজন এবং ফেনী থেকে সাইফুদ্দিন জেলা শিক্ষা অফিসার, এই বৃত্তি পেয়েছিলাম। অবশ্য সিলেকশন ছিল পরীক্ষা পাসের মধ্য দিয়ে। আমার যাওয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন; এই বিরাট সংসারের দায়িত্ব কাকে দিয়ে যাব! ছেলেমেয়েদের দেখবে কে?

এমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত (এ ইউ বি) যেতে পথ বেঁধে দিল না কেউ

অবাস্তব ঘটনার জের অনেক, সবাইকে কৈফিয়ৎ দিতে দিতে প্রাণান্ত। শেষে শুনতে হচ্ছে, এমন একজন মোল্লা-মুসল্লি স্বামী শেষে যেতে দিলে হয়, একটা স্কলারশিপ নষ্ট করছি আমি। আমার দুঃখ হতো। এরা তো জানে না, এই মানুষটি নিজের প্রিয়জনদের অবাধ্য এবং অপ্রিয় হয়েছিলেন একসময় আমাকে সাথে করে নিয়ে ব্রাবোর্ন কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। এখন তার মন-মানসিকতার কতটুকু দেখেছে! ভাল চাকরি করছে না। আর বয়সের থেকে বুড়ো মানুষ দেখে যাই ভাবুক না কেন অন্যরা, আসলে আমি ঠিকই ছাড় পাব। বৈরুত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কড়া নিয়ম-কানুনের চিঠি ছিল সঙ্গে; রাত দশটার পর হোস্টেলে ফিরলে তার সীট ক্যান্সেল হয়ে যাবে। এই চিঠিতে অভিভাবকের সই লাগবে। স্বামী সই দিলেন,মুখে হাসি। একটি কঠিন পরিস্থিতিকে এভাবে তার সহায়তায় সামলে উঠতে পেরে আমি সাহসী হয়ে উঠি। ভাগ্য প্রসন্ন হলে এমন-কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা, আমার উপর খবরদারি এবং হোস্টেলের কড়া নিয়ম।

 কিন্তু কঠিন সমস্যা অন্যদিকে। একজন দুজন নয় সাতজনের দায়িত্বভার, এ যে অসম্ভব! এমন লোকের ঘাড়ে দিয়ে যাব? ইনি তো Spare the rod and spoil the child নীতিতে ঘোর বিশ্বাসী। ইতিমধ্যে আমার বেতনের চেক বইতে সই এবং নগদ টাকা যা ছিল আমার, সংসার খরচ বাবদ স্বামীর হাতে তুলে দিলাম। উনিও নিজের বুবু ও ভাগ্নি (খুশী ওর নাম, আমার বড় মেয়ের বয়সী)-কে ঢাকায় নিয়ে আসেন। সংসারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে দেখছিলাম ওকে, বেশ উফুল্ল। এতটুকু ভীত নন। আল্লাহ ভরসা বার বার করে বলেন, বুজান আর খুশী এসেছে, আর অসুবিধা কি? এদিকে আমার আদরের কাজের মানুষটি বেঁকে বসে। শরবত আলীর মা সে। বাপরে এমন নিষ্ঠুর মাইয়া মানুষ! সব ফেইলা কই যায়! ব্যাটা ছেইলার এমন রাগ, ছাওয়ালদের মাইরা আস্ত রাখবো না। আপা আপনে গেলে কইলাম আমি থাকুম না। ওর কথার মধ্যে বাস্তব অভিজ্ঞতার ছোঁয়াচে ছিল। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, যাব না বলে ঠিকও করেছি, কিন্তু উল্টো বোঝাতে লাগলেন স্বামী। বি. টি.পড়তে যাওনি? ওদের কে দেখেছিল? কথা সত্য হলেও পুরো সঠিক নয়। তখন আমার মা ছিলেন, উনিই আসলে দেখাশানা করছিলেন, তবুও আমি মাসে একবার করে ময়মনসিংহ থেকে নোয়াখালী আসতাম। এবারের পড়তে যাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে। অসম্ভবের মধ্যে পাড়ি দেয়া। কী জানি! শেষ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম। এ যাওয়া যেমন ছিল করুণ, তেমনই ছিল দীনহীন। যাওয়ার অনিচ্ছায় কোন গোছগাছ করলাম না। সরকার থেকে সকলে ‘পাঁচশ টাকা’র বিদেশযাত্রা এলাউন্স পেল; আমি তোলার সময় পেলাম না। ছোট্ট একটা বেতের সুটকেস কিনে তাতে দু চারখানা শাড়ি-ব্লাউজ সম্বল করে যে যাত্রা, তাতে কোন থ্রিল ছিল না; শুধু দুশ্চিন্তার বোঝায় বার বার বিমর্ষ হতে হয়েছিল। তবুও প্লেনে ওঠার আহ্বান শুনি! আমি কি দুঃসাহস করলাম? একদিকে মায়ের অন্তরের চিন্তা-ভাবনার টুটি চেপে রেখে, অন্যদিকে একজন পিতার দায়-দায়িত্বের ওপর ঠেলে ফেলেসে কে? আমি! প্লেনের দরজা বন্ধ করার জন্য স্টুয়ার্ড এগিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে অবাক! আমি দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম অবুঝের মত শব্দ করে। আমার সাথী ছিলেন অন্য দুজন শিক্ষক (সেলিমা ড্রপ করেছিল) সাইফউদ্দিন এবং বীরেন বাবু। ওরা এসে আমাকে বোঝাতে শুরু করে; আপনাকে বেশ শক্ত ভেবেছিলাম,আসলে মেয়েদের মন কাদামাটির মত নরম, আপনিও তাই। এমন করলে দেখবেন, যে জন্য যাওয়া, তা হবে না। যাওয়াই সার।

আমার মন মানছিল না, কান্নাও থামে না। এরই মধ্যে কাণ্ড কিছু ঘটে যায়। প্লেন আবার ঢাকামুখী, আবহাওয়া খারাপ। এলাহাবাদ ক্রস করার পর এবাউটটার্ন করে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে গেল। আল্লাহর এ অযাচিত দান একটুও নষ্ট করলাম না; সোজা স্কুটার নিয়ে বাসায়, রাত তখন দুটো বাজে। দরজা ধাক্কাই; কেউ খোলে না। আমি ফিরে এলাম, একথা বলায় আরও ভুল হয়ে গেল। ঘরের ভেতর জড়োসড়ো, ভয়ের আতংক। মায়ের গলা নকল করে ভূত এসেছে, ওদের ভয় দেখাচ্ছে। প্রায় আধঘন্টা ডাকাডাকির পর স্বামী দরজা খোলেন। তার চোখের পলক পড়ে না। আর ছোট ছেলেমেয়েদের অবস্থা আরও খারাপ, কাঁপছিল। ছোট ছেলে ‘শায়ের’ অঘোরে ঘুমুচ্ছিল। ওকে কোলে তুলে চুমো খেলাম। হাসতে হাসতে বললাম,বোকারা, এই সাহস নিয়ে তোরা থাকবি! মা কোনদিন ভূত হয়ে আসে না। জ্যান্ত আর আসল হয়েই আসে। এই আমাকে চিমটি কেটে দেখ-রক্ত বের হবে।

ভয়ের আতংক কেটে যাওয়ার পর ওদের বিস্ময়ের সীমা নেই! আমি কেন ফিরে এলাম? আর কি যাব না?নতুন জামা-কাপড় আনতে পারবো না? ইত্যাদি প্রশ্ন।

দেখলাম দুপুরে আমরা সবাই যা একত্রে খেয়ে গেলাম, আর ওদের খাওয়া হয়নি, বিছানা পাতা হয়নি। ঘরে মা নেই, কে এসব দেখবে! আমি আবারও ভাবলাম … কী করবো! কেন ফিরে এলাম? কিন্তু দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আমি যে অন্যরকম হতে পারি না। সব কাজ ঘাড়ে নিয়ে নিলাম, তাহলে আর চিন্তা নয়।

ত্রিশে অক্টোবর, উনিশ’শ বাষট্টি সাল। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে পিআইএ চড়ে বৈরুতে যাত্রা, পথে করাচিতে সাত দিন। ওরিয়েনটেশন ক্লাস করলাম। হোস্টেলে থাকার নিয়ম, কিন্তু আমি অনুমতি নিয়ে বান্ধবী মনার বাসায় উঠি। ওর গাড়ি আছে। যাতায়াতে সুবিধা পেলাম। আরও পেলাম খিস্তি-খেউর। ফকিরনীর মত এসেছিস কেন? দেশের একটা ইজ্জত আছে না। আমার বেতের বাক্সে কত কী ভরে দিল। আমি চোখ মেলে দেখলামও না। শেষে হাতে উলের সোয়েটার দিয়ে বলে দিল, বৈরুতে এয়ারপোর্ট তোকে বরফ বানিয়ে দিতে পারে, আর মুখ বানাস না-এটা পরে নিস। কথা ছিল সত্যি, ওর সোয়েটার আমাকে শীত থেকে রক্ষা করলো। পশ্চিম পাকিস্তানি ছেলেমেয়েরা তো গরম কোর্ট সাথে এনেছিল।

এয়ারপোর্টে আমাদের নিতে এসেছিল ভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত সিনিয়ররা। একশ বিশজন ছাত্রছাত্রী। মাইক্রোবাসে যে যার মত উঠে গেলাম। সেদিনের খাওয়ার ব্যবস্থাও তাদের ছিল। আমি গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট, আমাদের জন্য সমুদ্রঘেঁষা বোস্তানি হল। আমার রুমের জানালা দিয়ে ভূমধ্যসাগররের নীল জল যতদূর চোখ যায় দেখলাম। দুজনের রুম, কী সুন্দর নরম বেড, পড়ার টেবিল, সোফা। এত পেয়ে আনন্দ উপভোগ করতেও পারি না। একি যন্ত্রণা! রাত ভোর হতে সিনিয়ররা এসে আবারও নিয়ে গেল। শহর দেখানো, খাওয়ানো। সেদিন ছিল রোববার, ছুটির দিন। সোমবার ছিল আরও চমৎকার। অফিসে গেলাম, দু শ পাউন্ড অ্যাডভান্স মিলে গেল। এ হচ্ছে লেবানিজ পাউন্ড। তখন আমাদের টাকায় এক পাউন্ডে আড়াই টাকা। আমি পাব মাসে তিনশ পাউন্ড। মনে মনে নেচে গেয়ে উঠি। অনেক খরচ করতে পারবো। দোকানে গিয়ে মাত্র দুখানা শাড়ি হবে-তেমন পিস কিনলাম খুব সস্তায়। মাত্র পাঁচ পাউন্ড দিয়ে। ছেলেমেয়েদের জন্য সব জমিয়ে রাখবো। ওদেরও কপাল ভাল; মতিঝিল বয়েজ স্কুলের শিক্ষক শামছুল কবিরকে পেয়ে গেলাম। উনি দেশে আসছিলেন। বুক ভরিয়ে কত কী কিনেছিলাম। ছেলে ভুলানোর কাজ করে আমিও শান্তি পেলাম।

আমার রুমমেট এক চমৎকার বেলুচ মেয়ে, এডুকেশনে মাস্টার্স করছে। আমাকে ইতিমধ্যে আপন করে নিল। জিজ্ঞেস করে, তুমি রাতে ঘুমের মধ্যে কাঁদো, কি দুঃখ তোমার! মিথ্যে করে বললাম, বদঅভ্যাস। কিন্তু মেয়ে তো ছাড়ে না। শেষে বললাম-আমি পালিয়ে এলাম। ও হেসে বলে-ফাইন। আমিও তাই করেছি। বাবা এক আমিরের সঙ্গে বিয়ে দেবে-অলরেডি তার তিন বৌ রয়েছে। পালিয়ে বান্ধবীর কাছে গেলাম। বাবা খুব নামী-দামী লোক। বান্ধবী বাবাকে সোজা জানিয়ে দিল, এ নিয়ে গোলমাল করবেন না আঙ্কল ওকে বৈরুতে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নিন। সেখানে পাকিস্তানি মেয়েরা পর্দার মধ্যে থেকেই পড়ে। তারপর এই তিন বছর এখানে-এখন স্কলারশিপ পাই।

ওর নাম রেহানা, পদবিটা খুব কঠিন, মনে নেই। আমি ওকে সৌভাগ্যবতী বললাম, আর নিজেকেও তদ্রুপ ভাবতে ভাল লাগলো। প্রেম, ভালবাসার ঘরতো আমার আছে। উন্নত জীবন গড়ে তোলার জন্য, সন্তানদের জীবনে প্রতিষ্ঠা আনার জন্য আমি সংগ্রামে নেমেছি। অল্প বয়সে বিয়ে, ওদের অনেক জৌলুস এবং আমিরি চালচলন দেখে কত স্বপ্নই মনে এঁকেছিলাম, মহারাণীর ভাইয়ের বৌ। হীরে মুক্তোর গহনা পরিয়ে আমাকে এনেছেন। আমি তো রাণীর মতো থাকবো। মন যা চায় তা করবো। কত মজা করবো। এক সময়ে স্বপ্ন ভেঙে গেল।

ওদের জমিদারি চলে গেল, অভাব আর দারিদ্রের মধ্যে পড়ার কোন কথা ছিল না, তাও ভাগ্যে এসে করাঘাত করে গেল। কতজনই মনের সুখ উৎরিয়ে নিল। আমার সংসার এই বুঝি ভাঙে! ছেলেমেয়েরা সকলে বখে যাবে! শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আজ আমি এখানে; বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেলাম এবং চলে এলাম। আমার বুকের কান্না শুধু ছেলেমেয়েদের কষ্টের কথা মনে করি বলে। বিনিময়ে আমি পাবো সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার জীবন।

 আমার পারিবারিক কথা রেহানাকে বলে দিলাম অকপটে। ওর চোখে অশ্রু গড়াচ্ছে। ওর অনেক ভাইবোন। বাবা আর মাকে সেই চলে আসার পর আর তো দেখেনি। আমরা অতঃপর সমব্যথী, পরস্পর সুখের আর দুঃখের সাথী হয়েছিলাম। রেহানার স্বপ্ন ছিল অ্যামেরিকার হার্ভার্ড থেকে এডুকেশনে পিএইচডি করে সেখানেই থেকে যাবে, বিয়ে আর করবে না। অধ্যাপনা করবে। ওর বাবা ওকে আটকিয়ে না রেখে দেশ থেকে বেরিয়ে আসার সাহস করেছিলেন, তাকে আমি শ্রদ্ধা করলাম।

ক্লাস করে ফিরছিলাম, হোস্টেলের নোটিশ বোর্ডে আমার নাম, হাউজ ম্যাডাম ডেকেছেন। কেন? কী দোষ করলাম আবার? ভয়ে ভয়ে তার কাছে গেলাম। ইনি ভীষণ রগচটা, বদরাগী মহিলা, অ্যামেরিকান, বয়স সত্তর হবে। গুড আফটার নুন’ বলে তার অফিসে দেখা করলাম। অতঃপর যা শুনলাম,কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না-কি বলে? আমি বোস্তানি হলের সিনিয়র স্টুডেন্ট হব কিনা। উনি আমাকেই অ্যাসিসট্যান্ট পেতে চান। আমি ভয়ে জড়োসড়ো, পারবো না বললাম কোনমতে। উনি বললেন, “Why not? I see. You are the right person. Others are butterflies.” বুড়ো ম্যাম মিষ্টি হেসে আমার সাথে হ্যান্ডশেক শেষ করেন। বোর্ডে আমার নাম লিখে দিলেন টাঙ্গিয়ে। সোজা কথায় বোস্তানি হলের উনি মা আর আমি হলাম মাসি। ঐ বাটারফ্লাইগুলোর লাগামহীন চলাফেরার কিছু করবো না শুধু হলের নিয়ম-শৃংখলা এবং সোশ্যাল ফাংশানগুলো ঠিকমত manage করতে হবে আমাকে। তা খবরদারি আর নাচগান, খানাপিনার কাজ ভালই করেছিলাম। রওদা’ নামের এক সুন্দরী মেয়ে রাত দশটার পর হোস্টেলে এসে ঢুকতে পারেনি, বাইরে অদূরে একটা পাহাড় ছিল, পাথরের সিঁড়ি তাতে, ওখানেই আলুথালু হয়ে ঘুমিয়েছিল। গেটের আরবি গার্ডও কম যায় না; ইংলিশ শেখে না, বলেও না-বন্দুক উঁচিয়ে শুধু অর্ডার মেনে চলে।

আমরা পাকিস্তান থেকে যারা গিয়েছিলাম, শুধু Aid, Scholarship ছিল, নিজের সরকার কোন অর্থ দিত না। কিন্তু African & Arabianরা দেশ থেকেও টাকা পেতো। ওদের হাত ছড়িয়ে খরচ করা দেখলে নিজেদের অভাগাই মনে হতো। সত্যি বলছি। রওদা মেয়েটির নাকে খৎ দেয়া অর্থাৎ ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখিয়ে তবে তাকে হলে থাকার পারমিশান করিয়ে দিলাম আমি। পর পর তিনবার এমন করলে ওকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়ার সাবধান বাণী দিলেন হাউজ গভার্নেস। মধ্যপ্রাচ্যের মেয়েরা, যেমন—সিরিয়া, জর্ডন, তুরস্ক, জেরুজালেম ইরান এখানকার মেয়েরা স্কার্ট-প্যান্ট যদিও পরেছে, তথাপি রওদাদের মত অত বেপরোয়া কখনও চলতো না। আরবীয় মেয়ে ফাতেমার বাড়ি ছিল জেদ্দা, বাবা বিরাট ধনী। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা এই স্কার্ট ড্রেস পর কেন? তোমাদের বোরখা পরতে হয় না? ও হেসে বলে, জেদ্দা এয়ারপোর্টে তুমি আমাকে চিনতে পারবে না। এই ড্রেস ঐ পর্যন্ত … তারপর চোখমুখ ঢাকা আমি এক আরবি মেয়ে। ওরা ইংরেজি বলতো ভাল, দেশের বাইরেইলেখাপড়া, তবুও ‘টি’ বলতে পারতো না, ‘ত’ বলতো। কথায় কথায় ‘ফাদ্দাল’ বলতো। সে যাকগে, আর একটা সুন্দর কথা-আমরাও বলতাম, আহালুন সাহালুন… (আরে আসুন আসুন, সুস্বাগতম)।

সেখানে কড়াকড়ির মধ্যে অন্য একটা দেখতাম, মেয়েরা কখনও ছেলেদের হোস্টেলে যেতে পারতো না। ছেলেরাও মেয়েদের হোস্টেলে আসার নিয়ম ছিল না। তবে মেয়েদের হোস্টেলে বড় পার্লার ছিল, সমুদ্রের দিকে খোলা ডেক ছিল। ছেলেদের এখান পর্যন্ত এসে অপেক্ষা করার নিয়ম ছিল। এগুলোতে কোন অশালীন কাজ যাতে না হয়, সেটা আমাকে মনিটর করতে হতো। তাতেও মাঝে মধ্যে আফ্রিকান ছেলেগুলোর কটু কথা শুনতে হয়েছে আমাকে। খাঁচার ভেতরে বাঘের আক্রোশের মতো ওরা চোখমুখের ভাব করতো। আমি বাধ্য হয়ে কখনও বলতাম, ইচ্ছা হয় বাইরে থেকে ঘুরে আস, খেয়াল রেখো এবং রাত দশটার আগে ফিরিয়ে দিয়ে যেও। সুন্দর একটা ব্যবস্থার কথাও মনে পড়ছে। বছরে একদিন ‘ওপেন ডে’ দেয়া হতো। ছেলেরা হবে মেয়েদের ঘরের মেহমান, মেয়েরা ছেলেদের ঘরের। সাজসাজ রব সেদিন সকাল থেকে রাত দশটা অবধি। তবে কেউ দরজা লাগাতে পারবে না,সব ওপেন। রেহানার বন্ধু ছিল কয়েকজন, কিন্তু বিশেষ বন্ধু যে, সে ছিল বাঙালি। ওর থেকে মাথায় ছোট ৫-৬’, রেহানা সম্ভবত ৫-৭ ছিল। রেহানা আমাকে বলে বাঙালি মেয়েরা নাচতে জানে। তুমি আমাকে নাচ শেখাও; রবি ঠাকুরের গান শেখাও,‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথে’ আমি বললাম, কেউ আমাকে এসব শেখায়নি। তোকে কেমন করে শেখাই। ও বিশ্বাসই করে না। বলে, হিন্দু কালচারে সকলকে নাচগান শিখতে হয়। তোমরা ইস্ট পাকিস্তানিরা সেই কালচারে বড় হয়েছ, তুমি পারবে… অগত্যা নাছোড়বান্দা মেয়েটিকে সামান্য একটু দেখিয়ে দিলাম,‘খর বায়ু বয় বেগে চারদিক ছাই মেঘে,’ এই গানটি যতটুকু পেরেছি আমরা দুজনে করলাম, নাচলাম। তার কয়েকজন বন্ধু নিয়ে আমাদের ঘরে ‘ওপেন ডে’ করলাম। লেবাননের তখনকার প্রাইম মিনিস্টার রশিদ কারিমি আমাদের ঘরে এসে বসেছিলেন। আমি বাঁশগাছ, নদী, নৌকা-এই দৃশ্য এঁকে ঘর সাজিয়েছিলাম।

ভাল কাজের সুনাম হলে আর রক্ষা নেই। All Pakistan Association ইলেকশন হচ্ছে। রেহানার বিশিষ্ট বন্ধু ছিল খাজা আজাদ, ও আমার নাম প্রস্তাব করলো, Education Section-এর সেক্রেটারি পদের জন্য দাঁড়াতে হবে আমাকে। কী গুণ আছে আমার? কোনোমতে ইংলিশ বলি, উর্দুও তেমন। ভাষা শিখতেই পারলাম না, কাজ করবো কোন মুরদে! কিন্তু কপাল আমার সর্বনাশী। ভোটে আমি জয়ী হলাম। লাহোর কলেজের একজন প্রফেসরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম। তিনি ভোট পেলেন কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানির, বাকি সব আমাকেই চাইলো। অতঃপর দায়িত্ব পালনে ভয় পেলেও আমার মধ্যে ভাল কাজ করার যে নেশা আছে তা দিয়ে সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারলাম। অবশ্য এ কাজে আমি সাইফউদ্দিন, রেহানা, আজাদ এবং আমার এক বাঙালি নার্স বান্ধবীর প্রচুর সাহায্য এবং সহযোগিতা পেয়েছি। সর্ব প্রথম আমি একটি Cultural show throw করলাম। এতে আমার কাজ অনেকখানি এগিয়ে নিয়েছিল।

সৌদি আরবে শিক্ষা সফর manageকরার কাজটি ছিল আমার বাড়তি পাওয়া। বৈরুতের রাস্তায় নানদের খপ্পরে পড়তাম। ওরা ফ্রি বাইবেল গছিয়ে দিয়েছিল। ভাবলাম মুসলিমদের কিছু নেই এখানে? ছিল। ইসলামিক সেন্টার। সেখানে অনেকেই কুরআন তেলাওয়াত করছিল। আমিও বসে গেলাম। একজন আমাকে প্রশ্ন করে, ইস্ট পাকিস্তানে মহিলারাতো হিন্দুর মত চলে, আপনি এত সুন্দর পড়লেন? কোথায়। শিখলেন? এ ধরনের অপমানসূচক কথা হজম করেছি অনেক। কিন্তু ভাল একটা কাজ এই সেন্টারের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করতে পারলাম আমরা। বাদশাহ ফয়সল তখন শিক্ষামন্ত্রী। তার কাছে আবেদন করলাম, আমরা চল্লিশজন মুসলিম ছাত্রছাত্রী সৌদি যেতে চাই। বাদশাহী মেজাজ-সব বিনে খরচায় মঞ্জুর। শুধু প্লেন ভাড়া দিতে হয়েছিল। উনিশ শ বাষট্টি সালের ঐ শিক্ষা সফরের অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন দৃশ্য চোখের সামনে তুলে ধরে। জেদ্দার সরকারি প্রাইমারি স্কুল আমাদের কল্পনার অতীত। কি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, কত অনুবাদ! শেক্সপিয়ার, কীটস, বায়রনের সাহিত্য আরবিতে ছোট ছোট শিশুরা পড়ছিল। কী পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। এছাড়া বেদুইনদের জন্যও ফ্রি শিক্ষা, বই পুস্তক ফ্রি, শিশুদের জন্য সুন্দর ড্রেস, বসার জন্য ছোট মাপের ডেক্স। মনে কষ্ট হলো এই ভেবে, আমরা শিক্ষার বড়াই করি, কিন্তু শিশুদের জন্য এমন চমৎকার পড়ার পরিবেশ দিতে পারি না। দুর্ভাগা দেশ আর দুর্ভাগ্য কবলিত তার শিশুরা। ‘আমি সংসারভারে ন্যুজ এক অভাবী মহিলা। কী করতে পারবো দেশের শিশুদের জন্য ! কিন্তু চেষ্টা করে দেখতেতো পারি! প্রাইমারি স্কুল দিয়েই যে আমার জীবনযাত্রা শুরু করেছি।

মক্কা শরীফের আসল সেই পবিত্র মসজিদ বায়তুল হারামে উপস্থিত হয়েও আমার বিচিত্র অনুভূতি। যখন তোয়াফ করছিলাম, স্বামীর কথা মনে করি। আমার মনের অস্থিরতা দেখে, তিনিই জোর করে বৈরুতে পাঠালেন। নিশ্চয়ই তার জন্য কোন মহৎ এবং নেক কাজ করার উদ্দেশ্য আল্লাহ নিজ হাতে তৈরি করেছেন। নাহলে এই শিক্ষা সফরে। অ্যাডভান্স ছ’শ পাউন্ড আমি খরচ কিছুতেই করতাম না। হাতে অর্থ ছিল না, সতীর্থরা চাঁদা করে দিয়ে দিলো। যাওয়ার পথে একরকম জোর করে ঠেলে দিলো। তাই কালো পাথর (আসওয়াদ) এ মুখ ঠেকিয়ে প্রার্থনা করলাম, আল্লাহ আমাকে এই তৌফিক দাও, যেন আমি এই কাজটা করতে পারি-আমার সারাজনমের সুখ-দুঃখের সাথী, আমার পরহেজগার স্বামীকে হজ্বব্রত পালন করার জন্য এই এখানে হাজির করাতে পারি।

মানুষের অন্তরের নিবিড় ডাক আল্লাহ শোনন, আমি সেই বিশ্বাস নিয়ে সব সময় চলি। আমার সাথের মেয়েরা আমি খোদার কাছে কি চেয়েছি জানতে চাইলে বেশ গম্ভীর হয়ে বলে দিলাম, আমাদের কালচারে নিষেধ আছে, নিজের মনের মোনাজাত অন্য কাউকে বলতে হয় না, বললে ফল পাওয়া যায় না।

বৈরুত শহর ভূমধ্যসাগরের উপকূলে একটি স্বাস্থ্যকর স্থান। ছাত্রছাত্রীরা সকলেই বেশ সুন্দর এবং স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠলো সহসা। আপেল, আঙুর আর কমলালেবুও হাত বাড়ালেই কেনা যায়, সস্তা এবং সুস্বাদু। তারপর আমরা খেতাম গাজরের জুস। সমুদ্রের পাড়ে এসব খাওয়ার ছোট ছোট দোকান ছিল। আমিও বাদ গেলাম না।

শরীর দিব্বি সুন্দর হয়ে গেল দেখতে। সবাই বলে, কী এসেছিলে আর কী হয়ে গেলে। তোমারই গায়ে ভূমধ্যসাগরের হাওয়া লেগেছে বেশি। ওদেরকে নিজের মনের কথা ব্যক্ত করি না। শরীরটা আমার বরাবর নিমকহারাম। মনের সাথে বিট্রে করে চলে। এত সংগ্রাম, এত পরিশ্রম মনকে কাহিল করে, পারে না এই দেহকে। কিছু না খেয়ে শুধু জলবায়ু পেয়েই এর প্রচুর পাওয়া হয়ে যায়। কারণ, খাওয়ার জন্য, নিজের অন্যান্য খরচের জন্য আমি ওখানকার সকলের চেয়ে কম পাউন্ড ব্যয় করতাম, আমার যে সংসারে সাতটি রত্ন রয়েছে, ওদের জন্যই মন পড়ে আছে।

একদিন আমার শিক্ষা উপদেষ্টা ডক্টর ক্যাজুলিয়াস দেখা করার জন্য চিঠি দিলেন। তার পরামর্শ ছিল, আমি কিছু কোর্স যেন বাদ দিয়ে অন্যগুলো নিই। স্কুল পরিদর্শন করার উপর জোর দিলেন, তাই -করলাম। স্কুলগুলো ফ্রেঞ্চ ভাষায়, মাত্র কয়েকটিতে ইংরেজি মিডিয়াম। উপায় কী, তাতেই রাজি হয়ে যাই। এভাবে তিনি আমাকে স্কুল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে এনে পরোক্ষে উপকার করে দিলেন। একটা কোর্সে আমার খারাপ রেজাল্ট হওয়ার আশংকা করছিলেন তিনি। তাই আমি যে বিষয় ভাল করতে পারি, সেটাই পড়তে উপদেশ দিলেন।

আমার বৈরুত অবস্থানকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তমিজ উদ্দিন খান এসে আমাদের খোঁজ-খবর করেন, কুশল জিজ্ঞাসা করেছিলেন-পাকিস্তান সোসাইটির এডুকেশন সেক্রেটারি হওয়ার মূল্য তখন নগদ পেলাম, ওঁরা আমার সঙ্গে মত বিনিময় করেছিলেন। মার্চ মাসে ‘পাকিস্তান ডে’, ভূমধ্যসাগরের কোলে জাহাজী ঢঙের এক দামী হোটেলে পার্টি। আমরা গেলাম। দেখছি সোহরাওয়ার্দী সাহেব এলেন। দুজন লেবানীজ তরুণী তাঁকে আগলিয়ে ধরে। দৃশ্যটি ভাল লাগলো না। শাড়ি পড়েছিলাম আমি। উনি দেখেই ডাকলেন। কিন্তু যাইনি। তখন মনের উদারতা ছিল না তো! পরে দুঃখ করলাম।

উনি অসুস্থ ছিলেন এবং বৈরুতে প্রয়াত হয়েছেন অল্প কয়েক মাস পর।

আমার এক নদীর জীবন (চতুর্থ পর্ব)

আমার এক নদীর জীবন (তৃতীয় পর্ব)

আমার এক নদীর জীবন (দ্বিতীয় পর্ব)

আমার এক নদীর জীবন (প্রথম পর্ব)

রওশন সালেহা

রওশন সালেহার জন্ম নোয়াখালী, ১৯২৯ সালী ১ জুলাই। বাবা ছিলেন আইনজীবী। কলকাতায় ম্যাট্রিক ও আইএ পড়েছেন। সাতচল্লিশে দেশভাগের পরে বিএ পড়বার সময় দেশে ফিরে এসে শিক্ষকতা শুরু করেন। বৈরুতে আমেরিকান ইউনির্ভাসিটি থেকে শিক্ষা প্রশাসন (UNESCO), দিল্লী এবং ব্যাংকক থেকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনে প্রশিক্ষন নিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। তিনি ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের জনশিক্ষা অধিদপ্তর ঢাকা থেকে ডিডিপিআই পদমর্যাদায় অবসর নেন। তাঁর প্রবল সাহিত্য অনুরাগের জন্য তিনি তাঁর সমকালীন বাংলাদেশের প্রধান প্রধান অনেক কবি সাহিত্যিকদের প্রায় সকলের সঙ্গেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর ‘আমার এক নদীর জীবন’ প্রকাশিত হবার পর আত্মজৈবনিক সাহিত্য তিনি শক্ত স্থান দখল করে নেন। ‘ফিরে এসো খামার কন্যা’ উপন্যাসের জন্য তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে পরিচিত।

Share